গ্রামসির কারাদণ্ডই ছিল মৃত্যুদণ্ডের সামিল

ঢাকা, মঙ্গলবার   ১৮ জুন ২০১৯,   আষাঢ় ৪ ১৪২৬,   ১৩ শাওয়াল ১৪৪০

গ্রামসির কারাদণ্ডই ছিল মৃত্যুদণ্ডের সামিল

স্বরলিপি ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ১৪:০৯ ২১ মে ২০১৯  

ফাইল ফটো

ফাইল ফটো

ইতালির ইতিহাসেই শুধু নয় বিশ্ব-রাজনীতির ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ নাম আন্তেনিয় গ্রামসি। ২০ বছরের কারাদণ্ড পেয়েছিলেন কিন্তু মুক্তির দিন এগিয়ে আসার অল্প কয়েকদিন আগে বন্ধ হয়ে যায় তার হৃৎক্রিয়া।

আন্তেনিয় গ্রামসি একাধারে রাজনৈতিক দার্শনিক, সাহিত্যিক, সংগঠক ও সম্পাদক ছিলেন। ইতিহাসে নজিরবিহীন ঘটনা ঘটিয়েছিলেন আন্তেনিয় গ্রামসি। তার ল্য দিরনে পত্রিকাকে কেন্দ্র করে সাংগাঠনিকভাবে লাখ লাখ মানুষ ঐক্য গড়ে তুলেছিল। ওই পত্রিকায় নিয়মিত ফ্যাক্টরি কাউন্সিলের গঠনতন্ত্র, নীতি ও কর্মপদ্ধতি প্রচার করা হত। এর বাইরে ফ্যাক্টরিতে গিয়ে শ্রমিকদের উদ্দেশ্যে বক্তব্য রাখতেন গ্রামসি।
  
গ্রামসির জীবনকাল ১৮৯১ থেকে ১৯৩৭ সাল পর্যন্ত। এর মধ্যে বিংশ শতাব্দিতে পৃথিবীতে ঘটে যায় বেশ কিছু উত্তাল ঘটনা,- প্রথম বিশ্বযুদ্ধ, ১৯৭১ সালে রুশ বিপ্লব, ফ্যাসিজমের বিকাশ ও ক্ষমতারোহন (প্রথমে ইতালি তারপর জার্মানি, ইউরোপ জুড়ে কমিউনিস্ট পার্টি গঠন, বলশেভিক বিপ্লব মডেলের অণুপ্রেরণায় বিপ্লব সংগঠনের তাড়না এবং পরাজয়।

ইউরোপকেন্দ্রিক এইসব ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে গ্রামসির চিন্তার পরিসর হয়েছিল। তার ভেতর দায়বোধ তৈরি হয়েছিল সার্দিনিয়ার মাটি ও মানুষকে মুক্ত করার দায়বোধ। বলে রাখা ভালো, ইতালির উত্তর সমৃদ্ধ হয়েছে দক্ষিণকে বঞ্চিত করে। আর সার্দিনিয়া হলো ইতালির দক্ষিণে থাকা এমন একটি প্রদেশ যেটা ইউরোপের মধ্যে আফ্রো-এশীয় কোনো উপনিবেশিত দেশের মতো। গ্রামসি প্রথমে সার্দিনিয়া -জাতীয়তাবাদে উদ্ধুদ্ধ হন পরে প্রলেতাবীয় আন্দোলনের মাধ্যমে হয়ে উঠেছিলেন আন্তর্জাতিকতাবাদী।

কিন্তু ফ্যাক্টরি কাউন্সিল ব্যর্থ হয়েছিল। তার কারণ তৎকালীন ইতালীয় ইউনিয়নগুলো অসহযোগিতা করেছিল। ফ্যাক্টরি কাউন্সিল আন্দোলনের পর গ্রামসি বুঝতে পেরেছিলেন, কৃষক -শ্রমিকের আন্দোলনের মাধ্যমে রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করা সম্ভব নয়। তিনি মনে করতেন, সোসালিস্টদের নিরলিপ্ততার জন্যই ইতালিতে দ্রুত ফ্যাসিবাদ প্রতিষ্ঠা পেয়েছে।

গ্রামসির মতে এই ফ্যাক্টরি কাউন্সিলের সঙ্গে ট্রেড ইউনিয়নের ফারাক অনেক। প্রথমত, কারণ তারা এক অর্থে পুঁজিপতিদের কাছ থেকে উৎপাদনের ওপর নিজেদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে পারে। অন্যদিকে ফ্যাক্টরি কাউন্সিল শাসনপদ্ধতির ভিত্তিতে গঠিত হয়।

১৯২১ সালের ১৫ জানুয়ারি লিভোর্ন শহরে ইতালিয় সোসালিস্ট পার্টির ১৭ তম জাতীয় কংগ্রেস বসে। গ্রামসি সেই সম্মেলনে যোগ দিয়েছিলেন তার গঠিত কমিউনিস্ট গ্রুপের প্রতিনিধি হিসেবে। কিন্তু কংগ্রেসে গ্রামসির তৎপরতা তেমন ছিল না।

তিনি মারকসের সৃজনশীল চরচার পক্ষে ছিলেন কিন্তু অন্ধভাবে কিছুই মেনে নেননি। তিনি মনে করতেন বিপ্লব নিজেস্ব পথ নির্ধারণ করা না গেলে তা ব্যর্থ হতে বাধ্য।

১৯২৫ সালে জিওলিয়াও গ্রামসি দম্পত্তির প্রথম পুত্র সন্তান জন্ম নেয়। পুত্রকে দেখার জন্য কমিন্টার্নের কার্যনির্বাহী কমিটির অধিবেশনে যোগ দিতে গ্রামসি সংক্ষিপ্ত সফরে মস্কো আসেন। এরপর তিনি রোমে ফিরে যান।

১৯২৬ সালের শেষের দিকে জিওলিয়া অন্তঃসত্ত্বা অবস্থায় মস্কো ফিরে যান। সারা ইতালিতে তখন নৈরাজ্য। আবার গ্রামসি আদর্শ হিসেবে বেছে নিয়েছিলেন সোভিয়েত ইউনিয়নকে সেখানেও চলছিল ক্ষমতার দ্বন্দ্ব। এরই পরিপ্রেক্ষিতে গ্রামসি সিপিএসইউকে একটি চিঠি লিখেন-তা সময়ের বিবেচনায় একটি গুরুত্বপূর্ণ দলিলে পরিণত হয়। পুলিশের নজরে ছিলেন গ্রামসি এরপর রোমেই গ্রেফতার হন। 

গ্রামসির কারাদণ্ডাদেশ ছিল মূলত মৃত্যুদণ্ড। কারাবরণের পর থেকেই গ্রামসি শারীরিকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়েন, কারা কর্তৃপক্ষের উদাসীনতার জন্য বিশেষভাবে দায়ী। এই সময়ে তিনি স্ত্রী-ও দুই সন্তানের সঙ্গে দেখা করতে পারছিলেন না। এমনকি দ্বিতীয় সন্তান জিওলিয়ানোকে কখনো দেখার সুযোগই পাননি গ্রামসি। তার ভাষায়-‘আমার জীবনের সঙ্গে জড়িত দ্বিতীয় কারাগার’।

গ্রামসির লেখা অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বই হলো- প্রিজন নোটবুক। এটি তার কারাজীবনের খণ্ডিত ও অসম্পূর্ণ লেখা। কারা নজরদারি ও নিষেধাজ্ঞার আওতায় থেকেই তিলেখাকালীন গ্রামসির বন্ধু কেমব্রিজ অর্থনীতিবিদ পিয়েরো স্রাফার প্রয়োজনীয় বই ও জার্নাল সরবরাহ করতেন। অন্যদিকে গ্রামসির শ্যালিকা তাতিয়ানা শেষ মুহূর্তে গ্রামসির লেখাগুলো সরিয়ে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেছিলেন। প্রিজনবুককে বলা হয়ে থাকে টুকরো টুকরো বিশ্লেষণ ও সংশ্লেষণ। শ্রেণি বিদ্বেশ ও গৃহযুদ্ধ বাধানোর অভিযোগে ১৯২৮ সালে গ্রামসির বিচার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছিল। সেই বিচারে প্রসিকিউটর দাবি করেছিলেন, ২০ বছরের জন্য গ্রামসির মস্তিষ্কের ক্রিয়া নিবৃত্ত করা হোক’ বিচারকার্যে ২০ বছরের কারাদণ্ড হয় গ্রামসির।

এই সময়ের মধ্যে তিনি প্রিয়তমা স্ত্রীকে চিঠি লিখতেন, সেই চিঠি থেকে জানা যায় গ্রামসির স্ত্রী মনে করতেন দ্বিতীয় প্রেমে মজেছেন গ্রামসি। যার নাম তানিয়া। তানিয়াকে কটাক্ষ করে চিঠি লিখেছিলেন গ্রামসির স্ত্রী জিওলিয়া।

বিষয়টি বন্ধবী তানিয়ার মাধ্যমে অবগত হয়েছিলেন গ্রামসি। তবে তিনি বিষয়টিকে ভালোভাবে নেননি বলে স্ত্রী জিওলিয়াকে ফিরতি চিঠি লিখেছিলেন। একই সঙ্গে তানিয়াকেও চিঠির মাধ্যমে জানিয়েছিলেন সীমা অতিক্রম না করতে। 

১৯৩৭ সালের ২০ এপ্রিল অনেক বেশি অসুস্থ হয়ে পড়েন গ্রামসি। ২৫ তারিখে তার মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণ হয়, এবং জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন। পরদিন বিকেলে হৃৎক্রিয়া বন্ধ হয়ে মারা যান গ্রামসি। ইতালিজুড়ে তখন বিশ্বযুদ্ধের পদধ্বনি। ইতালি দখল করে নেয় আবিসিনিয়া।

তথ্যসূত্র: গ্রামসি পরিচয় ও তৎপরতা ও ইন্টারনেট    

ডেইলি বাংলাদেশ/এমআরকে