গোলাবারুদ বাহী ট্রেনের বগি ফেলে দেয়া হয়

ঢাকা, বৃহস্পতিবার   ২৩ মে ২০১৯,   জ্যৈষ্ঠ ৮ ১৪২৬,   ১৭ রমজান ১৪৪০

Best Electronics

গোলাবারুদ বাহী ট্রেনের বগি ফেলে দেয়া হয়

শামসুল হক ভূঁইয়া,গাজীপুর ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ২০:৩৭ ১১ মার্চ ২০১৯   আপডেট: ২০:৩৯ ১১ মার্চ ২০১৯

মুক্তিযোদ্ধা আলীম উদ্দিন বুদ্দিন

মুক্তিযোদ্ধা আলীম উদ্দিন বুদ্দিন

গাজীপুরে মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর সঙ্গে মিত্র ও মুক্তিবাহিনীর বড় ধরনের সম্মুখ যুদ্ধ বিবরণ তুলে ধরে বর্ণনা করলেন সেকশন কমান্ডার মুক্তিযোদ্ধা আলীম উদ্দিন বুদ্দিন, তিনি বলেন ঢাকার সন্নিকটে গাজীপুরে যুদ্ধের শেষ পর্যায়ে দখলদার পাকবাহিনীর ব্যাপক বিপর্যয় ও ক্ষয়ক্ষতিই তাদের পতন ও আত্মসমর্পণকে ত্বরান্বিত করে। স্বাধীনতা যুদ্ধে গাজীপুরবাসীর রয়েছে এক গৌরবোজ্জ্বল ভূমিকা। 

১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ চূড়ান্ত মুক্তিযুদ্ধ শুরু হওয়ার পূর্বেই ১৯ মার্চ গাজীপুরের মাটিতে সর্ব প্রথম হয়েছিল পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে সশস্ত্র প্রতিরোধ যুদ্ধ। সে সময় সারা দেশে স্লোগান উঠেছিল ‘জয়দেবপুরের পথ ধর, বাংলাদেশ স্বাধীন কর’। আবার বিজয় লাভের পূর্বক্ষণে ১৫ ডিসেম্বর গাজীপুরের মাটিতেই সংঘটিত হয়েছিল হানাদার পাক বাহিনীর বিরুদ্ধে মুক্তি ও মিত্র বাহিনীর সর্বশেষ বড় ধরনের সম্মুখ যুদ্ধ। স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় জয়দেবপুরের ভাওয়াল রাজবাড়ীতে ছিল পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর ক্যান্টনমেন্ট। অডিন্যান্স ফাক্টরি, মেশিনটুলন্স ফাক্টরিও ছিল তাদের দখলে। অবস্থানগত কারণে রাজধানীর পাশের জেলা গাজীপুরে পাক বাহিনীর একটি শক্ত ঘাঁটি হিসেবে বহাল থাকে মুক্তিযুদ্ধের প্রায় শেষ পর্যায় পর্যন্ত। 

২৫ মার্চের পর গাজীপুরের বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতা-কর্মী, ছাত্র, কৃষক - শ্রমিক ও স্বাধীনতাকামী জনগণ ভারতে প্রশিক্ষণ নিয়ে তারা জেলার বিভিন্ন পয়েন্টে যুদ্ধে অংশ নেন। ১৭ সেপ্টেম্বর মাজুখান রেল ব্রীজে পাঞ্জাবি সেনা ও রাজাকারদের সঙ্গে মুক্তিযোদ্ধাদের বন্দুকযুদ্ধ হয়। ১১ অক্টোবর ধীরাশ্রম এলাকায় এক যুদ্ধে কিছু পাঞ্জাবি সেনাকে মুক্তিযোদ্ধারা ধরে নিয়ে ডেমোরপাড়ায় আটকে রাখে। 

১৪ অক্টোবর রাতে ধীরাশ্রমে প্রায় এক মাইল রেল লাইন উঠিয়ে জয়দেবপুর জংশনের দক্ষিণ সিগন্যাল সংলগ্ন সেতুতে মাইন বিস্ফোরণ ঘটিয়ে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করা হয়। ৮ ডিসেম্বর মুক্তিযোদ্ধারা জয়দেবপুর রেল স্টেশনের কাছে মাইন বিস্ফোরেণ ঘটিয়ে ঢাকাগামী অস্ত্র গোলাবারুদবাহী একটি ট্রেনের কয়েকটি বগি ফেলে দেয়। এতে বেশ কয়েকজন পাকিস্তানি সেনা নিহত হয়। ১৩ ও ১৪ ডিসেম্বর মুক্তিযোদ্ধারা গাজীপুরে সেনানিবাসে সম্মিলিতভাবে আক্রমণ চালায়। পাকবাহিনী জয়দেবপুরে টিকতে না পেরে ঢাকা চলে যাওয়ার সময় ময়মনসিংহ-জামালপুর-টাঙ্গাইল থেকেও পাকবাহিনী মিত্র ও মুক্তিবাহিনী এবং বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকীর কাদেরিয়া বাহিনীর আক্রমণে বিপর্যস্ত হয়ে পিছু হটে সড়কপথে ঢাকার দিকে হঠতে শুরু করে।

এরা জড়ো হতে থাকে জয়দেবপুরের বর্তমান মহানগরের চান্দনা- চৌরাস্তায়। পিছু হটে আসার পথে পাকবাহিনী ব্রিজ কালভার্টসহ অনেক কিছু ধ্বংস করে দিয়ে আসে। পিছন থেকে মিত্র ও মুক্তিবাহিনী পাকবাহিনীর ওপর আক্রমণ অব্যাহত রাখে। পাকিস্তানিবাহিনী চান্দনা চৌরাস্তায় সমবেত হওয়ার সময় মুক্তিযোদ্ধা ও মিত্রবাহিনী কাশিমপুর  থেকে কামান-মেশিনগান ও অন্যান্য অস্ত্র এনে বাসন, ভোগড়া, মোগড়খাল, শরীফপুর এসব গ্রামে রাস্তার দু’পাশে অসংখ্য বাঙ্কার খনন করে অবস্থান নেয়। ১৫ ডিসেম্বর পাকবাহিনীর ২৫-২৬টি গাড়িবহর সহকারে বিরাট একটি কনভয় চান্দনা- চৌরাস্তা থেকে রওনা হয় ঢাকার পথে।

পুরো গাড়ি বহর ফাঁদপাতা অ্যাম্বুসে ঢোকার সঙ্গে সঙ্গে কাশিমপুর থেকে মিত্র ও কাদেরিয়া বাহিনী তাদের উপর কামান ও মর্টারের  শেল নিক্ষেপ করতে থাকে। একই সঙ্গে সড়কের দুই পাশে অবস্থান নেয়া মুক্তি ও মিত্রবাহিনীর গুলিবর্ষণে পাক হানাদার বাহিনী একেবারে বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে। ধ্বংস হয় ট্যাংক, কামান, মর্টার, যানবাহন ও  গোলাবারুদ। হতাহত হয় অসংখ্য পাকিস্তানি সেনা। মুক্তিযুদ্ধের শেষ পর্যায়ে ঢাকার কাছে এটাই ছিল পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর সবচেয়ে বড় বিপর্যয়। 

গাজীপুরের তৎকালীন জয়দেবপুরে ১৯৭১ সালের ১৯ মার্চ পাকিস্তান হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে প্রথম সশস্ত্র প্রতিরোধের দিনটিকে এবং প্রতিরোধে অংশ নেয়াদের রাষ্ট্রীয় ও মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতি চায় যুদ্ধকালীন মুক্তিযোদ্ধারা। তারা দীর্ঘ দিন ধরে গাজীপুর জেলা প্রশাসকের মাধ্যমে এ দাবি জানিয়ে আসছেন প্রধানমন্ত্রীর নিকট। একই সাথে বাংলাদেশ সরকারের মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হক এমপিকে ১৯ মার্চের মহানায়ক ঘোষণার দাবিও জানায়।

তিনি আরো বলেন, ছাত্র অবস্থায় আপনজনদের মায়া ছেড়ে দেশের জন্য কয়েক বন্ধু মুক্তিযুদ্ধের প্রশিক্ষণ নিতে ভারতে যান। সেসময় ভারতে যাওয়ার সময় পথে পথে পাকসেনাদের প্রতিরোধের মুখে যে কষ্ট করে নদী নালা খাল বিল পাড়ি দিয়েছি তা এখন মনে হলে শরীর শিহরিত হয়ে উঠে। তার উল্লেখযোগ্য ছিল ব্রাম্মণবাড়িয়া অতিক্রম করার কথা। সেদিনের তারিখ মনে নেই জানিয়ে তিনি বলেন,আমরা বেশ কয়েকজন এক সঙ্গে একটি নদী পার হওয়ার জন্য একটি নৌকায় উঠি কিন্তু পাশেই ছিল পাকসেনাদের টহল।

সেদিন ধরা পড়ার আশংকায় জিহ্বা শুকিয়ে যাওয়ার কথাও জানান তিনি কিন্তু আল্লাহর অশেষ রহমতে পাকসেনাদের চোখ ফাঁকি দিয়ে নদী পার হয়েছিল তারা। আবার প্রশিক্ষণ শেষে দেশে ফিরে এসে জয়দেবপুর মেশিন টুলস এলাকায় পাক সেনারা চলে যাওয়ার দিন যখন মুক্তিসেনারা উপর এবং নিচ দিয়ে হামলা চালায় সেদিনও ভয়াবহ অবস্থায় পড়েছিলেন।

ডেইলি বাংলাদেশ/জেএইচ

Best Electronics