Alexa গুজবের বলি তাসলিমার শিশু সন্তানদের ভবিষ্যৎ কী?

ঢাকা, শনিবার   ২১ সেপ্টেম্বর ২০১৯,   আশ্বিন ৭ ১৪২৬,   ২২ মুহররম ১৪৪১

Akash

গুজবের বলি তাসলিমার শিশু সন্তানদের ভবিষ্যৎ কী?

 প্রকাশিত: ১৯:৪৬ ২৭ জুলাই ২০১৯  

অাফরোজা পারভীন, কথাশিল্পী, কলাম লেখক, সম্পাদক। জন্ম ৪ ফোব্রুয়ারি ১৯৫৭, নড়াইল। সাহিত্যের সকল ক্ষেত্রে অবাধ পদচারণা। ছোটগল্প, উপন্যাস, শিশুতোষ, রম্য, স্মৃতিকথা, অনুবাদ, গবেষণা ক্ষেত্রে ১০১টি পুস্তক প্রণেতা। বিটিতে প্রচারিত টিয়া সমাচার, ধূসর জীবনের ছবি, গয়নাসহ অনেকগুলি নাটকের নাট্যকার। `অবিনাশী সাঈফ মীজান` প্রামাণ্যচিত্র ও হলিউডে নির্মিত স্বল্পদৈর্ঘ্য `ডিসিসড` চলচ্চিত্রের কাহিনিকার। রক্তবীজ ওয়েব পোর্টাল www.roktobij.com এর সম্পাদক ও প্রকাশক। অবসরপ্রাপ্ত যুগ্মসচিব

আমাদের ছেলেমেয়েরা এতো উন্মত্ত হয়ে উঠেছে কেন? এত হিংস্র কেন তারা, কেন এত নির্মম! তারা নিজ হাতে পিটিয়ে মানুষ মারে, তারা মোবাইলে সহাস্যে সেই মারের দৃশ্য ভিডিও করে। কেন? এ কেনর কোনো জবার নেই।

আমরা কি  ছেলে মেয়েদের নৈতিক শিক্ষা দিতে পারছি না? মানুষের প্রতি সহমর্মিতা, ভালোবাসা, দয়া-মায়া এসব সুকোমলবৃত্তির জাগরণ ঘটাতে পারছি না? মূল্যবোধ নামে যে অদেখা জিনিসটির কথা আমরা বলি, সেটা কি আমরা হারিয়ে ফেলছি নিজেরাই? তাই শিক্ষা দিতে পারছি না সন্তানদের?  ধ্বস লেগেছে আমাদের মননে বোধে চেতনায়! যে শিক্ষা মানবিক, যে আচরণ নৈতিক তা আমরা সন্তানদের দিচ্ছি না, ওরা পাচ্ছে না। তাই ক্ষুব্ধ হচ্ছে, হিংস্র হচ্ছে। স্কুল কলেজ বিদ্যাপীঠ কি ওদের শুধু বইই মুখস্থ করাচ্ছে? চাকরিমুখী বিদ্যা রপ্ত করছে ওরা? মানবিকার শিক্ষা ওদের নেই? আমাদের সমাজ, রাষ্ট্র কি ওদের চাকুরে হবার, উপার্জনক্ষম হবার দীক্ষা দিচ্ছে, মানবতার শিক্ষা নয়?

এই যে অনেকগুলো জিজ্ঞাসা চিহ্ন এগুলোর কোনটিরই জবাব দেবার লোক নেই। জবাব হাতড়ে ফিরছে অসংখ্য মানুষ? প্রশ্নগুলো সারাক্ষণ ঘুরপাক খায় মনে। নুসরাত রিফাত রেনুসহ (তসলিমা) এমন অনেকের অসহায় মুখ মনে ভেসে উঠে দৃষ্টি ঝাপসা করে দেয়। হৃদয়ে ভাঙচুর তোলে। ওরা তো আমারই মা বোন, আমারই সন্তান। 

দেশ এগুচ্ছে, সূচক তাই বলে। বিশ্ব এগুচ্ছে বিজ্ঞানের ক্রম অগ্রগতি সেকথা বলে। তাহলে কেন আমাদের বোধ মনন  চেতনার উদ্দীপণ ঘটছে না, শাণিত হচ্ছে না। কেন আমরা সংস্কারমুক্ত আর উদার হচ্ছি না? কেন কানকথায় বিশ্বাস করছি, কেন গুজবে কান দিচ্ছি? যাচাই না করে আইন নিজ হাতে তুলে নিচ্ছি? আমরা কেন প্রতিনিয়ত অন্ধকারে হাঁটছি?  

একজন বলল, ওই মহিলা ছেলেধরা বা ওই পুরুষ ছেলেধরা। বলামাত্রই তাকে পিটাতে হবে। সে হয়ত গুছিয়ে কথা বলতে পারেনা। সবাই কি একইভাবে গুছিয়ে কথা বলতে পারে না। অনেকের স্বভাবগত তোঁতলামি আছে, অনেকে মুখচোরা, অনেকে অল্পতেই নার্ভাস হয়ে যায়, অনেকে মিতভাষী, কথা বলতে সময় লাগে। এই সময় লাগার মাঝেই বা একটু অগোছালো কথা বললেই সে ছেলেধেরা হয়ে গেল! যে মানুষটি বোবা তার কি সন্তানের প্রতি ভালবাসা নেই? সেকি সন্তানের খোঁজে বা তার লেখাপড়া সংক্রান্ত কোনো বিষয়ে স্কুলে যেতে পারবে না? সে যদি কথা না বলতে পারে তাকে পিটিয়ে মেরে ফেলতে হবে! 

দীর্ঘদিন এ দেশ বৃটিশদের অধীনে ছিল। তারপর পাকিস্তানিদের। বৃটিশরা নীলচাষের নামে এদেশে অনেক রকম নির্যাতন করেছে, লুটেপুটে নিয়েছে এদেশের সম্পদ। পাকিস্তানিরা এ দেশটাকে মেধাশূন্য বানানোর সবরকম চেষ্টা করেছে। শস্যদানা পর্যন্ত নিয়ে গেছে পাকিস্তানে। স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় নৃশংসতার রেকর্ড গড়েছে । কিন্তু তাদের আমলেও এমন প্রকাশ্যে পিটিয়ে সন্দেহের বশে মানুষ মেরেছে বলে শুনিনি। পাকিস্তান চলে গেছে। আমরা স্বাধীন। স্বাধীনতা কি আমাদের স্বেচ্ছাচারিতার লাইসেন্স দিয়েছে? 

‘ছেলেধরা’ এই অভিযোগে দু চারদিন পর পরই পিটিয়ে মারার খবর পাচ্ছি। সাভারের তেঁতুলঝোড়া ইউনিয়নে ২৫-৩০ বছর বয়সী এক নারী বাসাভাড়া নিতে এলে তাকে ছেলেধরা সন্দেহে পিটিয়ে মুমূর্ষু অবস্থায় ঢাকা মেডিকেলে আনলে চিকিৎসকরা তাকে মৃত ঘোষণা করেন।  কোনো বাড়ির বা কার ছেলে বা মেয়ে সে ধরে নিয়ে যাচ্ছিল সেকথা কিন্তু কেউ বলতে পারেনি। সে এলাকায় নতুন, এটাই তার অপরাধ। কেরাণীগঞ্জের কোলামুড়া এলাকায় অজ্ঞাতনামা একজনকে একই সন্দেহে পিটিয়ে মেরে ফেলা হয়েছে। মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্রের দেয়া তথ্য অনুযায়ী জুন ২০১৯ পর্যন্ত এই ৬ মাসে গণপিটুনিতে নিহত হয়েছেন ৩৬ জন। আর গত এক সপ্তাহে ৭ জন। 

সব ঘটনাই ঘটছে প্রকাশ্যে জোটবদ্ধ হয়ে। সবাই পিটাচ্ছে, কেউ বাঁচাতে এগিয়ে আসছে না। কাজেই কোথাও বিপদে পড়লে বা আক্রান্ত হলে মানুষ এগিয়ে এসে বাঁচাবে এ আশা আজ দুরাশা। বাইরে বেরুনোই এখন ভয়ের ব্যাপার। যাদের ছেলে মেয়ে স্কুল কলেজে, অফিস আদালতে যায় তারা আরও বেশি ভয়ে তটস্থ থাকে। কখন না জানি কি বিপদ ঘটে আর কী হয়ে যায়! 

তাসলিমা একসময় আড়ং-এ কাজ করতেন। স্কুলেও শিক্ষকতা করেছেন। ভালো ছাত্রী ছিলেন। বাবা মা চেয়েছিলেন তিনি ডাক্তার হন। কিন্তু জীবন তার সুখের হয়নি। স্বামীর স্বেচ্ছাচারিতায় তার সঙ্গে বিচ্ছেদের পর দুই সন্তান নিয়ে ভাইয়ের সাথে বসবাস করতেন মহাখালি এলাকায়। মেয়ের স্কুলে ভর্তির খবর নিতে গিয়েছিলেন বাড্ডার একটা স্কুলে। তখন কেউ একজন বলে দিলো সে ছেলেধরা।  আর সঙ্গে সঙ্গে সে গণপিটুনির শিকার হলো। যে নারী আড়ং-এর মতো প্রতিষ্ঠানে কাজ করেছেন, শিক্ষকতা করেছেন তিনি কথা বলতে পারেন না এ বিষয়টা মোটেও বিশ্বাসযোগ্য নয়। তিনি কথা বলার কোনো সুযোগই পাননি। হাজার হাজার লোক আরশোলার মতো ক্ষুদ্র কোনো প্রাণি মেরে ফেলার আনন্দে দুই দফা পিটিয়ে মেরে ফেলেছে তাকে। তিনি তাকিয়ে তাকিয়ে দেখেছেন তার মৃত্যু। একটু একটু করে বুঝেছেন তিনি চলে যাচ্ছেন বাচ্চা দুটোকে ছেড়ে। এখন কী হবে এই শিশু সন্তানদের? যে গুজব রটালো সে কোথায়? তাকে কি সনাক্ত করা গেছে? সনাক্ত করার চেষ্টা নেয়া হয়েছে? যারা পিটিয়ে মারলো তাদের কি সনাক্ত করা গেছে? সনাক্ত করার চেষ্টা নেয়া হয়েছে? যেখানে কোনো নির্দিষ্ট আসামির নাম না থেকে শত শত অজ্ঞাত আসামি থাকে সেখানে সুবিচার পাওয়ার সম্ভাবনা দূর পরাহত। সিসি ফুটেজে যাদের চেহারা দেখা গেছে তাদের সনাক্ত করা সহজ। নাম ধান বের করাও কঠিন নয়। একজন গ্রেফতার হয়েছে শুনেছি? অন্যরা? 

এসব প্রশ্ন একা আমার নয়। দেশের সুচেতনায় বিশ্বাসী অসংখ্য মানুষের।  তাসলিমার  মেয়ে এখন একবার হাসছে একবার কাঁদছে। সে বুঝতেও পারেনি তার মা চিরদিনের মতো হারিয়ে গেছে। তার বোন বিচারের দাবি জানিয়েছে, লক্ষ্মীপুরবাসী বিচারের দাবি জানিয়েছে । এমন দাবি আমরা প্রতিদিনই শুনি। শুনি আর ভুলে যাই। কারণ দুচারদিন পর আর আপডেট থাকে না। 

যেদিন আমার গলা থেকে চেনটা মীরপুর  রোড থেকে টান দিয়ে ছিনিয়ে নিয়ে মানুষের মধ্য দিয়েই হেঁটে গেল ছিনতাইকারী, যেদিন আমার হাত থেকে খাবলা মেরে মোবাইলটা কেড়ে  নিয়ে সোনারগাঁ সিগনালে ধীরে সুস্থে মানুষের মধ্য দিয়ে হেঁটে গেল ছিনতাইকারী, সেদিন আমার চিৎকারে কেউ এগিয়ে আসেনি। কেউ ছিনতাইকারিকে জাপটে ধরেনি। কেন ধরেনি? ওর হাতে ছুরি থাকতে পারে এই ভয়ে হয়ত ধরেনি। তাইই যদি হয়, সে মহিলা নিরস্ত্র নিরীহ তার উপর বুঝি সবাই মিলে ঝাঁপিয়ে পড়া যায়। কারণ সবাই নিশ্চন্ত যে সে আত্মরক্ষা করতে পারবে না। ছুরির বদলে ছুরি বা লাঠির বদলে লাঠি মারতে পারবে না?

রিফাতকে প্রকাশে ছুরির ওপর ছুরি মেরে মেরে ফেলা হল। সবাই তাকে ঘিরে ধরে মারের দৃশ্য ভিডিও করল। নয়ন বন্ডকে মারা হল। বলা হল ক্রসফায়ার। থলেতে শিশুর কাটা মাথা নিয়ে  নেত্রকোনার হরিজন পাড়ায় মদ্যপান করল এক যুবক। ধরা পড়ায় তাকেও গণপিটুনিতে মেরে ফেলা হল। এই বীভৎস চিত্রগুলি একটু ভিজুয়ালাইজ করার চেষ্টা করলেই শিউরে উঠছি । কোথায় আছি আমরা? এ  কোন অন্ধকার গহ্বর! 
সামান্য মোবাইলকে কেন্দ্র করে ঘটে যাচ্ছে হত্যাযজ্ঞ। সামান্য টাকা পয়সা আর তুচ্ছ স্বার্থে  ঘটে যাচ্ছে হত্যার মতো ঘটনা। ছেলে বাপকে রেয়াত করছে না, ভাই ভাইকে রেয়াত করছে না, স্ত্রী স্বামীকে রেয়াত করছে না। 

এই চরম অরাজক অবস্থার মধ্যে ছেলেধরা সন্দেহে পিটিয়ে হত্যার ঘটনা দিন দিন বাড়ছে। কোনো সচেতন মানুষেরই গুজবে কান দেয়া ঠিক না। প্রমাণ ছাড়া কোনো কিছু বিশ্বাস করা উচিৎ না। বিচার নিজের কাঁধে তুলে নেয়া অন্যায়। কিন্তু এই অন্যায় কাজগুলো প্রতিনিয়ত ঘটছে। এক শ্রেণির লোক গুজব ছড়াচ্ছে। বিষয়গুলি উদ্দেশ্য প্রণোদিত কিনা, সরকারকে বেকায়দায় ফেলার জন্য কিনা সেটাও বোঝা যাচ্ছে না । বোঝার কোনো চেষ্টা হচ্ছে বলেও মনে হয় না। 

একজন মানুষ মারা গেলে আমরা বলি, একজন মারা গেছে। কিন্তু তার পুরো পরিবারটি যে মারা যায় সে হিসেব কখনো করি না আমরা। তসলিমার মৃত্যু শুধু তার একার নয়, তার পুরো পরিবারের মৃত্যু সেকথা কি আমরা ভেবেছি একবারও!

ডেইলি বাংলাদেশ/আরআর