Alexa গানের রুদ্র-প্রাণের রুদ্র 

ঢাকা, মঙ্গলবার   ১৯ নভেম্বর ২০১৯,   অগ্রহায়ণ ৪ ১৪২৬,   ২১ রবিউল আউয়াল ১৪৪১

Akash

জ ন্ম দি নে র শু ভে চ্ছা

গানের রুদ্র-প্রাণের রুদ্র 

এইচ. এম. মেহেদী হাসান ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ১৪:১১ ১৬ অক্টোবর ২০১৯  

ছবি: লেখকের সৌজন্যে

ছবি: লেখকের সৌজন্যে

কবি কুসুম কুমারী দাশের ‘আদর্শ ছেলে’ নামের এই একটি মাত্র কবিতা ছাড়া আর ক’টি কবিতার কথাই-বা আমরা জানি? অথচ আজও তিনি বেঁচে আছেন মানুষের হৃদয়ে। 

কিংবা মধ্যযুগের কবি চণ্ডীদাসের ‘‘সবার উপরে মানুষ সত্য, তাহার উপরে নাই’’; তারও আগে যদি যাওয়া যায়, চর্যাপদের আটটি পদের কবি ভুসুকুপার ‘‘অপণা মাংসে হরিণা বৈরী’’ পংক্তি—এ সবই সদুক্তি প্রবচনে পরিণত হয়েছে। খুঁজলে পাওয়া দুষ্কর নয়-যে, চর্যাপদের সময় থেকে এখন পর্যন্ত এমন কবি-সাহিত্যিকের সংখ্যা অল্প নয়-যে অল্প লিখে অমর হন নাই।

সেই অল্প রচনা রচনাকারীর জন্য হয়েছে অমৃত, যা তাকে মরণের হাত থেকে রক্ষাই করেনি শুধু, অমরত্বের মর্যাদাও দিয়েছে। ‘মানবের মাঝে বাঁচার’ মাঝেই সে অমরত্ব আরো সার্থক হয়েছে। আবার ভুরিভুরি রচনা ও তার রচনাকারী হারিয়ে গিয়েছে কালের গহ্বরে, এও নির্মম সত্য। অর্থাৎ অসংখ্য রচনাই তার স্রষ্টাকে অমর করে না, উৎকৃষ্ট রচনা, যা আসলে মানুষের হৃদয়ে অনুরোণন সৃষ্টি করে, আরো সহজ করে বলতে গেলে মন ছুঁয়ে যায়, কালকে অতিক্রম করে, সেই রচনাই তার রচনাকারীকে অমরত্বের স্বাদ এনে দেয়।

এ দীর্ঘ ভণিতা যার জন্য তার কথা এবার বলা যাক, তিনি রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ। গেল শতাব্দের মাঝের দশকে যার জন্ম। বাংলা মাসের হিসেবে ১৩৬৩ বঙ্গাব্দের আশ্বিন মাসের ২৯ তারিখ; আর রোমান ক্যালেন্ডার হিসেবে ১৯৫৬ সালের অক্টোবর মাসের আজকের দিনে, অর্থাৎ ১৬ অক্টোবর। সে হিসেবে আজ থেকে ৬৩ বছর আগে তার জন্ম। কিন্তু বেঁচে ছিলেন মাত্র ৩৪ বছর! আমরা তাকে স্বল্পায়ূই বলবো, আসলে সৃষ্টিশীল মহৎ মানুষের মৃত্যু যখনই হোক, তা আমাদের কাছে সব সময় ‘অকাল’ বলেই মনে হয়। যদিও সুকান্তর মৃত্যু হয়েছিল আরো কম বয়সে, মাত্র একুশে। তার চলে যাওয়াকেও যথারীতি ‘অকাল’ চলে যাওয়াই বলি আমরা। সৃষ্টিশীল ছিলেন বলেই বলি, নইলে অল্প বয়সে মরে যাওয়া মানুষের অভাব তো নেই।

রুদ্রের প্রসঙ্গে ফিরে আসা যাক। রুদ্র যে অসাধারণ প্রতিভাধর কবি, এ নিয়ে কারো সন্দেহ নেই। জাতিসত্তার কবি মুহম্মদ নূরুল হুদার ভাষায় রুদ্র হলেন ‘‘দ্রোহ ও প্রেমের কাব্য ভাষা নির্মাণে শ্রেষ্ঠ বাঙালি কবিদের পংক্তিভুক্ত’’ এবং তিনিও রুদ্রকে ‘অকাল প্রয়াত’ই বলেছেন। কিন্তু তবু কবিতাই তার শ্রেষ্ঠ রচনা কিনা, কিংবা শুরুতে যা বলেছিলাম, অর্থাৎ বাঁচিয়ে রাখার মতো রচনা কিনা, তা নিয়ে বিতর্ক হতেই পারে। কিন্তু আমার কাছে মনে হয় রুদ্র কবিতার মানুষের কাছে যতটা সহজ করে উপস্থাপিত হয়েছেন, সাধারণের কাছে উপস্থাপিত হয়েছেন তাঁর গানের মাধ্যমে, আরো নির্দিষ্ট করে বললে একটি মাত্র গান তাকে অমরত্ব প্রদান করেছে। যদিও অর্ধ-শতাধিক গান তিনি রচনা ও তাতে সুরারোপ করেছেন। সেই একটি মাত্র গান আমরা কে না জানি, কে না গাই গুনগুন করে- ‘ভালো আছি, ভালো থেকো, আকাশের ঠিকানায় চিঠি লিখো।’ অল্পায়ু হয়েও শুধু এই গানটিই তাকে বোধকরি কালের পর কাল বাঁচিয়ে রাখার জন্য যথেষ্ট, নয় কি?

হ্যাঁ, তার সাতটি কাব্যগ্রন্থ, কাব্যনাটক, গল্প রচনার কথাও চলে আসবে। সেই সব রচনাও যে সমৃদ্ধ নয় তা বলার উদ্দেশ্যও যে আমার নয়; বরং রুদ্রও যে ভুসুকুপা, চণ্ডীদাস কিংবা কুসুম কুমারী দাশের মতো করে যুগের পর যুগ বেঁচে থাকবেন, সেই দিকটি বলাই আমার এই নিবন্ধের প্রকৃত উদ্দেশ্য। রুদ্রর ‘ভালো আছি ভালো থেকো’ গানটিই সাধারণ-অসাধারণ বাঙালির প্রাণকে গভীরভাবে আলোড়িত করতে পেরেছে, সীমানা অতিক্রম করতে পেরেছে।

যদিও রুদ্রর শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতি অঙ্গনে বেঁচে থাকবার জন্য, অন্তত আলোচিত থাকবার উপকরণ, তার স্বল্পায়ূ জীবনে অনেক রয়েছে। জাতীয় কবিতা পরিষদ, সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোট, বাংলাদেশ সংগীত পরিষদ-সহ নানা আন্দোলন-সংগ্রামে সংযুক্তি, কিংবা তসলিমা নাসরীনের সঙ্গে বিয়েতে আবদ্ধ হওয়া ও বিচ্ছিন্নতার দিকটি- এ সব ক্ষেত্রেই রুদ্র অবশ্যই আলোচিত হবেন, কিন্তু তা তার জীবনী-শক্তি নয়, যাপিত জীবনের অংশ মাত্র। বেঁচে থাকবার অমিয় শক্তি তো আছে তার ঐ একটি মাত্র গানেই, যে গান আজও সব মানুষের হৃদয়ে ঠাঁই করে নিয়েছে শ্রেণিভেদকে তুচ্ছ করে। আজও সে গান বাঙালির প্রাণে বাজে। রুদ্র হয়ে ওঠেন গানের রুদ্র, প্রাণের রুদ্র- বাঙালির অতি চেনা আপনজন।

ডেইলি বাংলাদেশ/আরআর
 

ডেইলি বাংলাদেশ/আরআর