গাছদের অদ্ভুত সুন্দর সংসার!

ঢাকা, বৃহস্পতিবার   ২৭ জুন ২০১৯,   আষাঢ় ১৪ ১৪২৬,   ২৩ শাওয়াল ১৪৪০

গাছদের অদ্ভুত সুন্দর সংসার!

সালমান আহসান নাঈম

 প্রকাশিত: ১০:৩২ ১২ জানুয়ারি ২০১৯   আপডেট: ১০:৩২ ১২ জানুয়ারি ২০১৯

ছবি: সংগৃহীত

ছবি: সংগৃহীত

বাংলাভাষী বিজ্ঞানীদের মধ্যে জগদীশচন্দ্র বসু জগৎ বিখ্যাত হয়ে আছেন ‌'গাছের অনুভূতি আছে' আবিষ্কার করে। তিনি দেখিয়েছেন, গাছেরা বাহ্যিক উদ্দীপনা সাড়া দিতে পারে শারীরিকভাবে। তার আবিষ্কারের শতবর্ষ পার হয়ে গেছে, বিজ্ঞান এখন অনেক এগিয়ে গেছে। গাছদের যে শুধু অনুভূতি আছে তা নয়, তাদের যে সমাজ আছে তাও আবিষ্কার হয়েছে!

অনেক আদিবাসী সমাজে প্রকৃতিকে একটি সত্তা হিসেবে দেখা হয়। তারা বিশ্বাস করে যে, প্রকৃতিতে সব জীবন মিলে একীভূত হয়ে আছে। জনপ্রিয় সায়েন্স ফিকশন চলচ্চিত্র 'এভাটার'- এ প্যানডোরা গ্রহের সব গাছ ও প্রাণীকে একটি নেটওয়ার্ক দ্বারা সংযুক্ত দেখানো হয়। এই চলচ্চিত্রে আদিবাসীদের বিশ্বাসকে বাস্তব রুপ দেয়া হয়েছে। মজার ব্যাপার হলো আদিবাসীদের এ ধারণার কিছু ভিত্তি আছে।

বিজ্ঞানীরা প্রমাণ পেয়েছেন যে, পৃথিবীর বনের গাছেরা একে অন্যের সঙ্গে আসলেই যুক্ত একটা নেটওয়ার্কের দ্বারা। যাকে তারা নাম দিয়েছেন উড ওয়াইড ওয়েব। এই নেটওয়ার্ক ব্যবহার করে গাছেরা একে অন্যের সঙ্গে যোগাযোগ করে জানিয়ে দেয় কখন পোকামাকড় আক্রমণ করছে। এমনকি তারা একে অন্যকে খাদ্য ও অন্যান্য রিসোর্সও পাঠাতে পারে।

এখন ব্যাখ্যা করা যাক এটা কীভাবে জানা গেল। Mycorrhiza হলো ছত্রাক ও স্থলজ উদ্ভিদের মূলের সঙ্গে সংযোগের মাধ্যমে গড়ে ওঠা মিউচুয়ালিস্টিক সম্পর্ক। এই ছত্রাকটি মাটি থেকে পানি ও বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ খনিজ শোষণ করে সরবরাহ করে গাছকে, আর গাছ তার বিনিময়ে খাবার দেয় ছত্রাককে। ছত্রাকটির দেহ মাটির নিচে ছড়ানো থাকে অনেক বড় স্থানজুড়ে।

বিজ্ঞানীরা আবিষ্কার করলেন যে, Mycorrhiza-তে থাকা এই ছত্রাকগুলো একই প্রজাতির অন্য ছত্রাকের মাইসেলিয়ামের সঙ্গে সংযোগ তৈরি করতে পারে। দুটো আলাদা উদ্ভিদের মূলের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা ছত্রাক যদি যোগাযোগ করতে পারে বা সংযুক্ত হয়ে যায় তার মানে তো উদ্ভিদ দুটোও সংযুক্ত হয়ে গেল, তাই না! এটা নিশ্চিত করতে বিভিন্ন ধরনের পরীক্ষা চলতে থাকলো। রেডিও-অ্যাক্টিভ ট্রেসার হিসেবে কার্বন আইসোটোপ দিয়ে চিহ্নিত শর্করা উদ্ভিদের দেহে প্রবেশ করিয়ে এর গতিবিধি দেখা হলো। দেখা গেল যে এই খাবার উদ্ভিদটির সঙ্গে যুক্ত ছত্রাকগুলোর মধ্য দিয়ে অন্য উদ্ভিদেও যাচ্ছে। সুতরাং মাটির নিচে ছড়িয়ে থাকা এই নেটওয়ার্ক ব্যবহার করে উদ্ভিদগুলো একে অন্যের সঙ্গে খাদ্য আদান-প্রদান করতে পারে।

এটা আবিষ্কারের সঙ্গে একটা অদ্ভূত বিষয়ও দেখা গেল। মা গাছগুলো তার বীজ থেকে জন্ম নেওয়া গাছদের শনাক্ত করতে পারে এবং প্রয়োজনে খাবার পাঠিয়ে সন্তানকে টিকে থাকতেও সাহায্য করে! এমনকি বড় বনের ছায়াঘন পরিবেশে এই সহায়তা ছাড়া সন্তান উদ্ভিদগুলো হয়তো কম বয়সে বাঁচতো-ই না। সন্তানদের প্রতি স্নেহ তাহলে একা প্রাণীরাই দেখায় না! কিছু জীব (যেমন ছত্রাক, পোকামাকড় ইত্যাদি) গাছের ক্ষতি করে। কেউ গাছে গর্ত খুঁড়ে ডিম পাড়ে, কেউ গাছের রস ও পাতা খায়। এমনকি এই কাজগুলো করার সময় গাছেদের কখনো কখনো রোগজীবাণু দিয়ে সংক্রমিত করে। গাছ তো নড়তে পারেনা, তাই এসব ক্ষতিকর জীবদের থেকে সে নানা উপায়ে নিজেকে রক্ষা করে। যেমন পোকামাকড়ের বিরুদ্ধে তার প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা হলো বিভিন্ন ধরনের বিষাক্ত রাসায়নিক নিঃসরণ করা। এসব রাসায়নিক নিঃসরিত হলে পোকামাকড় আর গাছের কাছে আসে না।

এই প্রতিরোধ ব্যবস্থা আলোচ্য নেটওয়ার্কের সঙ্গে যুক্ত কি-না, দেখতে নতুন পরীক্ষা চালানো হলো। একটা গাছে পোকামাকড় ছেড়ে দিয়ে চারপাশের প্রতিবেশী গাছের প্রতিক্রিয়া খেয়াল করা হলো। যখন প্রতিবেশী গাছগুলো এই আক্রান্ত গাছের সঙ্গে নেটওয়ার্কের দ্বারা যুক্ত থাকে, তখন ওই গাছগুলো আগেভাগেই পোকামাকড় তাড়ানোর রাসায়নিক ক্ষরণ করে। এভাবে তারা নিজেদের রক্ষা করে আক্রমণ থেকে। নেটওয়ার্ক দিয়ে যুক্ত না থাকলে তখন আর চারপাশের গাছগুলো রাসায়নিক ক্ষরণ করে না। সুতরাং এই নেটওয়ার্ক ব্যবহার করে বনের উদ্ভিদরা পোকামাকড়ের আক্রমণ প্রতিরোধ করে।

বনের উদ্ভিদের মধ্যে এই নেটওয়ার্কের অনেক কিছু এখনো রহস্যাবৃত। যেমন এই নেটওয়ার্ক ব্যবহার করে উদ্ভিদ শুধু সাহায্য না, একে অন্যের ক্ষতিও করতে পারে!  কিছু গাছ (ফ্যান্টম অর্কিড) এই নেটওয়ার্ককে ব্যবহার করে খাবার চুরি করে বেঁচে থাকে। কিছু গাছ এই নেটওয়ার্কের সুবিধা নিয়ে তার প্রতিদ্বন্দ্বী গাছের ক্ষতি করে। তারা এমন রাসায়নিক পদার্থ পাঠিয়ে দেয় যা ওই গাছগুলোর বৃদ্ধির হার কমিয়ে দেয়। অনেক বিজ্ঞানী মনে করেন যে, মানবসমাজের মতো এই নেটওয়ার্ক উদ্ভিদসমাজ তৈরিতে সাহায্য করেছে। অদ্ভুত ব্যাপার হলো উদ্ভিদের এ সমাজ কাজ করে মানবসমাজের মতো করেই। আমরা যেমন একে অন্যের সঙ্গে যোগাযোগ করি, উদ্ভিদেরাও এই ওয়ার্ল্ড ওয়াইড ওয়েব নেটওয়ার্ক ব্যবহার করে যোগাযোগ করে নিজেদের মধ্যে। আমরা যেমন একে অন্যকে সাহায্য করি, তাদের বিপদের সময় বা একতাবদ্ধভাবে বিপদকে মোকাবেলা করি, উদ্ভিদেরাও তা করে। তেমনি আমরা যেমন নিজেদের মধ্যে বিভেদ কোন্দলে জড়িয়ে পড়ি, তারাও তা করে। এই নেটওয়ার্ক তাই মানবসমাজের মতোই মিল-অমিলের এক অদ্ভুত সুন্দর সংসার।

ডেইলিবাংলাদেশ/এনকে