গর্ভপাত কি আসলেই নারী স্বাস্থ্যের জন্য হুমকি স্বরুপ?

ঢাকা, মঙ্গলবার   ১৮ জুন ২০১৯,   আষাঢ় ৪ ১৪২৬,   ১৩ শাওয়াল ১৪৪০

গর্ভপাত কি আসলেই নারী স্বাস্থ্যের জন্য হুমকি স্বরুপ?

আহমেদ সজিব   ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ১৬:৪৫ ১৩ জুন ২০১৯  

ছবি: সংগৃহীত

ছবি: সংগৃহীত

চলতি বছরের মে মাসে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আলাবামা রাজ্য সরকার গর্ভপাত নিষিদ্ধ করে একটি বিল পাস করে। পরবর্তীতে অন্যান্য রাজ্যগুলো ভ্রূণে হার্টবিট শনাক্ত হওয়ার পর গর্ভপাত নিষিদ্ধ করার অনুরূপ নীতি চালু করে। যদিও এই বিলগুলো প্রকৃতপক্ষে প্রয়োগ করা যেতে পারে কিনা তা নিশ্চিত নয়, তবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র একটি গর্ভপাতের তরঙ্গে ঘুরে বেড়ায়। এর সমর্থকরা দাবি করে, গর্ভপাত কেবল ভ্রূণের জীবনকেই নয় বরং মায়ের হুমকি দেয়। তবে একটি নতুন গবেষণায় বিপরীত প্রমাণ পাওয়া যায়। ৩০টি মার্কিন গর্ভপাত ক্লিনিক থেকে সংগৃহীত তথ্য অনুযায়ী, গর্ভবতী মহিলাদের জন্য কোনো স্বাস্থ্য ঝুঁকি নিয়ে গর্ভপাত করা হয় না তবে গর্ভপাত গ্রহণের অনুমতি দেয়া হয় না স্বাস্থ্য সমস্যাগুলোর কারণে।

সানফ্রান্সিসকো ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকরা, ২০১৪ সালের অনুদৈর্ঘ্য গবেষণায় ট্রেনওয়ে স্টাডি থেকে তথ্য ব্যবহার করেন যা গর্ভধারণের জন্য গর্ভবতী নারীদের স্বাস্থ্য অনুসরণ করে, কিন্তু কিছু ক্ষেত্রেই তারা গর্ভধারণ সীমা অতিক্রম করার পরে অস্বীকার করেছিল। গবেষকরা ৮৭৪ জন মহিলার স্বাস্থ্যের রেকর্ড পরীক্ষা করেছেন যারা ২০০৮ এবং ২০১০ সালের মধ্যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে গর্ভধারণের জন্য আবেদন করেছিলেন। অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে ৩২৬ জন প্রথম ত্রৈমাসিক গর্ভপাত পেয়েছিল, ৩৮২ টি দ্বিতীয় ত্রৈমাসিক গর্ভপাত করেছিল, এবং ১৬৬ জনকে গর্ভপাতের অস্বীকৃতি জানানো হয়েছিল এবং শিশু জন্মাতে দেয়া হয়েছিল।

প্রো-লাইফ গ্রুপগুলো কী পরামর্শ দিতে পারে তা সত্ত্বেও, গবেষণায় দেখা যায়, গর্ভপাত হওয়া নারীর শারীরিক স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর নয়। অন্যদিকে, গর্ভপাতের অ্যাক্সেস অস্বীকার করা স্বাস্থ্য সমস্যার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, গর্ভপাতকে অস্বীকার করার পাঁচ বছর পর, ২৭ শতাংশ নারী গর্ভপাত পেয়ে ২০ শতাংশ নারীর তুলনায় মোটামুটি সুস্থ হিসাবে তাদের মোট স্বাস্থ্যের রেটিং দেয়।

যারা গর্ভপাত পেয়েছে তাদের তুলনায় যারা জন্ম দেয় তারা দীর্ঘস্থায়ী মাথাব্যাথা, মাইগ্রেনাইনস এবং পেইন্টে যোগদান করার সম্ভাবনা বেশি। জন্ম দেয়ার পর প্রথম কয়েক সপ্তাহে দুই নারী মারা যান। এই গবেষণা গুরুত্বপূর্ণ কারণ এটি একটি অনন্য গবেষণা। এটি যে অন্যান্য গবেষণাকে ওপর স্পর্শ করেনি তা সহজেই উপলব্ধ করা হয়। উদাহরণস্বরূপ, এই গবেষণায় এমন মহিলারা জড়িত যারা গর্ভধারণ চেয়েছিলেন, তাদের জন্ম দেয়ার জন্য বেছে নেয়া হয়েছে। গবেষকরা বলেন, গর্ভাবস্থা চান এমন মহিলাদের জন্য বিষয়টি সাধারণত স্বাস্থ্যকর। এটি দ্বিতীয় ত্রৈমাসিক গর্ভপাত প্রাপ্ত মহিলাদের পরীক্ষা করে, যা প্রায়ই উপেক্ষা করা হয়। ফলাফলগুলো প্রথম এবং দ্বিতীয় ত্রৈমাসিকের মধ্যে গর্ভপাত হওয়া নারীদের মধ্যে স্বাস্থ্য ঝুঁকিগুলোতে কোনো পার্থক্য নেই বলে মনে হয়।

যদিও কোনো মার্কিন রাষ্ট্র (গর্ভপাতটি সাংবিধানিক অধিকার হিসাবে স্বীকৃত হয়েছে)তে গর্ভপাত নিষিদ্ধ করা হবে বলে মনে হয় না তবে এই ফলাফলগুলো গর্ভপাতের নারীর অধিকারের পক্ষে প্রমাণ হিসাবে গ্রহণ করা যেতে পারে। ‘যদিও কেউ কেউ যুক্তি দেন যে গর্ভপাত নারীর স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর তবে এই গবেষণা তথ্য নির্দেশ করে যে গর্ভপাত অস্বীকার করা নারীদের চেয়ে যারা গর্ভপাত করতে চেয়েছিলেন তাদের শারীরিক স্বাস্থ্য কোনও অংশেই খারাপ নয়। প্রকৃতপক্ষে পার্থক্য উদ্বুদ্ধ হয় যে, যারা জন্ম দেয় তাদের মধ্যে খারাপ স্বাস্থ্য প্রস্তাব করে।’ গবেষণায় এই কথাগুলো উঠে আসে।   

এবার আমাদের দেশের কথায় আসা যাক। উপমহাদেশের অন্যসব দেশের মত এখানেও গর্ভপাতকে সোশ্যাল ট্যাবু হিসেবে বিবেচনা করা হয়। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই স্বামী-স্ত্রীর দৈহিক যোগাযোগের অনিচ্ছাকৃত এবং অপ্রত্যাশিত কারণে দূর্ঘটনার মত স্ত্রী গর্ভবতী হয়ে যান। সর্বসাকুল্যে বললে, এখন আর ব্যাপারটা স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। অবিবাহিত যুবতীদের মধ্যে গর্ভপাতের বিষয়টি খুবই নেতিবাচক প্রবণতা হিসেবে পরিগণিত। এছাড়াও ম্যারিটাল রেপের কারণেও অনিচ্ছায় নারী প্রসূতি হয়ে পড়ে। এক্ষেত্রে গর্ভনিরোধে যথাযথ ব্যাবস্থা না নেয়াই দায়ী।

যাহোক,সামাজিক লজ্জায় নিমজ্জিত হয়ে অপ্রত্যাশিত গর্ভধারণের বিষয়টি লোকচক্ষুর আড়াল করে রাখতে আমাদের দেশের পরিবার অথবা যুবক-যুবতীরা স্বাচ্ছন্দ বোধ করে। অনেকে এমন দূর্ঘটনায় হীনম্মন্যতায় ভুগে নিজের স্বাস্থ্যের যত্ন নিতে অনাগ্রহী হয়ে পড়ে। এতে করে হিতের বিপরীত হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনাই বেশি। নানা প্রতিবন্ধকতা পেরিয়ে গোপনে কোনো হাসপাতালে বা ক্লিনিকে গর্ভপাত করলেও তারা স্বাস্থ্য অবনতির আশঙ্কায় থাকেন। এমনকি অনেকে দু’একবার গর্ভপাতের পর গর্ভধারণ ক্ষমতাই হারানোর চিন্তায় বিমর্ষ হয়ে পড়েন। তাদের জন্য বলতে গেলে একটা সুখবরই যে, গর্ভপাতের ফলে কোনো স্বাস্থ্য সমস্যা হয়না বরং সামাজিক কুসংস্কারের কারণে হীনম্মন্যতায় ভুগেই নিজের ক্ষতি ডেকে আনা হয়।

আমরা অবশ্যই গর্ভপাতের পক্ষে মত দিতে পারিনা। দৈহিক চাহিদা গগনচুম্বী হয়ে গেলে নিশ্চয়ই গর্ভনিরোধন পদ্ধতি ব্যবহার করা যেতে পারে। তবে গর্ভে ভ্রুণকে বিকশিত হতে দিয়ে পৃথিবীতে মৃত শিশু জন্ম দেয়ার অধিকার কারো থাকতে পারেনা। ফুটপাতে, হাসপাতালের বাথরুমে, এমনকি বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসে প্যাকেটে মোড়ানো অথবা খোলামেলা করে ফেলে দেয়া নবজাতকের লাশ নিশ্চয়ই সভ্য সমাজের নিদর্শন হতে পারেনা।

ডেইলি বাংলাদেশ/জেএমএস