Alexa গন্তব্য ।। আলমগীর রেজা চৌধুরী

ঢাকা, শুক্রবার   ০৬ ডিসেম্বর ২০১৯,   অগ্রহায়ণ ২১ ১৪২৬,   ০৮ রবিউস সানি ১৪৪১

গন্তব্য ।। আলমগীর রেজা চৌধুরী

গল্প ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ১৪:২৭ ২৬ নভেম্বর ২০১৯  

অলঙ্করণ: মিজান স্বপন

অলঙ্করণ: মিজান স্বপন

'তুমি আমাতে অবাধ্য হও, আমি তোমাতে’ এটা যেন কার কবিতা? বোধের বারান্দায় হেঁটে যেতে কার দেখা! একজন কবি হেঁটে যাচ্ছেন। তিনি সাধারণ মানুষ না। কেমন করে আদি চাওয়া-পাওয়ার শব্দরাজি, কোমল ভাষায় চিরন্তন কথকের ভূমিকায় চলে যায়। বুক ভরা হাহাকার তার মধ্যে বাস করে। ভুবনের তন্ত্রী খুঁজে বেড়ানো পর্যটক। আহা! তার মনে হয়, সে কি নিয়তি? কেন এ রকম! অনুসন্ধান করা যাক।

সালিম হাসান পাভেল। মফস্বল শহরের প্রিয় কিশোর। যৌবনে পা দেয়ার সঙ্গে সঙ্গে পরিত্যাজ্য। রাজধানীর ধাতব নগরে নেশামত্ত জীবন পেরিয়ে মিলানের রাস্তায় রাস্তায়। মিলানে থাকে আজ এগারো বছর সাত মাস তিন দিন। বঙ্গীয় তরুণ ঘাত-প্রতিঘাতের মধ্য দিয়ে মিলানের স্থায়ী বাসিন্দা। কদাচিৎ বঙ্গদেশে যাওয়া হয়। সংসার নিয়ে ভাবতে হয় না। অস্থির রাজনীতির শিকার, তাড়া খেয়ে মিলানে থাকে। নিরাপদে থাকে। বাবা-মা খুশি। ‘আমার সন্তান যেন থাকে দুধে-ভাতে।’ ওই সময় এত মানুষ ছিল না। তারপরও দুধ-ভাতের অভাব। নইলে কবি লিখবেন কেন? এখন মানুষ-অবরুদ্ধ প্রকৃতি; তারপরও দুধ-ভাতের কমতি নেই।

শুভপুরের পাভেলের মধ্য দিয়ে রূপান্তরিত বেঁচে থাকা। অনেকটা চালবাজির মতো যাপিত প্রাণ। নইলে লতিকার কথা মনে হয়নি কেন? শুভপুরের রূপবতী তরুণীর ছায়া। ছায়াবাজির খেল খতম করে মিলানের মারিয়ানোকে বলতে হয়েছে- ‘তোমার মতো কেউ নেই।’
লতিকা কেবল পাভেলকে চায়। পাভেল লতিকাকে! পরস্পরের চাওয়া-পাওয়া ওই সময় স্মৃতিবন্দি। কেবল মারিয়ানো তোমাকে চাই। সামারে আয়ারল্যান্ড গিয়ে জেমস জয়েসের কবরের পাশে ঘুমিয়ে পড়ে। সেন্ট হেলেনায় নেপোলিয়নকে বলেছে, ‘কি লাভ যুদ্ধ করে? এত রক্তপাত, এত বিনাশ দরকার ছিল না। তুমি তা-ই করলে?’

রাইন নদীর তীরে দাঁড়িয়ে যে প্রকৃতি, যে নৌকার মাঝির গান, তার সুরের নাম উদাসী। পঙ্ক্তি ‘কে যায় রে।’ শচীন কর্তার মতো। দিনকে দিন দাঁড়িয়ে বাউরি সুরের মূর্ছনায় কাতর যুবক।

এগারো বছর সাত মাস তিন দিন পর লতিকার কথা মনে হলো কেন? লতিকা নিতান্ত সাধারণ কৈশোর-উত্তীর্ণ বালিকা। সারা গাঁ চড়ানো ধুমসি, বেয়ারা। কারো কথা গ্রহণ করা ওর জন্ম ঠিকুচির ধারে কাছে নেই। ও একা এবং একাকী। শুভপুরের কোনো কৃষ্ণের বাঁশি ওকে উদাস করেনি। বলেনি, ‘তাকিয়ে দেখো, কালিন্দীর জলে যার ছায়া, আমি সেই মীনকুমার। জলতৃষ্ণা নিয়ে জলের কিনারে নেমে দেখি, তুমি আসোনি। জলস্রোতে তোমার মাতম। জলের উতরোল পাগলামি বিলয়মান গোধূলি প্রহরে শোকার্ত রূপ ধারণ করে। আর ঠিক তখন এক ঝাঁক হরিয়াল সন্ধ্যা বিদায় গাইতে গাইতে অনন্তে হারিয়ে যায়। ওদের কিছুই আমাকে আক্রান্ত করে না। জলে পা ডুবিয়ে আবিষ্কার করি সূর্য ডুবে গেছে। পৃথিবী এখন অন্ধকার। তারপর একসময় বাঁশঝোপ ছাপিয়ে গোল চাঁদ উঠে আসে। কৃষ্ণপক্ষের দ্বিতীয় রজনী। আমি তার প্রতীক্ষা করি। অনুক্ত উচ্চারণ শব্দ পায় না। হতাশা, দীনতা আচ্ছন্ন ভাটির কুমার। দখিনা হাওয়া আমার নিমন্ত্রণ গ্রহণ করো।’ না, লতিকা আসেনি। এলেই পারত। তা হলে খেদ কমে যেত। আসেনি বলেই অধরা রয়ে গেছে। তৃষ্ণাও নিভন্ত আগুনের নিচে দহনপর্ব অতিক্রম করছে। অথবা এক যুগ আগে যে তরুণ প্রতিদিন প্রতীক্ষা করত এক জলপাই গাছের ছায়ায়। কাতর অক্ষিযুগল, থরথর আবেগে অনুচ্চারিত কথামালা, লতিকা শুনতে চায়নি। যুবকের বলা হয়নি। চাঁদের আলো বংশাইর জল ভেঙে ভেঙে দূরে হারিয়ে গেছে। ভাটির মাঝি জিজ্ঞেস করেনি, জলের কারুকাজে যার মুখবায়ব সে কি মৎস্যকন্যা? না, লতিকা নামক মানবী, যা দূরায়ত নৌকায় ভাসতে ভাসতে কোন ঘাটে বসতি গেড়েছে কে জানে?

মারিয়ানো প্রশ্ন করে, ‘তোমার কোনো গার্লফ্রেন্ড নেই?’

উত্তর, ‘আছে। শুধু তাকে বলা হয়নি। তুমি আমার বন্ধু।’

মারিয়ানোর সরল উত্তর, ‘বললেই পারতে!’

‘ফিরিয়ে দিলে বেদনা বহন করার বয়স তখন ছিল না।’

‘এখন আছে?’

‘না।’

মারিয়ানো কথাহীন থাকে বেশ সময়। তারপর সিন নদীর জল ছুঁয়ে বলে, ‘ওই নারীকে মনে পড়ে?’ 

‘পড়ে।’ 

হঠাৎ মারিয়ানো আমাকে জড়িয়ে ধরে ঠোঁট কামড়ে দিয়ে বলে, ‘তা হলে আমার জায়গা কোথায়?’ 

মারিয়ানোকে বলা হয় না। তুমি শুভপুরের লতিকা নও। মিলানের তরুণী। যে জগতের সব বর্ণাঢ্য ধারণ করে হৃদয়ের জায়গা আবিষ্কার করতে চায়। লতিকা কিছুই চায় না। শুধু আরক্তিম লজ্জায় নারীর রহস্যকে ঢেকে রেখেছে। রয়ে গেছে শুভপুরের অনাঘ্রাতা তরুণী। যার জন্য পরান এখনো কাঙাল হয়ে আছে। মারিয়ানোর বুকের উষ্ণতা শৈত্য আনতে পারে না।

মারিয়ানোকে বলি, ‘এখন তুমি সত্য। লতিকা! ছাইচাপা নিভন্ত অনল। হাত পোড়ে না। হৃদয় পোড়ে।’ 

বাতাসে ফরাসি সুবাসের মাদকতা। সিন নদীর তটরেখায় হাজার হাজার বুনোহাঁস কলরবে মেতে ওঠে। আর মারিয়ানোর রক্তে মাতম বন্যমত্ততায় ডুবে যেতে থাকে। ঠিক তখন কবি বদরুল হায়দারের কবিতা মনে পড়ে, ‘তুমি আমাতে অবাধ্য হও।’
কিন্তু লতিকার তো বাধ্য-অবাধ্যতায় নেই। 

ওর সরল উক্তি, ‘সময় হলে নিয়ে যেও।’

ওই পর্যন্তই। যুবকের সময় হয়নি। সে এখন মারিয়ানোর কোমর জড়িয়ে ট্রাভোল্টার ডিসকো মুদ্রায় উন্মত্ত হিংস্র বাঘ। যে কেবল রক্তের প্রশ্রবণ খুঁজে ফেরে। সিন নদীর স্বচ্ছ জল বইতে থাকে। ক্লান্ত মারিয়ানো আকাশের দিকে তাকিয়ে বলে, ‘লতিকা ভাগ্যবান।’

আমার বলতে ইচ্ছে করে, ‘না। ও দুঃখী। ওর প্রেম কেউ গ্রহণ করেনি। না যুবক! না মাধবী রাত! প্রকৃতিও ওকে ছেড়ে চলে গেছে। সাতাশের তরুণী। তিন সন্তানের জননী। ওর শরীর রক্তশূন্য। পাÐুর। ও জন্মের কাছে অপরাধ জমা রেখেছে। অসভ্য উন্মত্ত পুরুষের নিকট প্রতিদিন ধর্ষিত হচ্ছে। সেই ভালোবাসাহীন রক্ত তৃষ্ণায় উগড়ে দিচ্ছে দুঃখী মানব প্রজন্ম। লতিকার কোনো স্মৃতি নেই। স্মৃতিও নির্মিত হয়নি, যা কিছু তা মানুষ। বিলয়মান না ফেরা পাখি। ডানা ঝাঁপটাতে ঝাঁপটাতে একসময় গন্তব্যহীন অলীক ছায়ায় নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে।’

কিছুই বলা হয় না মারিয়ানোকে। জাপটে ধরা মারিয়ানোর হাত, এ মুহূর্তে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠতম কামজ হাত। রক্তে ব্যগ্র হুঙ্কার। এ ভুবনে একমাত্র মারিয়ানোকে চাই। ট্রয়ের নায়িকা হেলেনকে ফিরিয়ে দিয়ে বলব, ‘সব তৃষ্ণার গলি-ঘুপচি এক। আমি তোমাকে চিনি। ঈভ আমাকে বহন করে। সেই যে অলিম্পাস থেকে যাত্রা শুরু। নর্ম সহচরী। কানে মারিয়ানোর কামার্ত নিঃশ্বাস।

আমি তাকে জাপটে ধরে বলি, ‘তুমি সেই নারী।’ 

আর কিছু বলতে হয়নি মারিয়ানোকে। সুখ আতিশয্যের প্রেমভাসানে কোথায় হারিয়ে গেছে জগতের চাওয়া-পাওয়া, কষ্ট, বেদনা, প্রেম-অপ্রেমের আরব্য রজনী। শুধু সিন নদীর শীতল হাওয়া দু’জন মানব-মানবীর উষ্ণ নিঃশ্বাস বয়ে বেড়ায়। চিৎপাত তটরেখায় শুয়ে তারাদের দেশে চোখ রেখে মারিয়ানো বলে, ‘আমি মাতৃত্ব চাই। আগামী বসন্তে তোমাকে বিয়ে করব।’
‘কেন?’

‘লতিকা তিন সন্তানের জননী।’

‘এত ঈর্ষা কেন?’

‘ঈর্ষা নয়। নারীর হাহাকার।’

মারিয়ানোকে কিছু বলা হয় না। ঠোঁট, মুখ, বুকে ওর লালার কামজ ঘ্রাণ।

ক্রমে লতিকা দূরতর দ্বীপ হয়ে যায়। চৈতন্যে ওর ছায়া ক্ষীণ। দাপিয়ে বেড়াতে থাকে মারিয়ানো নামক বাইশের তরুণী। লতিকা এখন মৃত। বাংলাদেশের এক অখ্যাত নারীর জীবনযাপন মনে রেখে লাভ কি? দেখা হলে বলা যেত, ভালো আছি, তুমি ভালো থেকো। ক্ষমা করো, জন্মধাত্রী রমণী বিস্মরণের ওপারে হঠাৎ ইশারায় শাসনের আঙুল উঁচিয়ে বলে, ‘ভুলে গেলি, ভুলে গেলি!’
আমি বলি, ‘না।’

প্যারিস থেকে মিলানে ফিরে মারিয়ানো বলে, ‘আমি ভেনিসে যাব। আজ আমার বাবা-মা পৃথক হয়ে যাবে। ওদের বিবাহিত জীবনের চব্বিশতম বছরে এসে ওরা বুঝতে পারে, পারস্পরিক বিশ্বাসের শেকড়ে ঘুণপোকা বাসা বেঁধেছে।’

আমি অবাক হই না। ব্যথিত কণ্ঠে ওকে বিদায় জানাই।

‘আমি কি তোমার কোনো সাহায্যে লাগতে পারি?’

‘না।’

‘না কেন?’

‘বাকি জনম তোমার সঙ্গে দেখা নাও হতে পারে!’
‘কেন?’

‘এ প্রশ্নের জবাব নেই।’

মারিয়ানো চলে যাবার পর লতিকাকে মনে পড়ে। লতিকার মুখ ঈষৎ ঝাপসা। যেন দূরতর দ্বীপ। সবুজে শুয়ে আছে। শুধু পিঙ্গল আকাশ।
মারিয়ানো চলে যাবার পর আমি ওর প্রতীক্ষা করি। আমি মারিয়ানোকে চাই। ওকে ছাড়া মিলান আমার কাছে অর্থহীন। বর্ণাঢ্য এবং ধাতবনগর আমার আপনার নয়। লতিকার পর আমি মারিয়ানোকে মনে রাখতে চাই। লতিকা দিয়েছে বুক ভরা হাহাকার; সেখানে কোনো চাওয়া-পাওয়া নেই। আছে মরুভূমির তৃষ্ণা। মারিয়ানো জল-সিঞ্চন করে শিখিয়েছে বাৎসায়নী পাঠ। আমাকে পুরুষ বানিয়েছে। আমি এখন কি করব? কারো অপেক্ষায় একটি নিশিগন্ধা রজনীর ঘেরাটোপে বন্দি জীবন পার করতে ভালো লাগবে না। অতৃপ্ত বাসনারা বিলাপ করে কোথায় কোন অতল গহŸরে ছিটকে ফেলে দেবে কে জানে?

মিলানের রাস্তায় একাকী হেঁটে যেতে নিজেকে কাঙাল মনে হয়। বুকে যে ক্ষত তার নাম শূন্যতা। নিঃসঙ্গ আলবার্ট্রাস। কেবলি তটরেখা ভুলে যায়।

ঠিক ঊনত্রিশ দিন পর মারিয়ানোর মুঠোফোন।

‘হ্যালো, পাভেল?’

‘তুমি কোথায়?’

‘প্যারিসে।’

‘কেন?’

‘মা’র সঙ্গে।’

‘কেন?’

‘বাবার সঙ্গে ছাড়াছাড়ি হবার পর মা চিত্রকলা শেখার জন্য প্যারিসে চলে এসেছে। আর বাবা! কোম্পানির প্রতিনিধি হয়ে জার্মানিতে। বাবা আমার বয়সী এক নারীকে বিয়ে করেছে। নাম, তাতশি পেকাউড। স্কটিশ।’

‘তুমি? ’

‘আপাতত মা’র কাছে। তোমার মতো আমার একজন আছে। বাতচেল্লি। মেরিনের লোক। সমুদ্রে নিজেকে ভাসিয়ে দেয়। আমি তাকে খুঁজে ফিরছি।’

পাভেলের কণ্ঠ ক্লান্ত।

তিরিশ সেকেন্ড মুঠোফোনে কথা হয় না। ওপাশে মারিয়ানো ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছে।

‘কাঁদছ কেন?’

‘আমি লতিকাকে সত্যি হিংসে করি।’

‘লতিকা কোনোদিন জানবে না।’

‘না জানুক। তুমি জানো!’

মুঠোফোন বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। মারিয়ানো আর কল করে না। করলে রিসিভ হয় না।

পাভেল জানালায় দাঁড়িয়ে মিলানের আকাশ দেখে। ওক গাছের মাথায় যে চাঁদ তা কুয়াশায় ঘেরা। তারাদের মুখ নেই। একটু দূরে গুঁড়িগুঁড়ি তুষার ল্যাম্পপোস্টের আলোয় শ্যামাপোকার মতো কিলবিল করছে। এক যুগ বসবাসের পর মিলান হয়ে ওঠে পরিত্যাজ্য। লতিকা হয়ে যায় সুদূরের ফানুস; আকাশে মিলিয়ে যেতে থাকে। পাভেল নিজেকে ভাবে শুভপুরের অনাথ যুবা। কাঙাল, নিঃসঙ্গ। শুভপুরের সবুজে লতিকা আলোকদাম বিছায়ে রেখেছে। যার স্পর্শহীন প্রণয়দাহ হৃদয়-উঠোনে দাপাদাপি করে। পাভেল শুভপুরের লতিকার দিকে ছুটে যেতে চায়।

ডেইলি বাংলাদেশ/আরআর