Exim Bank
ঢাকা, শনিবার ২৩ জুন, ২০১৮
Advertisement

গণমাধ্যমের জানা-অজানা

 রায়হান উল্লাহ ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ১৬:২২, ১২ মার্চ ২০১৮

আপডেট: ১৬:৩৫, ১২ মার্চ ২০১৮

২৭৬ বার পঠিত

ছবি: ডেইলি বাংলাদেশ

ছবি: ডেইলি বাংলাদেশ

গণমাধ্যম বিস্তৃত বিষয়। তবে সচরাচর গণমাধ্যম বলতে আমরা যা বুঝি তার জানা-অজানা নানা বিষয় নিয়ে কথা হবে। কথা হবে ভেতর-বাহিরের বিষয়েও। ভেতর-বাহির কথাটিও বিস্তৃতি রাখে। ভেতর-বাহিরে কী নেই? সবই আছে। আছে গণমাধ্যমের আদ্যোপান্ত। এতে যেমন আছেন গণমাধ্যমের মালিক, তেমনি আছেন গণমাধ্যমটির পিয়ন। তেমন আছেন একজন পাঠকও। সর্বাগ্রে আছেন সংবাদকর্মীরা, সহজ কথায় সাংবাদিকরা। এ লেখায় তাদের ভেতর-বাহির খোলাসা করার চেষ্টা করা হবে।

একজন সাংবাদিকের জীবন কেমন? কেমন তার চলাচল, বেঁচে থাকা? এসব খুঁজতে গেলে দেখা যায় বর্ণময় নানা চিত্র। একজন সাংবাদিক কেমন করে সাংবাদিক হন? বলা যায় পাকে-চক্রেই তা ঘটে। যারা বিষয়টি নিয়ে পড়াশোনা করেন তারাও ঠিক এ পেশাটিতে থাকেন না, কিংবা না থেকেও পারেন। তাই বলা যায় দৈব প্রক্রিয়াতেই একজন সাংবাদিক হন। এবং জীবনের বাকিটা সময় সাংবাদিকই থাকেন। এমন পাওয়া খুব সহজ নয়। কারণ সাংবাদিকতার আড়ালে অনেকে অনেক কিছুই করেন। সাংবাদিকতায় থেকেও অনেক কিছু করেন। এমন অনেক কিছু এ পেশাটির সঙ্গেও সাংঘর্ষিক।

কাগজে কলমে কিছু নীতিমালা ছাড়া গোছানো এবং বাস্তবিক প্রয়োগ হওয়া কোনো নীতিমালা গণমাধ্যমে দেখা যায় না। ফলে জীবনের প্রয়োজনে অনেকে গণমাধ্যমব্যক্তিত্ব হয়ে উঠেন। অধিকাংশ ক্ষেত্রে এ প্রয়োজন ঋণাত্বক। বিষয়টি একটু খোলাসা করি। একজন মানুষ বিস্তর সম্পদের মালিক। ক্রমশ তার সম্পদ ফুলে ফেপে উঠছে। কিন্তু তিনি ঠিক সন্তুষ্ট নন। কারণ তার সম্পদ আয়ে কিছু অন্যায় অবলম্বন আছে। আর এটাই নানা সময়ে গণমাধ্যমে প্রকাশ পাচ্ছে। এমনি করে তিনি একসময় ভাবেন, আমারও গণমাধ্যমের কেউ হতে হবে। আর এ ভাবনাই এক সময় ফল পায়। তিনি হয়ে উঠেন গণমাধ্যমের নিয়ন্তা। অথচ গণমাধ্যমের কিছুই বোঝেন না তিনি। অথচ অনেক গণমাধ্যমকর্মীর রুটি-রুজির সৃষ্টি করেন। এ বিষয়টি সুখের হলেও কিছু কথা থাকে। তার অজ্ঞানতায় সময়ে সময়ে গণমাধ্যম আঘাতপ্রাপ্ত হয়।

এমনি বেলায় তাকে নিয়ন্ত্রণ করেন অসংখ্য সাংবাদিক। তারাও ঠিক সাংবাদিকতার সূত্র মানেন না। মানেন নিজের লাভ। ফলে অসংখ্য অন্যায় দৃশ্যের সৃষ্টি হয়। সৃষ্টি হয় অনেক আর্তনাদ। কলুষিত হয় গণমাধ্যম।

ব্যক্তিক উপলব্দি ও অভিজ্ঞতা বলে অনেক কথা। সেসব বলে- এদেশে গণমাধ্যমের যেকোনো পর্যায়ের কেউ হতে কোনো যোগ্যতা লাগে না। অসীম যোগ্যতা নিয়েও আবার যেকোনো সময় চাকরি থাকে না। এ ধরনের দৃশ্য কখনো সুখকর না। ফলে ভালো কোনো কিছু কখনো আশা করা যায় না।

বাস্তব কিছু দৃশ্য, নামের প্রায়োগিক ভিন্নতায়; এখন বলা হবে। যা থেকে গণমাধ্যমের ভেতর-বাহির কিছুটা হলেও খোলাসা হবে।

দৃশ্য-১. ফয়সাল আলী একজন প্রকাশক ও সম্পাদক। তার কোনো শিক্ষাগত যোগ্যতা নেই। যদিও তিনি ডক্টরেট। তিনি সরকারের গুরুত্বপূর্ণ জায়গাগুলোই দৌড়ঝাপ করেন। আরো নানা ব্যবসা করেন। তার অঢেল সম্পতি। এক সময় একটি গণমাধ্যম কিনে নেন তিনি। পরে সৃষ্টি হয় অসংখ্য গল্প। যার অনেক কিছুই বেদনার। তিনি গণমাধ্যম ব্যবহার করে তার ব্যবসার পরিধি বাড়িয়েই চলেন। অবশ্যই অন্যায় অবলম্বনে। এক সময় তার লোভ বাড়ে। তিনি মাদক ব্যবসা শুরু করেন। নানা সময়ে সাংবাদিকরা তার দ্বারা নির্যাতনের শিকার হন। অনেকেই নূন্যতম পাওনা পারিশ্রমিক না নিয়েই চাকরি থেকে বিদায় নেন। যদিও তিনি সরকারের সব সুবিধা গ্রহণ করে একটি ওয়াইজ বোর্ডে সবাইকে বেতন দিচ্ছেন বলে কাগজে-কলমে পরিষ্কার থাকেন। প্রহসনের বিষয় তা বাস্তবে আর হয় না। অবশ্য তিনি নানা সময়ে অনেক সাংবাদিককে তার পাশে পান। এটিও দুঃখের। ফয়সাল আলী যখন যে সরকার আসে তার হয়ে যান। ফলে তার কোনো সমস্যা হয় না।

দৃশ্য ২. হাসান ইমরান একজন সাংবাদিক। তিনি একটি জাতীয় দৈনিকের নির্বাহী সম্পাদক। তার অনেক দায়িত্ব। তবে তিনি তা পালন করেন না। দৈনিকটির খবরগত উৎকর্ষতায় তিনি কিছুই করেন না। যা করেন তাতেই তার ক্ষমতায় টেকা যায় না। তিনি সম্পাদক ও প্রকাশকের লেজুড়বৃত্তি করেন। খাটি বা অভদ্র বাংলায় চামচামি করেন। আর তার অন্যায়ের শিকার হন অসংখ্য সাংবাদিক। এসব করে তিনি অবশ্য একটি মোটা অংকের টাকা পান। কিন্তু তার দ্বারা গণমাধ্যমের কোনো লাভ হয় না। অধিকাংশ ক্ষেত্রে ক্ষতি হয়।

দৃশ্য ৩. আল মাকসুদ একজন অপরাধ প্রতিবেদক। তিনি সংবাদপত্রের একটি গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় আছেন। সমাজের অপরাধের বিষয়গুলো তিনি তুলে আনেন। কিন্তু তিনি নিজেই অপরাধ করেন। সব সময় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে যোগসাজশে থাকেন। তাদের সরবরাহ করা খবরই পত্রিকায় জমা দেন। নিজ থেকে কোনো ঘটনার সত্যতা উদঘাটন করেন না। করলেও কোনো একটি গোষ্ঠীর কাছ থেকে অর্থ খেয়ে সঠিক সংবাদ লিখেন না। রাতের একটি সময়ে তাকে নেশাগ্রস্ত দেখা যায়। না হয় দেখা যায় কোনো অন্ধকার পল্লীতে। আর এসব করতে তার কোনো অর্থ লাগে না। জীবনধারণের জন্য যা অর্থ তা নানা উপায়ে আসে। সাংবাদিকতার আড়ালে তিনি অনেক অন্যায় ব্যবসার সঙ্গেও যুক্ত। সবচেয়ে কষ্টের বিষয় তিনি অনেক অপরাধ চক্রের কাছে নিয়মিত মাসোহারা নেন। সবচেয়ে অবাক করার বিষয় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অনেক অন্যায় অপকর্মের ভাগ নেন তিনি। নিয়মিত রাতের একটা সময়ে তিনি ওই বাহিনীর বিশেষ বিশেষ দপ্তরে যান। এবং ভাগের একটি অংশ বুঝে চলে আসেন।

দৃশ্য ৫. খয়বার হোসেন একটি পত্রিকার সহ সম্পাদক। নিয়মিত অফিসে আসেন তিনি। উদ্যেশ্যমূলক অনেক খবর পত্রিকার উর্ধ্ব পর্যায়ের যোগসাজশে ছাপান তিনি। অনেক গোষ্ঠীর সঙ্গে যোগাযোগেও তিনি সিদ্ধহস্ত। যদিও তিনি সম্পাদনার কিছুই জানেন না। অনেক সাংবাদিক তার হেনস্তার শিকার। সুবিধাজনক অনেক জায়গায় তিনি নিজেকে ওই দৈনিকের বার্তা সম্পাদক বলে পরিচয় দেন। নানা প্রশ্নবোধক জায়গায় সুবিধা নিতে তিনি ঢু মারেন। কালো কাচ ঘেরা গাড়িতে তাকে ঘুরে বেড়াতে দেখা যায়।

দৃশ্য ৬. মনির হোসেন একটি দৈনিকের সহ সম্পাদক। অন্যায়ের সঙ্গে আপস করেন না তিনি। বেতন পান একটি নির্দিষ্ট অংকের। যা দিয়ে তার সংসার চলে না। সংসার বলতে নাগরিক মেস জীবন। বাবা-মা-ভাই-বোনেদের কিছুই দিতে পারেন না তিনি। মেসের ভাড়া বাকি পড়ে যায়। অবশ্য তিনি ওয়াইজ বোর্ডেই বেতন পান। কিন্তু বাস্তবে পান ছোট একটি অংক। দৈনিকটির মালিকপক্ষের সব কাগজে তাকে স্বাক্ষর করতে হয়েছে। ওসবে ওয়াইজ বোর্ডের দেন-দরবার। তার নিয়মিত অভাব লেগেই থাকে। অথচ তিনি চেয়ে দেখেন সব অপসাংবাদিকতা। তার খুব বেশি কষ্টও নেই। লোভও নেই। সে স্বপ্ন দেখে ভিন্ন কিছু। তার বদ্ধমুল বিশ্বাস স্বপ্ন ধরা দেবে। কষ্ট; তাকে অনেক অন্যায় সইতে হয়।

দৃশ্য ৭. মানিক হোসেন একটি টেলিভিশনের জেলা প্রতিনিধি। তিনি ওই জেলার সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করেন। তিনি রাজনীতিও করেন। তিনি কী করেন না এটি লাখ টাকার প্রশ্ন। তিনি সব করেন। সব অপরাধ চক্রের সঙ্গে তিনি জড়িত। জেলার খবর, ইতিহাস ও ঐতিহ্য নিয়ে তাকে কোনো প্রতিবেদন করতে দেখা যায় না। তিনি ইংরেজি পিআরইডাবলএস লেখা স্টিকার সাটানো একটি মোটরসাইকেলে সারা জেলা চষে বেড়ান। খবরের প্রয়োজনে, তবে তা অর্থের প্রয়োজনে।

দৃশ্যগুলি কাল্পনিক। তবে বাস্তবে এর চেয়েও ভয়ঙ্কর সাংবাদিক বা গণমাধ্যম চরিত্র দেখা যায়। তারা পুরো গণমাধ্যমকে নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করেন। অনেকাংশে সফলও হন। ঠিক এর বিপরীতে অসংখ্য সৎ গণমাধ্যমকর্মী এ পেশাটিকে টিকিয়ে রাখেন। নানা সময়ে ওইসব অপসাংবাদিকের হেনস্তার শিকার হন। বলা প্রয়োজন সৎদের সংখ্যাই বেশি। তবে তাদের নাড়াচাড়া দেখা যায় না। সংখ্যায় কম হলেও অপসাংবাদিকদের ভাবে টেকা দায়। তবুও আশা দেখান মনির হোসেনরা। তাদের বদান্যতাতেই সংবাদপত্রের ভেতর-বাহির এখনো সমাজের সবার চোখে সুন্দর আছে।

(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। এর দায় ভার পুরোপুরি লেখকের। ডেইলি বাংলাদেশ-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)

লেখক: কবি ও গণমাধ্যমকর্মী

সর্বাধিক পঠিত