Alexa খাঁড়া পাহাড়ে ঝুলিয়ে শাস্তি, আড়াই লাখ মানুষের হত্যাকারী

ঢাকা, রোববার   ২৩ ফেব্রুয়ারি ২০২০,   ফাল্গুন ১১ ১৪২৬,   ২৯ জমাদিউস সানি ১৪৪১

Akash

খাঁড়া পাহাড়ে ঝুলিয়ে শাস্তি, আড়াই লাখ মানুষের হত্যাকারী

জান্নাতুল মাওয়া সুইটি ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ১৪:২৬ ২৬ জানুয়ারি ২০২০   আপডেট: ১১:৩৯ ২৭ জানুয়ারি ২০২০

ছবি: সংগৃহীত

ছবি: সংগৃহীত

ইতিহাসে এমন অনেক রাজা রানী রয়েছেন যারা নৃশংসতার চরম সীমা লঙ্ঘন করেছেন। তারা ছিলেন খুবই বর্বর। কে কার চেয়ে বেশি নৃশংসতার পরিচয় দিতে পারেন এ নিয়ে যেন ছিল প্রতিযোগীতা! এসব শাসকরা নিজেদের ক্ষমতা সর্বদাই নিরীহ প্রজাদের উপর প্রয়োগ করেছেন। তারা প্রজাদের উপর অমানবিক নির্যাতন করে এবং সবশেষে তাদেরকে হত্যা করে ক্ষান্ত হয়েছেন।

এমনই এক রানী ছিলেন যিনি তার নির্যাতনের জন্যই ইতিহাসের এক জঘন্যতম শাসক হিসেবে বিবেচিত। তিনি রানী প্রথম রানাভালোনা। দক্ষিণ আফ্রিকার মাদাগাস্কারের অত্যন্ত কঠোর এক শাসক ছিলেন তিনি। তার ভয়ে বাঘে মহিষে এক ঘাটে জল খেতো! তার শাসনামল ছিল ১৮২৮ থেকে ১৮৬১ সাল পর্যন্ত। ইতিহাসে তার শাসনামলেই সবচেয়ে বেশি হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। লক্ষাধিক মানুষের প্রাণ নিয়েছেন এই নিষ্ঠুর রানী।

কুখ্যাত রানীরামাভো থেকে রানাভালোনা (প্রথম) হলেন যেভাবে...

১৭৭৮ সালে একটি সাধারণ পরিবারেই জন্মগ্রহণ করেন তিনি। তখন তার নাম ছিল রামাভো। অন্যান্য আফ্রিকানদের মতোই রামাভোর গায়ের রং কালো ছিল। দেখতে অতটা সুশ্রী ছিলেন না তিনি। তবে একদিন তার ভাগ্যের চাকা ঘুরে গেল। ভাবছেন কী হলো? রামাভোর বাবা একদিন জানতে পারলেন তাদের রাজ্যের রাজাকে হত্যার পরিকল্পনা করছে কিছু দুষ্টচক্র। অতঃপর তিনি রাজার জীবন বাঁচাতে এই খবরটি রাজ দরবারে পৌঁছে দেন। 

রাজা তো অবাক! তার রাজ্যে এমনো মহৎপ্রাণের ব্যক্তি রয়েছেন এই ভেবে। এবার তো পুরষ্কার দেয়ার পালা। অতঃপর রাজা খুশি হয়ে রামাভোকে তার ছেলে রাদামার সঙ্গে বিয়ে দিয়ে রানীর মর্যাদা দানের প্রস্তাব দেন। এক সাধারণ কৃষক ছিলেন রামাভোর বাবা। এই প্রস্তাব পেয়ে তিনি তো মহাখুশি। ১৮১০ সালে রাজপরিবারের পুত্রবধু হিসেবে পদার্পণ করেন রামাভো। যদিও রাদামা ও রানাভালোনার বিবাহিত জীবন সুখকর ছিল না। 

এই বাড়িতেই জন্ম নেন রামাভোস্বামী কর্তৃক অনেক লাঞ্ছণার শিকার হয়েছেন এই নারী। প্রথম থেকেই রাদাম তাকে পছন্দ করেননি। শুধু বাবার সম্মান রক্ষায় বিয়েতে রাজি হন তিনি। এদিকে পিতার মৃত্যুর পর রাজ্যভার এসে পড়ে রাদামার উপর। রামাভোর পর অনেকগুলো বিয়ে করেন রাদামা। স্বামীর এই অমানবিক কার্যক্রম দেখে রামাভো ক্ষোভে ফেটে পড়তেন। অতঃপর তার একমাত্র নেশা হয়ে দাঁড়ালো কীভাবে ক্ষমতা লাভ করে সিংহাসনে আরোহণ করা যায়? স্বামী রাদামার প্রতিটি পদক্ষেপ লক্ষ্য রাখতেন তিনি। আর সেই অনুযায়ী ফাঁদ আটতেন। 

তবে তাকে আর বেশি মাথা ঘামাতে হলো না। পথের কাটা আপনাআপনিই দূর হয়ে গেল! বিয়ের মাত্র ১৮ বছরের মাথায় রামাভোর স্বামী রাদামার মৃত্যু ঘটে। রামাভোর জন্য সবচেয়ে নিশ্চিন্তের বিষয় ছিল, রাদামার কোনো উত্তরাধিকারী ছিল না। তবে রাজার মৃত্যুর পর জানা গেল, রাজপরিবারের নিয়ম অনুসারে রাদামার বড় বোনের পুত্র সিংহাসনে আরোহণ করবেন। তবে রাজপরিবারের সেই সিদ্ধান্ত কিন্তু মানেননি রামাভো। এরপর কী হলো জানতে আরো কিছুটা সময় পূর্বে যেতে হবে...

রাদামা ও রামাভোমৃত্যুর পূর্বে রাদামার রাজত্বের শেষ সময়গুলো রামাভো রাজ্যের বিভিন্ন ধনী ও ক্ষমতাশীল ব্যক্তিদের সঙ্গে হাত মেলাতে শুরু করেন। তারা নিজেরাই একটি দল গঠন করেন। তারা মাদাগাস্কির অতীতের সব শাসনামলকেই পাল্টে ফেলে নতুন নিয়মে শাসনতন্ত্র শুরু করার পরিকল্পনা করতে থাকে। আর তাদের মধ্যমণি ও পরিকল্পনাদাতা ছিলেন রামাভো। 

তাদের দলটি সম্পূর্ণ গোপনীয়তা রক্ষা করত। এজন্য রাদামা কখনো রামাভোর ষড়যন্ত্র আঁচও করতে পারেননি। রাদামার যদি স্বাভাবিক মৃত্যু নাও ঘটত রামাভো অতি দ্রুতই তাকে হত্যা করতেন এমনো পরিকল্পনা ছিলো তার মনে। অতঃপর স্বামীর মৃত্যুর পর রামাভো তো আল্লাদে আটখান! রামাভো থেকে মুহূর্তে রানাভালোনা পরিচয়ে সিংহাসনে আরোহণ করে সবাইকে চমকে দিলেন সাহসী এই নারী।  

রানীর নির্যাতনের নমুনাসিংহাসনে তার সূচনা ঘটল যেভাবে...

রাজ্যাভিষেকে সময় কঠিন গলায় নিজের সম্পর্কে রানাভালোনা যে কথাগুলো বলেছিলেন- কখনো বলবেন না, তিনি কেবল দুর্বল ও অজ্ঞ এক নারী, কীভাবে তিনি এত বিশাল সাম্রাজ্য শাসন করবেন?’ আমি এখানে আমার জনগণের সৌভাগ্যের উন্নতিকল্পে কাজ করব। আমার নামকে যথাযথ মর্যাদায় প্রতিষ্ঠা করব! আমি আমার পূর্বপুরুষদের ব্যতীত অন্য কোনো উপাস্য মানব না। সমুদ্র আমার রাজ্যের সীমানা হবে এবং এর এক চুলও আমি ছাড় দেব না!’

তার প্রথম পদক্ষেপই ছিল হত্যা। তার শাসন যে বা যারাই মানতে নারাজ ছিল ক্ষমতার প্রদর্শনে তাদেরকে হত্যা করাই ছিল রানাভালোনার নেশা। একে একে রাদামার রাজপরিবারের সবাইকে হত্যা করেন নিষ্ঠুর রানী। সে প্রতিশোধ নিতে শুরু করেন। অতীতে তার সঙ্গে ঘটা বিভিন্ন ঘটনার প্রতিশোধ হিসেবে তিনি সেই পরিবারের কাউকে জীবিত ছাড়েননি। তার শাসনামলের প্রথমদিকেই তিনি রাজ্যবাসীকে স্পষ্ট করে বলে দেন, তার রাজ্যের সবাই স্বাধীন ও সাবলম্বী। সেই স্বনির্ভরতা বজায় রাখতে হলো এই রাজ্যে বহিরাগতদের কোনো সংস্কৃতি মেনে নেয়া যাবে না। এই রাজ্যের নিয়ম, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি বজায় রাখা রাজ্যবাসীর দায়িত্ব ও কর্তব্য। 

রানীর নির্যাতন থেকে বাদ যেত না ছোট থেকে বৃদ্ধরানাভালোনা মূলত ইঙ্গিত করেন সেখানকার খ্রীষ্টান সম্প্রদায়কে। তার মতে, ‘তারা (খ্রীষ্টানরা) আমাকে অস্বীকার করেছে, তাই আমি তাদেরও অস্বীকার করি। তারা আমাকে প্রত্যাখ্যান করেছে। আমিও তাদের প্রত্যাখ্যান করি।’ এই ঘোষণায় সেই দ্বীপে বসবাসরত খ্রীষ্টান সম্প্রদায়ের সম্মান লুণ্ঠিত হয়। অতঃপর তিনি ধারণা করেন, প্রজারা তাকে শাসক হিসেবে দুর্বল ভাবছে! এজন্য তিনি ১৮৩৫ সালে নিজ রাজ্য থেকে খ্রীষ্টানদের অবৈধ বলে ঘোষণা করলেন। তার এই পদক্ষেপে ব্রিটিশ ও ফরাসীরা বেশ ক্ষেপে যায়। তাতে কি? রানী নিজের সিদ্ধান্তে সর্বদা অটল ছিলেন।

রানীর অত্যাচারের নমুনা...

তিন দশক ধরে রানী রানাভালোনা শুধু বহিরাগতদের উপরেই নয় বরং নিজ রাজ্যের মানুষদের উপরও কঠোর নৃশংসতার ছাপ ফেলেন। প্রজাদের ক্ষুদ্র অপরাধও তার কাছে বিবেচ্য ছিল না। শারীরিক নির্যাতন এমনকি মৃত্যুদণ্ডই ছিল তার দেয়া শাস্তির রীতি। এবার তবে জেনে নিন রানী তার প্রজাদের কীভাবে সাজা দিতেন-

পাশবিক শ্রম১. ঝুলন্ত সাজা: এতে অপরাধীকে বেশ কয়েকদিন খাঁড়া পাহাড়ের উপরে ঝুলিয়ে রাখা হত। আর এই দায়িত্ব ছিল আত্মীয়-স্বজনদের উপর। অনেক সময় দড়ি ছিঁড়ে নিচের গহীন খাদে পড়ে মৃত্যুবরণ করেছেন অপরাধীরা।

২. ফুটন্ত, জ্বলন্ত এবং জীবিত কবর দেয়ার রীতি: হাজারো অপরাধীরা এসব পদ্ধতির মাধ্যমে সাজাপ্রাপ্ত হয়েছেন। শুধু রানাভালোনার সতর্কবার্তা মেনে না চলার কারণে। 

৩. শিরচ্ছেদ: আটককৃত ফরাসী সৈন্যদের উপর এই সাজা বলবৎ ছিল। তাদের মাথা কেটে মুণ্ডুগুলো সাগরে ফেলে দেয়া হত। 

৪. বিষ পান করিয়ে: রানী রানাভালোনা তার গ্রহণযোগ্যতা পরীক্ষার জন্য হঠাৎই যে কাউকে নিজ হাতে বিষ প্রয়োগ করতেন। কে তার প্রতি কতটা আনুগত্য সেটা পরীক্ষার জন্য তিনি এই পদ্ধতি বেছে নেন। 

ফুটন্ত পানিতে ফেলা হত অপরাধীদের৫. পাশবিক শ্রম: প্রায়শই কৌতূহলবশত, রানী বিভিন্ন নকশা নির্মাণ করার নির্দেশ দিতেন বন্দীদের। পাশবিক শ্রমের ফলে অনেকেই মৃত্যুবরণ করতেন।

রানী রানোভালোনার ৩৩ বছরের শাসনামলে প্রায় আড়াই লাখ মানুষ মৃত্যুবরণ করেন। বিশেষজ্ঞদের মতে, সে সময় মাদাগাস্কারের জনসংখ্যার ৫০ থেকে ৭৫ শতাংশই যুদ্ধ, রোগ ও রানীর নির্মম অত্যাচারের ফলে অকালে মরেছেন। এজন্যই তিনি ‘বিশ্বের সর্বোচ্চ হত্যাকারী নারী’ উপাধি অর্জন করেছেন। ১৮৬১ সালে রানী থাকাকালীন সময়েই মৃত্যু হয় কঠিন হৃদয়ের এই নারীর। তার মৃত্যুর পর মাদাগাষ্কাবাসী দীর্ঘ নয় মাস গভীর শোক প্রদর্শন করেন।

সূত্র: হিস্টোরিকমিস্ট্রিজ

ডেইলি বাংলাদেশ/জেএমএস/এএ