Alexa ক্ষণিকের নায়ক তারা

ঢাকা, সোমবার   ২৬ আগস্ট ২০১৯,   ভাদ্র ১১ ১৪২৬,   ২৪ জ্বিলহজ্জ ১৪৪০

Akash

ক্ষণিকের নায়ক তারা

 প্রকাশিত: ১০:৩২ ১৯ ডিসেম্বর ২০১৭  

ছবি: সংগৃহীত

ছবি: সংগৃহীত

ঢাকাই চলচ্চিত্রে এমন কিছু অভিনেতা ছিলেন যাদের সাবলীল অভিনয় দেখে এক সময় মুগ্ধ হয়েছেন অসংখ্য চলচ্চিত্রপ্রেমী। বাংলাদেশের চলচ্চিত্রে আঁকাশচুম্বি জনপ্রিয়তা পেয়েছেন এ তারকারা। তাদের মধ্যে এমন কিছু তারকা রয়েছেন যারা খ্যাতির শীর্ষে অবস্থান করা অবস্থায় পাড়ি দিয়েছেন পরপারে।

হঠাৎ করে হাজারো দর্শক-ভক্তদের কাঁদিয়ে না ফেরার দেশে চলে গিয়েছেন তারা। ঢাকাই চলচ্চিত্রের এমন পাঁচ জনপ্রিয় তারকার অকাল মৃত্যুর কথা জানাবো আজ।

জাফর ইকবাল
নন্দিত চিত্রনায়ক জাফর ইকবাল। আশির দশকের বাংলাদেশের একজন জনপ্রিয় অভিনেতা। তিনি একাধারে সংগীত শিল্পী, অভিনেতা, মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন। তিনি পারিবারিক অশান্তির কারণে মানসিকভাবে অনেক ভেঙে পড়েন। শুরু করেন মদ্য পান, এবং অনিয়ম জীবন যাপন। পরবর্তীতে তিনি ক্যান্সারে আক্রান্ত হন। তার হার্ট এবং কিডনি নষ্ট হয়ে যায়। ১৯৯২ সালের ২৭ এপ্রিল তিনি না ফেরার দেশে চলে যান।

জাফর ইকবাল ১৯৬৬ সালে প্রথম একটি ব্যান্ড দল গড়ে তোলেন এবং তার প্রথম সিনেমায় গাওয়া গান ছিল ‘পিচ ঢালা পথ’। জাফর ইকবাল এর কণ্ঠে ‘হয় যদি বদনাম হোক আরো’ গানটি একসময় ব্যাপক জনপ্রিয়তা পায়। জাফর ইকবাল বাংলদেশের ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে দেশের প্রতি শ্রদ্ধা দেখিয়ে সরাসরি অংশগ্রহণ করেন।

বাংলা চলচ্চিত্রের স্টাইলিশ নায়কদের অন্যতম জাফর ইকবাল। তিনি চিরসবুজ নায়ক হিসেবে পরিচিত। তার অভিনীত প্রথম সিনেমার নাম আপন পর। এই সিনেমায় তার বিপরীতে অভিনয় করেন কবরী। জাফর ইকবালের সঙ্গে অভিনেত্রী ববিতা জুটি হয়ে প্রায় ৩০টির মত সিনেমা করেন। সবমিলিয়ে তিনি প্রায় ১৫০টি সিনেমা করেন।

সালমান শাহ
বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের আলোচিত ও সুদর্শন নায়ক সালমান শাহ। সালমান শাহের আসল নাম শাহরিয়ার চৌধুরী ইমন। জনপ্রিয় এই নায়ক নব্বইয়ের দশকের বাংলাদেশে সাড়া জাগানো অনেক চলচ্চিত্রে অভিনয় করেন। তিনি ১৯৯৬ সালের ৬ সেপ্টেম্বর রহস্যজনকভাবে মৃত্যুবরণ করেন। তার মৃত্যু নিয়ে কেউ কেউ অভিযোগ করে যে তাকে হত্যা করা হয়। কিন্তু তার ঘরে সিলিং ফ্যানে ঝুলে থাকা মৃতদেহ নিয়ে কোনো আইনী সুরাহা শেষ পর্যন্ত হয়নি।

সালমান শাহ ১৯৭১ সালে সিলেট জেলায় অবস্থিত জকিগঞ্জ উপজেলায় জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতা কমর উদ্দিন চৌধুরী ও মাতা নীলা চৌধুরী। তিনি পরিবারের বড় ছেলে। সালমান শাহ ১২ আগস্ট ১৯৯২ বিয়ে করেন, এবং তার স্ত্রীর নাম সামিরা।

সর্বমোট ২৭টি চলচ্চিত্র অভিনয় করেন তিনি। এ ছাড়াও টেলিভিশনে তার অভিনীত বেশ কয়েকটি নাটক প্রচারিত হয়। ১৯৯৩ সালে তার অভিনীত প্রথম চলচ্চিত্র সোহানুর রহমান সোহান পরিচালিত কেয়ামত থেকে কেয়ামত মুক্তি পায়। একই সিনেমায় নায়িকা মৌসুমী ও গায়ক আগুনের অভিষেক হয়।

চিত্রনায়ক জসিম
আশির দশকের একজন সফল ও জনপ্রিয় অভিনেতা জসিম। এ অভিনেতা ১৯৯৮ সালের ৮ অক্টোবর না ফেরার দেশে চলে যান। মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণের কারণে মৃত্যু হয় তার। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনি দাপটের সঙ্গে অভিনয় করে গেছেন। ঢাকাই চলচ্চিত্রে তিনিই প্রথম মারপিট শুরু করেন।

তিনি একজন অভিনেতা, প্রযোজক ও ফাইট ডিরেক্টর। তার আসল নাম তার আবদুল খায়ের জসিম উদ্দিন। খলনায়ক চরিত্রের মাধ্যমে চলচ্চিত্রে অভিনয় শুরু করলেও পরবর্তীতে নায়ক হিসেবেও সফলতা পেয়েছিলেন। দেওয়ান নজরুল পরিচালিত দোস্ত দুশমন সিনেমায় প্রথম অভিনয়ের মাধ্যমে তার চলচ্চিত্র জীবন শুরু হয়। একই পরিচালকের পরিচালনায় সবুজ সাথী চলচ্চিত্রে প্রথম প্রধান চরিত্রে অভিনয় করেন জসিম।

তার উল্লেখযোগ্য সিনেমা রংবাজ, রাজ দুলারী, দোস্ত দুশমন, তুফান, জবাব, নাগ নাগিনী, বদলা, বারুদ, সুন্দরী, কসাই, লালু মাস্তান, নবাবজাদা, অভিযান, কালিয়া, বাংলার নায়ক, গরিবের ওস্তাদ, ভাইবোন, মেয়েরাও মানুষ প্রভৃতি। এসব সিনেমায় তিনি খলনায়ক হিসেবেই অভিনয় করেছিলেন। নায়ক হিসেবে জসিমের উল্লেখযোগ্য সিনেমার মধ্যে কয়েকটি হলো—পরিবার, রাজা বাবু, বুকের ধন, স্বামী কেন আসামি, লাল গোলাপ, দাগী, টাইগার, হাবিলদার প্রভৃতি।

জসিমের প্রথম স্ত্রী ছিলেন সুচরিতা। পরে তিনি ঢাকার প্রথম সবাক সিনেমার নায়িকা পূর্ণিমা সেনগুপ্তার মেয়ে নাসরিনকে বিয়ে করেন।

সোহেল চৌধুরী
জনপ্রিয় চিত্রনায়ক সোহেল চৌধুরী। ১৯৯৮ সালের ১৭ ডিসেম্বর রাত ২টার দিকে তাকে হত্যা করে সন্ত্রাসীরা। এ সময় আততায়ীর ছোড়া গুলিতে সোহেল চৌধুরীর বন্ধু আবুল কালামও নিহত হন। তখন তার বয়স ছিলো মাত্র ৩৫ বছর। এ সময় আজাদ (৩৫) এবং ট্রাম্পস ক্লাবের কর্মচারী নিরব (২৫) ও দাইয়ান (৩৫) আহত হন। গুলির ঘটনার পরপরই জনতা আদনান সিদ্দিকী নামের এক সন্ত্রাসীকে ধরে পুলিশের কাছে সোপর্দ করে। অন্যরা পালিয়ে যায়। এ ঘটনাটি ঘটে ট্রাম্পস ক্লাবে। সোহেল চৌধুরীর বাসা থেকে ট্রাম্পস ক্লাবের দুরত্ব ২৫-৩০ গজের মতো। সোহেল চৌধুরী ও তার কয়েকজন বন্ধুরা হেঁটে ক্লাবের সামনে যান। ক্লাবের নীচ তলার কলাপসিবল গেটের কাছে দুই যুবক তাদের গতিরোধ করে। একপর্যায়ে এক যুবক রিভলবার বের করে সোহেল চৌধুরীর বুকে গুলি করলে তিনি মাটিতে লুটিয়ে পড়েন। তাকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। হাসপাতালের কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। ওই দিন পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে ট্রাম্পস ক্লাবের ১১ জনকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আটক করে।

দীর্ঘদিন ধরে তার হত্যার বিচার ঝুলে রয়েছে। তার স্বজন ও সহকর্মীরা আজও ভোলেননি তাকে। তারা হত্যাকারীদের শাস্তি দাবি করেন। হত্যা মামলাটি কয়েক বছর ধরে হাইকোর্টে স্থগিত হয়ে আছে।

চিত্রনায়ক মান্না
নব্বই দশকের জনপ্রিয় চিত্রনায়ক মান্না। চিত্র নায়ক মান্না ২০০৮ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি আকস্মিকভাবে সবাইকে কাঁদিয়ে এই পৃথিবী ছেড়ে চলে যান। মৃত্যুর আগের দিন রাতেও শুটিং করেছেন তিনি। হঠাৎ মধ্যরাতে বুকে ব্যথা অনুভব করলে সহকারী মিন্টুকে নিয়ে নিজে গাড়ি চালিয়ে উত্তরার বাসা থেকে গুলশানের ইউনাইটেড হাসপাতালে যান তিনি। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ১৭ ফেব্রুয়ারি দুপুরে আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা দেয় মান্না আর নেই।

১৯৬৪ সালে টাঙ্গাইলের কালিহাতী উপজেলার এলেঙ্গায় জন্মগ্রহণ করেন মান্না। তার আসল নাম এস. এম. আসলাম তালুকদার। উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষায় পাস করার পরই ১৯৮৪ সালে তিনি ‘নতুন মুখের সন্ধানে’র মাধ্যমে চলচ্চিত্রে আসেন। এরপর থেকে একের পর এক চলচ্চিত্রে অভিনয় করে নিজেকে সেরা নায়ক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেন এবং চলচ্চিত্র অঙ্গনে তার শক্ত অবস্থান গড়ে তোলেন। সমগ্র চলচ্চিত্র জীবনে তিনি ২০০ এর অধিক সিনেমায় অভিনয় করেন। মান্না বঞ্চিত মানুষের কথা সিনেমার পর্দায় সুনিপুণভাবে তুলে ধরেছেন।

নব্বইয়ের দশকে অশ্লীল চলচ্চিত্র নির্মাণের ধারা শুরু হলে যে কজন প্রথমেই এর প্রতিবাদ করেছিলেন, তাদের মধ্যে নায়ক মান্না ছিলেন অন্যতম। রীতিমতো যুদ্ধ করেছেন অশ্লীল চলচ্চিত্রের বিরুদ্ধে। এ সব চলচ্চিত্রের নির্মাতাদের সঙ্গে লড়াই করে শেষ পর্যন্ত জয়ী হয়েছিলেন তিনি। দাঙ্গা, লুটতরাজ, তেজী, আম্মাজান, আব্বাজান প্রভৃতি চলচ্চিত্রে চমৎকার অভিনয় এর মাধ্যমে জনপ্রিয়তার চূড়া ছুঁয়েছিলেন মান্না। তার অভিনীত আম্মাজান চলচ্চিত্রটি বাংলাদেশের সর্বাধিক ব্যবসাসফল ও জনপ্রিয় চলচ্চিত্রগুলোর মধ্যে অন্যতম।

মৃত্যুর পূর্বপর্যন্ত তিনি বাংলাদেশ চলচ্চিত্র শিল্পী সমিতির সাধারণ সম্পাদক ছিলেন।

ডেইলি বাংলাদেশ/এসআই

Best Electronics
Best Electronics