.ঢাকা, বুধবার   ২৭ মার্চ ২০১৯,   চৈত্র ১২ ১৪২৫,   ২০ রজব ১৪৪০

ক্রোধের চিকিৎসা (পর্ব-৩)

নুসরাত জাহান ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ২০:১৫ ১৩ মার্চ ২০১৯   আপডেট: ২০:১৬ ১৩ মার্চ ২০১৯

ছবি: প্রতীকী

ছবি: প্রতীকী

হজরত থানবি (রহ.) ক্রোধের চিকিৎসার আলোচনা করে বলেন, এর চিকিৎসা হিম্মত ও সংকল্প ছাড়া আর কিছুই হতে পারে না। (আনফাসে ইসা)।

যেমন, কারো মনে ক্রোধ সৃষ্টি হলো, ইচ্ছা হচ্ছে প্রতিপক্ষের চেহারায় থাবা মেরে গোশত তুলে আনি। এই যে একটা হিংস্রতা সৃষ্টি হলো এর বশবর্তী হওয়া যাবে না। তখন নিজের উপর বল প্রয়োগ করে নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। সংকল্প করতে হবে যে, আমি ওই ইচ্ছা মত কাজ করব না।

ইচ্ছা শক্তি প্রয়োগ করতে হবে যে, এই পাশবিক প্রেরণা যতই শক্তিশালী হোক, আমি তার বশবর্তী হবো না.. হবো না। এবং ওই কাজ করব না.. করব না। হাদিস শরিফে রাসূলে আকরাম সালালাহু আলাইহি ওয়াসালাম বলেছেন,

ليس الشديد بالصرعة، إنما الشديد من يملك نفسه عند الغضب

বাহাদুরের পরিচয় এই নয় যে, সে প্রতিপক্ষকে আছাড় দিতে পারে; বরং প্রকৃত বাহাদুর ওই ব্যক্তি, যে ক্রোধের সময় নিজেকে সংবরণ করতে পারে।

ইচ্ছাশক্তি বৃদ্ধির বিভিন্ন উপায়: 
মোটকথা ক্রোধ নিয়ন্ত্রণের মূল শক্তি হচ্ছে হিম্মত ও সংকল্প। তবে এ ক্ষেত্রে কিছু সহায়ক বিষয় আছে, যেগুলো ক্রোধ প্রশমিত হতে সাহায্য করে। হজরত থানবি (রহ.) এর ভাষায়, যার প্রতি ক্রোধ সৃষ্টি হয়েছে তার থেকে দূরে সরে যাওয়া, আউযুবিলাহ পড়া, নিজের ভুল-ত্রুটি ও আল্লাহ তায়ালার আযাবের কথা স্মরণ করা-এগুলো আত্মনিয়ন্ত্রণে সহায়ক হয়। (আনফাসে ইসা)।
 
প্রথম ও দ্বিতীয় ধাপ: 
উপর্যুক্ত মালফুজে কয়েকটি বিষয় বলা হয়েছে। প্রথমটি এই যে, যার উপর ক্রোধ আসছে তার থেকে সরে যাবে কিংবা তাকে সরয়ে দেবে। এতে ক্রোধের তীব্রতা হ্রাস পায়। দ্বিতীয় পন্থা বলা হয়েছে, أعوذ بالله من الشيطان الرجيم পাঠ করা। এটা কোরআন মজিদের নির্দেশ। আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন,

و إما ينزغنك من الشيطان نزغ فاستعذ بالله

‘যখন শয়তানের পক্ষ থেকে আক্রমণ আসে তো আল্লাহ তায়ালার কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করবে। أعوذ بالله من الشيطان الرجيم বলবে। (আরাফ : ২০০)।

ক্রোধের আরেক সমাধান দরুদ শরিফ পড়া:
আরবদের মধ্যে একটি ভালো রীতি ছিল, যা এখন ধীরে ধীরে বিদায় নিচ্ছে। তা এই যে, কখনো তাদের মধ্যে ঝগড়া-বিবাদ হলে কেউ যদি অত্যন্ত ক্রুদ্ধ হয়ে যায় তা হলে দ্বিতীয় জন তাকে বলে, صل على النبي (নবিজির প্রতি দরুদ পড়)। আশ্চর্যের বিষয় এই যে, এই কথা শোনার সঙ্গে সঙ্গে সে দরুদ পড়ে।

اللهم صل على سيدنا محمد

এবং সঙ্গে সঙ্গে তার ক্রোধ প্রশমিত হয়ে যায়। এরপর দুইপক্ষের মধ্যে মীমাংসা হয়ে যায়।
আরব-বেদুইন সমাজে এ ধরনের ভালো ভালো রেওয়াজ ছিল। কিন্তু আধুনিক সভ্যতার আগ্রাসনের ফলে এই জিনিসগুলো বিদায় হয়ে যাচ্ছে। যাই হোক, এটা ছিল ক্রোধ দূর করার একটি ভালো উপায়। 

তৃতীয় পদ্ধতি-

আল্লাহ তায়ালার গজবের কথা চিন্তা করা: তৃতীয় পন্থা বলা হয়েছে যে, নিজের ভুল-ত্রুটি ও আল্লাহ তায়ালার ক্রোধ ও শাস্তির কথা স্মরণ করা। ভাববে যে, আমি এর উপর যতটা ক্রুদ্ধ হচ্ছি তার চেয়ে অনেক বেশি ক্রুদ্ধ হতে পারেন আল্লাহ তায়ালা আমার প্রতি। কেননা আমার গুনাহ ও ভুল ত্রুটি অনেক। আর সত্যিই যদি আল্লাহ তায়ালা আমার প্রতি ক্রুদ্ধ হন তা হলে আমার কী পরিণাম হবে? এই পদ্ধতি অত্যন্ত ফলপ্রসূ।

বিনয় ও নম্রতার অনুশীলন করুন: হজরত থানবি (রহ.) বলেন, কিছুদিন কষ্ট করে হলেও নম্র ব্যবহারের অনুশীলন করা চাই। একসময় তা অভ্যাসে পরিণত হবে। তবে শর্ত এই যে, হাল ছাড়া যাবে না। (আনফাসে ইসা)।

অর্থাৎ, মানুষের সঙ্গে নম্র ভাষায় কথা বলবে এবং নম্র ব্যবহারের চেষ্টা করবে। কষ্ট করে হলেও তা অব্যহত রাখবে। এমন যেন না হয় যে, একদিন করলাম, দুই দিন করলাম, তারপর বাদ দিয়ে দিলাম; বরং আজীবন এই চেষ্ট অব্যহত রাখবে। এ জন্য সর্বদা সজাগ সচেতন থাকা কর্তব্য। কোনো অবস্থাতেই হাল ছাড়বে না। কিছুদিন এভাবে অতিবাহিত হওয়ার পর যোগ্যতা তৈরি হবে এবং ক্রোধ প্রবণতা দূর হয়ে যাবে। ক্রোধের পরিস্থিতিতেও দেখা যাবে সে শান্ত থাকতে পারছে।

ক্রোধের সময়ের সাত তদবির: পরবর্তী এক মালফুজে হজরত (রহ.) বলেন, যখন ক্রোধ জাগ্রত হয় তখন নিচের কাজগুলো করবে- 

১. চিন্তা করবে যে, আমিও তো আল্লাহ তায়ালার কাছে অপরাধী। তিনি যদি আমার উপর ক্রুদ্ধ হন তা হলে আমার কী উপায় হবে?

২. আমি যদি আল্লাহ তায়ালার বান্দাকে ক্ষমা করি তা হলে আল্লাহ আমাকে ক্ষমা করবেন। 

৩. কোনো কাজে, বিশেষত পড়াশোনায় মশগুল হয়ে যাবে। এ সময় কাজ ছাড়া থাকা উচিত নয়। 

৪. ওই স্থান ত্যাগ করবে।  

৫. বেশি বেশি أعوذ بالله পড়বে। 

৬. পানি পান করবে। 

৭. অজু করবে। (আনফাসে ইসা ১৭১)।

এই মালফুজে হজরত থানবি (রহ.) ক্রোধ দূর করার কয়েকটি পদ্ধতি নির্দেশ করেছেন-

আমি তো অপরাধী: প্রথম পদ্ধতি এ কথা চিন্তা করা যে, আমিও তো আল্লাহ তায়ালার কাছ অপরাধী। তা হলে আমি যেভাবে এই ব্যক্তির উপর রাগান্বিত হচ্ছি, আল্লাহ তায়ালাও যদি আমার উপর রাগান্বিত হন তা হলে আমার ঠিকানা কোথায় হবে? এভাবে চিন্তা করলে ক্রোধ প্রশমিত হবে।

আল্লাহ তায়ালা আমাকে ক্ষমা করবেন: দ্বিতীয় পদ্ধতি হলো এই কথা স্মরণ করা যে, আমি যার প্রতি ক্রুদ্ধ হয়েছি তাকে যদি ক্ষমা করে দেই, তা হলে আল্লাহ তায়ালাও আমাকে ক্ষমা করে দেবেন। আর যদি প্রতিশোধ নেই তা হলে আমার ক্রোধ চরিতার্থ হবে, কিন্তু এতে তো আমার কোনো প্রাপ্তি নেই। অন্যদিকে ক্ষমা করার দ্বারা যদি আমি অখেরাতে আল্লাহ তায়ালার ক্ষমা পেয়ে যাই, তা হলে এরচেয়ে বড় প্রাপ্তি আর কী হতে পারে?

এক সাহাবির ক্ষমা করার ঘটনা: একবার এক সাহাবি হজরত মুয়াবিয়া (রাদি.) এর কাছে অত্যন্ত রাগান্বিত অবস্থায় এসে বললেন, অমুক অমার দাঁত ভেঙ্গে দিয়েছে। আমি কিসাস নেব এবং তার দাঁতও ভেঙ্গে দেব। হজরত মুয়াবিয়া (রা.) তাকে বুঝালেন, ওই লোকের দাঁত ভেঙ্গে তোমার কী লাভ হবে? তারচেয়ে বরং অর্থদণ্ড আরোপ করি এবং এর মাধ্যমে বিষয়টি মিটমাট হয়ে যাক। কিন্তু তিনি অনড়, না আমি আপোষ করব না। আমি তার দাঁতই ভেঙ্গে দেব। হজরত মুয়াবিয়া (রাদি.) বললেন, ঠিক আছে, তোমার এই অধিকার আছে। 

ওই সাহাবি যখন এই উদ্দেশ্যে রওয়ানা হলেন, তখন সম্ভবত হজরত আবু দারদা (রাদি.) তাকে বললেন, তুমি তার দাঁত ভাঙ্গতে চলেছ, কিন্তু একটা কথা শুনে যাও। তিনি বললেন, কী কথা? হজরত আবু দারদা (রাদি.) তাকে বললেন, এখনো পর্যন্ত তুমি মাজলুম, কেননা সে তোমার দাঁত ভেঙেছে। কিন্তু তুমি যদি তার দাঁত ভাঙতে গিয়ে তারচেয়ে বেশি জোরে আঘাত কর, তখন তুমি হবে জালেম এবং আল্লাহ তায়ালার দরবারে অপরাধী। আর যদি তুমি তাকে মাফ করে দাও, তা হলে আমি রাসূল সালালাহু আলাইহি ওয়াসালামকে বলতে শুনেছি, যে ব্যক্তি কারো অত্যাচার ক্ষমা করে আল্লাহ তায়ালা তাকে কেয়ামতের দিন ক্ষমা করবেন। যেদিন তার ক্ষমার সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন হবে। সাহাবি জিজ্ঞেস করলেন, আপনি নিজে তা রাসূল সালালাহু আলাইহি ওয়াসালামের কাছ থেকে শুনেছেন? হজরত আবু দারদা (রাদি.) বললেন, জি! আমি নিজে এই কথা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছ থেকে শুনেছি। সাহাবি বললেন, আমি তাকে মাফ করে দিলাম।

দেখুন প্রথমে তার অবস্থা কী ছিল? রাগান্বিত হয়ে প্রতিশোধ নেয়ার জন্য প্রস্তুত। অর্থদণ্ড গ্রহণ করতেও রাজি নয়। আপোষ করতেও রাজ নয়। প্রতিশোধই নেবেন। কিন্তু যখনই রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের হাদিস শুনলেন, সঙ্গে সঙ্গে সকল রাগ দূর হয়ে গেল। বলাবাহুল্য যে, এটাই হল মুমিনের শান। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কত সহজ রাস্তা বাতলে দিয়েছেন যে, তুমি যদি মাফ কর তা হলে তোমাকেও মাফ করা হবে। আখেরাতে আল্লাহ তায়ালা তোমাকে মাফ করবেন।

কোনো কাজে লেগে যাওয়া: তৃতীয় পদ্ধতি এই বলা হয়েছে যে, ওই সময় কাজ ছাড়া থাকবে না। অর্থাৎ, যখন কেউ রাগান্বিত হয় তখন তার কোনো কাজে লেগে যাওয়া উচিত। বিশেষত পড়াশোনায় মগ্ন হওয়া অধিক উপকারী।

চতুর্থ পদ্ধতি: ওই স্থান ত্যাগ করা।

পঞ্চম পদ্ধতি:  বেশি বেশি أعوذ بالله من الشيطان الرجيم পড়া।

ষষ্ঠ পদ্ধতি: পানি পান করা।

সপ্তম পদ্ধতি: অজু করা।

আরো পড়ুন>>> ক্রোধের চিকিৎসা (পর্ব-২)

রাগ কমানোর আরেকটি পদ্ধতি: রাগ কমানোর আরেকটি পদ্ধতি হলো নিম্নমুখী হওয়া। অর্থাৎ, দাঁড়িয়ে থাকলে বসে পড়বে। বসে থাকলে শুয়ে পড়বে। কেননা ক্রোধ যাত্রা করে মস্তিষ্কের দিকে। এর প্রবণতাই হল ঊর্ধ্বমুখী। এ জন্য দেখা যায় ক্রুদ্ধ ব্যক্তি শুয়ে থাকলে উঠে বসে এবং বসে থাকলে উঠে দাঁড়ায় আর দাঁড়িয়ে থাকলে সামনে এগিয়ে যায়। এটা ক্রোধের বৈশিষ্ট্য। এ জন্য এর চিকিৎসা হলো উল্টো আচরণ করা। অর্থাৎ, দাঁড়িয়ে থাকলে বসে পড়ুন আর বসে থাকলে শুয়ে পড়ুন। এসব পদ্ধতি অনুসরণ করলে ইচ্ছাশক্তি বৃদ্ধি পাবে এবং ক্রোধ নিয়ন্ত্রণ করা সহজ হবে।

আগেই বলা হয়েছে যে, ক্রোধ নিয়ন্ত্রণে মূল বিষয় হলো ইচ্ছাশক্তি প্রয়োগ করা। উপর্যুক্ত পদ্ধতিগুলো সহায়কমাত্র। তাই এইসব পদ্ধতি অবলম্বন করার পাশাপাশি যদি ইচ্ছা শক্তি ব্যবহার করা না হয় তবে সুফল পাওয়া যাবে না।

মোটকথা দৃঢ় সংকল্প করুন, পরিস্থিতি যাই হোক, আমি ক্রোধের বশবর্তী হয়ে কোনো কাজ করব না। এটাই মূল বিষয়। এরপর উপর্যুক্ত পদ্ধতিগুলো আপনার সংকল্প অটুট রাখতে সহায়তা করবে। আল্লাহ তায়ালা নিজ অনুগ্রহে আমাদেরকে ক্রোধ নিয়ন্ত্রনের তাওফিক দান করুন।

ডেইলি বাংলাদেশ/আরএজে