Alexa ক্রোধের চিকিৎসা (পর্ব-২)

ঢাকা, মঙ্গলবার   ১৬ জুলাই ২০১৯,   শ্রাবণ ২ ১৪২৬,   ১৩ জ্বিলকদ ১৪৪০

ক্রোধের চিকিৎসা (পর্ব-২)

নুসরাত জাহান ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ১৮:৪০ ১১ মার্চ ২০১৯  

ফাইল ছবি

ফাইল ছবি

ক্রোধের তৃতীয় চিকিৎসা হজরত থানবি (রহ.) বলেছেন যে, ‘আলাহ তায়ালার আজাবকে স্মরণ করুন’। এই চিকিৎসাও হাদিস শরিফে এসেছে। একবার হজরত সিদ্দীকে আকবার (রাদি.) নিজের গোলামকে ভর্ৎসনা করছিলেন। রাসূল সাল্লালাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এটা দেখে বললেন-

لله أقدر عليك منك عليه

অর্থাৎ, এই গোলামের উপর তোমার যতটুকু ক্ষমতা রয়েছে তারচেয়ে অনেক বেশি ক্ষমতা তোমার উপর আল্লাহ তায়ালার রয়েছে। তুমি এই গোলামকে শাস্তি দিচ্ছ, যদি আল্লাহ তায়ালা তোমাকে শাস্তি দেয়ার সিদ্ধান্ত নেন, তা হলে তোমার অবস্থা কী হবে?
 
আল্লাহ তায়ালার আজাবকে স্মরণ করলে রাগ প্রশমিত হয়। ক্রোধের তীব্রতা হ্রাস পায়। এরপর হজরত থানবি (রহ.) বলেন, ‘নিজের গুনাহ স্মরণ করে অধিক পরিমাণে ইসতেগফার পড়তে থাকুন’। এটা প্রথম চিকিৎসারই অংশ। অর্থাৎ, নিজের ভুল-ত্রুটি স্মরণ করা ও ইসতেগফার করা। মোটকথা হজরত থানবি (রহ.) এখানে ক্রোধের তিনটি চিকিৎসা বয়ান করেছেন। কেউ যদি তা আনুসরণ করে, তবে ইনশাআলাহ ক্রোধ তার ক্ষতি করতে পারবে না।

ক্রোধের বশবর্তী হয়ে কাজ করো না: একজন লোক হজরত থানবি (রহ.) এর কাছে চিঠি লিখলেন যে, ‘কেউ যদি আপনার সমালোচনা করে তা হলে আমার সারা শরীরে আগুন ধরে যায়।’ জবাবে হজরত থানবি (রহ.) লিখলেন- ‘তবু প্রতিশোধের দিকে অগ্রসর হবে না, এমনকি মৌখিকভাবেও না।’ (আনফাসে ইসা ১৭০) অর্থাৎ, ক্রোধ আসুক, কিন্তু ক্রোধের বশবর্তী হয়ে কোনো কাজ করবেন না। এমনকি মৌখিকভাবেও প্রতিশোধ গ্রহণের চিন্তা করবেন না। 

ক্ষমা করা উত্তম: 
কোনো কোনো ক্ষেত্রে রাগান্বিত হওয়ার অনুমতি শরিয়তে রয়েছে। সেসব ক্ষেত্রে ক্রুদ্ধ হওয়া জায়েজ ও মুবাহ। যেমন, ন্যায়সঙ্গতভাবে বদলা নেয়া। (তবে তরবিয়তের জন্য এবং মাত্রাজ্ঞান ঠিক না থাকার আশংকা হলে জুলুম থেকে আত্মরক্ষার জন্য এই মুজাহাদা করানো হয় যে, বৈধ মাত্রার বদলাও নেবে না। অর্থাৎ, কোনো অবস্থাতেই ক্রোধ চরিতার্থ করবে না। যদিও ন্যায়সঙ্গতভাবে প্রতিশোধ নেয়া জায়েজ)। তবে সর্বাবস্থায় ক্ষমা করে দেয়াই উত্তম। কোরআন মাজিদে আল্লাহ তায়ালা বলেন,

الذين ينفقون في السراء و الضراء و الكاظمين الغيظ و العافين عن الناس 

‘তারা সকল অবস্থায় নেক কাজে সম্পদ ব্যয় করে, সচ্ছলতার সময়ও, অসচ্ছলতার সময়ও এবং ক্রোধ সংবরণ করে এবং মানুষকে ক্ষমা করে।’ (আলে ইমরান : ৩৪)

তাই ক্ষমা করে দেয়া আল্লাহ তায়ালার কাছে খুবই পছন্দনীয়। এর ফযীলত অনেক। এ জন্য প্রাথমিক পর্যায়ের সাধকদের জন্য বলা হচ্ছে যে, তোমরা প্রতিশোধ নিয়ো না। বরং সবর করো এবং কেউ যদি তোমাদের উপর অত্যাচার করে তাকে ক্ষমা করো। তা হলে তোমরা সবরেরও সাওয়াব পাবে ক্ষমা করারও সাওয়াব পাবে।

চিন্তা ও স্বভাবের বৈচিত্র্য: 
হজরত থানবি (রহ.) ‘আরওয়াহে সালাসা’তে একটি ঘটনা লিখেছেন। এক লোক তার শায়েখকে বলল, হজরত আমি শুনেছি যে, সুফী ও অলিদের নীতি ও স্বভাব বিভিন্ন ধরনের হয়। আমি এটা একটু দেখতে চাই। শায়েখ প্রথমে বললেন, এসব চিন্তা বাদ দাও। এগুলো কী কোনো কাজের কথা? নিজের প্রয়োজনীয় কাজে মশগুল থাকো। কিন্তু সে বারবার আবদার করতে লাগল, আমি একটু দেখতে চাই। শায়েখ বললেন, দিল্লীতে কুতুব সাহেবের মাজার আছে। তার কাছেই একটি ছোট মসজিদ আছে। সেখানে গেলে দেখবে তিনজন মানুষ আল্লাহ তায়ালার জিকিরে মশগুল আছে। তুমি তাদের প্রত্যেকের কোমরে একটি করে ঘুষি মারবে। এরপর যা কিছু ঘটে আমাকে এসে জানাবে। 

সে ওই মসজিদে গেল। সেখানে তিনজন মানুষ আল্লাহ তায়ালার জিকিরে মশগুল আছেন। সে প্রথমে একজন মানুষের কোমরে একটি ঘুষি মারলো। কিন্তু তিনি ভ্রুক্ষপই করলেন না। পূর্বের মতোই জিকিরে মশগুল থাকলেন। এবার দ্বিতীয় ব্যক্তির কোমরে ঘুষি মারলো। তিনি জিকির বন্ধ করে উঠে এসে তাকেও একটা ঘুষি বসিয়ে দিলেন এবং পুনরায় জিকিরে মশগুল হয়ে গেলেন। তৃতীয় ব্যক্তিকে ঘুষি দিলে তিনি ওঠে এসে তার হাত ধরে বলতে লাগলেন, হাতে ব্যথা পাওনি তো ভাই।

প্রতিশোধের চিন্তায় সময় নষ্ট করব কেন? 
মুরিদ শায়েখের কাছে ফিরে এসে বললো, বড় আশ্চর্য বিষয় দেখলাম। প্রথম ব্যক্তিকে ঘুষি দেয়ার পর তিনি আমার দিকে ফিরেও তাকালেন না। শায়েখ জিজ্ঞাসা কী করছিলেন? সে বলল, তিনি জিকির করছিলেন। শায়েখ বলল, তিনি ভাবছেন যে, যে আমাকে ঘুষি মেরেছে সে তো মেরেই দিয়েছে। ব্যথা যা পাওয়ার তা তো পেয়েছিই। এখন প্রতিশোধ নিয়ে এবং তাকে কষ্ট দিয়ে নিজের সময় কেন নষ্ট করব? যে সময়টা প্রতিশোধ নিতে ব্যয় হবে তা যদি অল্লাহ তায়ালার জিকিরে লাগাই তা হলে অনেক বেশি সওয়াব পাওয়া যাবে। এ জন্য তিনি তোমার দিকে ভ্রুক্ষেপই করেননি। পূর্বের মতোই জিকিরে মশগুল ছিলেন।

সমান বদলা নিয়েছেন: 
দ্বিতীয় ব্যক্তি যিনি তোমাকে ঘুষি দিয়েছেন, বলো দেখি, তিনি কী অত জোরেই মেরেছেন যত জোরে তুমি তাকে মেরেছ নাকি বেশি জোরে মেরেছেন? মুরিদ বলল, যত জোরে আমি মেরেছি তিনিও তত জোরেই মেরেছেন। শায়েখ বললেন, তিনি শরিয়তের নিয়ম অনুযায়ী প্রতিশোধ নিয়েছেন। কোরআন মজিদে এসেছে,

و إن عاقبتم فعاقبوا بمثل ما عوقبتم به 

‘যদি প্রতিশোধ নাও তবে অতটুকুই যতটুকু তোমাকে কষ্ট দিয়েছে।’ (নাহল : ১২৬)

এতেই তোমার জন্য কল্যাণ ছিল:
আর তিনি যে বদলা নিয়েছেন তাও তোমারই কল্যাণের জন্য। নিজের ক্রোধ চরিতার্থ করার জন্য নয়। কেননা কখনো কখনো এমন হয় যে, যদি কোনো আল্লাহ তায়ালার বান্দাকে কষ্ট দেয়া হয় এবং সে প্রতিশোধ না নিয়ে কসবর করে, তখন কষ্টদাতার উপর আল্লাহ তায়ালার আজাব এসে যায়। উর্দূ ভাষায় একে বলে ‘সবর পড়না’। এটা খুবই ভয়াবহ। এ জন্য ওই বুজুর্গ ভেবেছেন, আমার সবরের কারণে তার যদি কোনো ক্ষতি হয়ে যায়। তাই তিনি ন্যায়সঙ্গত বদলা নিয়েছেন।

একটি ইলমি প্রশ্ন:
এখানে প্রশ্ন হয় যে, তবে কী বুজুর্গরা আল্লাহ তায়ালার চেয়েও অধিক দয়াশীল হয়ে গেলেন? কেননা আল্লাহ তায়ালা বলেছেন,

من آذى لي وليا فقد آذنته بالحرب

‘যে আমার কোনো প্রিয় বান্দাকে কষ্ট দেয় তার সঙ্গে আমার যুদ্ধের ঘোষণা।’ 

অথচ বুজুর্গরা অধিক দয়ার পরিচয় দিয়ে তাকে ক্ষমা করে দিচ্ছেন। তাহলে কী বুযুর্গরা আল্লাহ তায়ালার থেকেও বেশি মেহেরবান ও দয়াশীল হয়ে গেছেন?

প্রশ্নের উত্তর:
হজরত থানবি (রহ.) এই প্রশ্নের উত্তর দিতে গিয়ে বলেন, দেখ, বাঘিনীকে যদি কেউ বিরক্ত করে তবে অনেক সময় সে ভ্রুক্ষেপও করে না, কিন্তু যদি তার শাবককে বিরক্ত করা হয় তা হলে সে বরদাশত করে না। এভাবেই চিন্তা করো যে, অনেক সময় আল্লাহ তায়ালা তাঁর সঙ্গে কৃত অপরাধকে ক্ষমা করে দেন। কিন্তু তাঁর খাঁটি বান্দাদের সঙ্গে বেয়াদবী ক্ষমা করেন না। এ জন্য বলেছেন,

من آذى لي وليا فقد آذنته بالحرب

এই হাদিস সম্পর্কে সমালোচনা: 
এই হাদিস ইমাম বুখারি (রহ.) সহিহ বুখারিতে এনেছেন। সহিহ বুখারির আর কোনো হাদিস এমন নেই যার সনদ সম্পর্কে মুহাদ্দিসগণ এত আপত্তি করেছেন। এমনকি কেউ কেউ এমন মন্তব্যও করেছেন যে, এ হাদিস সহিহ বুখারিতে সংকল করা ইমাম বুখারির ভুল হয়েছে। কেননা এটা তার মানদণ্ডে উত্তীর্ণ নয়। তথাপি তিনি তা তার কিতাবে স্থান দিয়েছেন। এ সম্পর্কে ওলামায়ে কেরাম লিখেছেন, এমন নয় যে, হাদিসটি অত্যন্ত যয়ীফ মওজু তবে তা ইমাম বুখারির নির্ধারিত মানদণ্ডে উত্তীর্ণ নয়। কিন্তু ইমাম বুখারি (রহ.) কখনো কখনো তার নির্ধারিত মানদণ্ড ওই সব ক্ষেত্রে পরিত্যাগ করে থাকেন যেখানে অন্যান্য আলামত দ্বারা বর্ণনাটি হাদিস হওয়ার প্রত্যয় জন্মে। 

ক্রোধ আসাটা স্বাভাবিক: 
হজরত থানবি (রহ.) বলেন, ক্রোধ একটা স্বভাবগত প্রবণতা। এটা সৃষ্টি হওয়া মানুষের এখতিয়ারের বিষয় না। এ জন্য শুধু ক্রোধ সৃষ্টি হওয়া দোষ নেই। তবে ক্রুদ্ধ হওয়ার পর যে কাজগুলো করতে ইচ্ছা করে তা করে ফেলা, যদি তা বৈধ মাত্রা অতিক্রম করে তা হলে নিন্দনীয়। (আনফাসে ইসা ১৭০)

অর্থাৎ, মনে রাগ সৃষ্টি হওয়ার উপর মানুষের নিয়ন্ত্রণ চলে না। এটা সৃষ্টি হয় স্বভাবগতভাবে। তাই শুধু রাগ সৃষ্টি হওয়ার কারণে অপরাধ হবে না। কেননা যে সব বিষয় মানুষের ইচ্ছাধীন নয় সে সম্পর্কে তাকে জিজ্ঞাসা করা হবে না। তাকে জিজ্ঞাসা করা হবে ওই সব বিষয়ে, যা সে স্বেচ্ছায় স্বজ্ঞানে সংঘটিত করে। অতএব স্বভাবগতভাবে মনে যে রাগ সৃষ্টি হলো, এটুকুর কারণে বান্দা আল্লাহ তায়ালার কাছে অপরাধী হবে না। কিন্তু এই রাগের কারণে আপনি যদি তার সঙ্গে মন্দ আচরণ করেন, মুখ বা হাতে তাকে কষ্ট দেন তা হলে এটা অপরাধ হবে। এ জন্য যতক্ষণ পর্যন্ত রাগের বশবর্তী হয়ে কোনো কাজ করা না হচ্ছে ততক্ষণ পর্যন্ত ইনশাআলাহ কোনো ক্ষতি হবে না। 

সীমা অতিক্রম করা নিন্দনীয়: 
কিন্তু ক্রোধের সময় সাধারণত যা হয়ে থাকে তা এই যে, মানুষ খুব উত্তেজিত হয়ে পড়ে এবং তার সকল অঙ্গ প্রতঙ্গে যেন বিদ্যুৎ প্রবাহিত হতে থাকে। তখন সে এমন আচরণও করে বসে যা অন্যায়। এ দিকেই ইঙ্গিত করে হজরত থানবি (রহ.) বলেন, ক্রোধ একটি স্বভাবগত বিষয়। এটা মানুষের ইচ্ছার অধীন নয় বলে তার অপরাধও নয়। তবে ক্রোধের বশবর্তী হয়ে কাজ করা, যখন তা ন্যায়ের সীমা অতিক্রম করে, নিন্দনীয়।

ডেইলি বাংলাদেশ/আরএজে