কোয়ারেন্টাইন ব্যবস্থা মহামারি ‘কালো মৃত্যু’ ঠেকাতে পারেনি!

ঢাকা, রোববার   ০৭ জুন ২০২০,   জ্যৈষ্ঠ ২৪ ১৪২৭,   ১৪ শাওয়াল ১৪৪১

Beximco LPG Gas

কোয়ারেন্টাইন ব্যবস্থা মহামারি ‘কালো মৃত্যু’ ঠেকাতে পারেনি!

জান্নাতুল মাওয়া সুইটি ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ১৫:১৪ ২৯ মার্চ ২০২০   আপডেট: ১৫:৪৪ ২৯ মার্চ ২০২০

ছবি: প্লেগ রোগের লক্ষণ

ছবি: প্লেগ রোগের লক্ষণ

ইতালিতে তখন ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে বুবনিক প্লেগ। প্রায় ৭০০ বছর আগের কথা। মধ্যযুগে বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়া এই বুবনিক প্লেগকে কালো মৃত্যুও বলা হত। ধ্বংসাত্মকভাবে পুরো ইতালিজুড়ে এই মহামারিতে মৃত্যুর সংখ্যা বাড়তেই থাকে। 

এই রোগের প্রাদুর্ভাব সম্পর্কে বিজ্ঞানী বা চিকিৎসকদের কোনো ধারণাই ছিল না। তখনকার চিকিৎসাব্যবস্থাও এই রোগের কারণ হিসেবে কোনো ভাইরাস বা ব্যাকটেরিয়া দায়ী সে কোনো তথ্য দিতে পারেনি। ৫৪০ থেকে ১৯৬০ পর্যন্ত মোট তিনবার প্লেগ মহামারির শিকার হয় বিশ্ব। এতে মৃত্যুর হিসাব সংখ্যায় গণনা করা কঠিন। 

১৩৪৪ সালে, প্লেগ রোগ ভেনিস এবং মিলানের মতো শহরে ছড়িয়ে পড়ে। অতঃপর সবার টনক নড়ে। জরুরি জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থা গ্রহণ করার লক্ষ্যে তখন চালু হয় সামাজিক দূরত্ব এবং কোয়ারেন্টাইন। এর মাধ্যমেই মরণব্যাধি প্লেগ প্রতিরোধ করা সম্ভব বলে জানানো হয়। করোনাভাইরাস প্রতিরোধেও কিন্তু বর্তমান বিশ্ব এই একই পন্থা অবলম্বন করছে। করোনার প্রাদুর্ভাব দিনকে দিন বেড়েই চলেছে। আর এই ভাইরাস মোকাবিলায় সবাই আজ কোয়ারেন্টাইন পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। ঠিক মধ্যযুগেও যখন প্লেগ ছড়িয়েছিল তখন দিশেহারা জনপদ এই একই নিয়মে আবদ্ধ হয়েছিলেন।

বুবনিক প্লেগ কী?

ইয়ারসিনিয়া পেস্টিস নামক ব্যাকটেরিয়া মক্ষিকার কামড়ের মাধ্যমে শরীরে প্রবেশ করত। অতঃপর নিকটবর্তী লসিকা গ্রন্থিতে এটি বসতি গড়ে বংশবিস্তার শুরু করত। এই ব্যাকটেরিয়াগুলো সাধারণত বগল, উরুর ঊর্ধ্বভাগ, কুঁচকি ও ঘাড় অঞ্চলে বেশি দেখা যায়। এছাড়া হাত ও পায়ের আঙুল, ঠোঁট ও নাকের অগ্রভাগের টিস্যুতে গ্যাংগ্রিনের রূপ ধারণ করত। এতে করে এসব স্থান কালো হয়ে ফুলে যেত। 

এই ব্যাকটেরিয়াটিই প্লেগের জন্য দায়ীএই রোগের লক্ষণ কেমন ছিল?

ঠাণ্ডা অনুভূতি, অসুস্থতা-বোধ, উচ্চমাত্রায় জ্বর, মাংসপেশি সংকোচন, খিঁচুনি, ব্যথাযুক্ত লসিকা গ্রন্থি বা বিউবো যা কুঁচকিতে বেশি দেখা যায় তবে বগল বা ঘাড়েও থাকতে পারে। প্রায়শ প্রাথমিক সংক্রমণের নিকটবর্তী স্থানে বেশি দেখা যায়। আক্রান্ত লসিকা গ্রন্থি ফুলে যাওয়ার আগেই ব্যথা হতে পারে। হাত ও পায়ের আঙুল, ঠোঁট ও নাকের অগ্রভাগের টিস্যুতে গ্যাংগ্রিন হয়। এর অন্যান্য লক্ষণসমূহের মধ্যে রয়েছে গভীর শ্বাস-প্রশ্বাস, অনবরত রক্তবমি, হাত-পা ব্যথা হওয়া, কাশি ও রোগী বেঁচে থাকা অবস্থাতেও ত্বকের ক্ষয় বা পচনের ফলে সৃষ্ট তীব্র ব্যথা। এছাড়া প্রচণ্ড ক্লান্তি, পেটের সমস্যা, লেন্টিকিউলি (সারা দেহে ছড়িয়ে থাকা কালো দাগ), প্রলাপ বকা ও গভীর ঘুম বা অচেতন অবস্থা।

এই রোগটি কীভাবে ছড়িয়ে পড়েছিল?

খাদ্যশস্যের মাধ্যমেই প্লেগ ছড়িয়ে পড়ে। এক ধরনের কালো ইঁদুরের শরীরেই নির্দিষ্ট ওই ব্যাকটেরিয়া বাস করত। আর এসব ইঁদুর যখন ফসলি জমির খাদ্যশস্যের সংস্পর্ষে আসত তখনই তাতে তা বাসা বাধত। ৫৪০ খ্রীষ্টাব্দের দিকে তৎকালীন সময় পৃথিবীতে মিশরই ছিল ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলে খাদ্যশস্য জোগানের একমাত্র উৎস। জাহাজের মাধ্যমে মিশর থেকে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে তখন পৌঁছে যেত বিভিন্ন খাদ্যশস্য। আর এ কারণেই সংক্রমণ এক দেশ থেকে অন্য দেশে গিয়ে আঘাত হানত। এই মহামারির ফলে রোমান সাম্রাজ্য মুখ থুবড়ে পড়েছিল। পাশাপাশি পুরো ইউরোপ, এশিয়া, উত্তর আফ্রিকা এবং আরব জুড়ে দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়েছিল প্লেগ। বিশ্বের জনসংখ্যার প্রায় অর্ধেক মানুষেই মারা যায় প্লেগে আক্রান্ত হয়ে। 

অক্সফোর্ড ব্রুকস বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাথমিক ইউরোপীয় ইতিহাসের প্রবীণ প্রভাষক জেন স্টিভেনস ক্র্যাশওয়া তখনকার পরিস্থিতি বিবেচনা করে বলেন, ইউরোপে যখন প্লেগ ছড়িয়ে পড়ে তখন সেখানে ব্যবসা বাণিজ্যও অচল হয়ে পড়েছিল। কারণ প্লেগের জীবাণু যে সর্বত্রই ছড়িয়ে পড়েছিল। ধারণা করা হত, ক্রয়কৃত বিভিন্ন জিনিসপত্র এমনকি খোলা স্থানেও এর জীবাণু থাকত। পরবর্তীতে ব্যক্তি থেকে ব্যক্তিতে ছড়িয়ে পড়ত জীবাণু। সে সময় সামাজিক যোগাযোগ সীমাবদ্ধ করতে কোয়ারেন্টাইনের ব্যবস্থা চালু হয়।

আক্রান্ত স্থান এমন রূপ ধারণ করতপ্রথম কোয়ারেন্টাইন

অ্যাড্রিয়াটিক বন্দর শহর রাগুসায় (আধুনিক ডুব্রোভনিক) সর্বপ্রথম কোয়ারেন্টাইনের  আইনটি পাস হয়। ইতালির সিসিলি শহরেই রাগুসার অবস্থান। সেখান থেকেই কোয়েরেন্টাইন শুরু হয়। কারণ সেখান থেকে জাহাজ আসা যাওয়া করত। এরপর যখন কোনো জাহাজই ওই বন্দরে আসত তখনই তাদের বাধ্যতামূলকভাবে কোয়ারেন্টাইনে রাখা হত। এমনকি ওই অঞ্চলে যারা থাকতেন তাদেরও শহরের অন্যান্য স্থানে যাওয়া নিষিদ্ধ ছিল। 

ইতিহাসবিদরা জানায়, এই উপায়ের মাধ্যমেই রাগুসা থেকে পরবর্তীতে প্লেগ ছড়ানো অনেকটা কমে যায়। এদিকে বন্দরের জাহাজগুলোর পৃথকীকরণ নির্দেশকে মধ্যযুগীয় চিকিৎসকরা তাদের অন্যতম অর্জন বলে মনে করেন। অন্তত ৩০ দিনের জন্য তখন নাবিক ও ব্যবসায়ীদেরকে কোয়ারেন্টাইনে রাখা হত জাহাজেই। ১৩৭৭ সালের কোয়ারেন্টাইন অর্ডারে নির্ধারিত ৩০ দিনের মেয়াদটি ইতালীয় ভাষায় ট্রেন্টিনো হিসাবে পরিচিত ছিল। 

এরপর শুরু হয় ৪০ দিনের কোয়ারেন্টাইন

স্বাস্থ্যবিদরা এরপর ৪০ দিনের পৃথকীকরণের পরামর্শ দিয়েছিলেন। কারণ মধ্যযুগীয় খ্রিস্টানদের কাছে এই সংখ্যাটির মহাত্ম ছিল অনেক। এটি তাদের একটি ধর্মীয় তাৎপর্যপূর্ণ প্রতীকী সংখ্যা! ঈশ্বর পৃথিবীতে নাকি একবার টানা ৪০ দিন বন্যা দিয়েছিলেন আবার ৪০ রাত বৃষ্টি হয়েছিল এবং যীশুখ্রীষ্টও নাকি ৪০ দিন একাধারে উপবাস করেছিলেন। স্টিভেনস ক্র্যাশওয়া বলেন, বাইবেলের এই ব্যাখ্যা অনুযায়ীই প্লেগ যাতে আর না ছড়িয়ে পড়ে এজন্য ৪০ দিনের কোয়ারেন্টাইন ব্যবস্থা চালু করা হয়। এমনকি তখনকার সময় কোনো মা সদ্য প্রসব করলে সেও ৪০ দিনের জন্য বিশ্রাম গ্রহণ করতে পারত।

কোয়ারেন্টাইন আইন কি কাজ করেছিল?

মাঝে কিছু প্লেগের প্রাদুর্ভাব কমলেও রাগুসা বন্দরটি ১৩৯১ থেকে ১৩৯৭ সালে আবারো প্লেগের আঁতুরঘর হিসেবে পরিণত হয়। কারণ এটি ছিল একটি বাণিজ্যিক কেন্দ্র। সেই বন্দর থেকেই নিত্য প্রয়োজনীয় মালামাল আনা নেয়া করা হত। কোয়ারেন্টাইনে চলাকালীন সময়ে অন্যান্য দেশের জাহাজ সেখানে ভিড়তে না পাড়ায় অর্থনৈতিকভাবে ঝুঁকিতে পড়েছিল গোটা ইউরোপ। এ কারণেই নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিসের সংকট এড়াতে ঠিক যখনই অন্যান্য জাহাজ বন্দরে ভিড়তে শুরু করল প্লেগ আবারো মহামারি আকার ধারণ করল। সে সময় রাগুসা বন্দর সম্পূর্ণভাবে প্লেগমুক্ত করা যেন অসম্ভব হয়ে গিয়েছিল। 

প্লেগে আক্রান্ত হয়ে কোটি কোটি মানুষ মারা যায়রাগুসায় প্রথম প্লেগ হাসপাতাল নির্মিত হয়

১৭ শতাব্দীতে ইউরোপে চলমান প্লেগের সঙ্গে লড়াইয়ের একমাত্র হাতিয়ার ছিল কোয়ারেন্টাইন। এই উপায় ছাড়া হয়ত মহাদেশটি ধ্বংস হয়ে যেত প্লেগের কবলে পড়ে। এরপরই রাগুসা শহরেই প্রথম প্লেগ হাসপাতাল স্থাপন করা হয়। মেলজেট নামক একটি দ্বীপে অস্থায়ীভাবে প্লেগ হাসপাতালটির কাজ শুরু হয়। রাষ্ট্রীয় অনুদানেই তৈরি করা হয় হাসপাতালটি। নাম দেয়া হয় ‘লেজারেত্ত’। যা দ্রুতই পুরো ইউরোপে পরিচিতি পায়। 

এই চিকিৎসা কেন্দ্রের প্লেগে আক্রান্ত রোগীদেরও যেমন চিকিৎসা দেয়া হত তেমনই অন্যদেরকেও আলাদাভাবে চিকিৎসা দেয়ার ব্যবস্থা ছিল। যেমন- নতুন আগত এবং স্থানীয় নাগরিকদের উভয়য়ের জন্য হাসপাতালের একপাশ বরাদ্দ ছিল। আর প্লেগে আক্রান্ত বা সম্ভাবনা রয়েছে এমন রোগীদের জন্য ভিন্ন ব্যবস্থা রাখা হয়েছিল। হাসপাতালটি সর্বোচ্চভাবে নিশ্চিত করেছিল যাতে সেখান থেকে প্লেগ না ছড়াতে পারে। এমনকি সেখানে প্লেগ আক্রান্তদেরও অত্যন্ত ভালোভাবে সেবা করা হত। তাদেরকে ভালো ও পুষ্টিকর খাবার, পরিষ্কার বিছানাপত্র এবং স্বাস্থ্য সুরক্ষামূলক সব ব্যবস্থায় রাষ্ট্র বহন করত।

স্টিভেনস ক্র্যাশওয়া বলেছেন, যে কোনো মহামারি ঠেকাতে সে দেশের রাষ্ট্রপ্রধানদের নেয়া পদক্ষেপগুলোই জনগণের প্রাণ বাঁচাতে পারে। জনসাধারণের স্বাস্থ্যের উন্নতিতেও যেমন রাষ্ট্র কাজ করবে ঠিক তেমনিভাবে তাদেরকে বাঁচানোর দায়িত্বও রাষ্ট্রের। এসব ক্ষেত্রে সরকারকে প্রচুর অর্থ ব্যয় করতে হয়। হাসপাতাল, ওষুধের যোগান, খাদ্যদ্রব্যের মজুদ, চিকিৎসাসেবা সব কিছুর বন্দোবস্ত করেই তবে মহামারি বিরুদ্ধে লড়াই করা সম্ভব।

ইতিহাসবিদের মতে, মহামারির চূড়ান্ত পর্যায়ে সেখানে প্রতিদিন গড়ে পাঁচ হাজার মানুষ মারা যেত! প্রায় ৫০ বছর ধরে বিশ্বে টিকে ছিল এই মহামারি রোগটি। এতে বিশ্বব্যাপী আড়াই কোটি মানুষ প্রাণ হারায়। তবে কিছু কিছু উৎসে সংখ্যাটা ১০ কোটিতেও ঠেকেছে। প্রাচীন পৃথিবীর সবচেয়ে ভয়ানক এ মহামারিই ইউরোপে ‘ডার্ক এজ’র সূচনা করেছিল। 

সূত্র: হিস্টোরিডটকম

ডেইলি বাংলাদেশ/জেএমএস