কোলাহলমুখর থেকে শূণ্য ক্যাম্পাস, দাগ কাটছে বুটেক্সিয়ানদের

ঢাকা, মঙ্গলবার   ০২ জুন ২০২০,   জ্যৈষ্ঠ ১৯ ১৪২৭,   ০৯ শাওয়াল ১৪৪১

Beximco LPG Gas

কোলাহলমুখর থেকে শূণ্য ক্যাম্পাস, দাগ কাটছে বুটেক্সিয়ানদের

ফরমান হোসাইন, বুটেক্স ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ১৩:০২ ৯ এপ্রিল ২০২০   আপডেট: ১৭:০৪ ৯ এপ্রিল ২০২০

বাংলাদেশ টেক্সটাইল বিশ্ববিদ্যালয়

বাংলাদেশ টেক্সটাইল বিশ্ববিদ্যালয়

পুরোদমে চলছিলো টার্ম ফাইনাল পরীক্ষার প্রস্তুতি। সবাই কামরুল ভাইয়ের দোকানে হুমড়ি খেয়ে পড়ছে শিট, নোট কিংবা বইয়ের কিছু পেজ ফটোকপি নিতে।

সারা বছর কামরুল ভাইয়ের দোকানে ভিড় থাকলেও এই সময়ে একটু বেশিই ভিড় বেড়েছে ।  

এইতো কদিন পরই শুরু হবে পরীক্ষা। কেউ যায় লাইব্রেরি কিংবা টিএসসিতে গ্রুপ স্ট্যাডি করতে। কেউ যায় প্রাণের ক্যাম্পাসের ঘ্রাণ নিতে। অনেকে যায় একসঙ্গে আড্ডা, গিটারের টুং টাং শব্দে সুর মিলাতে।

মাঠ শূণ্য, ক্যাম্পাসের পাতাবিহীন প্রতিটি গাছ ঠাই দাঁড়িয়ে আছে। এইতো কদিন পরই নতুন পাতা গজাবে। সকালে মন মরা গাছের ডালে পাখিরা গলা বাজিয়ে গান করে। এমন সুনশান নীরব পরিবেশে কার না ইচ্ছে করে বুক ভরে নিশ্বাস নিতে।

বলছিলাম দেশের টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ার তৈরির আঁতুড়ঘর বাংলাদেশ টেক্সটাইল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুটেক্স) কথা।

করোনা আতঙ্কে যখন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ১৮ মার্চ থেকে বন্ধ ঘোষণা করা হয় তখন থেমে যায় ব্যস্ততম ক্যাম্পাসের সব আয়োজন। সবাই তাড়াহুড়ো করে নিজ নিজ শহরে পাড়ি জমায়।

কেমন আছে প্রাণের সেই ক্যাম্পাস! চোখ বন্ধ করলেই ভেসে উঠে ক্যাম্পাসের প্রতিটি আঙ্গিনার প্রতিচ্ছবি। শহীদ মিনার, টিএসসি, বাঁধন- একাত্তরের রুম, নতুন বিল্ডিংয়ের ১৩ তলা, লাইব্রেরি, স্পিনার্স কর্নার, বিটাক মোড়, হাতিরঝিলের লাল-নীল বাতি। এইতো এসব স্থানের সঙ্গে জড়িয়ে আছে প্রতিটি শিক্ষার্থীর আবেগঘন স্মৃতি আর বুক ভরা ভালোবাসা। নিশ্চয়ই এ সময়টাতে সুযোগ বুঝে পুরো ক্যাম্পাস সেজেছে প্রকৃতির আপন নিয়মে। এসব ভাবতে ভাবতে চোখ ঝাপসা হয়ে আসে।

অন্যদিকে হলগুলোর প্রতি রাতের গান-বাজনা, আড্ডা, প্রতিটি বিকেলে নিয়ম করে হলের মাঠে ফুটবল খেলা। তারপর একটু  সন্ধ্যা হলেই কামাল মামার দোকানে চা আর লাড্ডু খাওয়া। তারপর টিউশন শেষ করে রাত করে হলে ফিরে সারাদিনে দেখা না হওয়া বন্ধুদের সঙ্গে জমিয়ে আড্ডা। একটু পরই বিছানার চাদরে গা এলিয়ে দিয়ে আরাম করে ঘুম। এসবই এখন রূপকথার গল্পের মতো।

তালা ঝুলছে ক্যাম্পাসের প্রতিটি রুমে রুমে। হল, ক্যান্টিন বাদ যায়নি একটিও। গাছে গাছে নতুন পাতা, পাখিদের কলকাকলি, পবিত্র এক সুন্দর পরিবেশ। শহীদ মিনারটা ঠাই দাঁড়িয়ে আছে, হয়না সপ্তাহে নিয়ম করে আড্ডা। সারি সারি লাল বাসগুলো দাঁড়িয়ে নেই এখন আর। টিএসসিতে দুপুরবেলার কান ঝাঁঝালো বিতর্ক হয় না এখন। তাছাড়া হাতিরঝিলটা এখন হয়তো জনমানবশূন্য। এই সুযোগে না হয় হাতিরঝিলটা সাজুক প্রকৃতির নিয়মে। সুন্দর হোক, কঠিনতম সুন্দর। 

কেমন যাচ্ছে করোনার ছুটির দিনগুলো। জানতে চাওয়া হয়েছিলো বুটেক্সিয়ানদের কাছে।

ফ্যাশন অ্যান্ড ডিজাইন বিভাগের কাজী ফারহান হোসেন পূর্ব বলেন, করোনা কিন্তু আমাদেরকে খুবই কঠোরভাবে নিয়মানুবর্তিতা শিখিয়ে দিয়ে যাচ্ছে। একটু ভিন্নভাবে ভাবলে দেখবেন কোয়ারেন্টাইনের এই অফুরন্ত অবসর সময়টা জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেয়ার মতো। কেউ এই সময়টাকে পুঁজি করে নিজেকে শক্তিশালী করে গড়ে তুলবে, কেউবা হারিয়ে যাবে অন্ধকারে। নিজের লক্ষ্য ঠিক করে কাজগুলোকে গুছিয়ে নেয়ার এইতো সময়। তাই আমি শত নেতিবাচকতার মধ্যেও করোনাকে একরকম আশীর্বাদ হিসেবেই দেখছি। এই অবসর সময়ে আমি বিভিন্ন বই পড়ছি। সাইকোলজি নিয়ে ভিডিও বানাতে পছন্দ করি। সেগুলো বানিয়ে ফেসবুকে আপলোড দিচ্ছি। সেই সঙ্গে কিছু অনলাইন কোর্স করে নিজেকে শান দিয়ে নিচ্ছি। সবারই এই সময়টাকে কাজে লাগানো উচিত এবং যেকোনো মূল্যে নিজেকে এবং আশেপাশের সবাইকে বাইরে যাওয়া থেকে বিরত রাখা উচিৎ।

৪৩তম ব্যাচের ইয়ার্ন ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের প্রসেনজিৎ সেন বলেন, এমন অবসর কখনো চাই না, যেখানে থাকবে শুধুই আতঙ্ক-ভীতি, থাকবে প্রিয়জনদের থেকে দূরে সরে গিয়ে সময় যাপন। আমার কাছে ব্যস্ততাকে সবসময় আপন মনে হয়েছে। এই হোম কোয়ারেন্টাইনের সময়টাতে সবথেকে বেশি মিস করি ঐ সব মানুষদের, যাদের নিয়ে আমার প্রতিমুহূর্ত অতিবাহিত হত এবং রাতের ঢাকা শহরকে। ঢাকা শহরও আমাদের ঠিকই মিস করে কারণ গভীর রাতে এই নীরব শহরকে আমরাই কোলাহলপূর্ণ করতাম।

কথা বলেছিলাম ৪২তম ব্যাচের ইয়ার্ন ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের শিক্ষার্থী আসাদুজ্জামান আকাশের সঙ্গে। তিনি বলেন, ছোটবেলা থেকে খেলাধুলার প্রতি আগ্রহ বেশি। এই মুহূর্তে ওসমানী হল খেলার মাঠকে খুব বেশি  মিস করছি। ব্যাট হাতে কবে যে মাঠে নামার প্রহর গুণছি। পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে আবার টেক্সটাইল ক্যাম্পাসে খেলাধুলা মুখর হবে আশা করি।

এনভায়রনমেন্টাল সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধরা তানিশা কবির বলেন, সর্বদা উৎসবমুখর আর প্রাণবন্ত বুটেক্সকে করোনা মোকাবিলায় হঠাৎ জানাতে হয়েছে। লকডাউন পরিস্থিতিতে পরিবারের সঙ্গে সময় কাটাচ্ছি। নতুন গল্পের বই পড়ছি। কিন্তু তবুও মনে হয় সকাল ৮টা থেকে বিকাল ৫টা পর্যন্ত ক্লান্তিময় রুটিনটিও বর্তমান অবস্থা থেকে ঢের ভালো ছিলো।

তিনি আরো বলেন, প্রকৃতি যখন বসন্তের আবেশে পরিপূর্ণ হওয়ার কাজে ব্যস্ত তখনই করোনার আঘাত স্তম্ভিত করে দিয়েছে সারাদেশ ও পৃথিবীকে। বাঙালি বীরের জাতি। সংগ্রাম করে বাঁচতে শিখেছে, কখনো পিছপা হয়নি। দেশের এই বিপদকালীন অবস্থাও আমরা সকলে করোনা সম্বলিত স্বাস্থ্যবিধি মেনে সফলভাবে কাটিয়ে উঠতে পারবো।

৪৫তম ব্যাচের এপারেল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের শিক্ষার্থী মিলন বনিক বললেন, ক্যাম্পাসে যখন ছিলাম, কোনোদিন খেয়ালই করিনি যে ঘন ঘন বিএমডব্লিউ যাওয়া, বিটাক মোড় যাওয়া, ক্যান্টিনে যাওয়া। এখন হয়তো এত্ত এত্ত মিস করব। এখন অনুভূতিটা এমন হয়েছে, যেন কেউ আমার কাঁচা হৃদপিণ্ডটা বুক থেকে একদম এক টানে ছিঁড়ে নিয়ে গেছে, আমার নিথর দেহটা এককোণে পড়ে আছে। ফাগুন পেড়িয়ে চৈত্রের চৈতালীও হয়ত বিদায় নিয়েছে। ওদিকে শেষের কবিতার ‘অমিত’ থাকলে হয়ত সানন্দে বসন্ত বিদায় করত। কিন্ত আমি একা সন্তর্পণে, বেলা যেন ফুরোতেই চায় না। খেয়াল করেছি আজকাল আমার ঘুমও যেন কমে গিয়েছে, চোখ বুঝলেই চোখে ভেসে উঠে ক্যাম্পাসের সবার ভুবন ভুলানো হাসি, কানে বাজে সবার কথা।

ডেইলি বাংলাদেশ/জেডএম