Alexa কোরআন হাদিসে বর্ণিত ঘটনার ছবি তৈরি: ইসলাম কী বলে?

ঢাকা, বুধবার   ১৭ জুলাই ২০১৯,   শ্রাবণ ২ ১৪২৬,   ১৩ জ্বিলকদ ১৪৪০

কোরআন হাদিসে বর্ণিত ঘটনার ছবি তৈরি: ইসলাম কী বলে?

শহীদুল ইসলাম ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ১৯:০৭ ১২ মার্চ ২০১৯  

ফাইল ছবি

ফাইল ছবি

কোরআন, হাদীসে বর্ণিত বিভিন্ন ঘটনা নিয়ে ছবি বা ফিল্ম তৈরি সম্প্রতি ব্যাপকতা পেয়েছে।

জনপ্রিয়তার কারণে উদ্যোক্তারা কোটি কোটি টাকা এ ছবিগুলো নির্মাণে ব্যয় করছে। বিভিন্ন দেশের জনপ্রিয় তারকারা এগুলোতে অভিনয় করছে। দেশি-বিদেশি বিভিন্ন টেলিভিশন এগুলোকে ধারাবাহিকভাবে সম্প্রচার করছে। যেমন ইউসুফ-জুলেখা, মূসা-ফেরাউন ও আসহাবে কাহাফসহ আরো বিভিন্ন ঘটনা। 

অনেকের দাবী হচ্ছে, এর দ্বারা দাওয়াতের কাজ হচ্ছে। মুসলমানদের মধ্যে যারা আলেম উলামাদের কাছ থেকে কোরআন হাদিস শিখতে পারে না, তারা এর দ্বারা কিছুটা হলেও দীনের সংস্পর্শে আসছে বা আসবে। এর দ্বারা মূলত বুঝাতে চাচ্ছে, এভাবে হলেও তাদের সামনে দীনের কিছু প্রচার প্রসার হোক। তাদের এই যুক্তি দাবি করে, ইসলাম প্রচার ও লোকদেরকে প্রভাবিত করার জন্য, যেকোনো পদ্ধতি অবলম্বন করা জায়েজ; চাই সেটি ইসলামী নীতিমালার বিরোধী হোকনা কেন।

এ ব্যাপারে কথা হচ্ছে, ইসলাম আল্লাহ তায়ালার মনোনীত ধর্ম। নবী মুহাম্মাদ (সা.) হচ্ছেন সেই ধর্মের নবী। তিনি হলেন সর্বশেষ নবী; তাঁর পর আর কোনো নবী আগমণ করবেন না। তাই কিয়ামত পর্যন্ত দুনিয়ায় যত মানুষের আগমণ ঘটবে, তাদেরকে ইসলামের দিকে দাওয়াত দেয়ার দায়িত্ব ন্যস্ত হয়েছে মুসলমানদের উপর। বিদায় হজের ভাষণে রাসূল (সা.) উম্মতে মুসলিমার উপর এই দায়িত্ব দিয়ে গেছেন। হাদিসটি হজরত ইবনে আব্বাস (রা.) এর সূত্রে, ইমাম বোখারী (রাহ.)-সহ আরো অনেকে বর্ণনা করেছেন। 

শরয়ী দৃষ্টিকোন থেকে দেখলে দাওয়াতে দীন, দীনের বিধিবিধানের মধ্য থেকে একটি। এ জাতীয় বিধিবিধান বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে আল্লাহ তায়ালা সুনির্দিষ্ট কোনো তরীকা দেননি। বরং কিছু মৌলিক নীতিমালা দিয়েছেন। সেই নীতিমালা মেনে, যেকোনো পদ্ধতি অনুসরণ করে দাওয়াত দেয়া যাবে। এর বাইরে গিয়ে দাওয়াতী কার্যক্রম পরিচালনার কোনো সুযোগ নেই। যারা কোনো নীতিমালার তোয়াক্কা না করে, দাওয়াতের ময়দানে যেকোনো পদ্ধতিকে জায়েজ বলেন, তাদের প্রতি প্রশ্ন হচ্ছে, যদি কোনো কালে কোনো এলাকার মানুষ সঙ্গিতের মাধ্যমে ইসলামের প্রতি ঝুঁকবে বলে মনে হয় তাহলে কী ঢোল, সারিন্দা বাজিয়ে সংগীত শুনানোকে জায়েজ বলবেন? যদি কোনো এলকার মানুষ রাসূল (সা.) এর ছবি দেখে মুসলমান হবে মনে হয় তাহলে কী তাদের সামনে রাসূল (সা.) এর ছবি বানিয়ে পেশ করবেন? কোনো এলাকার মানুষ যদি মুসলিম নারীদের গান শুনে মুসলমান হবে মনে হয় তাহলে কী তাদের কাছে নর্তকী-সংগীত শিল্পীদের টিম পাঠানো হবে?

এটা এমন এক বিকৃত চিন্তাধারা, যা প্রচলিত ও অপ্রচলিত সকল মন্দ কর্মকে শুধু বৈধতাই দিচ্ছে না বরং ইসলাম প্রচারের জন্য এগুলো অবলম্বনকে আবশ্যক দাবি করছে। দীনের প্রচারে যদি যেকোনো পন্থা অবলম্বন করা বৈধ হত তাহলে সাহাবায়ে কেরামকে এত কষ্ট সহ্য করতে হত না। কারণ, সামান্য মিথ্যার আশ্রয় নিলে, তারা সহজে অকত্য জুলুম নির্যাতনের হাত থেকে বেঁচে যেতেন। ওই সময় মানুষ যে মন্দ কাজগুলো করতো সাহাবায়ে কেরাম তার কোনো একটা গ্রহণ করে মানুষকে দীনের দিকে দাওয়াত দিতেন। কিন্তু তারা এগুলো থেকে সব সময়ের জন্য দূরে থেকেছেন এবং আদর্শ ও মনুষ্যত্ব দিয়ে দীন প্রচার করেছেন।
 
বর্তমান মুসলমানরা নিজেদের মানবীয় ও ধর্মীয় দুর্বলতাগুলোকে প্রশ্রয় দিয়ে যাচ্ছে। আর স্বাভাবিক বিষয় হচ্ছে, এগুলো আমাদের মাঝে থাকা অবস্থায়, আমাদের দেখে কোনো মানুষ ইসলামের দিকে ধাবিত হবে না। তাই আমরা মানুষকে দীনের দিকে আকৃষ্ট করার জন্য এসকল অসৎ পন্থা অবলম্বন করছি। কিন্তু মনে রাখতে হবে, আমরা যদি নিজেদের সংশোধন না করি তাহলে এগুলো আমাদের অনিষ্টতা বৃদ্ধি ছাড়া কোনো কাজে আসবে না। তাই আমাদের প্রথম কাজ হচ্ছে নিজেদেরকে সংশোধন করা।
 
কোরআনী ঘটনার ছবি তৈরি করে দাওয়াতী কাজ করা দ্বারা, শরয়ী বিভিন্ন মৌলিক নীতিমালার লংঘন হয়। তাই সমকালিন ফকিহগণ এর ব্যাপারে নিষিদ্ধের ফতোয়া দিয়েছেন। মূফতী তাকী উসমানী হাফিজাহুল্লাহু এর কাছে এ বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে তিনি এর বিস্তারিত আলোচনা করেন। নিম্নে সেই প্রশ্ন ও তার উত্তর হুবহু তুলে ধরা হলো-

প্রশ্ন : একটি বিষয়ে উলামায়ে কেরামের মতামত জানতে চাচ্ছি। বিষয়টি হচ্ছে, ‘কাসাসুল কোরআন’ (কোরআনের ঘটনা) নামে বর্তমানে একটি ছবি চলছে। এতে কোরআনের বিভিন্ন ঘটনা ফিল্ম আকারে দেখানো হয়। যেমন বনী ইসরাইলের গরু জবাহের ঘটনা, ফেরাউনের পানিতে ডুবে মরার ঘটনা, মিসর থেকে বনী ইসরাইলের বের হয়ে আসার ঘটনা। ফিল্মটিতে বনী ইসরাইলের নবী মূসা (আ.) এর ছবি দেখানো হয়নি (বর্তমানে কোনো কোনো ফিল্মে মূসা (আ.) এর ছবি দেখানো হয়েছে)। বরং কোনো এক ব্যক্তির আওয়াজ দ্বারা হজরত মূসা (আ.) এর আহকাম বনী ইসরাইল পর্যন্ত পৌঁছানো হয়েছে। এ রকম ফিল্ম দেখা, দেখানো শরয়ী দৃষ্টিকোন থেকে কেমন?

উত্তর : কোরআনে বর্ণীত বিভিন্ন ঘটনার ছবি তৈরি করা কখনো জায়েজ হবে না। বরং এ রকম ফিল্ম নির্মাণের কারণে কোরআনের অসম্মানি হচ্ছে, যার দরুণ বড় ধরণের কোনো বিপদ আমাদের উপর নেমে আসতে পারে। নাজায়েজের বহু কারণের মধ্য থেকে কয়েকটি হচ্ছে-

এক. কোরআনুল কারীমের বিষয়-বস্তু হচ্ছে, মর্যাদাপূর্ণ একটি বিষয়। তার ইজ্জত ও মাহাত্মের দাবী হচ্ছে, বিষয়-বস্তুকে আদব ও সম্মানের সঙ্গে কোরআন থেকেই পড়া, শুনা। এর বাইরে গিয়ে, কোরআনের ঘটনাকে চিত্রজগতের ফিল্মের ন্যায়, ফিল্ম আকারে পেশ করা, কোরআন নিয়ে খেল তামাশার নামান্তর। সরাসরি কোরআন দ্বারা প্রমাণীত, এ রকম করা হারাম। আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘আপনি ওদের পরিত্যাগ করুন, যারা ওদের দীনকে খেল-তামাশা বানিয়ে রেখেছে এবং পার্থিব জীবন ওদের ধোকা দিয়েছে। আর কোরআনের দ্বারা (ওদের ) নসীহত করুন, যেন কোনো ব্যক্তি নিজ কৃতকর্মের ফলে এভাবে ধ্বংস না হয়ে যায়।’ (সূরা আনআম, ৭০) উক্ত আয়াতে রাসূল (সা.)-কে আল্লাহ তায়ালা নির্দেশ দিচ্ছেন, যারা দীনি বিষয়কে খেল তামাশা বানাবে, তাদের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করতে। এর দ্বারা আন্দাজ করা যায়, বিষয়টি কত গুরুত্বের।

দুই. কোনো ছবি প্রাণীর ছবি ছাড়া হয় না। প্রাণীর ছবি বানানো, দেখা ও দেখানো শরয়ী দৃষ্টিকোন থেকে জায়েজ নেই। অতএব, কোরআনের বিষয়কে এমন মাধ্যম ব্যবহার করে মানুষের সামনে পেশ করা, যা ইসলাম সমর্থন করে না; শুধু নাজায়েজ নয় বরং কোরআনকে অসম্মান দেখানোর নামান্তর।

তিন. কোরআনী ঘটনা নিয়ে নির্মীত কোনো ছবিই পূর্ণতা পায় না, যদি তাতে নায়িকার ভূমিকা না থাকে। শরীয়তের দৃষ্টিতে মহিলাদের পর্দাহীন অবস্থায় পর পুরুষের সামনে আসা যাওয়া করা, এমনিভাবে প্রয়োজন ছাড়া মহিলাদের ছবি গায়রে মাহরামকে দেখানো না জায়েজ। কোরআনের দাওয়াতকে মানুষের সামনে পেশ করার জন্য এরকম একটা নাজায়েজ মাধ্যম ব্যবহার, শুধু নাজায়েজই নয় বরং কোরআনকে অসম্মান করার শামিল। (আল্লাহ তায়ালা আমাদেরকে এরকম কাজ থেকে হেফাজত করুন। আমীন)

চার. কোরআনী ঘটনা সত্য হলেও মানুষ এটাকে দেখতে আগ্রহবোধ করবে না, যে যাবত না তাতে চিন্তাপ্রসূত বিভিন্ন কল্পকাহীনি যুক্ত করা না হবে। তাছাড়া, কোরআনের ঘটনাগুলো ধারাবাহিক না হওয়ায়, নিজেদের পক্ষ থেকে কাহীনি বানিয়ে তা পূর্ণ করতে হয়। বাস্তবতা হচ্ছে, এগুলো ছাড়া কোনো ছবি নির্মাণের কল্পনাই করা যায় না। এগুলো না হলেও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের অবয়ব, সংখ্যা, তাদের চলাফেরার ধরণ, পরিবেশ ও আচার-আচরণ নিঃসন্দেহে ধারণাপ্রসূত হয়ে থাকে। নির্মাতাদের ধারণাপ্রসূত বিষয়গুলোকে, মূল ঘটনা থেকে পৃথক করা দর্শকদের জন্য অসম্ভব। এ জন্য, নির্মাতাদের কল্পনাপ্রসূত কাহীনিগুলোকেও কোরআনের ঘটনা হিসেবেই ধরে নেয়া হয়। এভাবে অর্থের দিক থেকে কোরআনকে বিকৃত করা হচ্ছে।

পাঁচ. কোরআনে বর্ণীত ঘটনাগুলোতে এমন শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে, যেগুলোর একাধিক অর্থের সম্ভাবনা রয়েছে। এগুলোর মধ্য থেকে কোনো একটি অর্থকে আবশ্যকীয়ভাবে ধরে, বাকিগুলোর সম্ভাবনাকে নাকচ করে দেয়া জায়েজ নেই। মুফাসসিরগণ যখন এরকম শব্দের ব্যাখ্যা দেন তখন সম্ভাব্য অর্থগুলোকেও আলোচনা করেন। বর্তমানের ছবিগুলোতে এরকম করা সম্ভব না। বরং নির্মাতারা কোরআনের ঘটনা দিয়ে এমনভাবে ছবি বানায় যে, অন্য কোনো সম্ভাবনা বাকি থাকে না। দর্শকদের সামনে এমনভাবে বর্ণনা করা হয় যে, এটাই কোরআন। এতে কোরআন ও কোরআনের বাইরের বিষয় সংমিশ্রণ ঘটে যায়। এটাও নাজায়েজের কারণ।

ছয়. যদিও দাবী করা হয় এর দ্বারা দীনের প্রচার উদ্দেশ্য কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে ভিন্ন। বরং এর দ্বারা উদ্দেশ্য হচ্ছে, খেল-তামাশা, বিনোদন ও মনোরঞ্জন। এর স্পষ্ট দলীল হচ্ছে, এই বিষয়গুলোই যদি আপন সুরতে দেখানো হয় তাহলে কোনো দর্শক পাওয়া যাবে না। কোরআন, হাদিসের বিষয়গুলোকে এরকম বিনোদনের বিষয় বানানো কোনভাবেই জায়েজ নেই। কোরআনের ঘটনার মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে, উপদেশ গ্রহণ। উপদেশ গ্রহণের সঙ্গে যদি কারো বিনোদনও লাভ হয়ে যায় তাহলে তা ভিন্ন বিষয়।

উল্লেখিত কারণগুলো ছাড়াও আরো বিভিন্ন সমস্যার দিক লক্ষ করে উলামায়ে কেরাম এরকম ছবি বানানো, দেখা ও দেখানোকে নাজায়েজ বলেছেন। মুসলমানদের কঠোরভাবে এগুলো থেকে বিরত থাকা উচিত। রাষ্ট্রের দায়িত্ব হচ্ছে, যেন এগুলো দেখাতে না পারে সে ব্যবস্থা গ্রহণ করা। (ফতোয়ায়ে উসমানী, খন্ড-১, পৃষ্ঠা-২০৮)।

বর্তমানে ইসলামের ঐতিহাসিক কিছু যুদ্ধ ও হজের ছবি তৈরি করা হচ্ছে। এগুলোর বিষয়েও উলামায়ে কেরামের মত হচ্ছে জায়েজ নেই। কারণ, এতে প্রয়োজন ছাড়া ছবি তোলা হয়। তাছাড়া, হজের বিষয়গুলো হচ্ছে মানুষের যুক্তির উর্ধ্বে। হজের বিষয়গুলো সাধারণভাবে দেখলে পাগলামি ছাড়া কিছুই মনে হবে না। তাই এগুলোকে সম্বল করে অমুসলিমরা সাধারণ মুসলমানের মনে সংশয় সৃষ্টির সুযোগ পাবে। ছবির আকারে দেখার কারণে হজের মাহাত্ম মুসলমানের অন্তর থেকে হ্রাস পাবে। তাই এগুলো দেখা থেকেও বিরত থাকা চাই।

ডেইলি বাংলাদেশ/আরএজে