কোরআন হাদিসের আলোকে নামাজ আদায়কারীদের স্তর

ঢাকা, রোববার   ০৫ এপ্রিল ২০২০,   চৈত্র ২২ ১৪২৬,   ১১ শা'বান ১৪৪১

Akash

কোরআন হাদিসের আলোকে নামাজ আদায়কারীদের স্তর

পর্ব-১

প্রিয়ম হাসান ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ২১:২৫ ১৪ মার্চ ২০২০   আপডেট: ২০:১৭ ১৯ মার্চ ২০২০

‘নিশ্চয় সালাত অশ্লীন ও গর্হিত কাজ হতে বিরত রাখে।’ (সূরা : আনকাবুত, আয়াত :৪৫)-ফাইল ফটো

‘নিশ্চয় সালাত অশ্লীন ও গর্হিত কাজ হতে বিরত রাখে।’ (সূরা : আনকাবুত, আয়াত :৪৫)-ফাইল ফটো

নামাজ (ফার্সি: نَماز‎‎) বা সালাত হলো ইসলাম ধর্মের প্রধান উপাসনাকর্ম। প্রতিদিন ৫ ওয়াক্ত (নির্দিষ্ট নামাজের নির্দিষ্ট সময়) নামাজ আদায় করা প্রত্যেক মুসলিমের জন্য আবশ্যক বা ফরজ।

নামাজ ইসলাম ধর্মের পঞ্চস্তম্ভের একটি। ঈমান বা বিশ্বাসের পর নামাজই ইসলামের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ।

একজন মানুষকে মুসলিম হতে হলে তার প্রধান কাজ হলো এই সাক্ষ্য দেয়া,

আরবি উচ্চারণ :

اشْهَدُ انْ لّآ اِلهَ اِلَّا اللّهُ وَحْدَه لَا شَرِيْكَ لَه، وَ اَشْهَدُ اَنَّ مُحَمَّدً اعَبْدُه وَرَسُولُه

বাংলা উচ্চারণ :

‘আশ্‌হাদু আল-লা-ইলা-হা ইল্লাল্লা-হু ওয়াহ্‌দাহু-লা-শারীকালাহু ওয়া আশ্‌হাদু আন্না মুহাম্মাদান আ'বদুহু ওয়া রাসূলুহু’।

অনুবাদ :

‘আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আল্লাহ্‌ ছাড়া কোনো উপাস্য নাই। তিনি এক, অদ্বিতীয় এবং আরো সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, মুহাম্মাদ তাঁহার বান্দা ও প্রেরিত রাসূল।’

একজন ব্যক্তির  এই সাক্ষ্য তখনই যথাযথ হবে, যখন তার মধ্যে অন্যান্য ইবাদতগুলো ইখলাসের সঙ্গে পাওয়া যাবে। আর সব ইবাদতের মূল হলো ‘সালাত’ কায়েম করা। সালাত কায়েম করার উপকারিতা সম্পর্কে মহান রাব্বুল আলামিন আল্লাহ তায়ালা বলেন,

إِنَّ الصَّلَاةَ تَنْهَى عَنِ الْفَحْشَاء وَالْمُنكَرِ

‘নিশ্চয় সালাত অশ্লীন ও গর্হিত কাজ হতে বিরত রাখে।’ (সূরা : আনকাবুত, আয়াত :৪৫)।

উপযুক্ত আয়াত থেকে প্রমাণিত হয় সালাত আদায়কারীর দ্বারা কখনো খারাপ কাজ হতে পারে না। কিন্তু বর্তমান সমাজে এমন একটি অবস্থা বিরাজ করছে যেখানে অন্যায়-অত্যাচারসহ যাবতীয় অশ্লীন ও খারাপ কাজে সালাত আদায়কারী ও সালাত না আদায়কারী সবারই ভূমিকা প্রায় সমান। অথচ সালাতের উদ্দেশ্য হলো এর মাধ্যমে মানুষ যাবতীয় নাফরমানী তথা পাপের কাজ থেকে বিরত থাকবে।

তাই সালাত মানুষকে উপকার দিচ্ছে না কেন? সালাত মানুষকে উপকার না দেয়ার কারণ হিসেবে দায়ী কে? সালাত না সালাত আদায়কারী!

নিন্মে এ বিষয়ে আলোচনা করা হলো- 

সালাত মানুষকে উপকার না দেয়ার আসল কারণ হলো সালাত আদায়কারীর সালাত বিশুদ্ধ হওয়ার জন্য যে শর্তাবলী পূরণ করা প্রয়োজন সালাত আদায়কারীর মাঝে তা পাওয়া যায় না। যেমন- (ক) রাসূল (সা.) এর পদ্ধতিতে পবিত্রতা অর্জন না করা। (খ) সালাতের মধ্যে একাগ্রতা ও বিনয়ীতা না থাকা।

বর্তমানে মুসলিম জাতি সালাতের মাধ্যমে উপকৃত না হওয়ার অন্যতম কারণ হচ্ছে  সালাতের একাগ্রতা না থাকা এবং তার সঙ্গে উদাসীনতা থাকা। সুতরাং আমরা যদি আমাদের সালাত আদায়কারী
ভাইদের নির্ণয় করি তাহলে তাদের মধে ৫টি স্তর বা পাঁচ প্রকারের সালাত আদায়কারী পাব। যা ইবনুল কাইয়্যূম (রা.) তার গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন।

প্রথম প্রকারের সালাত আদায়কারী : 

এরা হলো নিজের আত্নার ওপর অত্যাচারী, অর্থাৎ সে সালাতের বিভিন্ন বিষয়ে অবহেলা করার মাধ্যমে সে নিজের আত্নার ওপর অত্যাচার করে। যেমন: যথাযথ ভাবে রাসূল (সা.) এর সুন্নাত অনুপাতে ওজু করে না। যথাসময়ে সালাত আদায় করে না এবং সালাতের রুকনসমূহ ঠিক ভাবে আদায় করে না।

প্রথম প্রকার সালাত আদায়কারীর জন্য যে শাস্তি রয়েছে: এই প্রকারের সালাত আদায়কারীর জন্য রয়েছে জাহান্নামের শাস্তি। আল্লাহ তায়ালা বলেন,

فَوَيْلٌ لِّلْمُصَلِّينَ

الَّذِينَ هُمْ عَن صَلَاتِهِمْ سَاهُونَ

‘ধ্বংস ওই সব সালাত আদায়কারীদের জন্য যারা তাদের সালাত সম্পর্কে উদাসীন।’ (সূরা : মাউন, আয়াত : ৪-৫)।

শুধু তাই নয় সালাতের মধ্যে যারা অমনোযোগী তাদেরকে আল্লাহ তায়ালা মুনাফিক বলে আখ্যায়িত করেছেন। যেমন আল্লাহ তায়ালা বলেন,

إِنَّ الْمُنَافِقِينَ يُخَادِعُونَ اللّهَ وَهُوَ خَادِعُهُمْ وَإِذَا قَامُواْ إِلَى الصَّلاَةِ قَامُواْ كُسَالَى يُرَآؤُونَ النَّاسَ وَلاَ يَذْكُرُونَ اللّهَ إِلاَّ قَلِيلاً

‘নিশ্চয় মুনাফিকেরা আল্লাহকে ধোকা দেয় (দিতে চায়) অথচ আল্লাহ তায়ালাই তাদেরকে ধোকা দেন। আর তারা যখন সালাতে দাঁড়ায় তখন তারা অলস্যের ছন্দে দন্ডায়মান হয় এবং মানুষকে প্রদর্শন করার জন্য দাঁড়ায়। আর তারা আল্লাহকে সামান্যই স্বরণ করে।’ (সূরা : নিসা, আয়াত : ১৪২)।

অতএব, দু‘টি আয়াত থেকে প্রমাণিত হলো, সালাতে উদাসীন থাকা এবং সালাতের সব বিষয়ে যত্নবান না হওয়া মুনাফিকের কাজ। এছাড়াও  কোরআন এবং হাদিসের অনেক দলিল থেকে প্রমাণিত হয় যারা সালাতের সব বিষয়াদী সম্পর্কে যত্নবান নয় এবং সালাতে উদাসীন, তাদের জন্য রয়েছে জাহান্নামের শাস্তি।

দ্বিতীয় প্রকারের সালাত আদায়কারী : 

এরা হলো এমন ব্যক্তি যারা বাহ্যিকভাবে সালাতের ওজার হেফাজত করে, সালাতের সময়সীমা সংরক্ষণ করে এবং সালাতের রুকন সমূহ ভালোভাবে আদায় করে কিন্তু শয়তানী প্ররোচনা তার সালাতের মধ্যে একাগ্রতার জন্য আত্নপ্রচেষ্টাকে নষ্ট করে ফেলে। ফলে সে বিভিন্ন কুমন্ত্রনা ও চিন্তা-ভাবনা নিয়ে সালাত আদায় করে।

দ্বিতীয় প্রকার সালাত আদাযকারীর জন্য যে শাস্তি রয়েছে : 

এ প্রকার সালাত আদায়কারীর হিসাব কিতাব নেয়া হবে। যেমন- রাসূল (সা.) বলেছেন,

‘কিয়ামতের দিন বান্দার আমলগুলোর মধ্যে সর্বাগ্রে যে বিষয়ে জিজ্ঞাসা করা হবে তা হচ্ছে তার সালাত। তার সালাতের দিকে লক্ষ্য করা হবে। সালাত ঠিকভাবে আদায় হলে সে সাফল্য অর্জন ও মুক্তি লাভ করবে, অন্যথায় সে নিষ্ফল ও ক্ষতিগ্রস্ত হবে। (মু‘জামুল আওসাত্ব, হা: ৩৭৮২, ৪র্থ খণ্ড, ১২৭ পৃ:)।

তৃতীয় প্রকারের সালাত আদায়কারী : 

এরা হলো এমন ব্যক্তি যারা সালাতের সময়- সীমা ও রুকনসমূহ ভালোভাবে হেফাজত করে এবং শয়তানী কুমন্ত্রনাকে দূর করার জন্য নিজের আত্নার মধ্যে একাগ্রতা সৃষ্টির চেষ্টা করে। এই প্রকারের সালাত আদায়কারী তার শক্রর (শয়তানের) সঙ্গে সংগ্রামে ব্যস্ত থাকে যাতে তার সালাত শয়তান চুরি না করতে পারে। সুতরাং এই প্রকারের সালাত আদায়কারী তার সালাতের মধ্যে জিহাদরত অবস্থায় থাকে।

তৃতয়ি প্রকার সালাত আদায়কারীর জন্য যে সওয়াব রযেছে

এ প্রকার সালাত আদায়কারীর জন্য রয়েছে গুনাহ মাফ। কেননা সে শয়তানকে তারাতে অন্তর দিয়ে কঠিনভাবে জিহাদ করেছে। সালাতের মাধ্যমে যে গুনাহ মাফ হয় তার দলিল রাসূল (সা.) এর হাদিস,

‘পাঁচ ওয়াক্ত সালাত এক জুমা থেকে অপর জুমা পর্যন্ত বান্দার গুনাহ মাপের জন্য কাফফারা হয়ে দাঁড়ায় যদি সে বড় তথা কবিরা গুনাহ থেকে বেচে থাকে।’ (মুসলিম, মিশকাত)।

উল্লেখ যে সালাত পড়লেই যে গুনাহ মাফ হবে এমনটা নয় বরং সালাতটা যদি পূর্বে উল্লিখিত তৃতীয় প্রকারের সালাত হয় তাহলে গুনাহ মাফ হবে। আর যদি প্রথম প্রকার ও দ্বিতীয় প্রকার সালাত আদায়কারী হয় তাহলে তাতে গুনাহ মাফের চেয়ে শাস্তির আশঙ্কা বেশি রয়েছে। 

দলিল : 

فَوَيْلٌ لِّلْمُصَلِّينَ

الَّذِينَ هُمْ عَن صَلَاتِهِمْ سَاهُونَ

‘ধ্বংস ওই সব সালাত আদায়কারীদের জন্য যারা তাদের সালাত সম্পর্কে উদাসীন।’ (সূরা : মাউন, আয়াত : ৪-৫)।

চতুর্থ প্রকারের সালাত আদায়কারী : 

যখন সে সালাতে দাঁড়ায় তখন সালাতের হক্বসমূহ, রুকনসমূহ এবং সালাতের সময়সীমা পূর্ণ করে এবং সালাতের হক্বসমূহ ও সময়সীমা-সমূহ যত্নবানে তার অন্তর নিমগ্ন হয়। যাতে করে সে তার সালাতের কোনো অংশকে নষ্ট করতে না পারে। এবং তার সব চিন্তা এ দিকেই থাকে যাতে করে সে সালাতকে যথা সম্ভব কায়েম বা প্রতিষ্ঠা করতে পারে এবং সালাতের পূর্ণতার প্রতি তার সর্বদা আন্তরিক দৃষ্টি থাকে। এ প্রকারের সালাত আদায়কারী তার অন্তরকে সর্বদা সালাতের বিষয়াদীর মধ্যে এবং বরকতময় আল্লাহ তায়ালার দাসত্বের মধ্যে নিমজ্জিত রাখে।

চতুর্থ সালাত আদায়কারীর জন্য যে সওয়াব রয়েছে : 

এ প্রকার সালাত আদায়কারীর জন্য রয়েছে ক্ষমার সঙ্গে সঙ্গে অশেষ সওয়াব। আল্লাহ তায়ালা এরূপ সালাত আদায়কারী সম্পর্কে বলেন,

قَدْ أَفْلَحَ الْمُؤْمِنُونَ

الَّذِينَ هُمْ فِي صَلَاتِهِمْ خَاشِعُونَ

‘অবশ্যই ওই মুমিনরা সফলকামী হয়েছে যারা তাদের সালাতে বিনয়ী।’ (সূরা : সুরা মু’মিনুন, আয়াত : ১-২)।

এখানে মুমিনদের সফলকামী হওয়ার অর্থ হলো বিরাট সওয়াবের অধিকারী হওয়া অর্থাৎ জান্নাতের অধিকারী হওয়া। কেননা তারা সালাতে এমন বিনয়ী যা তাদেরকে আল্লাহর সন্তুষ্টির পাত্র বানিয়ে দেয়। চলবে...

ডেইলি বাংলাদেশ/আরএজে