কোরআন লিখে আর টুপি সেলাই করে পেট চালাতেন এই বাদশা!
SELECT bn_content.*, bn_bas_category.*, DATE_FORMAT(bn_content.DateTimeInserted, '%H:%i %e %M %Y') AS fDateTimeInserted, DATE_FORMAT(bn_content.DateTimeUpdated, '%H:%i %e %M %Y') AS fDateTimeUpdated, bn_totalhit.TotalHit FROM bn_content INNER JOIN bn_bas_category ON bn_bas_category.CategoryID=bn_content.CategoryID INNER JOIN bn_totalhit ON bn_totalhit.ContentID=bn_content.ContentID WHERE bn_content.Deletable=1 AND bn_content.ShowContent=1 AND bn_content.ContentID=190277 LIMIT 1

ঢাকা, বুধবার   ১২ আগস্ট ২০২০,   শ্রাবণ ২৮ ১৪২৭,   ২১ জ্বিলহজ্জ ১৪৪১

Beximco LPG Gas

কোরআন লিখে আর টুপি সেলাই করে পেট চালাতেন এই বাদশা!

সাতরঙ ডেস্ক ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ১৬:৪৪ ২৬ জুন ২০২০   আপডেট: ১৬:৫৪ ২৬ জুন ২০২০

ছবি: বাদশা হয়েও টুপি সেলাই ও কোরআন লিখে জীবিকা নির্বাহ করতেন তিনি

ছবি: বাদশা হয়েও টুপি সেলাই ও কোরআন লিখে জীবিকা নির্বাহ করতেন তিনি

বাংলা তথা ভারতবর্ষে যুগে যুগে শাসন করেছেন অনেক রাজা, বাদশা, নবাব। এরপর জমিদার যুগ বিলুপ্ত হয়ে এখন সরকার প্রধানের আমল চলছে। তবে রাজা বাদশারা সব সময়ই থেকেছেন আলিশান ভাবে। নিজেদের আখের গুছিয়ে, আমোদ-ফূর্তিতে জীবন কাটিয়েছেন। অনেক রাজাই প্রজাদের কথা চিন্তা করেননি। বংশ পরম্পরায় পাওয়া রাজত্ব চালাতে গিয়ে হয়েছেন অমানবিক। 

তবে এর অন্য নজিরও রয়েছে ইতিহাসে। তেমনই একজন বাদশার কথা জানাবো আজকের লেখায়। যিনি নিজের হাতে কোরআন লিখে আর টুপি সেলাই করে জীবিকা নির্বাহ করতেন। রাষ্ট্র ও জাতির রাজকোষ থেকে নিজের জন্য এক কানা কড়িও গ্রহণ করা বৈধ মনে করতেন না। 

টুপি ও কোরআন থেকে শেষ জীবনে মাত্র ৮০৫ পাঁচ টাকা সঞ্চয় করেছিলেন। এর মধ্যে মাত্র চার টাকা আট আনা তার কাফন দাফনে ব্যয় করার জন্য রেখে অবশিষ্ট অর্থ দান করে দেয়ার জন্য অসিয়ত করে গিয়েছিলেন। নিশ্চয় ভাবছেন কোন বাদশার কথা বলছি! তিনি ছিলেন ভারতবর্ষের ষষ্ঠ মোগল সম্রাট। তাকেই বলা হত ‘জিন্দা পীর’। তার খোদাভীরুতা এবং দূরদর্শিতার কারণেই তিনি সাধারণ গণমানুষের কাছে ‘জিন্দা পীর’ হিসেবে প্রসিদ্ধ লাভ করেন। 

আওরঙ্গজেব বাহাদুর আলমগীরতার পূর্ণ নাম আল-সুলতান আল-আজম ওয়াল খাকান আল-মুকাররম আবুল মুজাফফর মুহি উদ-দিন মুহাম্মদ আওরঙ্গজেব বাহাদুর আলমগীর। তার পিতা পঞ্চম মুঘল বাদশাহ তাজমহল-নির্মাতা শাহজাহান আর মাতা আগ্রার তাজমহলে শায়িতা মুমতাজ। ১৬১৮ খ্রিষ্টাব্দের ৩ নভেম্বর গুজরাটের দাহোদ-এ জন্মগ্রহণ করেন তিনি। 

শাহজাহান আর মুমতাজ মহলের তৃতীয় পুত্র ছিলেন আলমগীর। শাহজাহানের মৃত্যুর পর সিংহাসনে বসেন সম্রাট আলমগীর। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত ৪৯ বছর একাধারে ভারত শাসন করেন তিনি। দয়ালু এবং অত্যন্ত সাহসী ছিলেন তিনি। ১৬৩৩ খ্রিষ্টাব্দের ২৮ মে, এক সামরিক পাগলা হাতি তাকে আক্রমণ করে। তিনি সাহসিকতার সাথে দীর্ঘ গদা জাতীয় অস্ত্র দিয়ে হাতির শুঁড়ে আঘাত করে নিজেকে রক্ষা করেন। 

এই ঘটনার পর সম্রাট শাহজাহান তাকে বাহাদুর খেতাব দেন, সঙ্গে দুই লাখ রুপি পুরস্কার প্রদান করেন। এই ঘটনার স্মরণে ফারসি এবং উর্দু ভাষায় পংক্তিমালার মাধ্যমে আরঙ্গজেব বলেছিলেন, যদি সেদিন হাতির সঙ্গে যুদ্ধটা আমার মৃত্যুর মধ্য দিয়ে শেষ হতো তাহলে কোনো লজ্জা ছিল না। এতে কোনো অগৌরবের কিছু নেই। লজ্জা সেখানে যা ভাইয়েরা আমার সঙ্গে করেছে।   

ইসলাম প্রচারে আজীবন কাজ করেছেন তিনিঅন্যান্য সম্রাটদের মতো বিলাসি জীবনযাপন করেননি মুহাম্মদ আওরঙ্গজেব বাহাদুর আলমগীর। বলতে গেলে পুরো ভারতবর্ষই ছিল তার আওতাধীন। একজন বাদশাহ যে কতটা দয়ালু হতে পারেন তার উদাহরণ সম্রাট আলমগীর। সম্রাট হওয়া সত্ত্বেও তিনি সাধারণ মানুষের মত জীবন যাপন করে কাটিয়েছেন। তিনি সবসময় প্রজাদের খোঁজ খবর রাখতেন। তাদের ভালো মন্দ নিজে গিয়ে তদারকি করতেন। 

শ্রেষ্ঠ এক বাদশা ছিলেন তিনি

তিনি মনে করতেন, তার বাদশাহীকে আল্লাহ পাকের পবিত্র অবদান এবং সরকারি কোষাগারকে আমানত মনে করতেন। ঐতিহাসিক লেনপুল লিখেছেন, আওরঙ্গজেব ছিলেন ইনসাফ ও ন্যায়ের মূর্ত প্রতীক। তার ৫০ বছরের শাসনকালে তার কাছ থেকে জুলুম ও বেইনসাফের কোনো একটি কাজও প্রকাশ পায়নি। অত্যন্ত পরিশ্রমী মানুষ ছিলেন বাদশাহ আলমগীর।

দিনের ২৪ ঘন্টার মধ্যে মাত্র তিন ঘণ্টা ঘুমাতেন। স্মৃতিশক্তি ছিল খুবই প্রখর। সিংহাসনে আরোহন করার পর নানা কাজে ব্যস্ত থাকতেন। তবুও কোরআন পড়তে ভুলে যেতেন না। এর মধ্যেই কোরআন মুখস্তও করে ফেলেন। নিজে হাতে কোরআন লিখতেন। তার অনবদ্য রচনা ফতোয়ায়ে আলমগীরী এখনো পর্যন্ত ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানসমূহে অনেক যত্নসহকারে পড়ানো হয়ে থাকে। এটিকে শরিয়াহ আইন এবং ইসলামি অর্থনীতির উজ্জ্বল নক্ষত্র হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

তিনি মৌলিকভাবে একজন খাঁটি মুসলমান ছিলেন। শাসক হিসেবে তিনি রাসূলুল্লাহ (স.) এবং খোলাফায়ে রাশেদীনের পদাঙ্ক অনুসরণ করে চলার চেষ্টা করতেন। তিনি ভারতীয় উপমহাদেশে ইসলামের ব্যাপক অগ্রগতি করেছেন। শরীয়তের পরিপূর্ণ প্রবর্তন ছিল তার জীবনের অন্যতম লক্ষ্য। নিজের ধর্মীয় দায়িত্ব পালনে কখনো ত্রুটি করেননি। যাবতীয় ইবাদত বন্দেগীর প্রতি তিনি সম্মান প্রদর্শন করতেন। 

তাকে জিন্দা পীর বলা হতএতো বিশাল সাম্রাজ্যের সম্রাট হওয়া সত্ত্বেও তিনি ছিলেন অত্যন্ত উচুঁ স্তরের মুত্তাকি ও খোদাভীরু ব্যক্তি। ফরয নামায ছাড়াও তিনি নফল ইবাদত করতেন। রমযানের ফরয রোযা ছাড়াও নফল রোযা রাখতেন। কমপক্ষে প্রতি সপ্তাহে তিনটি রোযা অবশ্যই রাখতেন।

 তবে অন্যান্য সম্রাটদের মতো তিনি মুদ্রার উপরে কোরআনের আয়াত লেখার বিরোধী ছিলেন। কারণ মুদ্রা প্রায়শই হাত ও পায়ের স্পর্শ এ আসতো। তার আমলে মুদ্রার একপিঠ এর মুদ্রার প্রচলন এর সাল এবং অপর পিঠে একটি দ্বিপদী কবিতা থাকতো: সেখানে লেখা ছিল বাদশা আওরঙ্গজেব আলমগীর, স্বাক্ষরিত মুদ্রা এই দুনিয়ার বুকে একটি পূর্ণ চন্দ্রের ন্যায়।  

সম্রাটের সংসার জীবন

সংসার জীবনে বাদশার দুইজন স্ত্রী ছিল। একজন ছিলেন রাজপুরী জারাল রাজপুত রাজকন্যা নবাব বাই বেগম। ১৬৩৭ খ্রিষ্টাব্দে ইরানের সাফাভী রাজকন্যা দিলরাস বানু বেগমকে (অন্য নাম রাবিয়া-উদ্-দুররানি) বিবাহ করেন। তাদের ঘরে জন্ম নেয় বাদশার পাঁচ পুত্র এবং দুই কন্যা। নবাব বাই বেগমের ঘরে ছিল দুই পুত্র মুহাম্মদ সুলতান, বাহাদুর শাহ প্রথম আর কন্যা বদর-উন-নেসা। আর দিলরাস বানু বেগমের ছিল দুই পুত্র আজম শাহ, সুলতান মুহাম্মদ আকবর আর এক কন্যা জেব-উন-নেসা। অন্য এক পুত্র মুহাম্মদ কাম বক্স ছিল আওরঙ্গবাদী। যিনি ছিলেন বাদশাহর উপপত্নীর সন্তান। 

আওরঙ্গজেব তার পূর্বসূরীদের তুলনায় অনেক অনাড়াম্বর ছিলেন। তিনি ইসলামিক ক্যালিগ্রাফি পছন্দ করতেন। তার শাসনামলে লাহোরের বাদশাহী মসজিদ এবং আওরঙ্গবাদে তার স্ত্রী রাবিয়া উদ দুরানির স্মরণে বিবি কা মাকবারা নির্মাণ করেছিলেন।ইসলামিক ক্যালিগ্রাফি চর্চায় আওরঙ্গজেব পৃষ্ঠপোষকতা করতেন। 

বিভিন্ন যুদ্ধক্ষেত্রে ঘোড়ার পিঠেই তিনি বেশিরভাগ সময় কাটানবিশেষ করে শিল্পী সাঈদ আলী তাবরেজীর কথা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। আওরঙ্গজেব তার পিতার মতো স্থাপত্যে আগ্রহী ছিলেন না। দিল্লির লাল কেল্লার ভিতরে তিনি মোতি মসজিদ নামে একটি মার্বেল পাথরের মসজিদ তৈরি করেছিলেন। তিনি লাহোরে বাদশাহী মসজিদ নির্মাণ করার নির্দেশ দিয়েছিলেন। 

শাহী পরিবারের ফরাসি চিকিৎসক ফান কুইজ বার নিয়ার এর বর্ণনায় পাওয়া, মুঘল সাম্রাজ্যের আমলে ভারতের বস্ত্র শিল্প সুদৃঢ় অবস্থানে উন্নত হয়েছিল। সে সময় বিভিন্ন কারখানায় বুটিদার রেশমি কাপড়, সিল্ক এবং অন্যান্য দামি মসলিন প্রস্তুত হতো। এতে করে কারখানাগুলোতে শত শত মানুষের কর্মসংস্থান হয়েছিল।

৪৯ বছরের রাজত্বকালে অনেক অভিযানে গিয়েছেন বাদশাহ আলমগীর। ১৭০৭ খ্রিষ্টাব্দের ৩ মার্চ আহমেদ নগরে আওরঙ্গজেব মৃত্যবরণ করেন। এরপর বাহাদুর শাহ প্রথম দিল্লির সিংহাসনে বসেন। মুহাম্মদ আওরঙ্গজেব বাহাদুর আলমগীর ছিলেন মুঘল শাসকগণের মধ্যে ব্যতিক্রমী বাদশাহ। সাম্রাজ্যের শাসনকার্য পরিচালনায় তিনি আদর্শ ছিলেন। 

অগ্রজ শাসকগণের মতো অত্যধিক বিলাসিতা, বেপরোয়া জীবনযাপন পরিহার করে ইসলামের মহান চার খলিফাগণের জীবন-আদর্শকে বুকে ধারণ করে জীবন অতিবাহিত করেন তিনি। রাজত্বের বেশির ভাগ সময়ই তিনি যুদ্ধক্ষেত্রে ঘোড়ার পিঠে কাটান। রাজধানীতে থাকা তার পক্ষে খুব কমই সম্ভব হয়েছিল। তিনি উত্তর ভারতের পাশাপাশি সমগ্র দক্ষিণ ভারতে মুঘল বিজয় পতাকা উত্তোলনকারী প্রথম শাসক।

ডেইলি বাংলাদেশ/জেএমএস