কোনো প্রশ্ন ছাড়াই আল্লাহর হুকুম মানা যে কারণে জরুরি 

ঢাকা, রোববার   ০৫ এপ্রিল ২০২০,   চৈত্র ২২ ১৪২৬,   ১১ শা'বান ১৪৪১

Akash

কোনো প্রশ্ন ছাড়াই আল্লাহর হুকুম মানা যে কারণে জরুরি 

(পর্ব-১)

নুরাসত জাহান ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ১৯:৫৮ ১৪ মার্চ ২০২০   আপডেট: ১৯:৫৯ ১৪ মার্চ ২০২০

আল্লাহ তায়ালা মানুষকে বিবেক-বুদ্ধি দান করেছেন এবং এটি আল্লাহ তায়ালার অনেক বড় নেয়ামত-ছবি: সংগৃহীত

আল্লাহ তায়ালা মানুষকে বিবেক-বুদ্ধি দান করেছেন এবং এটি আল্লাহ তায়ালার অনেক বড় নেয়ামত-ছবি: সংগৃহীত

পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তায়ালা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের প্রতি সাহাবায়েকেরামের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন এবং তাদের মাধ্যমে সব উম্মতকে সতর্ক করেছেন। 

আল্লাহ তায়ালা সাহাবায়েকেরামকে লক্ষ্য করে বলেন, ‘মনে রেখ, তোমাদের মাঝে আছেন আল্লাহর রাসূল, তিনি বহু বিষয়ে তোমাদের কথা শুনলে তোমরা যেরূপ বলো, সেরূপ করলে তোমরাই কষ্ট পেতে।’ 

এ আয়াতের উদ্দেশ্য হলো, অনেক সময় এ ধরনের পরিস্থিতির সৃষ্টি হতে পারে, যখন তোমাদের মতামত রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মতের চেয়ে ভিন্ন হবে। উদাহরণত, তিনি তোমাদেরকে একটি বিষয়ের আদেশ দিলেন কিন্তু তা তোমাদের বুঝে আসছে না কিংবা তোমাদের মনে হচ্ছে বিষয়টি এভাবে হলে ভালো হয় এবং তোমরা তোমাদের মতামত পেশ করেছ কিন্তু তিনি তোমাদের মতামত গ্রহণ করেননি বরং পরিষ্কার বলে দিলেন, তোমাদের এ মতামত গ্রহণ করছি না। তখন মনে এ কথার সৃষ্টি হতে পারে যে, তিনি যে নির্দেশ দিচ্ছেন তা আমাদের বুঝে আসছে না।

রাসূল (সা.) সরাসরি আল্লাহর নির্দেশনায় চলেন :

যদি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তোমাদের প্রতিটি কথা মানেন তা হলে পরিণতিতে তোমরাই ক্ষতিগ্রস্ত হবে এবং তোমরা নিজেরাই কষ্টে পতিত হবে এবং বিভিন্ন বিপদাপদে আটকে যাবে। আল্লাহ তায়ালা বলেন, তিনি তোমাদের জন্য একজন রাসূল পাঠিয়েছেন। তিনি এমন রাসূল, আল্লাহ তায়ালার সঙ্গে যিনি সর্বদা সংযুক্ত। যার ওপর সকাল-সন্ধ্যা ওহি অবতীর্ণ হচ্ছে। যাকে এমন সব বিষয় সম্পর্কে অবগত করানো হচ্ছে যা সম্পর্কে তোমাদের কোনো জ্ঞান নেই। তাকে এমন সব বিধি-বিধান দেয়া হচ্ছে যা অনেক সময় তোমাদের বুঝার সাধ্যেরও বাইরে।

যদি তিনি তোমাদের পদাঙ্ক অনুসরণ করেন এবং তোমরা যেরূপ বলো সেরূপ করেন তা হলে রাসূল (সা.) প্রেরণের উদ্দেশ্যই ব্যহত হয়। তাহলে রাসূল (সা.) পাঠানোর দরকারই বা কি? রাসূল (সা.) তো পাঠানো হয়েছে এ জন্যই, যে সব বিষয় অনেক সময় তোমাদের বুঝে আসে না, তিনি সেগুলো তোমাদের বলবেন। তাই রাসূলের (সা.) কোনো হুকুম বা তাঁর কোনো পদক্ষেপ কিংবা তাঁর কোনো আমল তোমাদের বুঝে আসল না, আর তোমরা তাঁর ওপর আপত্তি করে বসলে কিংবা তোমাদের হৃদয়ে সে সম্পর্কে কোনো সন্দেহ ঘনীভুত হলো, এ জন্য রাসূলের (সা.) কথা মানবে না? আরে, যেসব বিষয় তোমাদের বুঝে আসবে না এবং তোমাদের বিবেকের কাছে যৌক্তিক মনে হবে না, সেগুলো বাতলে দেয়ার জন্যই তো রাসূলকে (সা.) পাঠানো হয়েছে।

বিবেক-বুদ্ধি একটি পর্যায় পর্যন্ত সঠিক ফয়সালা করে :

দেখুন, আল্লাহ তায়ালা মানুষকে বিবেক-বুদ্ধি দান করেছেন এবং এটি আল্লাহ তায়ালার অনেক বড় নেয়ামত। যদি মানুষ এর সঠিক ব্যবহার করে তা হলে দুনিয়া ও আখেরাতের বহু কল্যাণ অর্জন করতে পারে। কিন্তু এটা মনে কর না, যে বিবেক-বুদ্ধি তোমাদেরকে দেয়া হয়েছে তা জগতের সব জ্ঞান ও হেকমতকে ধারণ করতে পারে। বিবেক-বুদ্ধি বড় কাজের জিনিস কিন্তু তারও কিছু সীমাবদ্ধতা আছে; এটা অসীম নয়। একটি সীমা পর্যন্ত এটি কাজ করে। এরপর এটি কাজ করা বন্ধ করে দেয়। যেমন, চোখ। এটি অনেক বড় নেয়ামত কিন্তু একটি সীমা পর্যন্ত এটি দেখে। দৃষ্টির আওতায় যতদূর আসে, তারপরে সে আর দেখতে পায় না।

এমনিভাবে বিবেক-বুদ্ধিরও একটি সীমারেখা আছে। সেই সীমারেখা পর্যন্ত সেটা কাজ করে, সেই সীমানার পরে সেটা কাজ করে না। যেখানে মানুষের বিবেক-বুদ্ধি কাজ করে না, যেখানে মানুষের বিবেক-বুদ্ধি ধোঁকা খেতে পারে, ঠোকর খেতে পারে, আল্লাহ তায়ালা স্বীয় রাসূল (সা.) ও পয়গম্বরদেরকে সে সব বিষয়সমূহ মানুষকে শিক্ষা দানের জন্য পাঠিয়েছেন। আল্লাহর রাসূল (সা.) বাতলে দেন যে, তোমরা যা বুঝেছ তা সঠিক নয় বরং এটি সঠিক; আমাকে ওহির মাধ্যমে আল্লাহর পক্ষ থেকে বলে দেয়া হয়েছে।

বুঝে আসুক বা না আসুক, রাসূলের (সা.) হুকুম মানো :

বিষয়টি যখন এরূপ, তখন আল্লাহর রাসূল (সা.) যখন কোনো কথা বলেন কিংবা কোনো বিষয়ের আদেশ দেন অথচ তোমাদের বুঝে আসছে না আদেশটি কেন দিয়েছেন? এই বিধানের যৌক্তিকতা ও উপকারিতা কি? এরূপ অবস্থায় তোমরা যদি বিবেক-বুদ্ধির অনুসরণ কর তা হলে এর অর্থ হবে, তোমরা রাসূলকে (সা.) মানতে অস্বীকার করেছ। রাসূলকে (সা.) তো পাঠানো হয়েছে এজন্যে, যেখানে তোমাদের আকল কাজ করে না সেখানে ওহির মাধ্যমে প্রাপ্ত নির্দেশনা সম্পর্কে রাসূল (সা.) তোমাদেরকে অবগত করবেন।

তাই নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখনি আমাদেরকে কোনো বিষয়ের আদেশ দেন, সেটা কোরআনের মাধ্যমে প্রাপ্ত আদেশ হোক কিংবা হাদিসের মাধ্যমে প্রদত্ত আদেশ হোক যে, অমুক কাজ কর কিংবা অমুক কাজ কর না, সেক্ষেত্রে আদেশটি আমাদের বুঝে আসুক কিংবা না আসুক, আদেশটির কার্যকারণ, যৌক্তিকতা এবং উপকারিতা বুঝে আসুক কিংবা না আসুক, আমাদের ওপর অবশ্য কর্তব্য হলো আমরা তা মেনে নেব এবং তার ওপর আমল করব। কোরআনুল কারিমে ইরশাদ হচ্ছে,

وَمَا كَانَ لِمُؤْمِنٍ وَلَا مُؤْمِنَةٍ إِذَا قَضَى اللَّهُ وَرَسُولُهُ أَمْرًا أَن يَكُونَ لَهُمُ الْخِيَرَةُ مِنْ أَمْرِهِمْ

‘আল্লাহ ও তাঁর রাসূল কোনো বিষয়ে নির্দেশ দিলে কোনো মুমিন পুরুষ কিংবা কোনো মুমিন নারীর সে বিষয়ে কোনো ভিন্ন সিদ্ধান্তের অধিকার থাকবে না।’ (সূরা: আহযাব, আয়াত: ৩৬)।

সুতরাং কোনো ব্যক্তি মুমিন হলে সে নির্দেশ তাকে মানতে হবে এবং মেনে নিতে হবে যে, আমার বিবেক-বুদ্ধি অসম্পূর্ণ এবং আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের (সা.) জ্ঞান পরিপূর্ণ। তাই আমাকে তাঁর সামনে আত্মসমর্পণ করতে হবে।

শরীয়তে বিধানের যুক্তি ও উপকারিতা সম্বন্ধে প্রশ্ন :

বর্তমান যুগে অনেক শিক্ষিত লোকের মানসিকতা হলো, যখন শরীয়তের বিধান সম্পর্কে বলা হয় যে, অমুক বিষয়টি হারাম, কোরআনুল কারিম সেটি নিষিদ্ধ করেছে কিংবা আল্লাহর রাসূল তা নিষিদ্ধ করেছেন, তখন তাদের মাঝে প্রশ্ন দেখা দেয় যে, কেন নিষেধ করেছেন? নিষেধ করার কি যুক্তি এবং এর উপকারিতা কি? যেন ভাব-ভঙ্গিমা দ্বারা বুঝাতে চায়, যতক্ষণ এর পেছনের যুক্তি-দর্শন ও উপকারিতা আমাদের বুঝে না আসবে এবং আমাদের বিবেক-বুদ্ধি সেটিকে সঠিক মনে না করবে ততক্ষণ পর্যন্ত এ বিধানের ওপর আমরা আমল করব না। নাউযুবিল্লাহ! এ মানসিকতা ক্রমেই বৃদ্ধি পাচ্ছে। বিশেষ করে যারা কিছু পড়াশোনা করেছে, কিছু দ্বীনি কিতাবাদি পড়েছে, তাদের মধ্যে এ প্রবণতা বেশি।

এমন চাকর চাকরি থেকে বরখাস্ত হওয়ার যোগ্য :

গভীরভাবে লক্ষ্য করলে আমরা দেখব, আল্লাহ এবং তাঁর রাসূলের আদেশ সম্পর্কে কেন প্রশ্ন করা চরম বুদ্ধিহীনতার বিষয়। কারণ আমরা আল্লাহর বান্দা আর বান্দার মর্যাদার স্তর অনেক নিচে। দেখুন, একজন হলো গোলাম, আরেকজন হলো চাকর। আমরা যদি স্তর বিন্যাস করি তবে প্রথম স্তরে আসবে চাকর, এরপর গোলাম, এরপর বান্দা। কেউ যদি কাউকে চাকর হিসেবে রাখে, তা হলে তার কাজ নির্দিষ্ট থাকে এবং তার চাকরির সময়ও নির্দিষ্ট থাকে। সে চব্বিশ ঘণ্টা ডিউটি করে না, আট থেকে দশ ঘণ্টা ডিউটি করে। আপনি যদি আপনার চাকরকে বলেন, বাজার থেকে দশ কেজি গোশত নিয়ে আস, এখন চাকর যদি প্রশ্ন করে, আপনার পরিবারের সদস্য দু’জন, এক কেজি গোশতই তো অনেক, দশ কেজি গোশতের কি প্রয়োজন? কেন দশ কেজি গোশত আনব? আগে বিষয়টি ব্যাখ্যা করুন, আমার বুঝে আসলে তারপর আনব। বলুন, এ চাকর কি চাকরিতে থাকার উপযুক্ত?

আরে ভাই, এটা তোমার কাজ নয় যে, আমি কেন দশ কেজি গোশত আনতে বলেছি তা জিজ্ঞাসা করা। তোমার কাজ হলো তোমাকে যা আনতে বলা হয়েছে তা এনে দেয়া। তোমার কাছে যদি আমাকে ‘কেন’ প্রশ্নের উত্তর দিতে হয় তা হলে তুমি চাকরিতে থাকার উপযুক্ত নও। দেখুন, চাকর গোলাম নয় বান্দাও নয়, সেও মানুষ এবং আপনিও মানুষ, আপনার ভেতরে যে বিবেক-বুদ্ধি আছে, আপনার যে অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ আছে তা তার ভেতরেও আছে। কিন্তু এতদসত্তেও তার কোনো প্রশ্নকে আপনি কোনোভাবেই মেনে নিতে পারেন না?

আমরা আল্লাহর বান্দা :

আপনি আল্লাহর বান্দা, চাকর নন, গোলাম নন। আল্লাহ আপনাকে সৃষ্টি করেছেন। আল্লাহ আপনার স্রষ্টা, আপনি তাঁর সৃষ্টি। আপনার বিবেক-বুদ্ধি এবং তাঁর জ্ঞান ও হেকমতের মধ্যে কোনো সামঞ্জস্যতা নেই। আপনার বিবেক-বুদ্ধি সীমাবদ্ধ, তাঁর জ্ঞান ও হেকমত অসীম। যখন সেই স্রষ্টা এবং মুনিব বলেন যে, অমুক কাজ কর। আর আপনি বলেন, আমি কেন এ কাজ করব? যখন আপনি আপনার চাকরের কোনো প্রশ্ন বরদাশত করেন না। তখন আল্লাহর কথার ওপর কোনো প্রশ্ন করতে আপনার লজ্জা হয় না? আপনি আপনার সৃষ্টিকর্তাকে, আপনার মালিককে, আপনার মুনিবকে, আপনার প্রতিপালনকারীকে আপনি জিজ্ঞাসা করছেন যে, এ আদেশটি কেন দিয়েছেন? এটি চরম লজ্জাহীনতার বিষয় এবং আত্মপরিচয় সম্পর্কে চরম অজ্ঞতার পরিচায়ক।

চলবে...

ডেইলি বাংলাদেশ/আরএজে