Alexa কোচিং বাণিজ্যের নয়া কৌশল

ঢাকা, রোববার   ১৫ ডিসেম্বর ২০১৯,   পৌষ ১ ১৪২৬,   ১৮ রবিউস সানি ১৪৪১

কোচিং বাণিজ্যের নয়া কৌশল

জিন্নাতুল ইসলাম জিন্না, লালমনিরহাট ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ১৭:১০ ১৯ নভেম্বর ২০১৯  

প্রতীকী ছবি

প্রতীকী ছবি

সরকারি নিষেধাজ্ঞা থাকার পরেও আইন অমান্য করে প্রশাসনের নাকের ডগায় লালমনিরহাটে চলছে রমরমা কোচিং বাণিজ্য। পুরোনো কৌশল পরিবর্তন করে শিক্ষকরা নতুনভাবে চালিয়ে যাচ্ছেন তাদের এই শিক্ষা বাণিজ্য।

লালমনিরহাট জেলা শহরের খোর্দ্দসাপটান (অভিযান পাড়ায়) অবস্থিত এভারগ্রীন কোচিং সেন্টারে গেলে দেখা যায় বেশ খোলা-মেলাভাবেই কোচিং পরিচালিত হচ্ছে। যেখানে বিভিন্ন ক্লাসের ছাত্র-ছাত্রীরা ক্লাস করছে। শিক্ষকদের জন্য সরকার কোচিং বাণিজ্য নিষিদ্ধ করলেও লালমনিরহাটে বিভিন্ন স্কুল ও কলেজের শিক্ষকরা কৌশলে পরিকল্পনা করে চালিয়ে যাচ্ছেন। আর স্কুল-কলেজের শিক্ষক দ্বারা পরিচালিত এভারগ্রীন নামের কোচিংটি পরিচালনা করছেন আদিতমারী কান্তেশ্বর বর্মন স্কুল অ্যান্ড কলেজের ভূগোল (প্রভাষক) মো. সামছুল হক। 

বুধবার (১৩ নভেম্বর) বিকেলের দিকে এভারগ্রীন কোচিং সেন্টারে শিক্ষকদের সঙ্গে কথা বলতে গেলে সেখানকার শিক্ষকরা সাংবাদিকদের সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করেন।

সরকারি বিভিন্ন স্কুল, কলেজ ও এমপিওভুক্ত বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকরা বাসা ভাড়া নিয়ে নামে-বেনামে চালাচ্ছেন এই কোচিং বাণিজ্য। কোনো কোনো শিক্ষক নিজের বাড়িতে ৩০-৩৫ জোড়া বেঞ্চ তৈরি করে ৫০-৬০ জন শিক্ষার্থী নিয়ে প্রাইভেট পড়াচ্ছেন। একদিন পর পর এক একটি ব্যাচ পড়ানো হয়। এভাবে ৭-৮টি ব্যাচ পড়ানো হচ্ছে। ফলে ওই সব স্কুলের শিক্ষকরা বিভিন্ন অজুহাতে অনুপস্থিত থেকেও ইচ্ছেমতো চালাচ্ছেন কোচিং-প্রাইভেট বাণিজ্য।

কেউ কেউ ক্ষমতাসীন দলের নেতা সেজে কোচিং সেন্টার চালাচ্ছেন এবং বীরদাপটে বলছেন সারাদেশে অভিযান চললেও আমাদের কোচিং সেন্টারে কেউ অভিযান চালাতে পারবেন না, সব ম্যানেজ করা আছে। প্রশাসনের নাকের ডগায় এসব অবৈধ কার্যক্রম চলায় দরিদ্র শিক্ষার্থী, অভিাবক ও সচেতন মহলের প্রতিনিধিরা ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন। এসব কোচিং সেন্টারে সকাল সাড়ে ৭টা থেকে দুপুর ও বিকেলে এমন কি সন্ধ্যা পর্যন্ত চলছে শিক্ষকদের প্রাইভেট পাঠদান।

সরেজমিনে দেখা গেছে, জেলা শহরেই রয়েছে প্রায় অর্ধশতাধিক কোচিং সেন্টার। কোচিং চালানোর বিরুদ্ধে দেশে আইন থাকলেও এর বাস্তব প্রয়োগ না থাকায় দিনে দিনে কোচিং, প্রাইভেট সেন্টার ব্যাঙের ছাতার মত গড়ে উঠেছে। ফজলল করিম বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে সামেনে কোয়ান্টাম কোচিং সেন্টার, টিএন্ডটির সামনে ভারটেক্স কোচিং সেন্টার, গিয়াস উদ্দিন স্কুলের সামনে আইডিয়াল কোচিং সেন্টার, এনএসআই অফিসের ভবনের সামনে লাইসিয়াম কোচিং সেন্টার, এ্যাপোলো ডায়াগনস্টিক সেন্টারের পাশে অংকুশ কোচিং সেন্টার, নয়ারহাটে রেনেসাঁ কোচিং সেন্টার, মিশনমোড় এলাকার সাইফুর’স কোচিং সেন্টার, সাপ্টিবাড়ি উচ্চ বিদ্যালয়ের সামনে সেল্ফ কোচিং সেন্টার। 

কয়েকজন অভিভাবক বলেন, স্কুল, কলেজ ও মাদরাসাগুলোতে ঠিকভাবে ক্লাস হয় না। বছরের শুরুতে বিনামূল্যে বই সরকার দিলেও সময়মত ক্লাস নিচ্ছেন না শিক্ষকরা। কলেজগুলোতে শিক্ষকদের কথিত ছুটির কারণে সপ্তাহের ৩/৪ দিন পালা করে শিক্ষকরা কলেজে আসেন না। কলেজে ৯টায় ক্লাস শুরু করে দুপুরের আগে তালা ঝুলিয়ে দেন।

কোচিংয়ে পড়ানোর বিষয়ে একাধিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকের কাছে জানতে চাওয়া হলে তারা বিষয়টি স্বীকার করেন। তবে অনেকেই বলেন, আমাদের এলাকায় এমন কোনো প্রতিষ্ঠান নেই যার ২/৪ জন্য শিক্ষক প্রাইভেট কোচিং বাণিজ্যের সঙ্গে যুক্ত নেই। যার প্রমাণ পাবেন জেলা শহরের এভারগ্রীন কোচিং সেন্টারে গেলে। ১৪ বছর ধরে জেলা শহরের এভারগ্রীন কোর্চিং সেন্টারসহ প্রায় সব কোচিং সেন্টারই বিভিন্ন স্কুল কলেজের শিক্ষকরাই চালিয়ে যাচ্ছেন। সেখানে রয়েছে এমপিওভুক্ত বিভিন্ন স্কুল কলেজের ৬/৭ জন শিক্ষক। আর তারাই পরিকল্পনা করে চালিয়ে যাচ্ছেন। কিন্তু আমরা তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারিনা। কারণ তারা দলীয় ছত্রছায়ায় অনেক প্রভাবশালী। কিছু কিছু শিক্ষক তাদের বাসা-বাড়িতে প্রকাশ্যে প্রাইভেট পড়িয়ে থাকেন।

জেলা শহরের এভারগ্রীন কোচিং সেন্টারে যেসব এমপিওভুক্ত স্কুল-কলেজের শিক্ষক রয়েছেন তাদের মধ্যে আদিতমারী কান্তেশ্বর স্কুল অ্যান্ড কলেজের আইসিটি প্রভাষক মো. ওয়াজেদুল ইসলাম ফাতেমি, কালেক্টরেট কলেজিয়েট স্কুলের প্রধান শিক্ষক মো. রশিদুল ইসলাম, বেগম কামরুন্নেছা ডিগ্রী কলেজের সহ-অধ্যাপক মো. জিকরুল ইসলাম ফাতেমি, বেগম কামরুনেছা ডিগ্রী কলেজের জীববিজ্ঞানের (সহ-অধ্যাপক) যিনি প্রাইভেট সম্রাট নামে পরিচিত মো. জিয়াউর রহমান, বালা পুকুর উচ্চ বিদ্যালয়ের (সহ-শিক্ষক) পদার্থ অবিনাস চন্দ্র রায়, নেছারিয়া কামিল মাদরাসার (সহ-শিক্ষক) রসায়ন মো. লাবলু মিয়া। এছাড়াও ওই কোচিং সেন্টারে খন্ডকালীন শিক্ষক যারা ক্লাস পেমেন্ট সিষ্টেমে ক্লাস নেন। এসব শিক্ষকের বিরুদ্ধে তাদের নিজ-নিজ স্কুল ও কলেজের শিক্ষার্থীদের কোচিং করার জন্য বাধ্য করানো এবং শিক্ষার্থীদের দিয়ে লিফলেট বিতরণের অভিযোগও রয়েছে। এসব শিক্ষকরা লালমানরহাট জেলা শহর এবং শহরের বাইরে কোচিং বাণিজ্য করে অনেকেই হয়েছেন অঢেল সম্পদের মালিক।

এ বিষয়ে প্রতিমাসের আইন শৃংঙ্খলা সভায় ডিসির দৃষ্টি আকর্ষণ করে আলোচনাও হয়। তবুও সবকিছুকে উপেক্ষা করেও চলছে কোচিং সেন্টার।

সাইফুর’স কোচিং সেন্টারের লালমনিরহাট শাখার পরিচালক হেলাল মিয়া ডেইলি বাংলাদেশকে জানান, আমরা একাডেমিক কোনো কোর্স চালাই না। আর এখানে সরকারি কোনো স্কুল কলেজের শিক্ষক জড়িত নেই। এখানে যারা ক্লাস নেন তারা সবাই সাইফুর’স এর বেতনভুক্ত শিক্ষক। যারা ঢাকা এবং রংপুর থেকে এসে লালমনিরহাট শাখায় ক্লাস নেন।

এভারগ্রীন কোচিং সেন্টারের পরিচালক আতিদমারী কান্তেশ্বর স্কুল অ্যান্ড কলেজের ভূগোল শিক্ষক মো. শামসুল হক ডেইলি বাংলাদেশকে বলেন, তাদের কোচিং সেন্টারে খন্ডকালীন কিছু শিক্ষক ক্লাস পেমেন্ট হিসেবে ক্লাস নেন। তবে স্থায়ীভাবে কোনো শিক্ষক কোচিং সেন্টারের সঙ্গে সম্পৃক্ত নাই। 

সম্প্রতি বাংলাদেশে সরকারি স্কুল-কলেজের শিক্ষকদের কোচিং বাণিজ্য অবৈধ বলে রায় দিয়েছে হাইকোর্ট। সেই সঙ্গে শিক্ষকদের কোচিং বাণিজ্য বন্ধের নীতিমালা-২০১২কে বৈধ বলে রায় এসেছে। এই নীতিমালার বাইরে গিয়ে সরকারি স্কুল-কলেজের শিক্ষকদের কেউ শিক্ষার্থীদের পড়াতে পারবেন না।

ছবি: ডেইলি বাংলাদেশকোচিং বাণিজ্য বন্ধের নীতিমালাসহ শিক্ষকদের করা কয়েকটি রিটের ওপর শুনানি শেষে এই রায় দিয়েছেন হাইকোর্টের বিচারপতি শেখ হাসান আরিফ ও বিচারপতি রাজিক আল জলিলের সমন্বয়ে গঠিত দ্বৈত বেঞ্চ।

দুর্নীতি দমন কমিশনের আইনজীবী খুরশীদ আলম বলছেন, অ্যামিকাস কিউরিসহ সব পক্ষের সঙ্গে কথা বলে হাইকোর্ট সরকারি স্কুলে কোচিং বাণিজ্য অবৈধ বলে রায় দিয়েছেন। 

লালমনিরহাট জেলা শিক্ষা অফিসার (ডিও) আবুল কালাম আজাদ ডেইলি বাংলাদেশকে জানান, অক্টোবরের ২৬ তারিখ থেকে নভেম্বরের ১৫ তারিখ পর্যন্ত সবপ্রকার কোচিং বন্ধ রাখার সরকারিভাবে ঘোষণা দেয়া আছে। এরপরেও যদি কেউ কোচিং চালায় তাহলে তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। তবে জেলা শহরের এভারগ্রীন সেন্টারে কোচিং চালানো হচ্ছে বিষয়টা তিনি জানেন না। তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

ডেইলি বাংলাদেশ/আরএম