Alexa কেয়ামতের আলামত বা লক্ষণসমূহ (পর্ব -২)

ঢাকা, শনিবার   ২১ সেপ্টেম্বর ২০১৯,   আশ্বিন ৬ ১৪২৬,   ২১ মুহররম ১৪৪১

Akash

পবিত্র কোরআন ও হাদিসের আলোকে

কেয়ামতের আলামত বা লক্ষণসমূহ (পর্ব -২)

 প্রকাশিত: ১৪:৫০ ৩০ আগস্ট ২০১৮   আপডেট: ১৫:০৯ ৩০ আগস্ট ২০১৮

ফাইল ছবি

ফাইল ছবি

ইসলাম ধর্ম অনুসারে কেয়ামত কবে, কখন সংঘটিত হবে তার নির্দিষ্ট কোনো সময় কারো জানা নেই। 

কারণ মহান আল্লাহ পাক পবিত্র কোরআন শরীফে বলে দিয়েছেন যে, ‘নিশ্চয় আল্লাহর কাছেই কেয়ামতের জ্ঞান রয়েছে।’ (সূরা লুক্বমান, আয়াত-৩৪)

মহান আল্লাহ তায়ালা এই বিষয়ের জ্ঞান আর কাউকে প্রদান করেননি। তবে কেয়ামত সংঘটিত হওয়ার আগে কিছু আলামতের কথা বলে গেছেন আমাদের প্রিয় নবী হজরত মুহাম্মাদ (সা.)। কেয়ামত সংঘটিত হওয়ার আগে এমন কিছু আলামত বা লক্ষণ দেখে কেয়ামতের সম্পর্কে ধারণা করা যেতে পারে।

পবিত্র কোরআন ও হাদিসের আলোকে কেয়ামতের আলামত বা লক্ষণসমূহ (পর্ব-১) এ কেয়ামতের কয়েকটি আলামত সম্পর্কে আলোচনা করা হয়েছে। আজ বাকি আলামতগুলো সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো- 

দাব্বাতুল আরদের আবির্ভাব: 

কেয়ামত সংঘঠিত হবার পূর্বে বায়তুল্লাহ শরীফের পূর্বদিকে অবস্থিত সাফা পর্বত ভূমিকম্পে ভেঙ্গে যাবে এবং সেখান থেকে এক অদ্ভূত জন্তু বের হয়ে আসবে যা আরবিতে দাব্বাতুল আরদ নামে পরিচিত। দাব্বাতুল আরদ শব্দটির অর্থ হলো চতুষ্পদ জন্তু।
 
পবিত্র কোরআনে বর্ণিত আছে, ‘যখন ঘোষিত শাস্তি তাদের নিকট আসবে তখন আমি মাটি গর্ভ থেকে এক জন্তু নির্গত করব। এ জন্তু মানুষের সঙ্গে কথা বলবে এই জন্য যে তারা আমার নিদর্শনে ছিল অবিশ্বাসী’। (২৭: ২৮ নং আয়াত)

এই অদ্ভূত প্রাণীটির মুখমন্ডল হবে মানুষের মতো, পা উটের মতো, ঘাড় ঘোড়ার মতো, লেজ চিলের মতো, নিতম্ব হরিণের নিতম্বের মতো, শিং বহু শাখা বিশিষ্ট হরিণের শিংয়ের মতো আর হাত বানরের হাতের মতো। উক্ত জীবটি ভীষণ বাক পটু হবে ও খুব উচ্চমানের কথা বলবে। সে এতটা দ্রুত গতিসম্পন্ন হবে যে কেউ তার নাগাল পাবেনা আবার কেউ তার নাগালের বাইরেও থাকবে না। 

তার নিকট হজরত মুসা (আ.) এর লাঠি আর হজরত সুলায়মান (আ.) এর আংটি থাকবে। সেই লাঠি দ্বারা সকল মুমিনদের স্পর্শ করবে এতে করে তাদের মূখমন্ডল উজ্জ্বল হয়ে উঠবে আর সকলে মুমিন হিসাবে তাদের চিনতে পারবে। আর সুলায়মান (আ.) এর আংটি দিয়ে কাফেরদের নাকের ওপর ‘কাফের’ শব্দ সীল মেরে দেবে, যেনো সকলেই তাদের কাফের হিসেবে চিনতে পারে।  (আলামতে কিয়ামত)
 
ইয়াজুজ -মাজুজের আগমন:
 
ইয়াজুজ-মাজুজ দেখতে হবে মানুষের মতো কিন্তু তাদের স্বভাব চরিত্র হবে চতুস্পদ জন্তুর মতো। দেহের সন্মুখ ভাগ মানুষের মতো কিন্তু পিছন ও নিম্নভাগ চতুস্পদ জন্তুর মতো। দুনিয়ার এক সীমান্তে এরা বাস করে। এরা মানুষ বৃক্ষলতা সব ভক্ষণ করে। কেয়ামত নিকটবর্তী হওয়ার পর কেয়ামতের অপর একটি বড় আলামত হলো পৃথিবীতে ইয়াজুজ-মাজুজ নামে দুইটি চরম অত্যাচারী গোত্রের বহি:প্রকাশ ঘটা। হজরত ঈসা (আ.) অবতরণের পর এই ইয়াজুজ- মাজুজের প্রকাশ ঘটবে।
 
ফাতাহুল বারীর ৬ষ্ঠ খন্ডে হজরত কাতাদা (রা.) বলেন, এরা মানুষের আকৃতি হবে এবং হজরত নুহ (আ.) এর পুত্র ইয়াকা এর বংশধর থেকে হবে। তাফসীরে তাবারী গ্রন্থের বর্ণনা মতে, তারা পৃথিবীর উত্তর পূর্বাঞ্চলের বাসিন্দা হবে যেটা বর্তমান পৃথিবীর আরমেনিয়া ও আযারবাইযানের পাশাতবাগ বলে উল্লেখ্য করা হয়।

হজরত শাহ সেকান্দার সুদৃঢ় প্রাচীর নির্মান করে মানব এলাকায় আসার পথ বন্ধ করে দেয়। কারণ তারা এক সময় মানুষ জাতির ওপর অনেক অত্যাচার করত।
 
ইয়াজুজ-মাজুজ উক্ত প্রাচীরটি প্রতিদিন জিহ্বা দ্বারা চাটতে থাকে কিন্তু সন্ধ্যার সময় উক্ত প্রাচীর আবার পূর্বের অবস্থায় ফেরত যায় অর্থাত পূর্নাঙ্গ অবস্থা লাভ করে। এভাবে কিয়ামতের আগ পর্যন্ত চলতে থাকবে। কিন্তু হঠাৎ একদিন মহান আল্লাহর নির্দেশে এ দেয়াল নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে, তখনই ইয়াজুজ-মাজুজেরর দল স্রোতের ন্যায় মানুষের এলাকায় ঢুকে পড়বে। পানির পিপাসায় তারা দুনিয়ার সাগর-মহাসাগরের সব পানি পান করে ফেলবে। তাদের অত্যাচারে দুনিয়া তছনছ হয়ে যাবে। ওই অবস্থায় হজরত ঈসা (আ.) মুসলমানদের নিয়ে দুইহাত তুলে মহান আল্লাহর কাছে দোয়া করবেন। যার ফলে মহামারী দেখা দেবে এবং সে মহামারীতে এই অত্যাচারী সম্প্রদায় ধ্বংস হয়ে যাবে।

পবিত্র কোরআনের সূরা কাহফে এর ৯৪-৯৯ নং আয়াত সমূহতে ইয়াজুজ ও মাজুজের সম্পর্কে বিস্তারিত বলা আছে।

সূরা কাহফে এর ৯৪ নং আয়াতে বলা হয়েছে-

قَالُوا يَا ذَا الْقَرْنَيْنِ إِنَّ يَأْجُوجَ وَمَأْجُوجَ مُفْسِدُونَ فِي الْأَرْضِ فَهَلْ نَجْعَلُ لَكَ خَرْجًا عَلَى أَن تَجْعَلَ بَيْنَنَا وَبَيْنَهُمْ سَدًّا 
‘তারা বলল: হে যুলকারনাইন, ইয়াজুজ ও মাজুজ দেশে অশান্তি সৃষ্টি করেছে। আপনি বললে আমরা আপনার জন্যে কিছু কর ধার্য করব এই শর্তে যে, আপনি আমাদের ও তাদের মধ্যে একটি প্রাচীর নির্মাণ করে দেবেন।’
 
সূরা কাহফে এর ৯৫ নং আয়াতে বলা হয়েছে -

قَالَ مَا مَكَّنِّي فِيهِ رَبِّي خَيْرٌ فَأَعِينُونِي بِقُوَّةٍ أَجْعَلْ بَيْنَكُمْ وَبَيْنَهُمْ رَدْمًا
‘তিনি বললেন: আমার পালনকর্তা আমাকে যে সামর্থ্য দিয়েছেন, তাই যথেষ্ট। অতএব, তোমরা আমাকে শ্রম দিয়ে সাহায্য কর। আমি তোমাদের ও তাদের মধ্যে একটি সুদৃঢ় প্রাচীর নির্মাণ করে দেব।’

সূরা কাহফে এর ৯৬ নং আয়াতে বলা হয়েছে-

آتُونِي زُبَرَ الْحَدِيدِ حَتَّى إِذَا سَاوَى بَيْنَ الصَّدَفَيْنِ قَالَ انفُخُوا حَتَّى إِذَا جَعَلَهُ نَارًا قَالَ آتُونِي أُفْرِغْ عَلَيْهِ قِطْرًا 
‘তোমরা আমাকে লোহার পাত এনে দাও। অবশেষে যখন পাহাড়ের মধ্যবর্তী ফাঁকা স্থান পূর্ণ হয়ে গেল, তখন তিনি বললেন: তোমরা হাঁপরে দম দিতে থাক। অবশেষে যখন তা আগুনে পরিণত হলো, তখন তিনি বললেন: তোমরা গলিত তামা নিয়ে এসো, আমি তা এর উপরে ঢেলে দেই।’

সূরা কাহফে এর ৯৭ নং আয়াতে বলা হয়েছে-

فَمَا اسْطَاعُوا أَن يَظْهَرُوهُ وَمَا اسْتَطَاعُوا لَهُ نَقْبًا 
‘অত:পর ইয়াজুজ ও মাজুজ তার ওপরে আরোহণ করতে পারল না এবং তা ভেদ করতে ও সক্ষম হল না।’

সূরা কাহফে এর ৯৮ নং আয়াতে বলা হয়েছে-

قَالَ هَذَا رَحْمَةٌ مِّن رَّبِّي فَإِذَا جَاء وَعْدُ رَبِّي جَعَلَهُ دَكَّاء وَكَانَ وَعْدُ رَبِّي حَقًّا 
‘যুলকারনাইন বললেন: এটা আমার পালনকর্তার অনুগ্রহ। যখন আমার পালনকর্তার প্রতিশ্রুত সময় আসবে, তখন তিনি একে চূর্ণ-বিচূর্ণ করে দেবেন এবং আমার পালনকর্তার প্রতিশ্রুতি সত্য।’

সূরা কাহফে এর ৯৯ নং আয়াতে বলা হয়েছে-

وَتَرَكْنَا بَعْضَهُمْ يَوْمَئِذٍ يَمُوجُ فِي بَعْضٍ وَنُفِخَ فِي الصُّورِ فَجَمَعْنَاهُمْ جَمْعًا 
‘আমি সেদিন তাদেরকে দলে দলে তরঙ্গের আকারে ছেড়ে দেব এবং শিঙ্গায় ফুঁৎকার দেয়া হবে। অত:পর আমি তাদের সবাইকে একত্রিত করে আনব।’

সূরা আম্বিয়া ৯৬ নং আয়াত-

حَتَّى إِذَا فُتِحَتْ يَأْجُوجُ وَمَأْجُوجُ وَهُم مِّن كُلِّ حَدَبٍ يَنسِلُونَ 
‘যে পর্যন্ত না ইয়াজুজ ও মাজুজকে বন্ধন মুক্ত করে দেয়া হবে এবং তারা প্রত্যেক উচ্চভুমি থেকে দ্রুত ছুটে আসবে।’
 
দক্ষিণের বায়ুর প্রকাশ:

দাব্বাতুল আরদ অদৃশ্য হবার পর কেয়ামতের আরেক আলামতের প্রকাশ ঘটবে । সেসময় দক্ষিণ দিক থেকে পৃথিবীতে এক প্রকার বায়ু প্রবাহিত হবে। এই বায়ুর প্রভাবে মহান আল্লাহর মুমিন বান্দাগণ কিছুটা অসুস্থ্ হয়ে পড়বে আর দুনিয়া থেকে বিদায় নেবে। এরপর পৃথিবীতে এক ধরনের কালো মানুষের আধিপত্য হবে আর এরা কাবা ঘরের ধ্বংস সাধন করবে। বন্ধ হয়ে যাবে হজ পালন।
 
পশ্চিম দিক থেকে সূর্যোদয়ের ঘটনা ও তওবার দরজা বন্ধ:

পবিত্র কোরআন ও হাদীসের আলোকে বুঝা যায় যে, দাব্বাতুল আরদের প্রকাশের কিছু পূর্বে কিংবা তার পরই সিঙ্গায় ফুৎকারের আগে পশ্চিম দিক থেকে সূর্যোদয়ের ঘটনা ঘটবে। এ অস্বাভাবিক ঘটনার পর থেকে কারো তওবা কবুল হবে না। এই ঘটনা ঘটার পর থেকে ঈমানদারগণ রাতভর মহান আল্লাহর দরবারে কান্নাকাটি করবে। এই রাতের পর সূর্য পশ্চিম দিক থেকে উদিত হয়ে আবার পশ্চিম দিকেই অস্ত যাবে। পরের দিন সূর্য আবার পূর্ব দিক থেকে উদিত হবে এবং পশ্চিম দিকে অস্ত যাবে। এর কিছুদিন পরেই কিয়ামত সংগঠিত হবে।
 
পবিত্র কোরআনের অক্ষর বিলোপ:

কেয়ামতের আরেকটি লক্ষণ হলো পবিত্র কোরআনের অক্ষর মুছে যাওয়া। কেয়ামতের পূর্বে পবিত্র কোরআনের সব অক্ষর চলে যাবে থাকবে শুধু সাদা পৃষ্ঠা। পশ্চিম দিক থেকে সূর্যোদয়ের পর আতংকগ্রস্থ মানুষ দেখতে পাবে পবিত্র কোরআনে কোনো অক্ষর নেই। শুধুই সাদা কাগজ অবশিষ্ট আছে।
 
পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে তিনটি ভয়াবহ ভূমিকম্প ও সাড়া পৃথিবী ধোয়ায় আচ্ছন্ন:

হজরত ঈসা (আ.) ওফাতের পর কেয়ামতের পূর্বে সমগ্র পৃথিবীতে তিনটি ভয়ানক ভূমিকম্প হবে। হাদীসে বর্ণনা করা হয়েছে যে ‘একটি মক্কা মদীনার মধ্যবর্তী বায়দা মরু আঞ্চলে ঘটবে।’ এই সময়ের মধ্যেই সমস্ত পৃথিবী ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন হয়ে যাবে। ফলে মুসলমানরা স্নায়ু দূর্বলতা ও সর্দি-কাশিতে আক্রান্ত হয়ে পড়বে আর কাফেররা হবে সংজ্ঞাহীন। পৃথিবীতে এই অবস্থা চল্লিশ দিন পর্যন্ত অব্যাহত থাকবে। এরপর পৃথিবী ধোয়ামুক্ত হবে। (আলামতে কিয়ামত)
 
দক্ষিণের অগ্নিশিখার প্রকাশ:

কিয়ামতের সর্বশেষ আলামত হবে দক্ষিণ দিক থেকে আসা একটি মহা অগ্নিশিখা প্রকাশিত হয়ে মানুষকে উত্তর দিকে ধাওয়া করা শুরু করবে। বলা হয়ে থাকে এই মহা অগ্নিশিখা ইয়ামান থেকে প্রকাশিত হবে। লোকজন ক্রমশ উত্তর দিক সরে যাবে। কিয়ামত অতি নিকটবর্তী হবে।
 
সর্বশেষ আলামত ইস্রাফিল (আ.)শিঙ্গায় ফুৎকার:
 
সবশেষে একটি আওয়াজ শোনা যাবে। এই আওয়াজ ক্রমে আস্তে থেকে ধীরে ধীরে প্রচন্ডতর হতে থাকবে এবং সবজায়গাই একই রকম আওয়াজ শোনা যাবে এবং এটিই সেই মহা ফুৎকার যেটি মহান আল্লাহর আদেশে হজরত ইসরাফিল (আ.) দিবেন। ওই সময় থেকেই কিয়ামত শুরু হয়ে যাবে । বিশ্বব্রহ্মাণ্ড তছনছ হয়ে যাবে এক নিমিষে।
 
যার সৃষ্টি আছে তার বিনাশ আছে। তেমনিভাবে পৃথিবীও এর উর্ধে নয়। সৃষ্টিজগতের বিনাশের মধ্যে দিয়ে ইহকালের সমাপ্তি ও পরকালের শুরুর কথা বলা হয়েছে ইসলাম ধর্মে। আর এই ইহকালের বিনাশের সর্বশেষ বিষয়টাই হচ্ছে কেয়ামত।

আরো পড়ুন>>> পবিত্র কোরআন ও হাদিসের আলোকে কেয়ামতের আলামত বা লক্ষণসমূহ (পর্ব-১)

ডেইলি বাংলাদেশ/আরএজে