Alexa কেন আমাদের নি:সঙ্গ লাগে এবং একাকীত্ববোধ হয়?

ঢাকা, রোববার   ২২ সেপ্টেম্বর ২০১৯,   আশ্বিন ৭ ১৪২৬,   ২২ মুহররম ১৪৪১

Akash

আলমে আরওয়াহ কি?

কেন আমাদের নি:সঙ্গ লাগে এবং একাকীত্ববোধ হয়?

 প্রকাশিত: ১৯:১১ ২৯ আগস্ট ২০১৮   আপডেট: ১৯:১৬ ২৯ আগস্ট ২০১৮

ফাইল ছবি

ফাইল ছবি

পৃথিবীর প্রত্যেক মানুষ মহান আল্লাহ তাআলার সান্নিধ্যে রুহের জগত আলমে আরওয়াহে ছিল। 

পৃথিবীতে এসে মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীন এবং মানুষের মধ্যে দূরত্বের সৃষ্টি হয়। এই জন্য একজন প্রকৃত মুমিন সবসময় আল্লাহ’র সান্নিধ্যে আসতে চায়। মানুষের রুহ সেই পরম প্রভুকে সবসময় খুজে বেড়ায়। এ কারণে নি:সঙ্গতাবোধ আর একাকিত্ববোধের শিকার হতে হয় আমাদের।

মানুষের রূহ সৃষ্টির করার পর আলমে আরওয়াহ বা রূহের জগতে একত্রে থাকা অবস্থায় আল্লাহতায়ালা রুহকে প্রশ্ন করেন। প্রশ্ন করেন, ‘আলাসতু বিরাব্বিকুম? কালু বালা।’ অর্থাৎ- আমি কি তোমাদের রব বা প্রতিপালক নই? সমস্ত রুহ একসঙ্গে উত্তর দিয়েছিল, হ্যাঁ। এরপর মহান আল্লাহ তাআলা মানুষের দেহের মধ্যে রুহ দিয়ে পৃথিবীতে পাঠান।

ওস্তাদ জালালউদ্দিন রুমী তার মসনবি শরিফের একদম শুরুতে উল্লেখ করেছেন,

‘বিশনু আজ না এচুঁ হেকাইযে মিকুনাদ,
ওয়াজ জুদাই হা শিকাইয়েত মীকুনাদ।’

অর্থাৎ: বাঁশের বাঁশি যখন বাজে, তখন তোমরা মন দিয়ে শুনো, সে কী বলে। সে তার বিরহ বেদনায় অনুতপ্ত হয়ে কান্না করছে। 

মসনবি শরীফে রুমী আরো উল্লেখ করেন,

‘কাজ নাইয়াছতান তা মরা ব বুরিদাহআন্দ,
আজ নফিরাম মরদো জন নালিদাহআন্দ।’

অর্থাৎ: বাঁশি বলে আমি বাঁশ ঝাড়ের মধ্যে আপন জনের সঙ্গে সুখে শান্তিতে বসবাস করিতেছিলাম। সেখান থেকে আমাকে কেটে আলাদা করে আনা হয়েছে। সেই বিচ্ছেদের কারণে আমি ব্যথিত হয়ে বিরহ যন্ত্রণায় কান্না করিছি। আমার বিরহ ব্যথায় মানবজাতি সহানুভূতির কান্না করছে।

এখানে মাওলানা রুমি বাশির আর্তনাদকে মানব রূহের আর্তনাদের সঙ্গে তুলনা করেছেন। মানব রুহ আলমে আরওয়াহর মধ্যে মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের ভালোবাসায় ও সান্নিধ্যে ছিল। পার্থিব জগতে মোহের কারণে মানুষ মহান আল্লাহর ভলোবাসা ভুলে যায়। কোনো কামেল লোকের সাহচর্যে এসে, ঐশী ইচ্ছার কারণে অথবা কোনো প্রেমের কাহিনী পাঠ করে নিজের প্রকৃত গুণাবলী ও অবস্থার প্রতি সজাগ হয়, তখন খোদার প্রেমও চিরশান্তির জন্য অনুতপ্ত ও দু:খিত হয়। মাওলানা রুমী বলেন, বাঁশি কয়েক প্রকার বিরহের ব্যথা প্রকাশ করছে। মহান আল্লাহ তাআলা সব মানুষের রুহকে সৃষ্টি করে 'আলমে আরওয়াহ'তে রেখেছিলেন এবং পরবর্তীতে সময়ের ধারাবাহিকতায় পৃথিবীতে পাঠিয়েছেন। 

বাঁশি যখন বাজানো হয় সে কাঁদে। সে তার মুল উৎসের কাছে ফিরে যেতে চায়। মানব রুহও বাশির মতো তার পূর্বাবস্থায় ফিরে যেতে চাই। সব মানুষের রুহ যখন মহান আল্লাহর সান্নিধ্যে সহাবস্থান করছিলো তখন তার এই দু:খবোধ ছিল না।

মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীন পবিত্র কোরআন শরীফে বলেছেন, ‘এ মাটি থেকেই আমি তোমাদেরকে সৃষ্টি করেছি, এতেই তোমাদেরকে ফিরিয়ে দেব এবং পুনরায় এ থেকেই আমি তোমাদেরকে উত্থিত করব।’ (সুরা ত্বাহা : আয়াত ৫৫)

মানুষ সৃষ্টির সেরা জীব- আশরাফুল মাখলুকাত। মানুষের চাহিদা আছে ,অফুরন্ত চাহিদা যেন শেষ নেই। মানুষের অনেক কিছু অর্জনের পরও তার কেবল মনে হয় কি যেন নেই, কি যেন দরকার। এই যে মানুষের হৃদয়ের হাহাকার, সেটি মূলত আলমে আরওয়াহের রুহের সঙ্গে আল্লাহ’র বিচ্ছেদের কারণ। মহান আল্লাহকে কাছে পাওয়ার জন্যে একান্তে যে সাধনা করে সফলকাম হতে পারবে সেই এ অভাববোধ তাড়াতে পারবে। একান্ত সাধনার মাধ্যমে ফানাফিল্লাহ এবং বাকাবিল্লাহতে পোঁছতে হবে। ফানাফিল্লাহ হচ্ছে আল্লাহ’র সান্নিধ্যে অবস্থান করা এবং বাকাবিল্লাহ হচ্ছে আল্লাহ’র প্রেমে স্থায়ীভাবে বিলীন হয়ে যাওয়া।

নিজেকে পরিশুদ্ধ করে সমস্ত পাপ মুছে গেলে অন্তর পরিশুদ্ধ করে মহান আল্লাহর মাঝে নিজেকে বিলীন করে দিতে হবে। তবেই, প্রকৃত শান্তি অর্জিত হবে। মহানবী হজরত মুহাম্মাদ (সা.) বলেছেন, মানবদেহে একটি বিশেষ অঙ্গ আছে, যা সুস্থ থাকলে সমগ্র দেহ পরিশুদ্ধ থাকে, আর অসুস্থ থাকলে সমগ্র দেহ অপরিশুদ্ধ হয়ে যায়। জেনে রাখো এটি হলো কলব বা হৃদয়। সবসময় মহান আল্লাহকে স্মরণ এবং মহান আল্লাহর জিকিরের মাধ্যমে এ কলব পরিস্কার করতে হবে। মহান আল্লাহ’র কাছে ফানা হওয়ার জন্যে প্রেম-ই মাধ্যম। যে প্রেম স্রস্টার সঙ্গে সৃষ্টির। 

এই প্রেম বা সাধনা হচ্ছে তরিকত যা মহান আল্লাহ্ প্রাপ্তির পথ। তাই মহান আল্লাহকে পাওয়ার জন্য অন্তর পরিশুদ্ধ করে জিকিরের মাধ্যমে মহান আল্লাহকে ডাকতে হবে। কালব যখন পাপে নিমজ্জিত থাকে, দুনিয়ার মোহে বিমোহিত থাকে তখন সে এই শান্তি পায় না, আল্লাহ’র সান্নিধ্যে আসতে পারে না। মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিন বলেছেন, ‘আলা বিজিকরিল্লাহি তাতমাঈন্নুল কুলুব’ যার অর্থ -নিশ্চয়ই আল্লাহর জিকিরের মাধ্যমেই কালবে প্রশান্তি লাভ করা যায়।’
 
 আল্লাহ তায়ালা বলেছেন, ‘ওয়ানাহু  আকরাবু ইলায়হি মিন হাবলিল ওয়াবিদ।’ অর্থাৎ এবং আমি বান্দার কাছে তার গর্দানের ধমনীর চেয়েও অধিক নিকটবর্তী। (সূরা ক্বাহফ : ১৬)।

এতটা নিকটবর্তী হওয়ার পরেও বান্দা মহান আল্লাহকে কাছে পায় না। বান্দা রাব্বুল আলামীন আল্লাহকে কিভাবে কাছে পাবেন সে কথা মহান আল্লাহ তাআলা পবিত্র কোরান শরীফে বলে দিয়েছেন, ‘ওয়াল্লাজিনা জাহাদু ফিনা লানাহ্দিয়ান্নাহুম সুবুলানা।’ 

অর্থাৎ: ‘যারা আমার (সঙ্গে সম্পর্ক সৃষ্টির) জন্য কঠোর চেষ্টা ও সাধনা করে, আমি অবশ্যই তাদের পথপ্রদর্শন করব।’ (সূরা আনকাবুত : ৬৯)।

'মান আরাফা নাফসাহু ফাকাদ আরাফা রাব্বাহু; অর্থাৎ যে ব্যক্তি নিজেকে চিনতে পেরেছে সে তার প্রতিপালক আল্লাহর পরিচয় লাভ করেছে।'

আমাদের এ পৃথিবী নশ্বর। রুহ অবিনশ্বর। অস্থায়ী আবাস আমাদের এ পৃথিবীতে। এ পৃথিবী থেকে বিদায় নিয়ে প্রত্যেক মানুষকে কবর বা আলমে বরজখে যেতে হবে। বরজখ শব্দের অর্থ-যবনিকা বা পর্দা। মহান রাব্বুল আলামিন  আল্লাহ বলেন, ‘এবং তাদের পেছনে রয়েছে ‘বরযখ’ যার মুদ্দৎকাল হচ্ছে সেদিন পর্যন্ত যেদিন তাদেরকে পুনর্জীবিত ও পুনরুত্থিত করা হবে।’ (সূরা মুমেনুন:  ১০০)

আলমে আরওয়াহ আত্নিক জগত অতিক্রম করে আত্না আলমে আজসাম বস্তুজগতে অর্থাৎ এ পৃথিবীতে আগমন করে। এরপর আত্না আলমে বরজখ থেকে আলমে আখেরাত পরকাল তথা পুনরুত্থানের পরের জগতে প্রবেশ করবে। কবরের জীবন পেরিয়ে পুনরুত্থানের পর হাশরের ময়দানে সব রুহ আবার সমবেত হবে। 

ডেইলি বাংলাদেশ/আরএজে