উৎপাদিত ফসলের সঙ্গে মিশছে প্লাস্টিক, বাড়ছে ক্যান্সারের ঝুঁকি

ঢাকা, বুধবার   ০১ এপ্রিল ২০২০,   চৈত্র ১৮ ১৪২৬,   ০৭ শা'বান ১৪৪১

Akash

উৎপাদিত ফসলের সঙ্গে মিশছে প্লাস্টিক, বাড়ছে ক্যান্সারের ঝুঁকি

জান্নাতুল মাওয়া সুইটি ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ১৫:০০ ১৯ ফেব্রুয়ারি ২০২০   আপডেট: ১৭:০৯ ১৯ ফেব্রুয়ারি ২০২০

ছবি: সংগৃহীত

ছবি: সংগৃহীত

পানির বোতল থেকে শুরু করে কফির কাপ এমনকি খাবারের থালাটিও কিন্তু প্লাস্টিক মুক্ত নয়। দিনকে দিন এর ব্যবহার বাড়েই চলেছে। প্লাস্টিকের সমস্যাটি শুধু সুপারশপের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। বিশ্বব্যাপীই প্লাস্টিক ক্ষতিকর প্রভাব ফেলছে। এমনকি কৃষি ক্ষেত্রেও এর ব্যবহার বেড়েছে।  

তবে সবচেয়ে উদ্বিগ্ন হওয়ার কারণ হলো, বর্তমানে ফসল উৎপাদন থেকে শুরু করে প্রক্রিয়াজাত ও বাজারজাতকরণেও ব্যবহৃত হচ্ছে প্লাস্টিক। ক্ষেতে যখন বীজ বপন করা হয় তখনই প্লাস্টিকের কাগজ দিয়ে স্থানগুলো ঢেকে রাখা হয়। এরপর সার, ফসলে পানি দেয়া ইত্যাদি কাজেও পরিবেশ ধ্বংসকারী প্লাস্টিক ব্যবহার করা হচ্ছে। যুক্তরাজ্যের খাদ্য ও পল্লী বিষয়ক অধিদফতরের (ডিফরা) ২০১০ সালের এক প্রতিবেদন অনুসারে, যুক্তরাজ্যে প্রতি বছর ৪৫ হাজার টন প্লাস্টিক কৃষিকাজে ব্যবহারের জন্য উৎপাদিত হয়।

কৃষিক্ষেত্রে প্লাস্টিকএই কৃষি ক্ষেত্রে ব্যবহৃত প্লাস্টিক পণ্যের বাজারে প্রায় ৪০ শতাংশই দখল করে রেখেছে প্লাস্টিক শীট। যা মাটিতে ছড়িয়ে দেয়া হয় বীজ বপণের পর। এই প্লাস্টিক শীটের মাধ্যমেই জমির বিভিন্ন সমস্যার সমাধান করা হয়। যেমন- আগাছা দমন, সার গ্রহণের পরিমাণ বাড়ানো, তাপমাত্রা এবং আর্দ্রতা নিয়ন্ত্রণ, ফসল বা বীজ এবং মাটিকে খারাপ আবহাওয়ার হাত থেকে রক্ষা করা ইত্যাদি। 

গবেষকদের ধারণা, প্লাস্টিকের শীট ব্যবহারের ফলে অতীতের তুলনায় ফসলের ফলন এক তৃতীয়াংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। যদিও তা মোটেও পরিবেশবান্ধব নয়। ১৯৫০ সালে প্রথম যখন এই ব্যবস্থাটি চালু হয়। তখন থেকেই এই উদ্ভাবনটি কৃষিক্ষেত্রে বিরাট অবদান রাখে। সেসময় গবেষকরা ভেবেছিলেন, ২০১৯ সাল অব্দি বিশ্বের কৃষি খামারগুলোতে এসব  প্লাস্টিকের ব্যবহার ছয় দশমিক সাত মিলিয়ন টনে গিয়ে পৌঁছাবে। যা হিসাব করলে দাঁড়ায়, প্রতি বছর উত্পাদিত প্লাস্টিকের প্রায় দুই শতাংশ। যদিও বর্তমানে সেই সংখ্যা ৪০ শতাংশে গিয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশ্বব্যাপী ফসল বাড়ানোর জন্য প্লাস্টিক ব্যবহারও বাড়ছে। প্লাস্টিকালচার হিসেবে পরিচিত বর্তমান কৃষি ক্ষেত্র। 

চারা রোপণও করা হয় প্লাস্টিকের পাত্র সহতবে প্লাস্টিক মালচের (ফসলের চারপাশে রক্ষিত কাপড় বা কাগজ) ব্যাপক ব্যবহারে একটি বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়াচ্ছে। কারণ খামারে ব্যবহৃত এসব প্লাস্টিকের পুনর্ব্যবহার করা সাধারণত কঠিন এবং ব্যয়বহুল। আর বারবার একই শীট ব্যবহারের কারণে মাটি, কীটনাশক এবং সারও দূষিত হয়ে পড়ছে। পুনর্ব্যবহারের কারণে উৎপাদিত ফসলেও এসব দূষণ ছড়িয়ে পড়ছে। যার প্রভাব পড়ছে আমাদের স্বাস্থ্যে। কৃষিক্ষেত্রে প্লাস্টিক পণ্যের পুনর্ব্যবহারের ৫০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে। এতে পরিবেশ যেমন ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে মানব স্বাস্থ্যও ঝুঁকিতে পড়ছে। কৃষি-প্লাস্টিক যদি রিসাইকেল করা না যায় তবে তা ধ্বংস করা সম্ভব পুড়িয়ে অথবা মাটির গভীরে পুঁতে রাখা।  

মাইক্রোপ্লাস্টিক বনাম বায়োডেগ্র্যাডেবল প্লাস্টিক

ওয়াশিংটন স্টেট ইউনিভার্সিটির মাটি বিজ্ঞানের অধ্যাপক মার্কাস ফ্লুরি বলেন, প্লাস্টিকের মালচ পরিবেশের উপর অত্যন্ত ক্ষতিকর প্রভাব ফেলছে। আর এ নিয়ে আমরা পরিবেশবিদরা বেশ উদ্বিগ্ন। ফসল উৎপাদন বাড়ালেও এই প্লাস্টিক পণ্য মাটি ও ফসলসহ পুরো বিশ্বেরেই ক্ষতি করছে। গবেষণায় দেখা গেছে, মাইক্রোপ্লাস্টিকগুলো এতটাই সুক্ষ্ম তারপরও এর গড় আয়ু হতে পারে কয়েক দশক। মাইক্রোপ্লাস্টিক মাটির গুণাগুণকে নষ্ট করে এমনকি মাটিতে বসবাসকৃত জীবাণু এবং ক্ষুদ্র জীবের ক্ষতি করে। অথচ এসব জীবণু ও ক্ষুদ্র জীবের কারণেই মাটির উর্বরতা বাড়ে। 

জাপানে কাগজের পাত্রে বীজ রোপণ করা হয়প্লাস্টিক মাটিতে দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব ফেলছে। সেইসঙ্গে মানবদেহেও খাদ্য শৃঙ্খলের মাধ্যমে প্রভাব বিস্তার করছে। এতে করে ক্যান্সার, স্নায়ুবিক সমস্যা, জন্মগত ত্রুটি এবং শিশু বিকাশজনিত ব্যাধি, প্রজনন ক্ষতি, হাঁপানি ইত্যাদি হতে পারে। মাইক্রোপ্লাস্টিক মানবদেহে কীভাবে প্রবেশ করছে গবেষকরা এই বিষয়টি নিয়ে এখনো গবেষণা করছেন।

ফ্লুরি বিশ্বাস করেন, বায়োডেগ্র্যাডেবল প্লাস্টিক যদি এসবের বিকল্প হতে পারে তবে পরিবেশ বাঁচবে। বায়োডেগ্র্যাডেবল প্লাস্টিক হলো, যা জীবিত প্রাণীর ক্রিয়াকলাপ দ্বারা সাধারণত জীবাণুগুলো জলে, কার্বন ডাই অক্সাইড এবং জৈব জন্তুতে ক্ষয় হতে পারে। অর্থাৎ এটি একসময় ক্ষয় হয়ে মাটিতে মিশে যেতে সক্ষম। বায়োডেগ্রেডেবল প্লাস্টিকগুলো সাধারণত নবায়নযোগ্য কাঁচামাল, মাইক্রো-অর্গানিজম, পেট্রোকেমিক্যালস এই তিনটির সংমিশ্রণে উৎপাদিত হয়।

কাগজের পাত্রগুলো দেখতে ঠিক এমনএরইমধ্যে এই প্লাস্টিকের মাধ্যমে কিছু কৃষকদের উৎপাদন করতে আশ্বস্ত করেছেন ইউরোপের বিজ্ঞানী। তারা এই বিষয়ে বিস্তর গবেষণা করছেন। তবে বায়োডেগ্র্যাডেবল প্লাস্টিকের মূল্য এখনো কৃষকদের হাতের মুঠোয় আসে নি। গবেষক ফ্লুরির মতে, এই মুহুর্তে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে সাধারণ প্লাস্টিকের পলিথিনের চেয়ে বায়োডেগ্রেডেবল প্লাস্টিকের পলিথিনের দাম প্রায় তিনগুণ বেশি।

জাপানের চাষাবাদ অনুকরণীয়

বেশিরভাগ ফসলই ক্ষুদ্র প্লাস্টিকের ট্রে বা পাত্রে তার জীবন শুরু করে। তবে কয়েক দশক ধরে জাপানের কৃষকরা বীজ বপণ করতে কাগজ থেকে তৈরি ছোট পাত্র ব্যবহার করে আসছেন। জমিতে রোপণ করার জন্য প্রতিটি বীজকে ওই কাগজের পাত্রে রাখা হয়। অতঃপর একটি মেশিনের সাহায্যে জমিতে কাগজের পাত্রসহ বীজ বপণ করা হয়।

এই মেশিনের সাহায্যে বীজ রোপণ করা হয়মাত্র কয়েক ঘণ্টা পরিশ্রমের মাধ্যমেই এই কাজটি করে থাকেন তারা। এই অনুশীলনটি কেবল সময় সাশ্রয়ীই নয় বরং পরিবেশ বান্ধবও বটে। কারণ এসব কাগজ বায়োডেগ্রেডেবল। উদাহরণস্বরূপ, আমেরিকার উইসকনসিনে স্মল ফার্ম ওয়ার্কস নামে একটি সংস্থা এভাবেই ফসল উৎপাদন করে। 

যতদিন না প্লাস্টিক রিসাইক্লিং সহজলভ্য হচ্ছে ততদিন এর বিকল্প হিসেবে বায়োডেগ্রেডেবল প্লাস্টিকের ব্যবহার প্রয়োজন বলে জানান বিজ্ঞানীরা।  প্লাস্টিক পোড়ানোর ফলে বাতাসের মধ্যে ডাইঅক্সিন নামক ক্ষতিকারক উপাদান মিশে যায়। তবুও এই চর্চা এখন বিশ্বজুড়ে। কারণ প্লাস্টিক রিসাইক্লিং কৃষকদের জন্য অতোটা সহজ নয়। 

খাবারও মোড়ানো হচ্ছে প্লাস্টিকের পলিথিন দিয়েযুক্তরাজ্যের ফার্ম প্লাস্টিক সংগ্রহকারীদের একটি দল কৃষি প্লাস্টিকের জন্য একটি নতুন পুনর্ব্যবহার সংগ্রহের স্কিম গঠনের জন্য একত্রিত হয়েছেন। যার নাম ইউকে ফার্ম প্লাস্টিকের দায়বদ্ধতা প্রকল্প (ইউকেএফপিআরএস)।এটি ২০২০ সালের জানুয়ারিতে চালু হয়েছে। ইউকেএফপিআরএস সংস্থার এক সদস্য বলেন, এই স্কিমটি অলাভজনক হিসেবেই পরিচালিত হবে। কৃষকরা তাদের কৃষি-প্লাস্টিকগুলো রিসাইকেল করার জন্য বিনামূল্যে দিতে পারবেন।

এই প্রকল্পটি প্লাস্টিক বর্জ্য দূষণ কমাতে কৃষকদেরকে অবগত করছে। তবুও ফ্লুরি বলছেন, বিশ্বব্যাপী বৃহত্তম প্লাস্টিক সমস্যা সমাধানের একমাত্র উপায় রিসাইক্লিং নয়। বায়োডেগ্র্যাডেবল প্লাস্টিকের ব্যবহার বাড়ালেই সমস্যার সমাধান হবে। তার মতে, নন-বায়োডেগ্রেডেবল প্লাস্টিকের দাম বাড়িয়ে অন্যদিকে বায়োডেগ্রেডেবল প্লাস্টিকের দাম কমানোর মাধ্যমে এর ব্যবহার বাড়ানো সম্ভব। বায়োডেগ্রেডেবল পলিথিন ব্যবহার বাড়াতে হবেবাংলাদেশেও বায়োডেগ্রেডেবল প্লাস্টিক উৎপাদিত হচ্ছে 

এক্সপো অ্যাকসেসরিজ লিমিটেড নামক একটি সংস্থা এরই মধ্যে পলিথিন ব্যাগের বিকল্প তৈরি করেছে। কর্ন বা ম্যাজে (ভুট্টা) থেকে বায়োডেগ্রেডেবল প্যাকেজিং উত্পাদন করছে তারা। যা পরিবেশের উপর থেকে পলিথিনের ধ্বংসাত্মক প্রভাব রোধ করবে। এই কোম্পানি প্রাথমিকভাবে বাংলাদেশের পোশাক শিল্পকে টার্গেট করেছে।

চলতি বছরেই তারা ৩০ টি কারখানায় ব্যাগ সরবরাহ করেছে। কারখানাটি গাজীপুরের কামারপাড়ায় অবস্থিত। পরিবেশ বাঁচাও আন্দোলনের (পোবা) দেয়া তথ্যানুসারে, প্রতিদিন ঢাকা শহরে প্রায় দুই কোটি পলিথিনে ব্যাগ ব্যবহৃত হয়। পলিথিনের বিকল্প হিসেবে পাটের ব্যাগ মতো বায়োডেগ্রেডেবল ব্যাগ ব্যবহারকে উত্সাহিত করার জন্য সরকারের বিভিন্ন প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে।

পরিবেশ বাঁচাবে এই পলিথিনতবে এখনো পলিথিনের ব্যবহার সর্বত্র। কারণ এটি পাতলা ও দামে স্বস্তা। বেশিরভাগ গ্রাহকরাই পলিথিন ব্যাগগুলো একবার ব্যবহারের পরে ফেলে দেন। এরপরই দূষিত হতে থাকে পরিবেশ। ২০০২ সালে বাংলাদেশে পলিথিন ব্যাগ নিষিদ্ধ করা হয়েছিল। বিশেষজ্ঞদের মতে, নন-বায়োডেগ্রেডেবল ব্যাগগুলো মাটিতে মিশে যেতে কয়েকশ বছর সময় নেয়।

প্লাস্টিক বর্জ্য জনস্বাস্থ্যের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ। কারণ এটি খাদ্য শৃঙ্খলে প্রবেশ করে। ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের ২০১৮ সালের প্রতিবেদনে ভবিষ্যদ্বাণী করা হয়েছে, ২০৫০ সালের মধ্যে বিশ্বের মহাসাগরগুলোতে মাছের তুলনায় বেশি প্লাস্টিক ভেসে থাকবে।

সূত্র: বিবিসি

ডেইলি বাংলাদেশ/জেএমএস