Alexa কৃষকের ছেলে বিশ্বের নাম করা বিজ্ঞানী

ঢাকা, মঙ্গলবার   ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০২০,   ফাল্গুন ১২ ১৪২৬,   ০১ রজব ১৪৪১

Akash

কৃষকের ছেলে বিশ্বের নাম করা বিজ্ঞানী

জাহাঙ্গীর হোসেন, সুনামগঞ্জ ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ১০:৪২ ১৪ ফেব্রুয়ারি ২০২০  

ছবি: ডেইলি বাংলাদেশ

ছবি: ডেইলি বাংলাদেশ

বাবা ছিলেন কৃষক। সংসারে টানাপোড়েন ছিল নিত্যসঙ্গী। কিন্তু অভাবের কাছে মাথা নোয়াননি তিনি। স্বপ্ন পূরণে শত কষ্টের মাঝেও পড়াশোনা চালিয়ে গেছেন। থাকতে হয়েছে লজিং মাস্টার হিসেবে। তিনি এখন বিশ্বের নাম করা বিজ্ঞানী। এমন একটি প্রযুক্তি আবিষ্কার করেছেন যা মাত্র পাঁচশ টাকায় ৯০ মিনিটে মরণব্যাধি ক্যান্সার যাচাই করা যায়।

বলছিলাম ড. মুহম্মদ জহিরুল আলম সিদ্দিকীর কথা। তিনি সুনামগঞ্জের ধর্মপাশা উপজেলার জয়শ্রী গ্রামের আব্দুল হাকিম তালুকদারের ছেলে। জহিরুল ২০১২ সালে অস্ট্রেলিয়ার ফেডারেল সরকারের তিন লাখ ৭৫ হাজার ডলারের অনুদান পেয়েই প্রাথমিক পর্যায়ে ক্যান্সার শনাক্তকরণের একটি সহজলভ্য পদ্ধতি আবিষ্কারে কাজ শুরু করেন।

বিশ্বের নাম করা এ বিজ্ঞানী যখন প্রাথমিক শেষ করে মাধ্যমিকে ওঠেন তখন পড়াশোনা বন্ধের উপক্রম হয়। সাত মাস কেটে যাওয়ার পরও ষষ্ঠ শ্রেণিতে ভর্তি হতে পারেননি তিনি। সেই সময় পরিবারে বড় ধরনের একটি সমস্যা হয়েছিল। জহিরুল তখনই ভেবে নিয়েছিলেন হয়তো আর পড়ালেখা করতে পারবেন না। কিন্তু মা মজলিসুন নেছা তালুকদার ও এক চাচাতো ভাই তাকে গ্রাম থেকে তিন কিলোমিটার দূরে বাদশাগঞ্জ উচ্চ বিদ্যালয়ে ভর্তি করান।

মা ও বড় বোনের সঙ্গে জহিরুল

বাদশাগঞ্জ উচ্চ বিদ্যালয়ে নিজগাবী নামে একটি গ্রামে আত্মীয়ের বাড়ি থেকে দুই বছর পড়াশোনা করেন তিনি। অষ্টম শ্রেণিতে ওঠার পর আরো একটি সমস্যা দাঁড়ায়। এতে এক বছর বন্ধ রাখতে হয়েছে পড়াশোনা। পরে বড় ভাই আজহারুল ইসলাম সিদ্দিকি তার পড়াশোনার দায়িত্ব নিলেন। সিলেট গিয়ে দুই-একজন ছাত্রকে পড়ানোর বিনিময়ে থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা হয় তার। ভর্তি হন মোগলবাজার রেবতি রমন হাইস্কুলে। সেখান থেকেই ১৯৯৩ সালে এসএসসি পরীক্ষায় সর্বোচ্চ নম্বর পেয়ে উত্তীর্ণ হন।

এরপর ভর্তি হন সিলেটের এমসি কলেজে। সেখান থেকে এইচএসসি পাসের পর পড়াশোনা করেন শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগে। সেখান থেকে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর শেষ করার পর দক্ষিণ কোরিয়ার পুসান জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে পিএইচডি’র জন্য পাড়ি জমান। তার পিএইচডি গবেষণাপত্র পৃথিবীর নাম করা সব জার্নালে প্রকাশিত হয়েছে। পিএইচডি শেষে পোস্ট ডক্টরাল গবেষক হিসেবে কাজ করেন অস্ট্রেলিয়ার মোনাশ বিশ্ববিদ্যালয়ে। এরপর ইউনিভার্সিটি অব কুইন্সল্যান্ডে রিসার্চ ফেলো হিসেবে ছয় বছর কাজের পর ২০১৫ সাল থেকে গ্রিফিথ বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষক হিসেবে যোগদান করেন। পাশাপাশি তিনি গ্রিফিথ বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনিয়র লেকচারার।

বিজ্ঞানী ড. জহিরুল আলম বলেন, ক্যান্সার আক্রান্ত হয়ে অনেক আত্মীয়কে মারা যেতে দেখেছি। এ রোগে আক্রান্ত হলে চিকিৎসা ব্যয় বহন করা সবার পক্ষে সম্ভব না। তাই ২০১২ সাল থেকে এ বিষয় নিয়ে কাজ শুরু করি ও সাফল্যও পেয়েছি। এখন একটি যন্ত্র আবিষ্কার করেছি যা দিয়ে মাত্র ৯০ মিনিটে ক্যান্সার শনাক্ত করা যায়।

স্ত্রী ও ছেলে-মেয়ের সঙ্গে ড. জহিরুল

তিনি বলেন, ক্যান্সার দ্রুত শনাক্ত হলে চিকিৎসাও দ্রুত সম্ভব হবে। যদি কোনো রানিং ক্যান্সার রোগীকে এটা দিয়ে পরীক্ষা করা হয় ও সেল শনাক্ত হয় তাহলে বিভিন্ন থেরাপি কীভাবে যাবে, কখন যাবে এবং সেটি ঠিকমতো কাজ করছে কিনা সেটি সম্পর্কে জানা যাবে।

তিনি আরো বলেন, ক্যান্সার শনাক্তের পুরনো পদ্ধতিতে খরচ পড়বে ৪০ হাজার থেকে এক লাখ টাকা। সেখানে ৫০০ টাকার একটি সামান্য প্রযুক্তি ব্যবহার করে রোগী নিজেই ঘরে বসে ক্যান্সার শনাক্ত করতে পারবে। এছাড়া এটি দিয়ে গ্লুকোজের পরিমাপ, রক্তের বিভিন্ন উপাদান নির্ণয়েও বিভিন্ন প্রযুক্তিপণ্য ব্যবহার করা হয়। এতে রোগী নিজ থেকে তার রোগ সম্পর্কে সচেতন হবে।

প্রযুক্তির কাজের বিষয়ে তিনি বলেন, যন্ত্রটিতে আমরা বেশ কিছু মেটালিক-ম্যাগনেটিক ন্যানো পার্টিকেল ব্যবহার করেছি। সেগুলোর সঙ্গে ক্যান্সার শনাক্ত করতে সক্ষম বায়োমার্কার সংযুক্ত করা হয়েছে। বায়োমার্কারের উপাদানগুলো নির্ধারিত জৈব উপাদানের সঙ্গে সংযুক্ত হতে পারে। এ উপাদানকে রক্ত, লালা কিংবা মূত্রের সঙ্গে মেশানো হলে রোগীর শরীরে যদি ক্যান্সারের কোষ থাকে তাহলে সেগুলো বায়োমার্কারের উপাদানের সঙ্গে যুক্ত হয়ে যায়। এরপর ম্যাগনেটিক প্রভাব ব্যবহার করে রক্তের বাকি উপাদানগুলো থেকে এ পার্টিকেলগুলো আলাদা করে ফেলা হয়। এতে কিছু অতিরিক্ত নির্দেশক ফ্লুইড ব্যবহার করলেই উপাদানের রঙ বদলে যাবে। এটা থেকে অনায়াসেই ক্যান্সারের কোষ ওই রক্তে আছে কিনা বোঝা যাবে। এছাড়া রঙের মাত্রার ওপর নির্ভর করে ক্যান্সারের ধাপ সম্পর্কেও ধারণা পাওয়া সম্ভব।

বিশ্বের নাম করা এ বিজ্ঞানী বলেন, আমাদের দেশে এখন অনেক ভালো সুযোগ রয়েছে। তার জন্য আমাদের প্রচুর পড়াশোনা করতে হবে। অনেক শিক্ষার্থীই বিদেশে আসতে চান কিন্তু যোগ্যতা অনুযায়ী তাদের মূল্যায়ন করা হয় না। আমাদের যে যে বিষয়ে কাজ করার সুযোগ রয়েছে সেগুলো কাজে লাগাতে হবে। সবকিছুর মূল হচ্ছে কঠোর পরিশ্রম ও ডিটারমাইন্ড। দেশকে ভালোবাসতে হবে। আমি বিদেশে থাকলেও নিজের দেশকে নিয়ে ভাবি।

জহিরুল বলেন, সুনামগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় অনুমোদন হাওরের মানুষের ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য খুব ভালো খবর। যদি এটি হয় তাহলে আমাদের হাওরের ছেলে-মেয়েরা বেশি উপকার পাবে।

ডেইলি বাংলাদেশ/এমআর