কৃষকের আগ্রহ ড্রাম সিডারে

ঢাকা, বৃহস্পতিবার   ২৭ জুন ২০১৯,   আষাঢ় ১৩ ১৪২৬,   ২২ শাওয়াল ১৪৪০

কৃষকের আগ্রহ ড্রাম সিডারে

নকলা (শেরপুর) প্রতিনিধি

 প্রকাশিত: ১১:৩১ ৯ জানুয়ারি ২০১৯   আপডেট: ১১:৩১ ৯ জানুয়ারি ২০১৯

ছবি: ডেইলি বাংলাদেশ

ছবি: ডেইলি বাংলাদেশ

দুইপাশে প্লাস্টিকের দুটি চাকার ভেতর একটি লোহার দণ্ডের মধ্যে সারিবদ্ধভাবে নির্দিষ্ট দূরত্বে ছোট আকৃতির ছয়টি প্লাস্টিকের ড্রাম। প্রতিটি ড্রামে থাকে নির্দিষ্ট মাপের নির্দিষ্ট সংখ্যক ছিদ্র। প্লাস্টিকের চাকার সঙ্গে লাগানো থাকে একটি হাতল, যেটি ধরে একজন কৃষক সহজেই যন্ত্রটি টানতে পারেন। ৩/৪ হাজার টাকা হলেই এই যন্ত্রটি স্থানীয় প্রযুক্তি ব্যবহারে বানানো যায়। এটিই হল ড্রাম সিডার পদ্ধতি।

বীজতলার পরিবর্তে ড্রাম সিডারের মাধ্যমে সরাসরি ক্ষেতে ধান বপনে লাভবান হয়ে শেরপুরের নকলার অনেক কৃষক ব্যাপক সাড়া ফেলেছেন। এ পদ্ধতিতে বীজতলা তৈরি করতে হয় না তাই সময়, শ্রম, ব্যয় সব কম লাগে। সনাতন পদ্ধতির চেয়ে বেশি ফসল পাওয়ায় নকলার কৃষকদের মধ্যে ড্রাম সিডার পদ্ধতিতে ধান চাষে আগ্রহ বাড়ছে।

কৃষকরা বলেন, ড্রাম সিডারের মাধ্যমে একজন কৃষক দিনে দুই একর জমিতে ধান চাষ করতে পারেন। কিন্তু সনাতন পদ্ধতিতে এই ধানের চারা রোপণ করতে অন্তত ২০ জন শ্রমিকের প্রয়োজন। ড্রাম সিডারে ধান চাষ করায় উৎপাদন খরচ ২০ থেকে ২৫ শতাংশ কম লাগছে।  

তাই ধান চাষে ড্রাম সিডার ব্যবহার লাভজনক দেখে দিনে কৃষকেরা এর প্রতি ঝুঁকছেন। যেকোনো ধান চাষে জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে এ ড্রাম সিডারের ব্যবহার।
উপজেলার টালকী ইউপির রুনিগাঁও গ্রামের কৃষক শাহাব উদ্দিন, পৌরসভার চরকৈয়ার কিষানি ইয়াছমিন ও কৃষক ফরিদুল, কুর্শাবাদাগৈড়ের কৃষক লিয়াকত আলী, ভূরদীর কৃষক ছাইদুল ও কামাল, পোলাদেশীর আবদুুল হালিম, মোজার বাজার এলাকার কিতাব আলীসহ অনেকেই বলেন, আগের মতো বীজতলায় চারা উৎপাদন করে, পরে ধান ক্ষেতে রোপণের চেয়ে ড্রাম সিডারের মাধ্যমে সরাসরি ধান ক্ষেতে বীজ বপন করায় শ্রমিক, সময় ও উৎপাদন ব্যয় বহুলাংশে কম লাগে, পক্ষান্তরে ফলন ভালো পাওয়া যায়।

কৃষক শাহাব উদ্দিন বলেন, এ প্রযুক্তিতে ধান ক্ষেতের যত্ন করা সহজ হয়, ফলে আগের চেয়ে ফলন ভালো পাওয়া যায়। খরচও কয়েক গুণ কম লাগে। তবে কয়েকবার সেচ দিতে হয়। 

তাছাড়া জমি ও পরিবেশ ভেদে আউশ, আমন ও বোরো তিন মৌসুমেই এ প্রযুক্তিতে ধান চাষ করা যায়। তবে আউশ ও বোরো ধান চাষে এটি বেশি উপযোগী। সনাতন পদ্ধতিতে ধান রোপণের জন্য জমি যেভাবে তৈরি করতে হয়, সেভাবেই জমি তৈরি করে ড্রাম সিডার দিয়ে ধান বপণ করতে হয়। তবে জমিতে যেন পানি না জমে থাকে, সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে।

উপ-সহকারী উদ্ভিদ সংরক্ষণ কর্মকর্তা আতিকুর রহমান বলেন, সনাতনী পদ্ধতিতে ধান রোপণের জন্য জমি যেভাবে কাদা করতে হয় সেভাবেই জমি উত্তমরূপে চাষ ও মই দিয়ে কাদাময় করে নিয়ে তারপর ড্রাম সিডারের মাধ্যমে ধান রোপণ করতে হবে। বোরো মৌসুমে ডিসেম্বর থেকে জানুয়ারীর প্রথমার্ধে এবং আমন মৌসুমে পানি নিষ্কাশনের সুব্যবস্থা আছে এমন উঁচু ও মাঝারি উঁচু জমিতে জুনের শেষার্ধ থেকে জুলাইয়ের প্রথমার্ধে ধান বপন করা উত্তম। তবে জমির কোনো স্থানে যেন পানি জমে না থাকে, তা নিশ্চিত করতে হবে।
কৃষি স¤প্রসারণ কর্মকর্তা কৃষিবিদ আবদুল ওয়াদুদ বলেন, তারা গ্রামে গ্রামে ঘুরে ড্রাম সিডারের মাধ্যমে ধান চাষে কৃষককে পরামর্শ দিয়েছেন। ড্রাম সিডারে সারি ধরে গাছ হওয়ায় আগাছা দমন সহজ হয়। আগাছানাশক ব্যবহার করলে ৪/৫ দিন ক্ষেতে ছিপছিপে পানি থাকতে হবে। এলসিসি ভিত্তিক ইউরিয়া প্রয়োগ করতে পারলে এই পদ্ধতিতে ধান চাষে সুফল বেশি পাওয়া যায়। 

ধানগাছ একটু বড় হলে রোপা পদ্ধতির মতোই পানি সেচ দিতে হয়। সঠিক পরিচর্যায় ড্রাম সিডারে বোনা ধানের ফলন রোপা ধানের তুলনায় শতকরা ১০ থেকে ২০ শতাংশ বেশি হতে পারে। এ পদ্ধতিতে চাষ করলে রোপা পদ্ধতির চেয়ে ১২ থেকে ১৫ দিন আগে ধান ঘরে তুলা যায়।

উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ পরেশ চন্দ্র দাস বলেন, যন্ত্রটি হালকা হওয়ায় সহজে বহন করা যায়। ফলে সবাই এটি ব্যবহারে আগ্রহী হচ্ছেন। 

চলতি বোরো মৌসুমে নকলা উপজেলায় ১৩ হাজার ২৪৭ হেক্টর জমিতে বোরো আবাদের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারিত হয়েছে। এতে হাইব্রিড জাতের সাত হাজার ১১ হেক্টর, উফসী জাত ছয় হাজার ২০৬ হেক্টর এবং স্থানীয় জাতের জন্য ৩০ হেক্টর জমি। এই জমিতে উৎপাদিত ধান হতে চাল পাওয়ার লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৫৭ হাজার ৬৮৭ মেট্রিকটন। 

এর মধ্যে হাইব্রিড জাতের চাল ৩৩ হাজার ৩০২ মেট্রিকটন, উফসী ২৪ হাজার ৩২৭ মেট্রিকটন এবং স্থানীয় জাতের ধান হতে চাল পাওয়ার আশা করা হচ্ছে ৫৮ মেট্রিকটন। 

চলতি মৌসুমে উপজেলায় কমপক্ষে ১২ একর জমিতে ড্রাম সিডারের মাধ্যমে ধান চাষ করা হয়েছে। বাকি আবাদের জন্য ৮০৬ হেক্টর জমিতে বীজতলা করা হয়েছে। ড্রাম সিডারের মাধ্যমে ধান চাষের উৎপাদন ব্যয় কম কিন্তু ফলন বেশি পাওয়ায় কৃষক লাভবান হচ্ছেন। 

ডেইলি বাংলাদেশ/জেএস