Alexa কৃপণতার হাকিকত (শেষ পর্ব)

ঢাকা, মঙ্গলবার   ১৫ অক্টোবর ২০১৯,   আশ্বিন ৩০ ১৪২৬,   ১৫ সফর ১৪৪১

Akash

কৃপণতার হাকিকত (শেষ পর্ব)

নুসরাত জাহান ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ২০:০২ ১১ মার্চ ২০১৯   আপডেট: ২০:০৩ ১১ মার্চ ২০১৯

ফাইল ছবি

ফাইল ছবি

সম্পদের কোন ভালোবাসা গুনাহ? 

আগের আলোচনায় জানা যায় যে, অন্তরে মালের সহজাত মুহাব্বত থাকা গুনাহও নয় এবং ক্ষতিকারকও নয়। তবে যদি মালের মুহাব্বত এ পরিমাণ বৃদ্ধি পায় যে, তা মানুষকে সঠিক জায়গায় ব্যয় করতে বাধা দেয়, তবে তা কৃপণতা, যেটা হারাম এবং আধ্যাত্মিক রোগ। 

এখন লক্ষ্য করুন যে, এ মালফুজে হজরত থানবি (রহ.) ওই ব্যক্তিকে সান্তনা দিয়েছেন যে, ‘যদি ওয়াজিব হক ছুটে না যায় তা হলে কোনো দুশ্চিন্তা নেই।’ তবে এ কথা খুব ভালো করে বুঝুন যে, সব মানুষের জন্য এক ব্যবস্থা হয় না। ডাক্তার প্রত্যেক রোগীর অবস্থা অনুপাতে ব্যবস্থাপত্র দিয়ে থাকে। সুতরাং হজরত থানবি (রহ.) এ ব্যক্তির মধ্যে লক্ষ্য করেছেন যে, সে ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থার মধ্যে রয়েছে। ভারসাম্যের সীমা অতিক্রম করেনি। এ জন্য তিনি তাকে সান্তনা দিয়েছেন এবং কোনো বিপদের ব্যাপারে সতর্ক করেননি।

এটি বিপদের ঘণ্টা: 
ইমাম গাজালি (রহ.) বলেন যে, সম্পদের ভালোবাসা এবং সম্পদ ব্যয় করতে অন্তরে কষ্ট লাগা দোষনীয় বা গুনাহ নয়। তবে এমতাবস্থায় এ আশঙ্কা রয়েছে যে, এক সময় এ অবস্থা বৃদ্ধি পেয়ে কৃপণতার সীমায় পৌঁছে যাবে এবং যেকোনো সময় ওয়াজিব হক আদায় করার পথও বন্ধ করে দেবে। তাই মাল খরচ করতে অন্তর ব্যথিত হওয়া বিপদের ঘণ্টা। এ বিপদের ঘণ্টার চিকিৎসা এই যে, মালের এ মুহাব্বতকে কিছুটা কমাতে হবে। যাতে এ মুহাব্বত সীমান্ত থেকে এতটুকু দূরে থাকে যে, সীমান্ত অতিক্রম করার আর আশঙ্কা না থাকে। তাই ইমাম গাজালি (রহ.) বলেন যে, এ মুহাব্বতকে এ পরিমাণ কমাও যে, হয় এ ব্যথা সম্পূর্ণ খতম হয়ে যায়, কিংবা না থাকার পর্যায়ে চলে যায়। চর্চা করতে থাকলে এ অবস্থা আর্জন হবে।

ইমাম যুহরি রহ.এর চোখে দিরহাম: 
ইমাম যুহরি (রহ.) উঁচু মাপের একজন মুহাদ্দিস। ইমাম মুয়াম্মার বিন রাশেদ (রহ.) তার শাগরেদদের অন্যতম। তার এ শাগরেদ তার সম্পর্কে বলেন যে,

ما رأيت أحدا الدنيا أهون عنده مما كانت عند الزهري، كانت الدراهم عنده بمنزلة البعر

‘আমি আজ পর্যন্ত এমন কোনো মানুষ দেখিনি, যার অন্তরে দুনিয়া এত অধিক মূল্যহীন, যত অধিক মূল্যহীন ইমাম যুহরি (রহ.) এর অন্তরে ছিল। তার কাছে দিরহাম ছিল পশুর বিষ্ঠার মত।’

বিষ্ঠার যেমন, কোনো মূল্য নেই, এমনিভাবে তার নিকট দিরহামেরও কোনো মূল্য ছিল না। দিরহামের প্রতি তার কোনো ভ্রুক্ষেপ ছিল না। কোনো মুহাব্বতই ছিল না।

মিঁয়াজি নুর মুহাম্মদ (রহ.) এবং দুনিয়া: 
হজরত মিয়াঁজি নুর মুহাম্মদ (রহ.) এর জীবনীতে আছে যে, তিনি যখন বাজারে গিয়ে কোনো জিনিস ক্রয় করতেন, তখন পয়সার থলে দোকানদারকে দিয়ে দিতেন এবং বলতেন যে, তুমি এ জিনিসের দাম এ থলে থেকে নিয়ে নাও। নিজে গুণে দিতেন না। তিনি চিন্তা করতেন যে, যতটুকু সময় থলে থেকে পয়সা বের করে তা গোণার পেছনে ব্যয় হবে, ততটুকু সময় আল্লাহ তায়ালার জিকিরে কেন ব্যয় করব না? একবার এক চোর দেখে যে, তার কাছে পয়সার একটি থলে রয়েছে। তিনি থলেটি কাঁধে ঝুলিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন। চোর পিছন দিক থেকে এসে থলেটি নিয়ে পালিয়ে যায়। তিনি কোনো প্রকার বাধা না দিয়ে থলে ছেড়ে দেন এবং পিছন দিকে ফিরেও তাকান না যে, কে ছিনিয়ে নিয়ে গেল। 

এবার চোর থলে নিয়ে ওই এলাকা থেকে বের হতে চাচ্ছে, কিন্তু রাস্তাই পাচ্ছে না। বেচারা গোলক ধাঁধায় পড়ে যায়। সে অস্থির হয়ে একবার এ গলিতে প্রবেশ করে আবার আরেক গলিতে প্রবেশ করে। কিন্তু কোনোভাবেই বের হওয়ার রাস্তা পায় না। অবশেষে তার ধারণা হয় যে, এ সব কিছু আল্লাহ তায়ালার ওই ওলির সঙ্গে অন্যায় আচরণের বিপদ। তখন ওই চোর মিয়াঁজির বাড়িতে গিয়ে দরজায় কড়াঘাত করে। তিনি ভেতর থেকে জিজ্ঞাসা করেন, কে? চোর বলল যে, আপনার থলে নিয়ে নিন। মিয়াঁজি বলেন যে, আমি এ থলি নেব না। কারণ যখন তুমি ছিনিয়ে নিয়েছিলে তখনই আমি ওটা তোমাকে দান করে দিয়েছি। তাই আমি আর এ থলের মালিক নই। চোর বলে যে, আল্লাহ তায়ালার ওয়াস্তে নিয়ে নিন। কিন্তু তিনি বলেন যে, না আমি নেব না। অবশেষে চোর বলে যে, হজরত, আমি বের হওয়ার রাস্তা পাচ্ছি না। আপনি দোয়া করুন যাতে রাস্তা পেয়ে যাই। তখন তিনি বলেন যে, ঠিক আছে, চলে যাও, আমি তোমার জন্য দোয়া করছি। তখন চোর থলে নিয়ে চলে যায়।

মালের মুহাব্বত থেকে একটু সরে থাকতো: 
মোটকথা আল্লাহ তায়ালার এমন বান্দাও রয়েছেন, যাদের অন্তর থেকে মালের মুহাব্বত একদম খতম হয়ে গেছে। আমাদেরও হয় এমন অবস্থা সৃষ্টি হতে হবে, আর না হয় মালের মুহাব্বত কমপক্ষে এতটুকু পরিমাণ কম হতে হবে যে, বিপদজনক সীমানা থেকে দূরে থাকবে। এ কারণে ইমাম গাজালি (রহ.) বলেন, মালের মুহাব্বত থেকে একটু সরে থাক। এ ব্যাপারে ইমাম গাজালি (রহ.) দুটো কথা বলেছেন।

এ অবস্থাকে খারাপ মনে করো এবং দোয়া করতে থাক: 
১. প্রথম এই যে, যখন তুমি অনুভব করবে যে, পয়সা হাতছাড়া হওয়ার কারণে অন্তর ব্যথিত এবং সংকুচিত হচ্ছে তখন একটি কাজ এই করো যে, অন্তরের এ অবস্থাকে খারাপ মনে করো। মনে করো যে, এটি কোনো ভালো অবস্থা নয়।

২. দ্বিতীয় কাজ এই করো যে, আল্লাহ তায়ালার নিকট দোয়া করতে থাক যে, হে আল্লাহ, মালের মহব্বতের এ সাপ যেন আমাকে দংশন না করে এবং এটি আমার জন্য কোনো এক সময় বিপদের কারণ না হয়ে যায়। তাই হে আল্লাহ, আমার মালের এ মুহাব্বতকে সীমালংঘন করা থেকে প্রতিহত করুন এবং একে সীমার মধ্যে রাখুন। যদি এভাবে দোয়া করতে থাক তা হলে ইনশাআলাহ এ মুহাব্বত ক্ষতিকর হবে না।

তিনি তাকে সান্তনা দিলেন: 
তবে হজরত থানবি (রহ.) এ মালফুজে ওই ব্যক্তিকে সান্তনা দিয়েছেন যে, এ দুঃখ ও বেদনা মন্দ বা নাজায়েজ নয়। তিনি ওই ব্যক্তিকে এ বেদনার জন্য সতর্ক করা জরুরত মনে করেননি। এর কারণ হলো, ওই ব্যক্তির বৈশিষ্ট। তিনি জানতেন যে, এ ব্যক্তি মালের মহব্বতে সম্মুখে অগ্রসর হবে না। ব্যক্তি হলে তিনি তাকে সান্তনা দিতেন না। বরং তাকে সতর্ক করে বলতেন যে, এ বেদনা তো মারাত্মক বিপজ্জনক বিষয়। এর সংশোধনের ফিকির করো। শায়েখের আসল কাজই হলো, তিনি দেখবেন যে, কাকে কোনো সময় কী ব্যবস্থাপত্র দেয়া যায়।

এটি ভারসাম্যপূর্ণ মুহাব্বত:  
অপর একব্যক্তি হজরত থানবি (রহ.)-কে চিঠি লিখেন যে, ‘সম্পদ ব্যয় করতে এক প্রকারের চাপ অনুভূব হয়। নিঃস্ব ও ঋণগ্রস্ত হওয়াকে ভয় পাই। যদিও ওয়াজিব হকসমূহ আদায় করতে ত্রুটি করি না।’

উত্তরে হজরত থানবি (রহ.) বলেন যে, ‘এটি মালের নিষিদ্ধ মুহাব্বত নয়, এটি ভারসাম্যপূর্ণ মুহাব্বত।’ (আনফাসে ইসা ১৯০)

একব্যক্তি লেখে যে, যখন আমি পয়সা খরচ করি, তখন অন্তরে চাপ অনুভব করি এবং পয়সা খরচ করতে ভয় পাই যে, একদম নিঃস্ব হয়ে না যাই, তখন আবার ঋণ নিতে হবে। অবশ্য ওয়াজিব হকসমূহ আদায় করতে কোনোরুপ ত্রুটি করি না। উত্তরে হজরত বলেন যে, এটি মালের নিষিদ্ধ মুহাব্বত নয়, বরং ভারসাম্যপূর্ণ মুহাব্বত। কারণ যখন ওয়াজিব হকসমূহে ত্রুটি হচ্ছে না, তখন উদ্দিষ্ট বস্তু তার হাসিল রয়েছে। সম্পদের যে ভালোবাসা নিন্দনীয়, আধ্যাত্মিক রোগ এবং গুনাহ তা তার মধ্যে নেই। তাই এটি দোষণীয় নয়। তবে এরপরও মানুষের সতর্ক থাকার প্রয়োজন রয়েছে। এমন যেন না হয় যে, এ ভালোবাসাই ক্রমে ক্রমে মানুষকে গুনাহ লিপ্ত করার মাধ্যম হয়ে যায়। আল্লাহ তায়ালা আমাকে এবং আপনাদের সকলকে এসব কথার উপর আমল করার তাওফিক দান করুন। আল্লাহুম্মা আমিন।

আরো পড়ুন>>> কৃপণতার হাকিকত (পর্ব-১)

ডেইলি বাংলাদেশ/আরএজে