ঢাকা, শুক্রবার   ২২ ফেব্রুয়ারি ২০১৯,   ফাল্গুন ৯ ১৪২৫,   ১৬ জমাদিউস সানি ১৪৪০

কুখ্যাত সিসিল হোটেলে ঘটে যাওয়া অদ্ভুতুড়ে সব কাণ্ড

আহনাফ তাহমিদ

 প্রকাশিত: ১২:২৩ ১০ আগস্ট ২০১৮   আপডেট: ১২:২৩ ১০ আগস্ট ২০১৮

ফাইল ছবি

ফাইল ছবি

১৯২৭ সালে প্রাথমিকভাবে আর্ট ডেকো পদ্ধতিতে মোট ৭০০টি কক্ষ নিয়ে যাত্রা শুরু হয় সিসিল হোটেলের। প্রথমে এটি চালু করা হয়েছিল ব্যবসায়ীদের আকর্ষিত ও মনোরঞ্জন করবার জন্য। লস এঞ্জেলেসের ডাউনটাউনে অবস্থিত এই হোটেলটি গ্রেট ডিপ্রেশনের সময় বেশ বড়সড় ধাক্কা খায়। 

এর চারপাশের প্রায় ৪ মাইল স্থানজুড়ে গৃহহীন ও ভবঘুরে লোকজন ঘাঁটি স্থাপন করে। ব্যবসায়ীরা আর এই হোটেলের প্রতি কোনোধরনের আকর্ষণ দেখায় না। দেখাবেই বা কীভাবে? তাদের জন্য তৈরি হোটেলের চারপাশে যদি এভাবে মানুষজন ঘাঁটি স্থাপন শুরু করে, বসবাসের জন্য খুবই অসুবিধা হয়ে যায় বৈকি। 

তবে স্থানীয় লোকজনরাই এই হোটেলের নাম ক্ষুণ্ণ করেনি। আত্মহত্যা, হত্যা, সিরিয়াল কিলিং সবকিছুর জন্যই এই হোটেল কুখ্যাত হয়ে ওঠে। ২০ তলা এই দালানটি ধীরে ধীরে মানুষের কাছে একটি ভয়ের নামে পরিচিত হয়। ৯০ বছরের ইতিহাসের যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম ভয়ানক স্থানগুলোর তালিকায় নাম ঢুকে যায় সিসিল হোটেলের। 

আসুন, আজ এই হোটেল কেন এত কুখ্যাত, তার কিছু কারণ জেনে নিই। 


এলিসা ল্যামের মৃত্যু:
২০১৩ সালে ২১ বছর বয়সী কলেজছাত্রী এলিসা ল্যামের মৃতদেহ একটি পানির ট্যাঙ্কে সম্পূর্ণ নগ্নাবস্থায় পাওয়া যায়। সেদিন সকাল থেকেই কলে জল আসছিল না বলে হোটেলে থাকা ব্যক্তিরা জানায়। কী হয়েছে, তা জানতে গিয়ে হোটেলের ছাদের পানির ট্যাঙ্কে পাওয়া যায় এলিসার লাশ। 

ট্যাঙ্কের কিছুদূরেই এলিসা ল্যামের জামাকাপড় পড়ে ছিল। ডাক্তার পরীক্ষা করে জানান যে আত্মহত্যার উদ্দেশ্যেই এলিসা হোটেলের পানির ট্যাঙ্কে ঝাঁপ দিয়েছে। তবে বেশকিছু প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হয়। যদি আত্মহত্যাই উদ্দেশ্য হয়ে থাকে, তাহলে জামাকাপড় খুলে বিবস্ত্র হবার মানে কী? চারপাশে যে আলামত দেখা দিচ্ছে, তা কিন্তু অন্য কথা বলছে। 

এলিসা ল্যামের মৃত্যু স্বাভাবিক কিছু হতে পারে না। ভ্যাঙ্কুবার থেকে এলিসা ল্যাম লস এঞ্জেলেসে এসেছে, খুব বেশী দেরিও হয়নি। আত্মহত্যা করবার জন্য তাকে কেন এই হোটেলটিই বেছে নিতে হবে? তাছাড়া সাথে অনেক কিছুই নিয়ে এসেছিল সে। যদি নিজেকে শেষ করে দেয়াই তার লক্ষ্য হয়ে থাকে, তাহলে এতসব কিছু হোটেল কক্ষে জড়ো করবার মানে কী ছিল? 

সিসিটিভির ফুটেজ খেয়াল করতে শুরু করল পুলিশ। এলিসার আচরণ খুবই রহস্যময়। হোটেলের কক্ষ থেকে বের হয়ে সে এমন কিছু আচরণ করেছে, যাতে মনে হয় কেউ তার পিছু নিয়েছে। এলিভেটরের এক কোণায় লুকিয়ে সে ক্যামেরার পিছু হয়ে কারও সাথে কথা বলছিল। তবে ক্যামেরায় এলিসা ল্যাম ছাড়া আর কাউকে দেখা যাচ্ছিল না। 

এলিভেটর যখন খুলে যায়, দৌড়ে বের হয়ে আসে এলিসা। তার পিছু পিছু কেউ যাচ্ছিল সেখানে, এটা নিশ্চিত, তবে কাউকে দেখা যায়নি। পুলিশ ধাঁধায় পড়ে যায়। এটিকে তারা হত্যা বলবে নাকি আত্মহত্যা, থৈ খুঁজে পায় না কোনো। অমীমাংসিত অনেক কেসের মতোই চাপা হয়ে যায় এলিসা ল্যামের মৃত্যু রহস্য। 


এলিজাবেথ “দ্য ব্ল্যাক ডালিয়া” শর্ট: 
১৯৪৭ সালে এক মা ও তার সন্তান ২২বছর বয়সী অভিনেত্রী এলিজাবেথ শর্টের মৃতদেহ আবিষ্কার করেন। স্থানটি ছিল লস এঞ্জেলেসের লেইমার্ট পার্ক। শর্টের দেহ এমনভাবে সাজিয়ে রাখা হয়েছিল যে প্রথম দেখায় সেটিকে একটি ম্যানিকিন বলে ভুল হয়। 

কোমর থেকে তার শরীরটি সম্পূর্ণভাবে দ্বিখণ্ডিত করা হয়েছে, মুখের দুই পাশ কেটে বিস্তৃত করা হয়েছে কান পর্যন্ত। দেখে মনে হয়, খুনী যেন গ্লাসগো স্মাইলের একটি প্রতিকৃতি তৈরি করতে চেয়েছিল এলিজাবেথের মুখমণ্ডলের সাথে। শরীর থেকে পুরো রক্ত আগেই ধুয়ে ফেলা হয়েছিল এবং পা দুটি ছিল ফাঁক করা। 

হাতদুটি মাথার ওপর তোলা ছিল, যেন মৃত এই শরীরটির সাথেও একটি রক্তাক্ত মজার খেলায় মেতে উঠেছিল খুনী। এলিজাবেথ শর্ট মৃত্যুর আগে সিসিল হোটেলে উঠেছিলেন। বেচারী হলিউডে এসেছিল ছবিতে অভিনয় করে নিজের মুখটি সারা দুনিয়ার মানুষের কাছে চেনানোর জন্য। তার আগেই খুনীর ভয়াবহ জিঘাংসার শিকার হয়ে তার মৃতদেহ সারা পৃথিবীর কাছে পরিচিত হয়ে গেল। 


রিচার্ড “দ্য নাইট স্টকার” রামিরেয:
১৯৮৪ সাল থেকে ১৯৮৫ সাল পর্যন্ত লস এঞ্জেলেস এবং সান ফ্রান্সিস্কোর মানুষের মনে ভয়ের কাঁপন ধরিয়ে দিয়েছিলেন রিচার্ড রামিরেয। রাতের রাস্তায় ঘুরে ঘুরে হতভাগ্য মানুষদের ওপর কসাইয়ের মতো ঝাঁপিয়ে পড়তেন তিনি। কুপিয়ে হত্যা করতেন তাদের। 

স্যাটানিস্ট বা শয়তানের উপাসক বলে পরিচিত এই খুনীর অস্ত্র ছিল হ্যান্ডগান, ছুরি, ম্যাশেটি, লোহার তৈরি চেইন এবং হাতুরি। ‘মানুষের বোঝার বাইরে’ খুন করেন রিচার্ড রামিরেয এমন একটি কথা তার নামে চারপাশে রটে গিয়েছিল। খুন করবার সময় রিচার্ড রামিরেয সিসিল হোটেলকেই থাকবার স্থান বলে ঠিক করেছিলেন। 

তখন প্রতি রাতে এর ভাড়া ছিল মাত্র ১৪ডলার। ভবঘুরেদের জন্য এটি বেশ পরিচিত একটি স্থান হয়ে উঠেছে। নিঃসঙ্কোচে রামিরেয তাই থাকবার জন্য এই সিসিল হোটেলকেই বেছে নিয়েছিলেন। রাতের বেলায় নানা ভবঘুরেদের সাথে মিশে যেতেন তিনি, ফলে সন্দেহ করবার মতো কিছুই থাকত না। ২০১৩ সালে ৫৩ বছর বয়সে সান কুয়েন্টিন জেলে মৃত্যুবরণ করেন এই ভয়ানক খুনী। 

পিজিয়ন গোল্ডিঃ
পিজিয়ন গোল্ডির অমীমাংসিত হত্যারহস্য আজও মানুষের মনে একটি ভয়ের সঞ্চার করে। সিসিল হোটেলে অবসরপ্রাপ্ত টেলিফোন অপারেটর গোল্ডি ছিলেন একজন পরিচিত মুখ। পার্শিং স্কয়ারের পাশে আসা সব কবুতরদের খেতে দিতেন তিনি। এই কারণেই তার নামের আগে “পিজিয়ন” উপাধিটি দেয়া হয়েছিল।

১৯৬৪ সালে গোল্ডির মৃতদেহ তার কক্ষে পাওয়া যায়। উপর্যুপরি ছুরির আঘাত, শারীরিক লাঞ্ছনা, এবং গলায় ফাঁস দেয়া হয়েছিল তার। ঘরের চারপাশে গোল্ডির জামাকাপড় এবং কবুতরদের খাওয়াবার জন্য নানা খাবারও খুঁজে পুলিশ। অর্থাৎ, সেদিনও কবুতরদের খাওয়াবার জন্য তৈরি হচ্ছিল গোল্ডি। জ্যাক বি এহলিঙ্গার নামের ২৯ বছর বয়সী একজনকে গ্রেপ্তার করা হয় কিন্তু পরবর্তীতে পুলিশ তাকে ছেড়ে দিতে বাধ্য হয়। 

জ্যাকের বিপক্ষে উপযুক্ত প্রমাণ পুলিশের কাছে ছিল না। তাছাড়া অ্যালিবাইও ছিল বেশ নিখুঁত। তাকে ধরা হয়েছিল পার্শিং স্কয়ারের পাশে রক্তমাখা জামাকাপড় পরে হেঁটে যাবার জন্য। এলিসা ল্যামের মৃতদেহ পাবার আগে পিজিয়ন গোল্ডির এই অমীমাংসিত হত্যাই এতদিন বেশ আলোড়ন তুলেছিল।  



শিশুহত্যাঃ
সিসিল হোটেলের সবচেয়ে কনিষ্ঠতম সদস্য তার প্রাণ হারায় ১৯৪৪ সালে। সে রাতে ১৯ বছর বয়সী ডরোথি জা পারসেলের খুব পেট ব্যথা করতে শুরু করে। পাশে শুয়েছিল ৩৮ বছর বয়সী জুতার দোকানের সেলসম্যান বেন লেভিন। তাকে ঘুম থেকে জাগিয়ে না তুলে একা একাই বাথরুমে যায় ডরোথি। সে যে মা হতে চলেছে, এটি জানা ছিল না তার। 

বাথরুমেই জন্ম দেয় একটি শিশুপুত্রের। কী করবে বুঝতে না পেরে বাথরুমের জানলা দিয়ে শিশুটিকে বাইরে ছুঁড়ে ফেলে দেয় ডরোথি। হোটেলের দশতালা থেকে এই উচ্চতায় ছোট একটি শিশুর দেহ পড়ে গেলে বেঁচে থাকবার কথা নয়। তাই হলো। পরেরদিন হোটেল সংলগ্ন একটি বাড়ির ছাদে পাওয়া গেল শিশুর লাশ। পুলিশ গ্রেপ্তার করে নিয়ে গেল ডরোথিকে। ‘মানসিকভাবে বিকারগ্রস্থ’ এই কথা বলে আদালত থেকে ছাড়া পায় ডরোথি। মানসিক হাসপাতালে ঠাই হয় তার।
 

হাই প্রোফাইল যত গ্রেপ্তারঃ
১৯৭৬ সালে ২৬ বছর বয়সী জেফ্রেই থমাস প্যালে একটি রাইফেল ক্রয় করেন। সিসিল হোটেলের ছাদে উঠে গিয়ে অন্তত ১৫ রাউন্ড গুলি ছোঁড়েন নিচে হাঁটতে থাকা মানুষগুলোর দিকে। সৌভাগ্যবশত কোনো মানুষের গায়ে গুলি লাগেনি তবে প্যালেকে গ্রেপ্তার করা হয়। 

জিজ্ঞাসাবাদের সময় প্যালে বলেন যে কাউকে হতাহত করবার উদ্দেশ্য তার ছিল না। ওপর থেকে গুলি ছুঁড়লে মানুষের মনে কীভাবে আতঙ্ক ছড়িয়ে যায় এবং তারা ভয়ে দৌড় শুরু করে। আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কথাও বলেন প্যালে। তার মতো একজন বিকারগ্রস্থ মানুষের জন্য অস্ত্র ক্রয় করা কতটা সহজ ব্যাপার, সেটিও পুলিশের চোখে আঙুল তুলে দেখিয়ে দেন তিনি। তবে প্যালেই প্রথম ছিলেন না। 


১৯৮৮ সালে রবার্ট সুলিভান নামক আরও একজনকে এই সিসিল হোটেল থেকে গ্রেপ্তার করা হয়। টেরি ফ্রান্সিস ক্রেইগ নাম্নী এক নার্সকে হত্যা করবার অভিযোগ ছিল তার ওপর। সাত বছর ধরে এই দুজন হোটেলের একই কক্ষে বসবাস করতেন। ঠাণ্ডা মাথায় হত্যা করা খুনীদের মাঝে রবার্ট সুলিভান একটি অন্যতম নাম। 

১৯৩০-৪০ এর দশকে যত আত্মহত্যাঃ
১৯৩১ সালে ডব্লু কে নর্টন নামক এক ব্যক্তির মৃতদেহ পাওয়া যায় এই সিসিল হোটেলের কক্ষে। বিষযুক্ত ক্যাপসুল সেবন করেছিলেন তিনি। আত্মহত্যার জন্য সিসিল হোটেলের নাম তখনও ছড়িয়ে পড়া শুরু হয়নি। একদম প্রথম দিকের ঘটনা এটি। ঠিক এর পরের বছর বেঞ্জামিন ডডিচ নামক ২৫ বছর বয়সী এক কর্ত্রীর লাশ পাওয়া যায়। 

নিজের মাথায় রাইফেল ঠেকিয়ে আত্মহত্যা করেছিলেন তিনি। ১৯৩৪ সালে আর্মি মেডিকেল কর্পসের প্রাক্তন সার্জেন্ট লুই ডি বোর্ডেন নিজের গলা কেটে আত্মহত্যা করেন। হোটেল কক্ষের দেয়ালে নানাপ্রকার সুইসাইড নোট রেখে গিয়েছিলেন তিনি। ১৯৩৭ সালে গলায় টেলিফোন তার পেঁচিয়ে নয় তলা থেকে লাফ দেন গ্রেস ই মার্গো। 

ঠিক এরপরের বছরই সিসিল হোটেলের ছাদে উঠে পাশের বাড়ির স্কাইলাইটের ওপর ঝাঁপ দিয়ে আত্মহত্যা করেন ইউ এস মেরিন রয় থম্পসন। সামরিক বাহিনীর লোকজনের আত্মহত্যা কেন যেন খুব সহজলভ্য হয়ে ওঠে সিসিল হোটেলের জন্য। কারণ, ১৯৩৯ সালে নেভি অফসার আরউইন সি নেবলেট বিষ খেয়ে আত্মহত্যা করেন এই হোটেলে। গ্রেট ডিপ্রেশনের কারণে কীভাবে তার জীবন ধ্বংস হয়ে গিয়েছে এবং পরিবার থেকে বিচ্যুত হয়েছেন, তার সবকিছুই একটি নোটে বিস্তারিত লিখে যান তিনি। 

ডেইলি বাংলাদেশ/টিএএস