Alexa কিশোর অপরাধ এবং আমাদের করণীয়

ঢাকা, শুক্রবার   ২০ সেপ্টেম্বর ২০১৯,   আশ্বিন ৫ ১৪২৬,   ২০ মুহররম ১৪৪১

Akash

কিশোর অপরাধ এবং আমাদের করণীয়

 প্রকাশিত: ১৬:৩৮ ১১ সেপ্টেম্বর ২০১৯   আপডেট: ১৬:৪১ ১১ সেপ্টেম্বর ২০১৯

নব্বইয়ের দশকের অন্যতম কবি বীরেন মুখার্জী। পেশা: সাংবাদিকতা। পাশাপাশি গল্প, প্রবন্ধ, উপন্যাস রাজনৈতিক কলাম লিখে চলেছেন একাধারে।  তার আগ্রহের অন্যতম বিষয় ‘মুক্তিযুদ্ধ’ এবং ‘লোকঐতিহ্য’। সম্প্রতি মনোযোগ দিয়েছেন চলচ্চিত্র নির্মাণে। তার নির্মিত স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র ‘ঘোর’ বেশ প্রশংসিত হয়েছে।

বাঙালির যেকোনো আন্দোলনে তরুণ সমাজই ছিল প্রাণ। 

এ কথা অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই যে, আন্দোলন-সংগ্রামে, মুক্তির মিছিলে তরুণ সমাজ সবসময়ই ছিল অগ্রভাগে, ছিল আদর্শের ধারক-বাহক। আমরা যদি ৫২’র ভাষা আন্দোলনের দিকে তাকাই, কিংবা ‘৬৯ এর গণঅভ্যুত্থান থেকে ৭০ এর নির্বাচন এবং সর্বোপরি একাত্তরের স্বাধীনতা সংগ্রাম; আবার স্বাধীন দেশে ৯০ এর গণআন্দোলনের প্রেক্ষাপটও যদি বিবেচনা করি তাহলে স্পষ্ট হবে আমাদের দেশের তরুণ সমাজের অগ্রণী ভূমিকার কথা। কিন্তু আজকের বাংলাদেশের দিকে তাকালে বাঙালির অতীত গৌরব ফিকে হয়ে আসে। কেন এই পরিবর্তন? আর এই প্রশ্নটির উত্তর খুঁজতেই আজকের লেখার বিষয় ইতিহাসের গৌরবগাথা নয়, রাজধানীসহ সারাদেশে গড়ে ওঠা কিশোর অপরাধীদের দৌরাত্ম্য এবং আমাদের করণীয় বিষয়ে। 

৭ সেপ্টেম্বর দেশের বিভিন্ন দৈনিকের সংবাদ ছিল ‘কিশোর গ্যাং কালচার’ নিয়ে। এসব সংবাদের তথ্যে বলা হয়েছে, রাজধানীতে গ্যাং কালচার ভয়ংকর আকার ধারণ করেছে। স্কুল-কলেজের গণ্ডি পেরোনোর আগেই কিশোরদের একটা অংশের বেপরোয়া আচরণ রাজধানীর বিভিন্ন পাড়া মহল্লায় আতঙ্কের অন্যতম কারণ হিসেবে দেখা দিয়েছে। এরা মাদক নেশায় জড়িয়ে পড়া থেকে শুরু করে চুরি, ছিনতাই, ইভটিজিং, মাদক ব্যবসা, এমনকি নিজেদের অভ্যন্তরীণ বা অন্য গ্যাং গ্রুপের সঙ্গে তুচ্ছ বিরোধকে কেন্দ্র করে খুন-খারাবি থেকেও পিছপা হচ্ছে না। আরো উদ্বেগের বিষয়, ছোটখাটো অপরাধে জড়ানো বিভিন্ন গ্যাংয়ের সদস্যরা বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে হয়ে উঠছে ভয়ংকর অপরাধী, এলাকার ত্রাস। আর ‘গ্যাং কালচারে’ জড়িত থাকার অভিযোগে গত দুই মাসে দুই শতাধিক কিশোরকে আটক করে সংশোধনাগারে পাঠিয়েছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। এ তথ্য দেশের প্রতিটি নাগরিকের জন্যই আতঙ্কের। একটা বিষয় লক্ষ করলে দেখা যাবে, ২০০১ সালের নির্বাচনে বিএনপি নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট সরকার ক্ষমতায় এলে সারাদেশে ন্যাক্কারজনক পরিস্থিতির উদ্ভব ঘটে। নির্যাতন নেমে আসে আওয়ামী লীগ সমর্থনকারী ব্যক্তি-পরিবার এবং সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর। এদের বাড়িঘর পুড়িয়ে দেয়া হয়, অকথ্য নির্যাতন করা হয় এবং ধর্ষণের উৎসবে মেতে ওঠে বিজয়ী সমর্থকরা। যার বেশিরভাগ নেতৃত্ব দিয়েছে তরুণরা। মূলত গ্যাং কালচারের প্রবণতা শুরু হয় তখন থেকেই। সেই শুরু, এখনো অপ্রতিরোধ্যভাবে চলছে কিশোর-তরুণদের এই ধ্বংসাত্মক সংস্কৃতি। 
যদিও সাম্প্রতিক সময়ে, ২০১৭ সালের জানুয়ারি মাসে উত্তরা ১৩ নম্বর সেক্টরে আদনান কবির হত্যার পর ‘গ্যাং কালচারের’ বিষয়টি ব্যাপকভাবে সামনে আসে। এরপর এসব গ্রুপের ব্যাপ্তি বেড়েছে। ১৫-২০ বছর বয়সী কিশোরদের প্রতিটি গ্রুপে ১০ থেকে ২০ জন করে সদস্য থাকে। 

বিশ্লেষকরা বলছেন, কিশোরদের অপরাধ প্রবণতা আগেও ছিল, এখনো আছে। আগে তারা বখাটেপনা বা মেয়েদের উত্যক্ত করত। এখন হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটাচ্ছে। আর এর বড় কারণ পারিবারিক নিয়ন্ত্রণ না থাকা। সামাজিক নিয়ন্ত্রণের বিষয়টিও পরিলক্ষিত হয় না বলে কিশোর অপরাধীরা দ্রুতই বাড়ছে, যা উদ্বেগের অন্যতম কারণ বলে মনে করছেন তারা। অপরদিকে রাজনৈতিক ‘বড় ভাই’দের আশ্রয়-প্রশ্রয়ের বিষয়টি সামনে এসেছে। এর সাম্প্রতিক উদাহরণ বরগুনা শহরে প্রকাশ্যে কুপিয়ে রিফাত শরীফকে হত্যার ঘটনা। হত্যাকারী নয়ন বন্ডসহ অন্যরাও ০০৭ নামে একটি গ্যাংয়ের সদস্য। এমনকি যাকে কুপিয়ে হত্যা করা হয় সেই রিফাত শরীফও এক সময় হত্যাকারীদেরই গ্যাং সঙ্গী। সঙ্গত কারণেই কিশোর অপরাধীর বিষয়টি আতঙ্ক হিসেবেই বিবেচনা করা সমীচীন।   

একটু গভীরে তলিয়ে দেখলেই বুঝা যেতে পারে, এদেশের প্রশাসন যেমন অনেকটাই রাজনৈতিক দল বা প্রভাবশালীদের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত (যদিও এটা অলিখিত একটি বিষয়), তেমনিভাবে এই কিশোর গ্যাং-ও রাজনৈতিক আশ্রয়-প্রশ্রয়ে বেড়ে উঠেছে। বরগুনার বন্ডবাহিনীর দিকে তাকালেও বিষয়টি স্পষ্ট হতে পারে। সারাদেশে ছোট বড় যেসব গ্যাং বাহিনীর তথ্য আসছে, সেগুলোও যে রাজনৈতিক রাঘব বোয়ালদের ছত্রছায়ায় গড়ে ওঠেনি, তা নিশ্চিত করে বলার উপায় নেই। প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করতে এবং নিজের প্রভাব বিস্তারে, দখলদারিত্বে নেতারা যে কম যান না, তা নানান সময়ের আলোচনায় উঠে এসেছে। বাস্তবতা হচ্ছে, ক্ষমতা আর প্রতিপত্তির নিষ্ঠুর বলি হতে হচ্ছে দেশের অগণিত কিশোর-তরুণদের। এ প্রবণতা একটি রাষ্ট্রের অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ এবং তুমুল অন্ধকারের বিষয়টিকেই স্পষ্ট করে বললে বোধ করি অত্যুক্তি হয় না। 

গণমাধ্যমের তথ্যগুলো বিশ্লেষণ সাপেক্ষে সামনে এসেছে যে, গ্যাং কালচার দেশের বিভিন্ন এলাকায় বিস্তৃত হয়েছে তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহার করে। গ্যাং-এর সদস্যরা ফেসবুক কিংবা অন্য কোনও সামাজিক মাধ্যমে আইডি খুলে একে অপরের সঙ্গে যোগাযোগ করছে। ফলে উদ্বিগ্ন ও উৎকণ্ঠিত অভিভাবকদের মধ্যেও এই প্রশ্ন জেগে ওঠা স্বাভাবিক যে, এসব কী হচ্ছে দেশে? একেবারে কিশোর বয়সী বাচ্চা ছেলেরা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়লে গোটা সমাজেই এর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে, তা আজ হোক কিংবা কাল হোক। ফলে কিশোর অপরাধীদের বিষয়টি বিবেচনায় না নিয়ে উপায় থাকে না।

বিশেষজ্ঞরা বলেন, পরিবার ও সমাজের দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের ইতিবাচক পদক্ষেপ এবং রাজনৈতিক নেতা ও স্থানীয় প্রশাসনের কঠোর উদ্যোগ ছাড়া গ্যাং কালচার রোধ সম্ভব হবে না। এক্ষেত্রে প্রথমেই এগিয়ে আসতে হবে পিতামাতাকে। সন্তান কী করে, কার সঙ্গে মেশে কোথায় সময় কাটায়- এ কয়টি বিষয়ে পর্যাপ্ত মনিটর করতে পারলেই গ্যাংয়ের মতো বাজে কালচারে সন্তানের জড়িয়ে পড়া রোধ করা সম্ভব। এর বাইরে ধর্মীয় ও নৈতিক মূল্যবোধের শিক্ষাও নিশ্চিত করার বিকল্প নেই। ছাত্র ও ঝরেপড়া সব কিশোর সন্তানের গতিবিধি সম্পর্কেই পিতামাতা, অভিভাবক ও আত্মীয়স্বজনদের বাড়তি পর্যবেক্ষণ থাকলে মাদক সেবন, অন্যায়-অপরাধ ও জঙ্গিবাদের মতো ভয়ানক কাজে জড়ানো রোধ করা সম্ভব হবে। এছাড়া অভিভাবকহীন ও পথশিশুদের বিষয়ে থানাকেন্দ্রিক পর্যবেক্ষণের উদ্যোগ নেয়া যেতে পারে। 
এছাড়া দেশের রাজনীতিতে ২০ বছরের কম বয়সীদের অংশগ্রহণ নিষিদ্ধ করতে হবে।

কিশোরদের শিক্ষাসংক্রান্ত কিংবা গঠনমূলক যে কোনো আন্দোলন, দাবি, সভা-সমিতি বা প্রতিবাদ গঠনমূলক ভাষা আর কার্যক্রমে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানেই সীমাবদ্ধ থাকবে। রাজনৈতিক দলের ছাত্রসংগঠনগুলো পরিচালিত হবে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানেই। সকাল-সন্ধ্যার পর কোনো ছাত্রসংগঠন তাদের রাজনৈতিক বা দাবি আদায়ের কর্মসূচিতে অংশগ্রহণ করতে পারবে না। দেশের কোনো রাজনৈতিক কর্মসূচিতে ২০ বছরের কম বয়সের তরুণ-কিশোর অংশ নিতে পারবে না। ছাত্রসংগঠন কেবল ছাত্রদের জন্যই আর তা হবে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান কেন্দ্রিক। যারা শিক্ষার্থী নয় তাদের ২০ বছর পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে রাজনৈতিক দলের কর্মী হতে। আজকের শিশু-কিশোররাই যেহেতু আগামী দিনের কর্ণধার, ফলে এদের প্রতি অধিক যত্নবান হতে হবে। পাশাপাশি সচেতনতা বৃদ্ধি ও সতর্কতা অবলম্বনই পারে কিশোরদের বাজে সংস্কৃতি এড়িয়ে পরিবারের তথা দেশের সম্পদে রূপান্তর করতে। প্রশাসন, পরিবার, রাজনৈতিক দলগুলো যদি এ ব্যাপারে সম্মিলিত প্রচেষ্টা জারি রাখে তাহলে আমাদের দেশের ভবিষ্যৎ নাগরিকরা সত্যিকার অর্থেই সোনার ছেলে হিসেবে তৈরি হয়ে দেশের সেবায় আত্মনিয়োগ করতে পারবে।

ডেইলি বাংলাদেশ/আরআর