‘কিছু লোক লেখাপড়া শেখে জনগণের টাকা হাতিয়ে নেয়ার জন্য’

ঢাকা, বৃহস্পতিবার   ০৯ এপ্রিল ২০২০,   চৈত্র ২৬ ১৪২৬,   ১৫ শা'বান ১৪৪১

Akash

‘কিছু লোক লেখাপড়া শেখে জনগণের টাকা হাতিয়ে নেয়ার জন্য’

নিজস্ব প্রতিবেদক ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ১১:৪৩ ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২০  

অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম

অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম

অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম বলেছেন, কিছু লোক লেখাপড়া শেখে জনগণের টাকা হাতিয়ে নেয়ার জন্য। এরা হোয়াইট কলার ক্রিমিনাল। এদের কাজই হচ্ছে জনগণের টাকা হাতিয়ে নেয়া। কোম্পানি চলবে কি চলবে না, সে বিষয়ে আপনারা সিদ্ধান্ত নিন।

তিনি আরো বলেন, আগে তো ব্যাংক ছিল না। মানুষ গোলায় ধান রাখত। এটাই ছিল গ্রামীণ অর্থনীতির বৈশিষ্ট্য। কিন্তু মানুষ এখন ব্যাংকে টাকা রাখে। এখন অনেকেই ব্যাংক করেন জনগণের টাকা লুটের জন্য।

মঙ্গলবার পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত আর্থিক প্রতিষ্ঠান ইন্টারন্যাশনাল লিজিং অ্যান্ড ফাইন্যান্স সার্ভিস লিমিটেডের (আইএলএফএসএল) সাবেক পরিচালক (এমডি) প্রশান্ত কুমার হালদারের (পি কে হালদার) সাড়ে তিন হাজার কোটি টাকার দুর্নীতির মামলা নিয়ে শুনানি চলার সময় তিনি এসব কথা বলেন।

প্রধান বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেনের নেতৃত্বাধীন আপিল বিভাগের তিন সদস্যের বেঞ্চে এই শুনানি গ্রহণ করা হয়। শুনানিতে হাইকোর্টের নির্দেশে নিযুক্ত চেয়ারম্যান ইব্রাহিম খালেদ এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক শাহ আলম ইন্টারন্যাশনাল লিজিংয়ের সর্বশেষ পরিস্থিতি তুলে ধরেন। গত ১৬ ফেব্রুয়ারি তাদের আদালতে হাজির হয়ে কোম্পানির সর্বশেষ পরিস্থিতি তুলে ধরার জন্য নির্দেশ দেন আপিল বিভাগ।

আদালতে রাষ্ট্রপক্ষে শুনানি করেন অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম ও বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষে আইনজীবী তানজিব-উল আলম। অন্যদিকে ইন্টারন্যাশনাল লিজিংয়ের পক্ষে ছিলেন আইনজীবী আহসানুল করিম। শুনানি শেষে এ বিষয়ে আদেশের জন্য বুধবার দিন ধার্য করা হয়েছে।

অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, পি কে হালদার কীভাবে চলে গেল, সেটি আদালতের দেখা উচিত। কোর্ট কি চোখ বন্ধ করে থাকবে? দেশের অর্থনীতিকে বাঁচাতে হাইকোর্ট আদেশ দিয়েছেন। কোর্টের ওই আদেশ যদি স্থগিত করা হয়, তাহলে যারা কোম্পানিটি ডুবিয়েছে তারাই লাভবান হবে। হাইকোর্ট যে আদেশ দিয়েছেন এর চেয়ে ভালো আদেশ হতে পারে না।

শুনানিতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সাবেক গর্ভনর খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদ বলেন, ২০১৫ সাল পর্যন্ত ইন্টারন্যাশনাল লিজিং অ্যান্ড ফাইন্যান্স সার্ভিস লিমিটেড খুবই ভালোমতো চলছিল। ২০১৬ সাল থেকে এর অবস্থা খারাপ হতে থাকে। এর পেছনে ‘কি পারসন’ (মুখ্য ব্যক্তি) হিসেবে কাজ করেছেন প্রশান্ত কুমার হালদার। তার সঙ্গে আরো অনেকেই রয়েছেন। তারা একসঙ্গে অনেক শেয়ার কিনে কোম্পানির আগের নেতৃত্বকে সরিয়ে দিয়েছেন। এর মানে কাউকে চাকরিচ্যুত করা হয়েছে, কাউকে বাধ্যতামূলক অবসরে যেতে বাধ্য করা হয়েছে অথবা ছাঁটাই করা হয়েছে।

পি কে হালদারসহ কিছু ব্যক্তি এই কোম্পানি থেকে এক হাজার ৫৯৬ কোটি টাকা ঋণ নিয়েছেন। বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদনেও এ তথ্য উঠে এসেছে। তবে তা খতিয়ে দেখতে অনুমতি দেয়া হয়নি। সর্বশেষ কোন ব্যক্তি পর্যন্ত ওই টাকা পৌঁছাচ্ছে তা জানা যায়নি। 

তিনি আরো বলেন, এসব টাকা ফেরত আসার সম্ভাবনা নেই। টাকা কোথায় আছে তারও হদিস পাওয়া যাচ্ছে না। দেশেও থাকতে পারে, দেশের বাইরেও যেতে পারে। তবে ওই টাকা উদ্ধার করতে রিকভারি এজেন্ট নিয়োগ দেয়া যেতে পারে।

ইব্রাহিম খালেদ আরো জানান, পিপলস লিজিংকে অবসায়ন করা হয়েছে। এখন যদি একইভাবে ইন্টারন্যাশনাল লিজিংকেও অবসায়ন করা হয়, তাহলে আর্থিক খাতে ধস নামতে পারে। আবার এ অবস্থায় এটাকে কতটা দাঁড় করানো যাবে সেটা নিয়েও আমি সন্দিহান। আমি সাহস পাচ্ছি না। আমি তো এই কোম্পানির কোনো শেয়ারহোল্ডার নেই। হাইকোর্টের আদেশে আমাকে স্বতন্ত্র চেয়ারম্যান করা হয়েছে। বাইরে থেকে এসে আমি এটাকে কতটা দাঁড় করাতে পারব! সরষের মাঝে ভূত থাকলে আমি কী করতে পারি!

এ পর্যায়ে কোম্পানির আমানতকারীদের অবস্থা জানতে চান প্রধান বিচারপতি। তখন ইব্রাহিম খালেদ বলেন, টাকা তো নেই। তারা চাইলেও টাকা ফেরত দেয়া যাচ্ছে না। ইন্টারন্যাশনাল লিজিংয়ের ব্যবস্থাপনা পরিচালক বর্তমানে ভারপ্রাপ্ত এবং তিনি অসুস্থ। আবার বাংলাদেশ ব্যাংকের নীতিমালায় আছে তিন মাসের বেশি ভারপ্রাপ্ত কাউকে দায়িত্বে রাখা যায় না। এটা বেআইনি না অনিয়ম। আমি প্রথম বৈঠকেই বলেছি দ্রুত ব্যবস্থাপনা পরিচালক নিয়োগ দিতে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক মো. শাহ আলম শুনানিতে বলেন, ইন্টারন্যাশনাল লিজিংয়ের মূলধনে ৪৫০ কোটি ১৯ লাখ টাকা ঘাটতি রয়েছে। ব্যাংক ঋণ আছে ৯৫৭ কোটি ১৪ লাখ টাকা। সর্বমোট ঋণ হচ্ছে তিন হাজার ৮৯৫ কোটি টাকা। তখন বাংলাদেশ ব্যাংক এ পরিস্থিতিতে কী পদক্ষেপ নিয়েছে জানতে চান প্রধান বিচারপতি।

জবাবে শাহ আলম বলেন, আমরা বিভিন্ন ধরনের পরিকল্পনা দিয়েছি। কখনও কখনও বাস্তবায়ন করেছে, কখনও কখনও করেনি। বিধিবহির্ভূতভাবে টাকা নিয়ে যাওয়ায় মূলধনের ঘাটতি তৈরি হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের ফিন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট বিষয়টি নিয়ে তদন্ত করছে। এরই মধ্যে একটি প্রতিবেদন জমাও দিয়েছে। মোট ৪৮টি ঋণ হিসাবের সঙ্গে ১২টি প্রতিষ্ঠান ও কতিপয় ব্যক্তির বিপরীতে মোট এক হাজার ৫৯৬ কোটি টাকার ঋণ বিতরণ করা হয়েছে। ঋণ বিতরণে পরিচালক পর্ষদের যথাযথ তদারকির ঘাটতি ছিল। এই ৪৮টি ঋণ হিসাবের লেনদেন ভাউচার পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হচ্ছে। সুবিধাভোগী কারা তাও খতিয়ে দেখা হচ্ছে। এক্ষেত্রে নতুন নিযুক্ত স্বাধীন চেয়ারম্যানের নেতৃত্বেও কোম্পানিটি পুনর্গঠন করা সম্ভব। তখন প্রধান বিচারপতি বলেন, আমরা দেখলাম একজনই সাড়ে তিন হাজার কোটি টাকা নিয়েছে। আপনাদের হিসাব কি শুভঙ্করের ফাঁকি?

এমন প্রশ্নে শাহ আলম বলেন, পি কে হালদারসহ অন্যরা এই কোম্পানি থেকেই সাড়ে তিন হাজার কোটি টাকা নিয়েছে বলে বাংলাদেশ ব্যাংকের পর্যবেক্ষণে আমরা পাইনি।

এ সময় বাংলাদেশ ব্যাংক জড়িতদের বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা নিয়েছে জানতে চান আপিল বিভাগ। জবাবে শাহ আলম বলেন, আমরা তাদের ১০ লাখ টাকা করে জরিমানা করেছি, শোকজ করেছি এবং দুর্নীতি দমন কমিশনকে ব্যবস্থা নিতে বলেছি।

এরপর ইন্টারন্যাশনাল লিজিং নিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিদর্শন প্রতিবেদন তুলে ধরেন আইনজীবী তানজীব-উল আলম। 

ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, যারা শেয়ার নিয়ে কোম্পানিটি দখল করেছে, তারা ডাকাতির জন্যই এসেছিল। বিআর ইন্টারন্যাশনাল লিমিটেড, নেচার এন্টারপ্রাইজ লিমিটেড, নিউটেক এন্টারপ্রাইজ লিমিটেড ও হাল ইন্টারন্যাশনাল লিমিটেড একই সময়ে ২০১৫ সালের ১১ মার্চ একই পরিমাণ মূলধন ২০ লাখ টাকা নিয়ে ৩১ দশমিক ৫৪ শতাংশ শেয়ার কিনেছিল। পরে পরিচালনা পর্ষদে এই চারটি প্রতিষ্ঠান থেকে পরিচালক নিয়োগ দেয়া হয়। পরের তিন বছরে আগ্রাসী ঋণ বিতরণের মাধ্যমে এক কোটি টাকার বেশি ১৩৩টি ঋণের নামে বিতরণ করা হয় দুই হাজার ১০৮ কোটি টাকা। অনেক ক্ষেত্রেই বাংলাদেশ ব্যাংকের চেক ব্যবহার করে ঋণের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট নয় এমন ব্যক্তি অথবা প্রতিষ্ঠানের হিসাবে অর্থ সরিয়ে নেয়া হয়েছে, যাতে প্রকৃত সুবিধাভোগীদের আড়াল করা যায়। এই অনিয়মের জন্য কোম্পানির পরিচালনা পর্ষদ, প্রধান নির্বাহী, নির্বাহী কমিটি, নিরীক্ষা কমিটি, ঋণ-ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা বিভাগ, অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ ও পরিচালনা পরিপালন বিভাগ সম্মিলিতভাবে দায়ী।

এ পর্যায়ে শুনানিতে অংশ নিয়ে বক্তব্য তুলে ধরেন অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম। তখন হাইকোর্টের আদেশ স্থগিত চেয়ে ইন্টারন্যাশনাল লিজিংয়ের আবেদনকারী দুই কর্মকর্তার আইনজীবী আহসানুল করিম বলেন, কোম্পানি অবসায়নের কথা এসেছে। কোম্পানি যদি ভেঙে যায়, তাহলে কিছু থাকবে না। বাংলাদেশ ব্যাংকও বলেছে কোম্পানি পুনর্গঠনের কথা। অবসায়ন হয়ে গেলে আর ব্যবসা থাকবে না। অর্থনীতিতে এর বিরূপ প্রতিক্রিয়া হবে। বাংলাদেশ ব্যাংকও চাচ্ছে যে কোনোভাবে কোম্পানিটি বাঁচাতে।

তিনি আরো বলেন, কোম্পানিতে কিছু ভালো পরিচালকও আছেন। ভালো মানুষ স্বাধীনভাবে কাজ করতে না পারলে টিকতে পারবে না। পি কে হালদারকে শাস্তি দিন। আমাদের আপত্তি নেই। পি কে হালদারসহ জড়িতদের আমিও শাস্তি চাই। কিন্তু এদের জন্য যদি আমাদের (আবেদনকারীরা) মরতে হয়, তাহলে ব্যাংকিং খাত ধ্বংস হয়ে যাবে। তাদের তো ব্যবসা আছে। মাঝামাঝি কোনো পথ নেই, হয় কোম্পানি অবসায়ন করতে হবে, নয় কোম্পানিকে জীবিত রাখতে হবে।

ডেইলি বাংলাদেশ/এমআরকে