.ঢাকা, বুধবার   ২০ মার্চ ২০১৯,   চৈত্র ৬ ১৪২৫,   ১৩ রজব ১৪৪০

কাশ্মীর নিয়ে দড়ি টানাটানি

ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধ 

 আফরোজা পারভীন ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ১৪:১৬ ১ মার্চ ২০১৯  

অাফরোজা পারভীন, কথাশিল্পী, কলাম লেখক, সম্পাদক। জন্ম ৪ ফোব্রুয়ারি ১৯৫৭, নড়াইল। সাহিত্যের সকল ক্ষেত্রে অবাধ পদচারণা। ছোটগল্প, উপন্যাস, শিশুতোষ, রম্য, স্মৃতিকথা, অনুবাদ, গবেষণা ক্ষেত্রে ১০১টি পুস্তক প্রণেতা। বিটিতে প্রচারিত টিয়া সমাচার, ধূসর জীবনের ছবি, গয়নাসহ অনেকগুলি নাটকের নাট্যকার। `অবিনাশী সাঈফ মীজান` প্রামাণ্যচিত্র ও হলিউডে নির্মিত স্বল্পদৈর্ঘ্য `ডিসিসড` চলচ্চিত্রের কাহিনিকার। রক্তবীজ ওয়েব পোর্টাল www.roktobij.com এর সম্পাদক ও প্রকাশক। অবসরপ্রাপ্ত যুগ্মসচিব

ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে উত্তেজনা চলছে।  কখনো বাড়ছে। কখনো কমছে। প্রতিবেশী ও  বৈরী এই দুই দেশের মধ্যে সংঘাত বা উত্তেজনা এবারই প্রথম নয়। 

দেশ বিভাগের পর থেকেই দুই দেশের মধ্যে উত্তেজনা চলছে প্রধানত কাশ্মীর নিয়ে। আমরা যদি দেশ দুটির পেছনের ইতিহাসের দিকে তাকাই তাহলে শুরু থেকেই তাদের যুদ্ধংদেহী মনোভাবের পরিচয় পাবো। ভারত-পাকিস্তানের মধ্যে প্রথম যুদ্ধ হয় দেশবিভাগের মাত্র দুই মাসের মাথায়। যে যুদ্ধের কারণ ছিল কাশ্মির। এরপর ১৯৬৫ সালের আগস্ট মাসে কাশ্মির নিয়ে দুই দেশের মধ্যে বড় ধরণের যুদ্ধ হয় আবারো। ১৯৭১ সালে আমাদের স্বাধীনতা যুদ্ধে সহায়তা করে ভারত। 

মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেয় ভারতীয় মিত্রবাহিনী।  সেসময় পাকিস্তানে বোমা নিক্ষেপ করে ভারতীয় বিমান বাহিনী। বাংলাদেশের স্বাধীনতার মধ্য দিয়ে যুদ্ধটি শেষ হয়।  ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী অটল বিহারী বাজপেয়ী ১৯৯৯  সালের ফেব্রুয়ারি মাসে একটি বাসে করে পাকিস্তানের লাহোরে যান। পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফের সঙ্গে তার একটি শান্তিচুক্তি হয় সেখানে। একই বছরের জুলাই মাসে পাকিস্তানি সেনা এবং জঙ্গিরা কার্গিল পর্বতে ভারতের একটি সামরিক চৌকি দখল করে নেয়। ভারত বিমান এবং সেনা অভিযান শুরু করার পর দখলকারীরা পিছু হটে যায়। ২০০১  সালের মে মাসে ভারতের  প্রধানমন্ত্রী বাজপেয়ীর সঙ্গে ভারতের আগ্রায় মিলিত হন পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট পারভেজ মুশাররফ। তবে তারা কোন সমঝোতায় পৌঁছাতে ব্যর্থ হন। ২০০১ সালের অক্টোবর মাসে  শ্রীনগরে কাশ্মীর বিধানসভায় একটি ভয়াবহ হামলায় ৩৮জন নিহত হন।  একই বছর ১৩ই ডিসেম্বর দিল্লিতে ভারতের সংসদ ভবনে সশস্ত্র হামলায় ১৪জন নিহত হয়। ২০০৭ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে  ভারত-পাকিস্তানের মধ্যে চলাচলকারী ‘সমঝোতা এক্সপ্রেস ট্রেনে’ বোমা হামলায় ৬৮জন নিহত হন।

২০০৮ সালের ২৬ নভেম্বর  মুম্বাইয়ের প্রধান রেলওয়ে স্টেশন, বিলাসবহুল একটি হোটেল এবং একটি ইহুদি সাংস্কৃতিক কেন্দ্রে প্রায় ৬০ ঘণ্টা ধরে চলা জঙ্গি হামলায় ১৬৬জন নিহত হন। ভারতের অভিযোগ, ওই হামলার পেছনে রয়েছে পাকিস্তানি গ্রুপ ‘লস্কর-ই-তাইবা’। ২০১৬ সালের জানুয়ারি মাসে পাঠানকোটে ভারতের বিমান ঘাঁটিতে চারদিন ধরে চলা হামলায় সাতজন ভারতীয় সেনা এবং ছয়জন জঙ্গি নিহত হয়।  একই বছরের ১৮ই সেপ্টেম্বর ভারত নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরের ‘উরি’ সেনা ঘাঁটিতে জঙ্গি হামলায় ১৯জন সেনা সদস্য নিহত হয়। এই বছরের ৩০শে সেপ্টেম্বর পাকিস্তানের কাশ্মিরের জঙ্গিদের ওপর 'সার্জিক্যাল স্ট্রাইক' চালিয়েছে বলে ভারত দাবি করে। কিন্তু এ হামলার কথা নাকচ করে  দেয় ইসলামাবাদ। ২০১৯ সালের ১৪ই ফেব্রুয়ারি কাশ্মীরের পুলওয়ামায় একটি সামরিক কনভয়ে আত্মঘাতী হামলায় অন্তত ৩৪জন সেনা সদস্য নিহত হয়। পাকিস্তানভিত্তিক নিষিদ্ধ জঙ্গি সংগঠন ‘ জৈশ-এ মোহাম্মদ’  এই হামলার দায় স্বীকার করে। ২০১৯ সালের ২৬ই ফেব্রুয়ারি ভারত জানায়, তারা পাকিস্তানের অভ্যন্তরে কাশ্মীরে জঙ্গি ঘাঁটিতে বিমান হামলা করে জঙ্গি ঘাঁটি ধ্বংস করে দিয়েছে। 

গত ১৪ ফেব্রুয়ারি পুলওয়ামায় জঙ্গি হামলার পর নতুন করে উত্তেজনা সৃষ্টি হয় বিতর্কিত অঞ্চলটিকে ঘিরে। এই ঘটনার ১২ দিন পর ২৬ ফেব্রুয়ারি পাকিস্তান ভূখণ্ডে ভারতীয় বিমানবাহিনীর হামলা চালায় । ভারতের হামলার প্রতিউত্তরে পাকিস্তান ২৭ ফেব্রুয়ারি দুটি ভারতীয় যুদ্ধবিমান ভূপতিত ও দুজন পাইলটকে আটকের দাবি করে। তখন এই উত্তাপ শুধু ভারত নয়, উত্তাপ ছড়িয়ে যায় দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশগুলোতেও।

এ বিষয়ে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সুষমা স্বরাজ বলেছেন, ‘নতুন দিল্লি চায় না এই পরিস্থিতির আরও অবনতি হোক।’ একইভাবে পাকিস্তান পররাষ্ট্র দপ্তরের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, ‘কাশ্মির সীমান্তে দুই দেশের সেনাদের মধ্যে গোলাগুলি চললেও সেই পরিস্থিতিকে আরও খারাপের দিকে নিয়ে যাওয়ার কোনো ইচ্ছা তাদের নেই।’

চলমান পরিস্থিতি নিয়ে দুই দেশেই চলছে উচ্চপর্যায়ের সামরিক ও বেসামরিক কর্তাব্যক্তিদের  বৈঠক।  দেশ রক্ষার দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করছেন  দেশ দুটির কর্ণধাররা।  জানা যায়, পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান  বৈঠক করেছেন ‘ন্যাশনাল কমান্ড অথরিটি’র সঙ্গে। এই অথরিটি দেশটির পরমাণু অস্ত্রভাণ্ডার বিষয়ে সিদ্ধান্ত দেওয়ার ক্ষমতা রাখে। অন্যদিকে, ভারতীয় সামরিক বাহিনীর প্রধানদের সঙ্গে  বৈঠক করেছেন দেশটির প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। ভারতের আক্রমণের চব্বিশ ঘণ্টা  পার হবার আগেই ভারতের আকাশসীমা লঙ্ঘন করে পাকিস্তনের যুদ্ধবিমান ঢুকে পড়ায় তার চিন্তাও যথেষ্ঠ।

পাকিস্তান বেসামরিক বিমান পরিবহন কর্তৃপক্ষ দেশটির আকাশসীমা বাণিজ্যিক বিমান চলাচলের জন্যে বন্ধ করে দিয়েছে। ভারতও  কাশ্মীর এবং পাঞ্জাবসহ দেশটির উত্তরাঞ্চলের বিভিন্ন শহরের বিমানবন্দরগুলো বন্ধ করে দিয়েছে।

ভারত-পাকিস্তানের ক্রমবর্ধমান উত্তেজনার মধ্যে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান টেলিভিশন বক্তৃতায় বলেছেন, পারমাণবিক শক্তিধর দুই দেশের উচিত দায়িত্বশীল আচরণ করা। উভয়েরই প্রজ্ঞা এবং বিবেচনা দিয়ে কাজ করা উচিৎ। বলেছেন, 'সব বড় বড় যুদ্ধ ভুল হিসাবের কারণে হয়েছে। হিটলার কখনো ভাবেননি যে, যুদ্ধ এতো বছর ধরে চলবে। আমেরিকানরা কখনো ভাবেনি যে, ভিয়েতনাম আর আফগানিস্তানের যুদ্ধ কয়েক দশকে গড়াবে।’

পাকিস্তানের পাল্টা হামলার পক্ষে সাফাইও দিয়েছেন ইমরান খান। বলেছেন, ১৪ই ফেব্রুয়ারির জঙ্গি হামলার তদন্তে সহায়তা করার জন্য তিনি  ভারতকে প্রস্তাব দিয়েছিলেন। কিন্তু কোন ফলাফল পাননি। তিনি দাবি করেছেন, পাকিস্তানের ভেতর হামলার সময় দুটি ভারতীয় মিগ বিমানকে ভূপাতিত করা হয়েছে। পাকিস্তানী অঞ্চলে ভেঙ্গে পড়া ভারতীয় বিমানটির পাইলটকেও গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তিনি আরো বলেছেন,  ভারতে হামলার উদ্দেশ্য কাউকে হত্যা করা বা ক্ষতি করা ছিল না। তারা শুধুমাত্র পাকিস্তনের ক্ষমতার বিষয়টি দেখাতে চেয়েছেন। ইমরান খান এই বক্তৃতা দিলেও ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র এই বিষয়টি নিয়ে এখনো কোন মন্তব্য বা টুইট করেননি।

এই ঘটনা এবং বিমান চলাচল বন্ধ করে দেয়ায় জনমনে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। কাশ্মিরের শ্রীনগর থেকে বিবিসি সংবাদদাতারা জানাচ্ছেন, রাজৌরি আর পুঞ্চ সেক্টরে নিয়ন্ত্রণ রেখার কাছাকাছি এলাকা থেকে সাধারাণ মানুষ ভয়ে পালিয়ে যাচ্ছেন।

দেশ ভাগ হবার দু মাসের মধ্যেই ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে কাশ্মির দিয়ে যে সমস্যার সূত্রপাত হয়েছিল আজও তা চলমান। দেমভাগকালে কাশ্মিরের সিংগভাগ মানুষ চেয়েছিল, একটি স্বাধীন দেশ। তাদের সেই চাওয়াকে অস্বীকার করা হয় নির্মমভাবে। দীর্ঘদিন ধরে তারা স্বাধীনতার জন্য লড়াই করে যাচ্ছে। ভারত কাশ্মিরের ৪৩ ভাগ এলাকা দখল করে রেখেছে। যার মধ্যে রয়েছে জম্মু, কাশ্মীর উপত্যকা, লাদাখ ও সয়ানচেন হিমবাহ। পাকিস্তান অধিকার করে রেখেছে কাশ্মিরের ৩৭ ভাগ ভূখণ্ড। যার মধ্যে রয়েছে আজাদ কাশ্মিও (রাজধানী  মুজাফফরাবাদ) এবং উত্তরাঞ্চলীয় গিলগিট ও বেল্টিস্তান। অন্যদিকে চীনের দখলে রয়েছে কাশ্মিরের ২০ ভাগ এলাকা। যার নাম আকসাই চীন। ১৯৬২ সালে চীন-ভারত যুদ্ধের সময় চীন এই এলাকা দখল করে। তাই কাশ্মীরের জনগণের ন্যায়সঙ্গত দাবি মুক্তি দেশ আর ভাগ্য উন্নয়নের পথে বাধা এই তিন রাষ্ট্র। বরং কাশ্মীরের জনজণের মুক্তিসংগ্রামকে ‘বিচ্ছিন্নতাবাদ’ বা ‘সন্ত্রাসবাদ’ বলে অভিহিত করছে কোনো কোনো পক্ষ।  

এই পরস্পরবিরোধী যুদ্ধে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, জীবন দিচ্ছে কাশ্মীরের সাধারণ মানুষ, ঘর হারাচ্ছে , উদ্বাস্তু আর দেশান্তরী হচ্ছে তারা। ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে দুই দেশের সেনা সদস্যরা।  যে দেশটি স্বাধীন হতে চায় তাকে স্বাধীন করে দেয়ায় উচিত। অনিচ্ছুক একটি জনপদকে তিন দেশের মাঝে ভাগাভাগি করে রেখে দড়ি টানাটানি আর কতোদিন চলবে! এ বিষয়টির অবিলম্বে মীমাংসা প্রয়োজন। প্রয়োজন আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের জোরালো হস্তক্ষেপের।

ডেইলি বাংলাদেশ/আরআর
 

শিরোনাম

শিরোনামসাফ নারী চ্যাম্পিয়নশিপের সেমিফাইনালে ভারতের কাছে ৪-০ গোলে হেরে বাংলাদেশের বিদায় শিরোনামবাসচাপায় আবরারের মৃত্যুর ঘটনায় ১০ লাখ টাকা ক্ষতিপূরণ দেয়ার নির্দেশ হাইকোর্টের শিরোনামযশোরের শার্শায় পিকআপ ভ্যানচাপায় স্কুলছাত্রীর পা বিচ্ছিন্ন শিরোনামরাজধানীতে সড়ক দুর্ঘটনায় বিইউপির ছাত্র নিহতের প্রতিবাদে প্রগতি সরণিসহ কয়েকটি সড়ক অবরোধ করে শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ; নিরাপদ সড়কের দাবিতে শাহবাগে ঢাবি শিক্ষার্থীদের অবস্থান শিরোনামসিঙ্গাপুরে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরের সফলভাবে বাইপাস সার্জারি সম্পন্ন শিরোনামক্রাইস্টচার্চ হামলা: নিহতদের দাফন শুরু; এখনো হস্তান্তর হয়নি সব মরদেহ শিরোনামঢাকা-কলকাতা জাহাজ সার্ভিস চালু ২৯ মার্চ