Alexa কাউন্টারে না থাকলেও কালোবাজারীদের হাতে টিকেট

ঢাকা, মঙ্গলবার   ১২ নভেম্বর ২০১৯,   কার্তিক ২৭ ১৪২৬,   ১৪ রবিউল আউয়াল ১৪৪১

Akash

কুমিল্লা রেলস্টেশন

কাউন্টারে না থাকলেও কালোবাজারীদের হাতে টিকেট

শাহাজাদা এমরান, কুমিল্লা ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ১৭:৫২ ১৪ অক্টোবর ২০১৯  

ছবি: ডেইলি বাংলাদেশ

ছবি: ডেইলি বাংলাদেশ

যাত্রী ভোগান্তির চরম উদাহরণ কুমিল্লা রেলস্টেশন। অবৈধ লেভেল ক্রোসিং, দালাল, হকার, মলমপার্টি, ভিক্ষুক সিন্ডিকেটচক্রসহ নানা সমস্যায় জর্জরিত স্টেশনটি। তবে সব ছাড়িয়ে চরম আকার ধারণ করেছে টিকেট অনিয়ম। টিকেট সিস্টেম পুরোটাই থাকে কালোবাজারীদের নিয়ন্ত্রণে। কাউন্টারে গিয়ে টিকেট পাওয়া যায় না।

কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া সরকারি কলেজের বাংলা বিভাগের প্রধান প্রফেসর ফাতেমা সুলতানা অভিযোগ করেন, ১০ দিন আগে ট্রেনের টিকেট ছাড়া হয়। যে ট্রেন ১০ তারিখ যাত্রা শুরু করবে ২ তারিখ গিয়ে সে ট্রেনের টিকেট পাই না। তাহলে এ টিকেট যায় কোথায়? কিন্তু কালোবাজারীদের কাছে ঠিকই টিকেট পাওয়া যায়। দীর্ঘদিনের এ সমস্যার কারণে চাইলেও টিকেট কিনতে পারি না। আবার অনেকে টিকেট ছাড়াই ট্রেনে চড়ে।

জানা যায়, ১৮৯৫ সালে যাত্রা শুরু করে কুমিল্লা রেলস্টেশন। সে হিসাবে স্টেশনটির বয়স ১২৪ বছর। কিন্তু নতুন অনেক স্টেশনের চেয়েও কম উন্নত এটি। ৭১টি লেভেল ক্রসিং এর মধ্যে ৫৮টি অবৈধ। অর্থনৈতিক টার্গেট পূরণ করতে পারেনি কয়েক বছর ধরে।

গত ৭ থেকে ১০ অক্টোবর ধারাবাহিক ভাবে তিনদিন সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়,  দেশের প্রাচীন এই রেল স্টেশনটি  নানা সমস্যা সংকটে জর্জরিত। রয়েছে টিকেট কাউন্টার সংকট। প্লাটফর্ম ব্যবহারের অনপুযোগী কয়েক বছর আগেই। কালোবাজারীদের দখলে স্টেশনের সব টিকেট। বেশির ভাগ ট্রেন সময় মতো পৌঁছায় না। রয়েছে দালাল, হকার, মলমপার্টি, সিন্ডিকেটচক্রসহ নানা প্রুপ। এছাড়া হকার ও ভিক্ষুকদের জন্য চলাচল করতে বিড়ম্বনা পোহাতে হচ্ছে। বিশ্রামাগারটি প্রায় সময় থাকে তালা দেয়া। অনুসন্ধান কেন্দ্রে পাওয়া যায়না তথ্য প্রদানকরীকে।

কুমিল্লা নগরীর সুজানগর এলাকার বাসিন্দা তৌহিদ হোসেন সরকার বলেন, এ স্টেশনে প্রায় চুরি ছিনতাই ও নানা অপকর্মের ঘটনা ঘটে। সীমন্তবর্তী জেলা হওয়ায় মাদক পাচারকারীরা এই রেল পথ ব্যবহার করে থাকেন। মাদক চোরাকারবারীদের জন্য রেলে চলাচল করাটাও ঝুঁকিপূর্ণ।

মাওলানা আবু তাহের নামে এক যাত্রী বলেন, মোবাইল অপারেটর রবির সৌজন্যে কুমিল্লা স্টেশনে বিশুদ্ধ খাবার পানি দেয়া হয়েছে এটি মহৎকাজ। রেলওয়ের নামাজের ঘরটি ছোট ও বেশ পুরনো। এটা সংষ্কার করা প্রয়োজন।

নাম প্রকাশ না করা শর্তে স্টেশনের একজন কর্মচারি জানান, প্লাটফর্মসহ স্টেশনের কাছাকাছি কয়েকটি দোকনদার সিন্ডিকেট করে টিকেট ক্রয় করে। নিজেরদের লোক দিয়ে তারা উচ্চমূল্যে তা বিক্রি করে। এটার সঙ্গে সরাসরি কর্মকর্তারা জড়িত রয়েছেন। তিনি আরো জানান, দুলাল, হারুন, কালা জনি, রবি, সুজনসহ ১০-১৫ জন কালোবাজারী এ কাজ করছে।

রেলের নিয়মিত যাত্রী কুমিল্লার এপিপি অ্যাডভোকেট খোরশেদ আলম জানান, ভারতসহ বিশ্বের অন্যান্য দেশে রেলপথ প্রধান যোগাযোগ ব্যবস্থা। বাংলাদেশের রেল পথে যোগাযোগ ব্যবস্থা আরো উন্নত করা প্রয়োজন। যাত্রীসেবার মান বৃদ্ধি করা প্রয়োজন। কুমিল্লা রেল স্টেশনে যাত্রী সেবার মান খুব খারাপ।

সাংবাদিক তৈয়বুর রহমান সোহেল জানান, লোকাল যাত্রীদের অনেকেই টিকেট ক্রয় করেন না। বিশেষ করে, কুমিল্লা থেকে লাকসাম পথে অনেক যাত্রী টিকেট ক্রয় করেন না। এ বিষয়ে কর্তৃপক্ষকে আরো গুরুত্বের সঙ্গে বিষয়টি দেখা প্রয়োজন। এর কারণে সরকার রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।

বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন কুমিল্লা আঞ্চলিক কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক এমরানুল হক সরকার বলেন, কর্তৃপক্ষ স্বীকার না করলেও বলব, এই রেল স্টেশনে দালালদের দৌরাত্ম চরমে । কাউন্টারে গেলে টিকেট পাওয়া যায়না। বেশি টাকা দিলে মুহূর্তের মধ্যে টিকেট পাওয়া যায়।

কুমিল্লা রেলওয়ে ফাঁড়ি ইনচার্জ অফিসের তথ্যমতে,  চলতি বছর জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত মোট ৩৯টি মামলা হয়েছে। যার বেশির ভাগই বিনা টিকেটে যাতায়াত করার জন্য। এবছর এখন পর্যন্ত ৩৯৪  জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে।  যাদের থেকে ৯৭ হাজার ২৫০ টাকা জরিমানা আদায় করা হয়েছে। চুরি, ছিনতাইসহ বিভিন্ন অপরাধ কর্মকান্ডের জন্য ১৫২ জনকে আসামী করে মামলা দেয়া হয়েছে।

কুমিল্লা রেলওয়ে ফাঁড়ি ইনচার্জ মো. মেছবাহুল আলম চৌধুরী জানান, অপরাধ কর্মকাণ্ড আগের থেকে অনেক কমেছে। এখন বিশেষ করে বিনা টিকেটে যাতায়াত আর ট্রেনের ছাদে যাতায়াত এ জাতীয় অপরাধ বেশি হয়। মলমপার্টি নেই বললেই চলে। কসবা স্টেশনে পুলিশ ফাঁড়ি নেই, সেখানে কিছুটা ঝুঁকি এখনো রয়েছে।

টিকেট কালোবাজারীর অভিযোগ বিষয়ে কুমিল্লা স্টেশন প্রধান বুকিং সহকারী মো. জসিম উদ্দিন জানান, বর্তমানে অর্ধেকের চেয়েও বেশি টিকেট অ্যাপসের মাধ্যমে বিক্রি হয়। আর যাদের প্রয়োজন তারা আগেই টিকেট ক্রয় করে নেন। শেষ সময়ে যারা আসেন তারা টিকেট পায় না। আবার বৃহস্পতিবার, ছুটির দিন বা বিশেষ সময়ে টিকেট সংকট দেখা দেয়।
 
সিনিয়র সাব অ্যাসিস্ট্যান্ট ইঞ্জিনিয়ার ওয়াকর্স, কুমিল্লা রেলওয়ে শাখার উপ-সহকারী প্রকৌশলী রামনারায়ন ধর জানান, ব্রাহ্মণবাড়িয়া থেকে শুরু করে কুমিল্লা স্টেশন হয়ে লাকসাম জংশন পর্যন্ত মোট ৭১টি লেভেল ক্রসিং রয়েছে। যার মধ্যে ১৩টি বৈধ আর ৫৮টি অবৈধ। বর্তমানে ডাবল লাইনের কাজ চলমান আছে। যদি কাজ শেষ হয় তাহলে এর আওতায় ৩০টি লেভেল ক্রসিং বৈধ করা হবে। বাকী থাকবে ২৮টি, এগুলোও ধারাবাহিক ভাবে বৈধ করার প্রক্রিয়া চলমান আছে।

কুমিল্লার স্টেশন মাস্টার মো. সফিকুর রহমান ভূঁইয়া বলেন, ২০১৫-১৬ সালের দিকে এখানে কালোবাজারী ও দালালদের দৌরাত্ম ছিলো। বর্তমান কুমিল্লা স্টেশন শতভাত দালাল মুক্ত। প্লাটফর্মসহ আরো যে সমস্যা আছে সেগুলো প্রকল্পের আওতায় আছে। আশা করি দ্রুত কাজ শুরু হবে। জনবল সংকটের কারণে যাত্রীদের সকল সেবা দেয়া সম্ভব হচ্ছে না। এখানে চতুর্থ শ্রেণি ও তৃতীয় শ্রেণির অনেক পদ দীর্ঘদিন ধরে খালি রয়েছে। বার্ষিক রাজস্ব টার্গেট পূরণ না হওয়ার কারণ জানতে চাইলে ব্যস্ততা দেখিয়ে নিজ কার্যালয় থেকে বেরিয়ে যান তিনি।

ডেইলি বাংলাদেশ/এস