‘কলিজা খেকো’ মেয়েকে জীবন্ত সমাধি দিলেন বাবা!

ঢাকা, বুধবার   ০১ এপ্রিল ২০২০,   চৈত্র ১৮ ১৪২৬,   ০৭ শা'বান ১৪৪১

Akash

‘কলিজা খেকো’ মেয়েকে জীবন্ত সমাধি দিলেন বাবা!

সাদিকা আক্তার    ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ১৪:৫৭ ২৭ নভেম্বর ২০১৯   আপডেট: ১৫:২৭ ২৭ নভেম্বর ২০১৯

ছবি: সংগৃহীত

ছবি: সংগৃহীত

অত্যন্ত প্রভাবশালী এক নারী। তিনি হঠাৎই অত্যন্ত দুরারোগ্য ব্যধিতে আক্রান্ত হন। পরিবারের সবাই অনেক ডাক্তার, কবিরাজ, হাকিম ডাকেন তাকে সুস্থ করে তুলতে। তবে কোনো কিছুতেই তিনি সুস্থ হচ্ছিলেন না। অবশেষে এক হাকিম তার এই দুরারোগ্য অসুখ সারাতে সমর্থ হন। 

ওষুধের পথ্য হিসেবে তিনি যা দিয়েছিলেন শুনলে সবারই গায়ে কাঁটা দেবে। এই নারীকে প্রতিদিন একটি করে শিশুর কলিজা খাওয়ার পরামর্শ দেয়া হয়। হাকিম এর কথা অনুযায়ী, ওই নারী প্রতিদিনই একটি করে শিশুর কলিজা খেতে থাকেন। কিছুদিন পর তিনি সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে যান। তবে শিশুদের কলিজা খাওয়া তার নেশায় পরিণত হয়। জানতে চান সেই নারীর সম্পর্কে? তার নাম আজিমুন্নিসা বেগম।

আজিমুন্নিসার বেগমের পরিচয়

বাংলার ইতিহাসে ঐশ্বর্য বৈভবের ছোঁয়ার পাশাপাশি রহস্যময়তাও কিছু কম নেই। নবাব-বেগমদের জীবন যেমন রহস্যময় ছিল, তেমনি বেশ কিছু নবাব এবং বেগম কুখ্যাত ছিলেন তাদেরই নিষ্ঠুরতার কারণে। তেমনই এক নিষ্ঠুর বেগম ছিলেন আজিমুন্নিসা বা জিন্নতউন্নিসা। তার অন্য নাম জায়নাব উন্নিসা। যে নারীর কঠোর হৃদয় দেখে স্তম্ভিত হয়ে গিয়েছিল স্বয়ং তার পিতা। বেগম আজিমুন্নিসা ছিলেন বাংলার প্রথম নবাব মুর্শিদকুলি খাঁর পালিতা কন্যা। তার বেগম নৌসেরী বানু ছিলেন সন্তানহীনা। 

মুর্শিদকুলি খাঁর কোনো পুত্র সন্তান ছিলো না। তার একমাত্র কন্যা জিন্নতউন্নিসা। তার কন্যাকে তিনি বিয়ে দেন উড়িষ্যার নবাব সুজাউদ্দিন মোহাম্মদ খানের সঙ্গে। আজিমুন্নিসা বেগম ছিলেন সেই সময়কার সবচেয়ে প্রভাবশালী এবং ধনশালী নারী। তাই তার অনুচরেরা তার কথামতো প্রত্যেকদিন একটি করে শিশুর কলিজা তাকে এনে দিতেন। কারণ তিনি কলিজা খাওয়ায় আসক্ত হয়ে পড়েন। এমনিভাবে বেশ কিছুদিন চলার পর খবরটি নবাব মুর্শিদকুলি খাঁ এর কানে ওঠে।

তিনি ঘটনার সত্যতা যাচাইয়ের জন্য অনুসন্ধান শুরু করেন। শেষে যখন দেখা যায় ঘটনাটি আসলেই সত্য, তখন তিনি এ ঘটনার শাস্তি স্বরূপ কন্যা আজিমুন্নিসাকে জীবন্ত সমাধি দেন। আবার অনেকের মতে, নবাব সুজাউদ্দৌলা তার স্ত্রীকে জীবন্ত সমাধির আদেশ দিয়েছিলেন। কারণ তাদের দাম্পত্য সম্পর্ক একেবারেই ভাল ছিল না। আজিমুন্নিসা সব সময় স্বামীর চরিত্র নিয়ে সন্দেহ করতেন এবং বিভিন্ন বিষয় তাদের মধ্যে মতবিরোধ লেগে থাকত।

পিতা নবাব মুর্শিদকুলি খাঁ ও কন্যা আজিমুন্নিসা বেগম

মুর্শিদকুলি খা’র জামাতা সুজাউদ্দিনের নবাব হওয়ার গল্প

জামাতা সুজাউদ্দিনের সঙ্গে মুর্শিদকুলি খাঁ’র সম্পর্ক ভালো ছিলো না। ফলে তিনি আজিমুন্নিসার পুত্র সরফরাজকে বাংলার পরবর্তী নবাব ঘোষণা করেন এবং দিল্লির সম্রাটের কাছ থেকে অনুমোদন আনার চেষ্টা করেন। ওদিকে, সুজাউদ্দিনকে তিনি উড়িষ্যার ছোট নবাব করেছেন। তবে সুজাউদ্দিনও নিজেকে নবাব করার জন্য দিল্লিতে দূত পাঠান। 

তখন মুর্শিদকুলি খাঁ প্রায় মৃত্যুসজ্জায়। সুজাউদ্দিন দিল্লির অনুমোদন পেয়ে মুর্শিদাবাদের দিকে অগ্রসর হন। পথিমধ্যেই খবর পান মুর্শিদকুলি খাঁ মারা গেছেন। এরপর মুর্শিদাবাদ এসে তিনি নিজেকে বাংলার নবাব ঘোষণা করেন ও চেহেলসেতুন প্রাসাদের সিংহাসনে বসেন। 

অন্যদিকে, মুর্শিদকুলি খাঁ'র দৌহিত্র সরফরাজ খাঁ’ও তখন মানসিকভাকে নবাব হওয়ার জন্য প্রস্তুতি নিলেন। ফলে পিতা-পুত্রের মধ্যে দ্বন্দ্ব বেঁধে গেলো। এ দ্বন্দ্ব নিরসনে মুর্শিদকুলি খাঁর স্ত্রী নৌসেরী বানু ও মেয়ে আজিমুন্নিসা এগিয়ে এলেন। তারা বোঝালেন যে, বাবার পরে তুমিই হবে নবাব। তাই অকারণ রক্তক্ষয় করো না। এরপর সরফরাজ তার পিতাকেই নবাব হিসেবে মেনে নিলেন। সুজাউদ্দিন ১৭২৪ সালে বাংলার নবাব হলেন। তার অন্য নাম সুজাউদ্দৌলা। মুর্শিদকুলি খা’র পরে সুজাউদ্দিন হন মুর্শিদাবাদের তৃতীয় স্বাধীন নবাব। 

আজিমুন্নিসার সমাধিআজিমুন্নিসার সমাধি নিয়ে বিতর্ক

আজিমুন্নিসার জীবন্ত কবর দেয়ার বিষয়ে ইতিহাসে নানা রকম ঘটনার প্রচলন রয়েছে। জানা যায়, স্বামী থাকা সত্তেও প্রতি রাতে কোনো না কোনো সুপুরুষের সঙ্গে দৈহিক মিলনে লিপ্ত হতেন। যাতে এই কথা কেউ জানতে না পারে সেইজন্য দৈহিক মিলনের পর খাবারে বিষ প্রয়োগ করে প্রতিটি পুরুষকেই হত্যা করতেন। নবাব মুর্শিদকুলি খাঁ, তার মেয়ের এই হত্যালীলার কথা জানতে পারেন। পরে এই স্থানে তার মেয়েকে জীবন্ত সমাধিস্থ করেন। 

আজিমুন্নিসা অত্যন্ত স্বাধীনচেতা প্রকৃতির মানুষ ছিলেন। তিনি পিতা মুর্শিদকুলি খাঁ এর মত একটি মসজিদ নির্মাণ করেন এবং সেই মসজিদের নিচেই নিজের সমাধি তৈরি করে রাখেন। পরবর্তীতে সেখানেই জীবন্ত সমাধি দেয়া হয় তাকে। আজিমুন্নিসা মনে করতেন তার সমাধির ওপরে পুণ্যবান মানুষের পায়ের ছাপ পড়লে তাদের চরণ স্পর্শে তার সমস্ত পাপ মুছে যাবে এবং তিনি মুক্তি লাভ করবেন‌। মৃত্যুর পরে সেখানেই তাকে সমাধিস্ত করা হয়। পরবর্তীতে যা ভূমিকম্পে প্রায় ধ্বংস হয়ে যায়। আজিমুন্নিসা বেগম এর সমাধির উপরে আরো একটি সমাধি দেখতে পাওয়া যায়। 

তবে এই সমাধিটি আসলে কার সেটি সঠিকভাবে জানা যায়নি। কেউ কেউ বলেন, সমাধিটি সেই হাকিমের আবার কেউ কেউ বলেন, সমাধিটি বেগমের বিশ্বস্ত এক অনুচরের। ২৮৫ বছর আগের ঘটা ঘটনার অমীমাংসিত রহস্য আজো মুর্শিদাবাদের আনাচে কানাচে ঘুরে বেড়ায়। আজিমুন্নিসা বেগমের মসজিদটি প্রবল ভূমিকম্পে ধ্বংস হয়ে যায়, তবে এর কারুকার্য করা একটি দেওয়াল এখনো বর্তমান। এই মসজিদটির সঙ্গে মুর্শিদকুলি খাঁ’র নির্মিত কাটরা মসজিদ এর অনেক মিল পাওয়া যায়। অন্য একটি মত থেকে পাওয়া যায়, আজিমুন্নিসা কাটরা মসজিদের অনুকরণে একটি ছোট মসজিদ এখানে নির্মাণ করেন। 

মসজিদের ভাঙা দেওয়ালমসজিদের বর্তমান অবস্থা

১৯৮৫ সালে ভারতীয় পুরাতত্ত্ব বিভাগ এই ভগ্নপ্রায় মসজিদটির রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব নেন। তারপরেই এটিকে সর্বসাধারণের জন্য খুলে দেয়া হয়। ১৭৩৪ সালে নির্মিত এই মসজিদটিতে ঠিক কবে যে আজিমুন্নিসা বেগমকে জীবন্ত সমাধি দেয়া হয়েছিল তা ইতিহাস মনে রাখার প্রয়োজন মনে করেনি। তাই তার মৃত্যুর সঠিক সময়টি আমাদের অজানাই রয়ে গেছে। 

মসজিদটি আজ পুরোই ধবংসপ্রাপ্ত। শুধু একটি দেয়ালের অংশবিশেষ আজো দাঁড়িয়ে রয়েছে। মুঘল স্থাপত্যে গড়া প্রধান ফটক দিয়ে ভেতরে ঢুকলে সোজা একটি পথ উঠে গেছে উঁচু একটি মঞ্চের মতো ঢিবির উপর। এই ঢিবির উপর রয়েছে ফুলের বাগান। সিঁড়ি বেয়ে এই ঢিবি বা বাগানে উঠতে হয়। 

সিঁড়িতে না উঠে বামদিক দিয়ে সিঁড়ির নিচের দিকে এগুলেই দেখা যাবে একটি সমাধি। এটিই আজিমুন্নিসার সমাধি। অনেক ইতিহাসবিদের মতে, ১৭৩০ সালে আজিমুন্নিসার মৃত্যু হয়। আর ১৭৩৪ সালে এখানে এই মসজিদটি নির্মাণ করা হয়। তাহলে কীভাবে সেখানে আজিমুন্নিসার কবর দেয়া হয়? এই প্রশ্ন সবার মনেই! বাবার সমাধির মতো তিনিও প্রবেশ সোপানের তলদেশে সমাহিত। অলঙ্করণ ও স্থাপত্য বিন্যাসে কাটরা মসজিদের সঙ্গে এর সাদৃশ্য রয়েছে। ব্রিটিশ পূর্ববর্তী স্থাপত্যের মতো এখানেও রয়েছে মুঘল ছাপ। 

এখন মুর্শিদাবাদের লালবাগের আজিমুন্নিসা বেগমের জীবন্ত সমাধি দর্শনে আসেন বহু মানুষ। তাদের চরণ স্পর্শে বেগমের মুক্তিলাভ ঘটেছে কি-না জানা নেই তবে তার জীবদ্দশায় তার করা কুকীর্তির কথা শুনে সবাই মনে মনে শিহরিত হয়ে ওঠেন এটা এক বাক্যে বলা যায়।

ডেইলি বাংলাদেশ/জেএমএস