করোনা সংকটেও দেশে যেভাবে হলো রেমিট্যান্স ও রিজার্ভে রেকর্ড
SELECT bn_content.*, bn_bas_category.*, DATE_FORMAT(bn_content.DateTimeInserted, '%H:%i %e %M %Y') AS fDateTimeInserted, DATE_FORMAT(bn_content.DateTimeUpdated, '%H:%i %e %M %Y') AS fDateTimeUpdated, bn_totalhit.TotalHit FROM bn_content INNER JOIN bn_bas_category ON bn_bas_category.CategoryID=bn_content.CategoryID INNER JOIN bn_totalhit ON bn_totalhit.ContentID=bn_content.ContentID WHERE bn_content.Deletable=1 AND bn_content.ShowContent=1 AND bn_content.ContentID=192019 LIMIT 1

ঢাকা, শনিবার   ০৮ আগস্ট ২০২০,   শ্রাবণ ২৫ ১৪২৭,   ১৮ জ্বিলহজ্জ ১৪৪১

Beximco LPG Gas

করোনা সংকটেও দেশে যেভাবে হলো রেমিট্যান্স ও রিজার্ভে রেকর্ড

নিজস্ব প্রতিবেদক ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ২১:১৩ ৪ জুলাই ২০২০   আপডেট: ১৫:৪৯ ৫ জুলাই ২০২০

ফাইল ফটো

ফাইল ফটো

সৌদি আরবের রিয়াদে থাকেন বাংলাদেশের বহু প্রবাসী। তাদের একজন চাঁদপুরের মতলব উপজেলার ইকবাল হোসেন। লকডাউন ও করোনার জের ধরে চরম সংকট পার করে গত ১৭ জুন গ্রামের বাড়িতে বাবার কাছে টাকা পাঠিয়েছেন তিনি এবং এবার একটু বেশি পরিমাণেই পাঠানোর চেষ্টা করেছেন তিনি।

তিনি বলেন, এই দুঃসময়েও টাকা পাঠিয়েছি যাতে বাবা-মা ও আমার পরিবার কোনো সমস্যায় না পড়ে। দেশের এই অবস্থায় তারা যেন ভালোভাবে চলতে পারে। বেশি করে টাকা পাঠিয়ে বাবাকে বলেছি, আশপাশের লোকজন যারা সংকটে পড়েছে তাদেরও যেন কিছুটা সহায়তা করেন।

আবার সৌদি আরবেই গৃহপরিচারিকার কাজ করেন লাভলী খাতুন। মার্চ ও এপ্রিল মাসে তিনি বাড়িতে টাকা পাঠাননি। কিন্তু জুনের প্রথম সপ্তাহে তিনি বাড়িতে থাকা তার মা ও মায়ের কাছে থাকা দুই সন্তানের জন্য বেশি করে টাকা পাঠিয়েছেন। 

তিনি বলেন, ‘আগের দু’মাস পাঠাইনি। আবার সামনে ঈদ আসতেছে। তাই ভাবলাম এই সুযোগে একটু বেশি করে পাঠাই। নিজের জমানো কিছু ছিলো আর রিয়াদের কাছাকাছি আমার এক আত্মীয়ও থাকেন, ওনার কাছ থেকে ৫০০ রিয়াল ধার করে সব এক সঙ্গে বাড়ি পাঠাইছি।’

ঢাকার দোহারের এক গ্রামে থাকা লাভলী বেগমের মা মনোয়ারা বেগম বলেন, মেয়ের কাছ থেকে টাকা না পেয়ে এপ্রিলে তাকে টাকা ধার করতে হয়েছিল। এখন অতিরিক্ত অর্থ পেয়ে আগে দেনা শোধ করেছেন। বাড়তি টাকাটা মেয়ে না পাঠালে তো বিপদে পড়ে যেতাম, বলেন তিনি ।

এভাবেই বিশ্ব জুড়ে ছড়িয়ে থাকা প্রবাসীদের পাঠানো টাকা অর্থাৎ রেমিট্যান্সে তৈরি হয়েছে একটা নতুন রেকর্ড, যার ফলে ইতিহাসে প্রথমবারের মতো বাংলাদেশে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ৩৬ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছে গত বৃহস্পতিবার।

বাংলাদেশ থেকে যাওয়া একটি বড় সংখ্যক শ্রমিক মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে কাজ করেন। গত বছরের শেষার্ধে চীনের উহানে করোনাভাইরাস সংক্রমণের যে ধারা শুরু হয়েছিল, তার ঢেউ মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে আসার পরপরই রেমিট্যান্স নিয়ে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছিলেন কম বেশি সবাই।

এর মধ্যেই সৌদি আরবসহ মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে লকডাউনের কারণে প্রবাসী শ্রমিকদের চাকরি হারানো বা কাজ না পাওয়ার খবরে রেমিট্যান্স নিয়ে আশঙ্কা ছিল 

বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসেবে ৩০ জুন শেষ হওয়া অর্থবছরে মোট এক হাজার ৮২০ কোটি ৩০ লাখ বা ১৮ দশমিক ২০ বিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্স পাঠিয়েছেন প্রবাসীরা।

এটি ২০১৮-১৯ অর্থবছরের চেয়ে ১০ দশমিক ৮৫ শতাংশ বেশি। ২০১৮-১৯ অর্থবছরে মোট ১৬ দশমিক ৪২ বিলিয়ন রেমিট্যান্স এসেছিল।

এবার ৩০ জুন দিন শেষে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের পরিমাণ ছিল ৩৬ দশমিক ১৪ বিলিয়ন ডলার। এর মধ্যে শুধু জুনেই এসেছে ১৮৩ কোটি ডলারের বেশি রেমিট্যান্স, যা মাসের হিসেবে সর্বোচ্চ।

আর মহামারির মধ্যেও এমন খবরে খুশি সরকারও, যার প্রমাণ হলো বছরের শেষ দিনে বৃহস্পতিবার রাতেই অর্থমন্ত্রীর একটি বার্তা, যা গণমাধ্যমে পাঠায় অর্থ মন্ত্রণালয়। এতে যুক্তরাজ্যে অবস্থানরত অর্থমন্ত্রী বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে থাকা প্রবাসী বাংলাদেশিদের প্রতি তার ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানান।

যদিও এর আগে মার্চের দিকে রেমিট্যান্স প্রবাহ কমতে থাকায় উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়েছিল এবং পরিস্থিতি সামাল দিতে রেমিট্যান্সের জন্য ২ শতাংশ প্রণোদনা ঘোষণা করেছিল সরকার। এটা রেমিট্যান্স বৃদ্ধিতে সহায়তা করেছে।

জুনে রেকর্ড রেমিট্যান্সের কারণ কী: মধ্যপ্রাচ্যে লকডাউনের পর প্রবাসীরা যে বিপাকে পড়েছিলেন তার রেশ পড়তে শুরু করে মার্চের দিকে। কিন্তু জুন নাগাদ এসে পরিস্থিতি পাল্টে রেমিট্যান্সের নতুন রেকর্ড তৈরি হওয়ার কারণগুলো নিয়ে চলছে নানা বিশ্লেষণ ।

রিয়াদে বাংলাদেশ দূতাবাসের লেবার কাউন্সিলর মেহেদী হাসান বলেন, এমন প্রতিকূল পরিস্থিতিতেও রেমিট্যান্সের ঊর্ধ্বগতি হয়েছে, যা অনেকে চিন্তাই করতে পারেনি।

 তিনি বলেন, এটি বাংলাদেশের জন্য স্বস্তিদায়ক। তবে এর কারণগুলো বলা খুব কঠিন। কারণ সময়টা আসলেই ভালো নয়। আমরা আগামী দুই-তিন মাস পর্যবেক্ষণ করবো। তারপরেও হয়তো রেমিট্যান্সের গতি-প্রকৃতি ও কারণগুলো সম্পর্কে ধারণা করা সম্ভব হবে।

তারপরও বর্তমান পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে রেমিট্যান্স বাড়ার সম্ভাব্য কয়েকটি কারণের কথা উল্লেখ করেছেন মেহেদী হাসান। সেগুলো হলো-

১.লকডাউন চলার কারণে অনেক দিন কাজ ছিল না। এখন লকডাউন উঠে গেছে। তাই লকডাউনের কারণে যারা মাঝের সময়ে টাকা পাঠাতে পারেননি তারা গত মাসে সেটা পুষিয়ে দেয়ার চেষ্টা করেছেন বাড়িতে বাড়তি টাকা পাঠিয়ে।

২. লকডাউনের সময় অনেকেরই কোনো কাজ ছিল না, ফলে আয়ও ছিল না। নিজের জমানো যা ছিল তা খরচ করতে হয়েছে নিজের জন্য। ফলে হয়তো বাড়িতে পাঠাতে পারেননি। এখন লকডাউন উঠে যাওয়ার পর অনেকেই নতুন করে কাজ শুরু করেছেন। তারাও রেমিট্যান্স পাঠিয়েছেন যতটা সম্ভব বেশি করেই।

৩. করোনা পরিস্থিতির জের ধরে অনেক কোম্পানি শ্রমিকদের বাধ্যতামূলক ছুটি দিয়ে দেশে পাঠিয়ে দিচ্ছে। এজন্য যাদের ছুটি দেয়া হচ্ছে তাদের ক্ষতিপূরণ বাবদ কিছু অতিরিক্ত অর্থও দিচ্ছে কোম্পানিগুলো। গত মাসের রেমিট্যান্সে তারও একটি অবদান থাকতে পারে।

৪. আবার করোনা অবস্থার কারণে সার্বিকভাবে কাজের সুযোগ কমে গেছে। অনেক দিন ধরে আছেন ও ভালো টাকা পয়সা জমিয়েছেন, এমন অনেকে হয়তো চিন্তা করতে পারেন যে সৌদিতে যেহেতু কাজের সুযোগ এখন কম, তাই বরং সব টাকা নিয়ে দেশে গিয়ে কিছু একটা করার চেষ্টা করি। সে কারণেও অনেকে বাড়তি টাকা পাঠানো শুরু করেছেন, যা রেমিট্যান্স প্রবাহ অনেক বাড়িয়ে দিয়েছে।

রিয়াদে থাকা বাংলাদেশি সাংবাদিক সাগর চৌধুরী বলেন, তিনি এ নিয়ে প্রবাসীদের অনেকের সাথেই কথা বলেছেন। তাতে তার ধারণা হয়েছে যে প্রবাসীরা বিশেষ করে শ্রমিকরা জানে বাংলাদেশের গ্রামীণ বাস্তবতায় পরিবারের কোনো সদস্য বিদেশে থাকলেও অন্যরা সেই পরিবারকে ধনী ভাবতে শুরু করে।

তিনি বলেন, শ্রমিকরা জানে তাদের পরিবারকে দেশে কেউ সহায়তা করবে না, বিদেশে পরিবারের সদস্য আছে এই যুক্তি দিয়ে। সে কারণেই লকডাউন ও কারফিউতে বিপর্যস্ত হয়েও তারা জুনে এসে বাড়তি টাকা পাঠানোর চেষ্টা করেছেন দেশে থাকা পরিবারকে।

অর্থনীতির গবেষক ড. জায়েদ বখত গণমাধ্যমকে বলেন, দেশে মানুষের আয় উপার্জন ব্যাপকভাবে কমে যাওয়ায় গত মাসে প্রবাসীরা নিজেদের সঞ্চিত অর্থ থেকে বা অনেকে ধার দেনা করেও পরিবারের জন্য টাকা পাঠিয়েছেন, তারই প্রভাব পড়েছে রেমিট্যান্সে।

আবার অনেকে হয়তো দেশে শিফট করবেন- সেজন্য ধীরে ধীরে জমানো টাকা দেশে আনার কাজ শুরু করেছেন। এ কারণেও রেমিট্যান্স বেশি এসেছে বলে মনে করেন তিনি।

এর বাইরে গত বছর সরকার যে দুই শতাংশ হারে প্রণোদনা ঘোষণা করেছিল, তারও ইতিবাচক প্রভাব রেমিট্যান্সের ক্ষেত্রে ভূমিকা রেখেছে বলে মনে করেন তিনি।

এ বিষয়ে  বিশ্বব্যাংকের ঢাকা অফিসের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন বলেন, দুটি কারণে প্রবাসী আয় বেড়েছে। বিদেশ থেকে যারা সব কিছু গুটিয়ে দেশের পথে, সেই সঙ্গে তাদের সঞ্চয়ের সব অর্থও আসছে। আর কোনো কোনো দেশে করোনার প্রভাব কমে আসছে কিংবা লকডাউন তুলে দিচ্ছে। সে ক্ষেত্রে ব্যবসা-বাণিজ্য আবার স্বাভাবিক হতে শুরু করেছে। এসব কারণে রেমিট্যান্স বাড়ছে। রিজার্ভ বাড়ার কারণ হিসেব তিনি দাতা সংস্থাগুলোর সহায়তাকেই প্রাধান্য দিয়েছেন।

তিনি বলেন, এরইমধ্যে দাতা সংস্থাগুলো  দেড় বিলিয়নের বেশি অর্থ সহায়তা দিয়েছে। পাশাপাশি, আমদানি ব্যয়ও কমে গেছে। সব মিলিয়ে রিজার্ভ বাড়ছে। 

অন্যদিকে, রেমিট্যান্স বাড়ার বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক কাজী ছাইদুর রহমান বলেন, বিভিন্ন কারণে রেমিট্যান্স এবং রিজার্ভ বাড়ছে। এরমধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে- বিদেশি মিশনগুলোর বড় অঙ্কের অর্থ সহায়তা এবং আমদানির চাপ কমে যাওয়া। এছাড়া করোনাভাইরাসের মহামারির সময় পরিবার-পরিজনের প্রয়োজনে সর্বশেষ জমানো টাকাও পাঠাচ্ছেন প্রবাসীরা।

ডেইলি বাংলাদেশ/এসএস/এসএএম/এসআর/আরআর