করোনা প্রতিরোধে মোবাইল অ্যাপ

ঢাকা, মঙ্গলবার   ১৪ জুলাই ২০২০,   আষাঢ় ৩০ ১৪২৭,   ২২ জ্বিলকদ ১৪৪১

Beximco LPG Gas

করোনা প্রতিরোধে মোবাইল অ্যাপ

 প্রকাশিত: ১১:০৬ ২৪ মে ২০২০  

ড. এম. মেসবাহউদ্দিন সরকার

তথ্যপ্রযুক্তিবিদ প্রফেসর ড. এম. মেসবাহউদ্দিন সরকার। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের আইআইটি বিভাগের পরিচালক হিসেবে দায়িত্বরত আছেন। করেন গবেষণা ও লেখালেখি। দেশের শীর্ষস্থানীয় পত্রিকায় মন্তব্য কলাম লিখছেন নিয়মিত।  

বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থা ও বিশেষজ্ঞদের মতে করোনার তাণ্ডব শীঘ্রই শেষ হচ্ছে না। একটু ভালো হবে- আবার দেখা দিবে। কারো কারো মতে এটি আগামী দুই বছর পর্যন্ত চলতে থাকবে। এমতাবস্থায় আগামীতে দক্ষিণ আমেরিকা, আফ্রিকা ও অন্যান্য গরিব দেশগুলোতে করোনার সংক্রমণ আরো বাড়বে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। এসব গরিব দেশের কথা ভেবেই মোবাইলভিত্তিক অ্যাপ তৈরি করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থা। গুগল ও মাইক্রোসফটের অ্যাপ ডেভেলপারদের তত্ত্বাবধানে অ্যাপটি তৈরি করা হচ্ছে – যা এ মাসের (মে মাস) শেষ দিকে উন্মোচন করা হবে। যে কোনো দেশ অ্যাপটির কাস্টমাইজ সংস্করণ তৈরি করে জনগণের জন্য উন্মুক্ত করতে পারবে। কোভিড-১৯ হয়েছে কিনা তা যাচাইয়ে অ্যাপটি ব্যবহারকারীকে বিভিন্ন লক্ষণ সম্পর্কে প্রশ্ন করবে। এছাড়াও, কিভাবে টেস্ট করাতে হবে সে দিক-নির্দেশনা দেবে অ্যাপটি। এতে ব্লুটুথভিত্তিক কন্ট্যাক্ট ট্রেসিং ফিচার সংযোজন করা হয়েছে l

‌‌‌‌‌'কন্ট্যাক্ট ট্রেসিং' বা সংক্রমণ-বাহক অনুসন্ধান প্রক্রিয়াটি জনস্বাস্থ্য খাতে সংক্রামক রোগব্যাধির নিয়ন্ত্রণে বহু দশক ধরেই একটি প্রধান স্তম্ভ হিসেবে কাজ করে আসছে। “কন্ট্যাক্ট ট্রেসিং” বলতে বোঝায় যেখানে কোনো নিশ্চিতভাবে ছোঁয়াচে রোগাক্রান্ত (বা নিশ্চিতভাবে রোগজীবাণু দ্বারা সংক্রমিত) ব্যক্তির সংস্পর্শে এসেছেন, এমন সম্ভাব্য সমস্ত ব্যক্তিকে অনুসন্ধান ও শনাক্ত করা হয়। এভাবে প্রক্রিয়াটি চলতে থাকে, যতক্ষণ না পর্যন্ত সমস্ত সংক্রমিত ব্যক্তিকে খুঁজে না পাওয়া যায়। এই পদ্ধতিতে মোবাইলের ব্লুটুথ ওয়াই-ফাই দিয়ে আশেপাশের লোকজনের তথ্য সংগ্রহ (স্ক্যানিং) করে। স্ক্যানিংকৃত ডাটা তাৎক্ষণিকভাবে মোবাইল নেটওয়ার্কের মাধ্যমে মূল সার্ভারে রক্ষিত করোনা সংক্রান্ত বিগডাটা তথা ইন্ট্রিগেটেড ডাটা ওয়্যারহাউসের সঙ্গে পর্যালোচনা ও বিশ্লেষণ করত: প্রয়োজনীয় তথ্য-উপাত্ত নিয়ে রিয়েলটাইম রেসপন্স বা বার্তা রোগীর কাছে প্রেরণ করে। আপনি করোনায় আক্রান্ত কিনা তা হয়তো আপনার জানা নেই। আবার জানা থাকলেও অনেকে লজ্জায় কিংবা আতঙ্কে বলতে চায় না। তথ্য লুকানো কিংবা গোপন রাখেন অনেকে। কিন্তু এই অ্যাপ থাকলে সেটি করার সুযোগ নেই। ফলে করোনা প্রতিরোধ ও সচেতনতায় “কন্ট্যাক্ট ট্রেসিং” খুবই কার্যকর ও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
 
“কন্ট্যাক্ট ট্রেসিং” বা স্ক্যানিং প্রক্রিয়ার এই সুবিধা পেতে হলে ব্যবহারকারীর মোবাইলে এই অ্যাপটি ইন্সটল করা থাকতে হবে। এর জন্য অবশ্যই থাকতে হবে ব্যবহারকারীর মোবাইলে ইন্টারনেট কানেক্টিভিটি l অর্থাৎ যে সব মোবাইলে অ্যাপটি ইন্সটল করা আছে শুধু তাদের তথ্যই সে আদান-প্রদান করতে পারে। তবে যেখানে ইন্টারনেট নেই সেখানে শুধু ব্লুটুথ দিয়েই এর কার্যকারিতা পাওয়া যাবে বলে দাবি করছেন এর আবিষ্কারকগণ l এইভাবে যত বেশি ব্যবহারকারী এই অ্যাপটি তার মোবাইলে রাখবে - ততই এর কার্যকারিতা ও উপযোগিতা পাওয়া যাবে। বিশ্ববাজারে এখন পর্যন্ত এ ধরনের যেসব অ্যাপ ডেভলপ হয়েছে  এবং ব্যবহৃত হচ্ছে সেগুলো প্রায় দুই-তিন সপ্তাহের তথ্য বিশ্লেষণ করার ক্ষমতা রাখে। অর্থাৎ গত ১৪-২১ দিনে ব্যবহারকারী কোনো করোনা রোগীর সংস্পর্শে এসেছিলেন কিনা সেই তথ্য সংরক্ষণ করতে পারে। এইভাবে এক মোবাইল থেকে অন্য মোবাইলে তথ্যের আদান-প্রদান ঘটে এবং করোনা ভাইরাস নিয়ে মানুষকে সচেতন করে থাকে। তাই বলা যেতে পারে এই মুহূর্তে মোবাইল অ্যাপ করোনাযুদ্ধে সবচেয়ে বেশি কার্যকর ও প্রশংসনীয় ভূমিকা রাখছে।

‘আমাদের দেশেও এই ধরনের অ্যাপস তৈরি হচ্ছে l “কোভিড ফাইন্ডার” নামে মোবাইল অ্যাপ উদ্ভাবন করেছেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট অব ইনফরমেশন টেকনোলজি সহযোগী অধ্যাপক ড. ওয়াহিদুজ্জামান ও শিক্ষার্থী রাজন হোসেন। এটি শনাক্ত রোগীর সংস্পর্শে আসা মানুষদের খুব সহজেই খুঁজে দেবে। গুগল প্লে-স্টোর থেকে অ্যাপটি নামিয়ে নাম ও মোবাইল নম্বর দিলেই চালু হয়ে যাবে এটি। অ্যাপে তৈরি হয়ে যাবে ইউনিভার্সালি ইউনিক আইডেন্টিফায়ার (UUID)। এটি মূলত একটি ইউনিক সংখ্যা যা একটি মোবাইল নম্বরের জন্য একটিই তৈরি হবে। অনেক রোগী সত্য তথ্য দেন না। তথ্য লুকানোর চেষ্টা করেন। কিন্তু এই অ্যাপ থাকলে সেটি আর পারবেন না। বড় বড় শপিংমল কিংবা অফিসগুলোতে এর মাধ্যমে অবাধ যাতায়াত ও ঝুঁকি কমানো সম্ভব হবে। “পাশে আছি মোবাইল অ্যাাপ” নামে অপর আরেকটি অ্যাপ উদ্ভাবন করেছেন একই ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ড. শামিম আল মামুন এবং শিক্ষার্থী শাহিন বাশার। এই অ্যাপে থাকছে করোনা সম্পর্কিত সকল তথ্য আর স্থানীয় পর্যায়ে সেবা প্রতিষ্ঠান গুলোর ম্যাপ লোকেশন। দেখা যাবে কোন সংগঠন কোথায় তাদের সাহায্য বিতরণের কাজ করছে। ফলে অন্যান্য সংগঠন অথবা ব্যাক্তি তাদের সাহায্যের সঠিক বিতরণের প্ল্যান করতে পারবেন। অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয় ও গবেষণাগারেও এ ধরনের অ্যাপ তৈরি করা হচ্ছে।

দেশে আইসিটি  ডিভিশনের তত্ত্বাবধানে “লাইভ করোনা টেস্ট” নামে একটি অ্যাপ তৈরি  করা হয়েছে। সাধারণ কিছু তথ্যের মাধ্যমে অ্যাপটি বলে দিতে পারে করোনার ঝুঁকির মাত্রা। অ্যাপটি ব্যবহার করে কতজন আইসোলেশন বা কোয়ারেন্টাইন আছে তা বের করা যায়। সরকারসহ ডাক্তারকে এই অ্যাপ নানাভাবে সহায়তা করতে পারবে। এটুআই এবং স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অংশীদারিত্বে রবি টেলিকম কোম্পানি মাই রবি ও মাই এয়ারটেল অ্যাপ থেকে ডেটা সংগ্রহ করে রোগটি কোন নির্দিষ্ট এলাকায় কিভাবে ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে তা গ্রাফিক্স বা ভিজুয়ালাইজ করে দেখার ব্যবস্থা রেখেছে। “করোনা আইডেন্টিফায়ার” নামে অপর একটি অ্যাপ তৈরি করেছে ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগ। ভারতে “আরোগ্য” নামে এক ধরনের অ্যাপ ব্যবহৃত হচ্ছে। এভাবে সিঙ্গাপুর, অস্ট্রেলিয়াসহ বিশ্বের অনেক উন্নত দেশে এ ধরনের অ্যাপ ব্যবহার করে সুফল পাচ্ছে।

বাংলাদেশে করোনায় আক্রান্ত রোগীরা যখন ডাক্তার এবং হাসপাতালের পেছনে ঘুরতে ঘুরতে হয়রান- তখন তার হাতে থাকা মোবাইল অ্যাপ থেকেই সে জানতে পারে কতটুকু সে আক্রান্ত। জানতে পারবে তার আশেপাশে থাকা লোকজনের অবস্থা কী? যদি অ্যাপটি হাসপাতালে প্রবেশ মুখে কিংবা ডাক্তারের চেম্বারে বা শপিংমলে সেট করা থাকে, তবে সেখান থেকেই বুঝা যাবে আগত লোকটি কিংবা ব্যবহারকারী করোনায় আক্রান্ত কিনা অথবা তার বর্তমান স্ট্যাটাস কী? প্রস্তুতকৃত প্রত্যেকটি অ্যাপের স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য থাকতে পারে, তবে মূল উদ্দেশ্য একটাই- করোনা সচেতনতায়ে সহায়তা করা। তাই করোনার এই ভয়াবহ পরিস্থিতিতে কোনোরকম আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় না গিয়ে সকল ধরনের উদ্ভাবনকে আমলে নিলে তরুণ বিজ্ঞানীরা অনুপ্রাণিত হবে এবং ভবিষ্যতে দেশের কল্যাণে কাজ করতে উৎসাহিত হবে। কাজেই দ্রুত পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে অ্যাপগুলো কার্যকর করার জন্য সরকারের সহযোগিতা একান্ত কাম্য।

বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার মতে দক্ষিণ আমেরিকা, আফ্রিকার ও অন্যান্য গরিব দেশগুলোতে অ্যাপ তৈরি করার মতো প্রকৌশলীর অভাব রয়েছে এবং অ্যাপ তৈরি করে দিলেও তা পরীক্ষা-নিরীক্ষার সুযোগ নেই। এমতাবস্থায় সারা বিশ্বের সকল অঞ্চলের ডাটা  সংগ্রহ  করে “বিগডাটা এনালাইসিস” এবং “ডাটা মাইনিং”  পদ্ধতিতে ফলাফল পর্যবেক্ষণ করে অঞ্চল ভিত্তিক সমাধানের দিকে এগুলো টেকসই ফল পাওয়া যাবে। অর্থাৎ বিশ্বের অন্যান্য দেশের দিকেও নজর দিতে হবে এবং সে অনুযায়ী মোবাইল অ্যাপস উদ্ভাবনের দিকে মনোযোগ দিতে হবে। অনুন্নত দেশগুলোর জনগণের এই ধরনের অ্যাপ ব্যবহার উপযোগী মোবাইল ফোন কেনার সামর্থ্য নেই। সে ক্ষেত্রে বিনামূল্যে কিংবা  স্বল্পমূল্যে মোবাইল ফোনও সরবরাহ করা উচিত। লেখাপড়া না জানা ব্যবহারকারীর জন্য প্রয়োজনে আঞ্চলিক ভাষায় অডিও ও ভিডিওর মাধ্যমে প্রয়োজনীয় বার্তা পৌঁছানোর ব্যবস্থা রাখা যেতে পারে। ব্যবহৃত মোবাইল থেকেও সংক্রমণ ছড়াতে পারে। সেজন্য ঘন ঘন হাত ধোয়ার মত নিজের মোবাইল ফোনটিও পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখতে হবে।

ডেইলি বাংলাদেশ/আরআর