করোনা থেকে সুরক্ষায় রোবট দিচ্ছে হ্যান্ড স্যানিটাইজার

ঢাকা, রোববার   ০৭ জুন ২০২০,   জ্যৈষ্ঠ ২৪ ১৪২৭,   ১৪ শাওয়াল ১৪৪১

Beximco LPG Gas

করোনা থেকে সুরক্ষায় রোবট দিচ্ছে হ্যান্ড স্যানিটাইজার

সাঈদ চৌধুরী, চুয়েট ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ১৬:৫৯ ২৯ মার্চ ২০২০   আপডেট: ১১:২৬ ৩০ মার্চ ২০২০

সাধারণ মানুষ স্বয়ংক্রিয় হ্যান্ড স্যানিটাইজার ব্যাবহার করছে। গত সোমবার দুপুরে নগরীর জিইসি মোড়ে। ছবি-সংগৃহীত

সাধারণ মানুষ স্বয়ংক্রিয় হ্যান্ড স্যানিটাইজার ব্যাবহার করছে। গত সোমবার দুপুরে নগরীর জিইসি মোড়ে। ছবি-সংগৃহীত

চট্টগ্রামে জিইসি মোড়ের যাত্রী ছাউনিতে গত সোমবার দেখা গেলো এক ভিন্ন চিত্র। কেউ দাঁড়িয়েছেন আছেন, কেউবা আবার সামনে রাখা একটি বক্সে হাত রাখছেন। দূর থেকে দেখেই জানার ইচ্ছে হলো কি সেখানে। একটু কাছে আসার পর দেখা গেলো এক হাতের সঙ্গে আরেক হাত মেলাচ্ছেন। এরপর চলে যাচ্ছেন যার যার গন্তব্যে। একটু পর ব্যাপারটি আরো পরিষ্কার হলো।

খোঁজ নিয়ে জানা গেলো, এটি একটি অটো হ্যান্ড স্যানিটাইজার। আরো জানা গেলো বোতলজাত হ্যান্ড স্যানিটাইজারের স্পর্শ করলে ভাইরাস থেকে যাওয়ার আশঙ্কা থাকেন। কিন্তু অটো হ্যান্ড স্যানিটাইজারে সেই আশঙ্কা নেই। এই আশঙ্কাকে উড়িয়ে দিলো যারা তারা হলেন একদল শিক্ষার্থী। সবাই পড়ছেন চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে। এটি রোবট সম্পর্কিত জ্ঞানকে কাজে লাগিয়ে তৈরি করেছেন তারা। 

জানা গেলো এর কারণ, ১৯ মার্চ ২০২০। বাংলাদেশে করোনার আতংক ধীরে ধীরে বেড়েই চলছে। তখন চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (চুয়েট) রোবটিক্স গবেষণা সংগঠন রোবো মেকাট্রনিক্স এসোসিয়েশনের (আরএমএ) ফেসবুক গ্রুপে শুরু হলো আলোচনা। কিভাবে দেশের মানুষের জন্য কিছু করা যায়। সেই সময় ঐ সংগঠনের সদস্য আব্দুল্লাহ সৌমিক টেলিভিশনের একটি সংবাদে হঠাত তিনি দেখলেন কয়েকজন যুবক রেলস্টেশন, বাস-স্টেশনসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থানগুলোতে জীবাণুনাশক ছিটিয়ে দিচ্ছে। তখন তিনি ভাবলেন এই জায়গাগুলোতে যদি এমন ব্যবস্থা করা যায়, একটি হ্যান্ড স্যানিটাইজার যন্ত্র থাকবে, সেটাকে কেউ স্পর্শ না করে হাত পরিষ্কার করে নিবে। তাহলে ভাইরাস ছড়ানোর কোনো উপায় থাকবে না। আইডিয়াটা মনে ধরে সংগঠনটির প্রাক্তনদেরও। তারা আর্থিক সহায়তা করার আশ্বাস দিয়ে কাজ শুরু করতে বলেন।

২০ মার্চ সকাল থেকেই সংগঠনটির সাত সদস্য আব্দুল্লাহ সৌমিক, আবু আদনান, শাফিন হাসনাত, সৌরভ রক্ষিত রিদন, হাসিবুল হোসেন, অর্ণব দাস এবং আদিত্য বড়ুয়া নগরীর জিইসি মোড়ে দুই সপ্তাহ এর জন্য বাসা একটা বাসা ভাড়া নিয়ে যন্ত্রটি তৈরির কাজ শুরু করেন। ২২ মার্চের মধ্যেই তারা একটি স্বয়ংক্রিয় হ্যান্ড স্যানিটাইজার যন্ত্র তৈরি করে ফেলেন এবং জিইসি মোড়ের যাত্রী ছাউনিতে স্থাপন করেন। ২৫ মার্চ পর্যন্ত চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে দুইটি এবং নগরীর জিইসি মোড়ে একটিসহ মোট তিনটি স্বয়ংক্রিয় হ্যান্ড স্যানিটাইজার যন্ত্র স্থাপন করেছিলেন। 

এ সময় এই দলের এক সদস্য আবদুল্লাহ সৌমিক জানান, যেসব হাসপাতালে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত রোগীদের চিকিৎসা দেয়া হবে এবং নগরীর বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে আরো বিশটি স্বয়ংক্রিয় হ্যান্ড স্যানিটাইজার যন্ত্র স্থাপন করবেন। চেষ্টা করছি আরো কিছু যন্ত্র বানানোর, কিন্তু দেশের এই অবস্থায় আমরা আমাদের প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র না পাওয়াতে বিশটির বেশি তৈরি করতে পারছি না। স্বয়ংক্রিয় হ্যান্ড স্যানিটাইজার যন্ত্রটি হলো মূলত এমন একটি যন্ত্র যেখান থেকে কোনো ধরনের সংস্পর্শ ছাড়াই জীবাণুনাশক তরল বের হবে। স্যানিটাইজারটিতে মূলত ব্যাবহার করা হয়েছে, একটা পাম্প, সোনার সেন্সর, রিফিল পাত্র এবং একটি ডিসপেন্সার। যখন কেউ ডিসপেনসার এ হাত রাখে, সোনার সেন্সর এ সিগন্যাল বাধা পেয়ে পাম্প চালু হয়। সঙ্গে সঙ্গে রিফিল পাত্র থেকে প্রতিবার ৪ মিলি স্যানিটাইজার বের হবে।

শিক্ষার্থীরা জানালেন, এর দুই লিটার ধারণ ক্ষমতার রিফিল পাত্রটি একবার পূর্ণ থাকলে তা থেকে চার হাজার মানুষকে স্যানিটাইজার সরবরাহ করা যায়। আরেকটি ভালো দিক হলো নিম্নশ্রেণির মানুষেরা এটি সহজেই ব্যাবহার করতে পারবে। একেকটি যন্ত্র  তৈরিতে খরচ পড়ে প্রায় পনেরশ টাকা। তারা এরকম বিশটি যন্ত্র তৈরি করেছেন। এই অর্থের কিছু অংশ যোগান দিয়েছে রোবো মেকাট্রনিক্স এসোসিয়েশন এর প্রাক্তন শিক্ষার্থীরা। এছাড়া চুয়েটের শিক্ষার্থীদের আরেকটি ফান্ড রাইজার দল 'চুয়েটিয়ান'স ফান্ড' ও চুয়েট ছাত্রলীগ  তাদেরকে আর্থিক সহায়তা দিয়েছে।

চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (চুয়েট) রোবট্রিক্স গবেষণা সংস্থা রোবো মেকাট্রনিক্স এসোসিয়েশনের (আরএমএ) এর সভাপতি সৌরভ রক্ষিত বলেন, দেশেই এই দুর্যোগের সময় আমরা চুপ করে বসে থাকতে পারি না। তাই আমরা যখন ভাবছিলাম নিজেরা নিরাপদ থেকে কি করা যায়। তখন আমাদের সবার ভাবনাতেই আসে আমরা সবচেয়ে ভাল পারি রোবটিক্স। আর এই জ্ঞানকেই কাজে লাগিয়ে আমরা চেষ্টা করেছি করোনার বিরুদ্ধে কিছুটা প্রতিরোধ গড়ে তুলতে। 

এই যন্ত্রগুলো যদি বহাল তবিয়তে থাকে তাহলে শুধু করোনা কেনো অনেক ধরনের জীবাণু থেকেই নিম্নশ্রেণির মানুষসহ সব শ্রেণির মানুষকে সুরক্ষিত রাখা যাবে এমনটাই মনে করছে দলটির শিক্ষার্থী আব্দুল্লাহ সৌমিক। তিনি বলেন, আমরা এই যন্ত্রটি সম্পূর্ণ বিনামূল্যে সাধারণ মানুষের ব্যাবহারের জন্য দিয়েছি। এগুলো সুরক্ষিত রাখা তাদের নাগরিক দায়িত্ব।

শিক্ষার্থীদের এই ধরনের সমাজসেবামূলক কাজ মুগ্ধ করেছে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক মোহাম্মদ রফিকুল আলমকে। তিনি শিক্ষার্থীদের সাধুবাদ জানিয়ে বলেন, বর্তমানে পুরো জাতি এক সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। এই অবস্থায় পরস্পর পরস্পরকে সাহায্য করতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা যেভাবে তাদের মেধা এবং অর্থ দিয়ে সবার সাহায্যে এগিয়ে এসেছে এটা সকলের জন্যই দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে।

তাছাড়া চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ এর ইন্টার্ন ডাক্তার এম এ আউয়াল রাফি বলেন, চুয়েটের শিক্ষার্থীরা মেডিকেলের প্রবেশপথেই এই যন্ত্রটি বসিয়েছে।প্রতিদিন এই পথ ধরে শত শত রোগী,রোগীর আত্নীয় স্বজন, ডাক্তার  যাতায়াত করে। করোনাভাইরাস প্রতিরোধে তাদের এই কাজটি নিঃসন্দেহে প্রশংসাযোগ্য।

ডেইলি বাংলাদেশ/জেডএম