করোনায় যদিও ‘হ্যান্ডশেক’ নিষিদ্ধ, তবে জানেন কি এর আদ্যোপান্ত?

ঢাকা, শুক্রবার   ০৪ ডিসেম্বর ২০২০,   অগ্রহায়ণ ২০ ১৪২৭,   ১৭ রবিউস সানি ১৪৪২

করোনায় যদিও ‘হ্যান্ডশেক’ নিষিদ্ধ, তবে জানেন কি এর আদ্যোপান্ত?

কানিছ সুলতানা কেয়া ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ১৫:০৫ ২৫ মার্চ ২০২০  

ছবি: হ্যান্ডশেক

ছবি: হ্যান্ডশেক

কুশল বিনিময়ের সময় নিশ্চয় আপনার ডান হাতটি অন্যজনের দিকে বাড়িয়ে দেন হ্যান্ডশেকের উদ্দেশ্যে! যুগ যুগ ধরে এই রীতি চলমান রয়েছে। তবে করোনাভাইরাস বিশ্বব্যাপী যেভাবে প্রভাব বিস্তার করেছে এতে করে এখন কারো সঙ্গে হাত মেলানোই যেন দায় হয়ে পড়েছে! মূলত হাত থকেই এই ভাইরাসটি চোখ, মুখ ও নাক স্পর্শের মাধ্যমে শরীরে প্রবেশ করে। 

স্বভাবতই, আমাদের অঙ্গভঙ্গিগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি আমরা হাতের ব্যবহার করে থাকি। সেইসঙ্গে কোনো উল্লাস করতে হাইফাইভের বা ভি সাইন আপনিও দেখান নিশ্চয়! আবার কারো সঙ্গে দেখা হলেই হ্যান্ডশেক বা করমর্দনে তাকে স্বাগত জানান। তবে জানেন কি? হাতের এই অঙ্গভঙ্গিগুলো কবে থেকে শুরু হলো? কেনই বা এলো? কোথা থেকে উৎপত্তি ঘটেছে হ্যান্ডশেক, হাইভাইভ বা ভি সাইনের? তবে জেনে নিন আপনার অজানা এসব কৌতূহলের উত্তর। 

হ্যান্ডশেকহ্যান্ডশেক 

খ্রিষ্টপূর্ব পঞ্চম শতকের দিকে প্রাচীন গ্রিক কবরগুলোর এপিটাফে খোদাই করা ছবিতে করমর্দনরত মানুষের দেখা পাওয়া যায়। প্রাচীন রোমান মুদ্রাতেও বন্ধুত্ব এবং আনুগত্যের নিদর্শনস্বরূপ করমর্দনের কথা উল্লেখ আছে। এছাড়াও এথেন্সের অ্যাক্রপোলিস যাদুঘরে সংগৃহীত এক কলামে দেখা যায় গ্রীক পৌরাণিক কাহিনী ও ধর্মের অলিম্পিয়ান প্যানথিয়নে জিউসের স্ত্রী এবং বোনকে দেখা যায় তারা একজন অন্যজনের সঙ্গে হাত মিলাচ্ছেন। 

প্রাচীনকালে ভিন্ন ভিন্ন উদ্দেশ্যে করমর্দনের উল্লেখ থাকলেও ১৭০০ সাল থেকে এটিকে সম্ভাষণের প্রতীক বলা হয়। ১৬ জুন ১৮৪৮ সালে আমস্টারডাম শহরের পরামর্শদাতা এবং মেয়র ক্যাপ্টেন উইটসেন পুরুষ এবং নারীদের হাত মেলানোর প্রচলন শুরু করেন। এই অঙ্গভঙ্গিটির আইনি অনুমোদন তিনি তার বিয়ের অনুষ্ঠানেই করেছিলেন। 

সে সময় খ্রিষ্টধর্মাবলম্বীদের কোয়াকার সম্প্রদায় হ্যাট খুলে মাথা ঝোঁকানোর বিকল্প হিসেবে করমর্দন চালু করে। এরপর থেকেই বলা যায়, শিষ্টাচার বিধিগুলোর অন্যতম একটি হলো করমর্দন। 

১৯৯৩ সালের ১৩ সেপ্টেম্বর করমর্দনের মাধ্যমে তৈরি হয়েছিল এক নতুন ইতিহাস। মধ্যপ্রাচ্যের হোয়াইট হাউস লনে যখন ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী ইয়েজক রবিন এবং ফিলিস্তিনের লিবারেশন অর্গানাইজেশনের চেয়ারম্যান ইয়াসের আরাফাত ওসলো শান্তি চুক্তিতে স্বাক্ষর করেন এবং করমর্দন করেন। তাই হ্যান্ডশেককে বলা হয় শান্তির প্রতিশ্রুতি। 

থাম্বস আপ

থাম্বস আপগ্ল্যাডিয়েটরের কাহিনী মনে আছে তো? গ্ল্যাডিয়েটর হচ্ছেন এমন একজন অস্ত্রধারী যোদ্ধা যিনি অন্য কোনো গ্ল্যাডিয়েটরের সঙ্গে লড়াই করে সাধারণ মানুষ ও রাজাদের আনন্দ দেন। এটি ছিল মূলত রোমান সাম্রাজ্যের একটি প্রাচীন রীতি। এই রীতি অনুসারে গ্ল্যাডিয়েটররা হাজার হাজার দর্শকের সামনে শুধু যে অন্য যোদ্ধার সঙ্গেই লড়াই করতেন তা নয়। এর বাইরেও বড় আসামি কিংবা হিংস্র বন্যপ্রাণীদের সঙ্গেও লড়াই করতেন গ্ল্যাডিয়েটররা। 

জানেন কি? থাম্বস আপ বা বৃদ্ধা আঙ্গুল দেখানোর প্রচলন গ্ল্যাডিয়েটরদের যুদ্ধক্ষেত্র থেকেই। পরাজিত গ্ল্যাডিয়েটরের ভাগ্য নির্ভর করত এক আঙ্গুলের ইশারার উপর। যুদ্ধক্ষেত্রে গ্ল্যাডিয়েটর যদি ভালো করতেন তো জনগণ তাকে থাম্বস আপ দেখিয়ে প্রশংসা জানাতো। অপরদিকে সম্রাট যদি থাম্বস ডাউন দেখান তার মানে হলো পরাজিত গ্ল্যাডিয়েটরের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা। 

তবে কলোসিয়ামে থাম্ব উপরে বা নীচে কোনোটার তেমন কোনো আলাদা মানে ছিল না। জনগণ যদি গ্ল্যাডিয়েটরকে বাঁচাতে চায় তাহলে তারা তাদের থাম্বটি উপরে রাখবে এবং তা লুকিয়ে। আর যদি তাকে হত্যা করতে চায় তবে সবার সামনে থাম্বস আপ রাখবে। 

ভি সাইন 

ভি সাইন 

আপনি কোনো কিছু অর্জন করলেন বা বিজয়ী হলেন তা জানাতে নিশ্চয় আপনার হাতের তর্জনি আর মধ্যমা উঁচু করে দেখান। যাকে বলে ভি সাইন। এটি মূলত শান্তি বা বিজয়ের প্রতীক। জানেন কি? কবে থেকে এলো ভি সাইন? 

আজিমনকোর্টের যুদ্ধের সময় কিছু তীরন্দাজ শত্রুদের হাতে ধরা পরে। তখন তাদের হাতের তর্জনি আর মধ্যমা বাদে বাকি আঙ্গুল কেটে দেয়া হয়। বেঁচে যাওয়া তীরন্দাজরা তাদের বাকি আঙ্গুল উচু করে শত্রুদের তিরষ্কার করেছিল। আর তখন থেকেই কাউকে তিরষ্কার করতে দুই আঙ্গুলে ভি চিহ্ন দেখানো হত।

এজন্য ১৯০০ সাল থেকে কমনওয়েলথ দেশগুলোতে বিশেষ করে ইংল্যান্ডে এটিকে অপমানজনক অঙ্গভঙ্গি হিসেবে ধরা হত। আর ১৯৪১ সালের জানুয়ারিতে ভি সাইন ব্যবহার করা হত দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রচারনায়। তবে ১৯৬০ সালে ভিয়েতনাম যুদ্ধের চলাকালীন সময় ভি চিহ্ন শান্তির প্রতীক হিসেবে ব্যাপকভাবে গৃহীত হয়। এরপর থেকেই সারাবিশ্বে শান্তি বা বিজয়ের প্রতীক হিসেবেই ব্যবহৃত হচ্ছে।

স্যালুট

স্যালুটএর উৎপত্তি মধ্যযুগে। যখন সৈন্যরা 'স্যালেট' বা ধাতব হেলমেট ব্যবহার করত। তবে কিছু আধুনিক সামরিক ম্যানুয়াল অনুযায়ী, আধুনিক পাশ্চাত্য স্যালুট ফ্রান্সে নাইটদের থেকে এসেছে। তারা বন্ধুত্বপূর্ণ উদ্দেশ্য দেখানোর জন্য একে অপরকে দেখলে স্যালুট ব্যবহার করত। এছাড়াও সেসময় ভিসার অনুমতি বাড়ানোর জন্য বা অনুমতি পাওয়ার জন্য ব্যবহৃত হত স্যালুট।

১৮ এবং ১৯ শতকের দিকে ইউএস আর্মি কোয়ার্টারমাস্টার স্কুল উচ্চপদস্তদের সম্মান জানাতে ব্যবহার করতেন এটি। তবে আমেরিকান বিপ্লবের শেষ মুহূর্তে, একজন ব্রিটিশ সেনা তার টুপি সরিয়ে সালাম করলেন। এরপর ১৮৪৮ সাল থেকে উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাকে অভিবাদন জানাতে সৈন্যরা টুপি খুলে সালাম দেয়া অব্যাহত রেখেছিল। নেপোলিয়োনিকে ব্রিটিশরা যুদ্ধের সময় দুই আঙ্গুল মাথায় ঠেকিয়ে সালাম জানিয়েছিল। 

হাই ফাইভ 

হাই ফাইভ হাতের এই অঙ্গভঙ্গিটি এখন বিশ্বজুড়ে একটি শুভেচ্ছা বা উদযাপন হিসাবে ব্যবহৃত হয়। যুক্তরাষ্ট্রের একটি স্কুলের বেসবলের একটি দল এটি প্রথম শুরু করে। ১৯৭৭ সালে লস অ্যাঞ্জেলেস ডজারস এবং ১৯৭৮ সালে লুইসভিলে কার্ডিনালে তারা তাদের বিজয় উদযাপন করেছিল। তখন তারা হাতের এই অঙ্গভঙ্গিটি ব্যবহার করে। এটি ছিল একজন অন্যজনের সঙ্গে উঁচু করে হাত মেলানো। এরপর থেকেই বিজয় উদযাপন করতে ব্যবহার করা হয় হাই ফাইভ।

সূত্র: হিস্ট্রিএক্সট্রা

ডেইলি বাংলাদেশ/জেএমএস