করোনায় অবহেলা নয়, এমনই এক ‘ফ্লু’ কেড়েছিল ১০ লাখ মানুষের প্রাণ

ঢাকা, বৃহস্পতিবার   ০৪ জুন ২০২০,   জ্যৈষ্ঠ ২১ ১৪২৭,   ১১ শাওয়াল ১৪৪১

Beximco LPG Gas

করোনায় অবহেলা নয়, এমনই এক ‘ফ্লু’ কেড়েছিল ১০ লাখ মানুষের প্রাণ

কানিছ সুলতানা কেয়া ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ১৪:৩৯ ২৭ মার্চ ২০২০   আপডেট: ১৪:৫২ ২৭ মার্চ ২০২০

ছবি: রাশিয়ান ফ্লু

ছবি: রাশিয়ান ফ্লু

পুরো পৃথিবী তখন আক্রান্ত এক মহামারিতে। বলছি ১৮৮৯ সালের কথা। তখন বিশ্বব্যাপী রাশিয়ান ফ্লু এর প্রাদুর্ভাব ছড়িয়ে পড়েছে। বর্তমানে করোনাভাইরাস যেভাবে ২০০ টিরও বেশি দেশে পৌঁছে গেছে ঠিক সেভাবেই রাশিয়ান ফ্লু এর প্রভাবও ছড়িয়ে পড়েছিল সর্বত্র।

শুধু অবহেলার কারণেই সাধারণ জ্বর-ঠাণ্ডা জীবন নাশের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছিল অনেকের। সবাই ভেবেছিল এটি মারাত্মক নয়, সাধারন এক ফ্লু। এই কথাটির জন্যই ১৮৮৮ থেকে ১৮৯০ সালে মহামারি রূপ নিয়েছিল এই রাশিয়ান ফ্লু। যাতে মারা যায় প্রায় ১০ লাখেরও বেশি মানুষ। 

ফ্লুর মাধ্যমে সৃষ্ট প্রথম মহামারি ছিল এটি। একে মহামারি হিসেবে উদ্ভূত আধুনিক ফ্লুও বলা হয়। ১৮৮৮ সালে প্রথম সাইবেরিয়া ও কাজাখস্তানে এই ফ্লু দেখা দেয়। পরে মস্কো হয়ে ফিনল্যান্ড ও পোল্যান্ডে তা ছড়িয়ে পড়ে। আর রাশিয়ায় ১৮৮৯ সালের মে মাসে প্রথম দেখা দেয় এ ফ্লু। এই রোগে আক্রান্ত ব্যক্তি ছিলেন রাশিয়ার বোখারার অধিবাসী। 

সেসময় এই ফ্লুতে রাশিয়ার অনেকেই, বেলজিয়ামের রাজা, জার্মানির সম্রাটসহ বিশ্বের ১৫ শতাংশ মানুষ আক্রান্ত হন। মাত্র কয়েক মাসের মধ্যেই এ ফ্লু পৃথিবীর প্রায় প্রতিটি অঞ্চলে ছড়িয়ে পরে। এক পর্যায়ে ইউরোপেও দেখা দেয় এই মহামারি। এই ফ্লু ১৮৮৮ সালের অক্টোবর থেকে ১৮৯০ এর ডিসেম্বর পর্যন্ত ছিল। এরপর ১৮৯১ সালের মার্চ থেকে জুন, নভেম্বর, ১৮৯২ সালের জুন এবং ১৮৯৩, ১৮৯৪ এবং সবশেষ ১৮৯৫ সালে কিছু সময়ের জন্য এ ফ্লু দেখা গিয়েছিল। এটিকে রাশিয়ান বা এশিয়ান ফ্লুও বলা হয়।  

পরবর্তীতে বিজ্ঞানীরা এর ছড়িয়ে পড়ার উপায় খুঁজতে গিয়ে দেখেন, এটি বাতাস বা অন্য কোনো উপায়ে নয় বরং মানুষের যোগাযোগের মাধ্যমেই ছড়িয়েছিল। সেসময় যোগাযোগের অন্যতম মাধ্যম ছিল সমুদ্র। এছাড়াও রাস্তা এবং রেলপথের মাধ্যমে এক অঞ্চল থেকে অন্য অঞ্চলে ছড়িয়ে পরে এ মহামারি। মানুষের যোগাযোগের মাধ্যমে এটি শহর থেকে শহর, দেশ থেকে দেশে স্বাচ্ছ্যন্দে ছড়িয়ে পড়েছিল। 

সমুদ্র পেড়িয়ে ১৮৮৯ সালে উত্তর আমেরিকা ও আফ্রিকা অঞ্চলেও ছড়িয়ে পড়েছিল রাশিয়ান ফ্লু। শীর্ষস্থানীয় ইউরোপীয় নেতারা এই রোগে অসুস্থ হয়ে পড়ার পর মহামারি সম্পর্কে জানতে পারে দেশটি। সেখানকার সংবাদপত্রগুলো তখন বার্লিন, ব্রাসেলস, লিসবন, লন্ডন, প্যারিস, প্রাগ, ভিয়েনা এবং অন্যান্য শহরের পাশাপাশি এ ফ্লুর দৈনিক আপডেট দিতে থাকে। এরপরও এ সংবাদটি মার্কিনরা যেন আমলেই নিল না। তারা নিজেদের রেলপথ এবং যোগাযোগের সব পথই উন্মুক্ত রেখেছিল। ফলে পরিণাম খুব ভয়াবহ আকার ধারণ করে। এর কয়েক সপ্তাহ পরই এটি ইউরোপের দেশগুলোতে ছড়িয়ে পড়ে। 

নিউইয়র্ক এবং অন্যান্য পূর্ব উপকূল বন্দর শহরে ১৪ থেকে ৫০ বছর বয়সী একটি ম্যানহাটনের পরিবারের সাত সদস্য এতে আক্রান্ত হয়। তাদের পরিবারের সবাই হঠাৎ করে অসুস্থ হয়ে পড়ে। সবারই ঠাণ্ডা লাগা এবং মাথাব্যথা দিয়ে শুরু এরপর গলা ব্যথা, ল্যারঞ্জাইটিস এবং ব্রঙ্কাইটিসে আক্রান্ত হন। এগুলো ছিল রাশিয়ান ইনফ্লুয়েঞ্জার লক্ষণ। 

অন্যদিকে বিশেষজ্ঞরাও রাশিয়ান ইনফ্লুয়েঞ্জাকে হালকাভাবেই নিলেন। তারা একে মৌসুমী ফ্লু’র মতোই ভেবেছিলেন।এমনকি নিউইয়র্কের ইভিনিং ওয়ার্ল্ড নামক একটি জাতীয় পত্রিকাও ঘোষণা করেছিল, এটি মারাত্মক নয় এমনকি তেমন বিপজ্জনকও নয়। তাই জনসাধারনও এতে কোনো সাবধানতা অবলম্বন করেনি। আর তাতেই ঘটল বিপত্তি। মহামারির মতো চারদিকে ছড়িয়ে যেতে থাকল রাশিয়ান ফ্লু। 

প্রথম মৃত্যু 

২৮ ডিসেম্বর ২৫ বছর বয়সী টমাস স্মিথ নামের এক ব্যক্তি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ম্যাসাচুসেটস মারা যায়। সংবাদপত্রে তার মৃত্যুর জন্য সাধারণ সর্দি এবং নিউমোনিয়াকেই দায়ী করে। তবে এরপরেই বোস্টনের এক বিশিষ্ট ব্যাংকারও আত্মহত্যা করেন। 

তবে মৃত্যুর সংখ্যা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে আমেরিকানরা বিষয়টিকে গুরুত্ব দিতে শুরু করে। ১৮৯০ সালের জানুয়ারির প্রথম সপ্তাহে নিউইয়র্কে মারা যান এক হাজার ২০২ জন। নিউইয়র্ক ট্রিবিউন জানায়, ফুসফুস এবং হৃদরোগ বা কিডনির সমস্যায় আক্রান্ত ব্যক্তিরাই সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্থ হয়। আর অনেক ক্ষেত্রে ইনফ্লুয়েঞ্জা দ্রুত নিউমোনিয়ায় রূপ নেয়।

১৮৯০ সালের ফেব্রুয়ারির শুরুতে নিউইয়র্ক সিটিতে সর্বাধিক মৃতের সংখ্যা রেকর্ড করা হয়। সেখানে এ ফ্লুতে মারা যায় দুই হাজার ৫০৩ জন। ইউএস সেন্সাস অফিস অনুযায়ী, বিশ্বব্যাপী প্রায় এক মিলিয়নের মধ্যে মোট মার্কিন মৃত্যুর সংখ্যা ১৩ হাজারের কাছাকাছি। ১৮৯০ সালের শেষ নাগাদ এই রোগে প্রায় তিন লাখ ৬০ হাজার মানুষের মৃত্যু হয়।

রোগটির বিস্তারে অন্তর্দেশীয় হিসেবে সাহায্য করে যুক্তরাষ্ট্রের সুবিশাল রেলপথ নেটওয়ার্ক। শিকাগো, ডেট্রয়েট, ডেনভার, কানসাস সিটি, লস অ্যাঞ্জেলেস, সান ফ্রান্সিসকো এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অন্যান্য শহরগুলোতে ফ্লু এভাবেই ছড়িয়ে পড়ে। লস অ্যাঞ্জেলেসে এই ফ্লুতে আক্রান্ত এক ব্যক্তি তার অভিজ্ঞতা গণমাধ্যমে তুলে ধরে বলেন, আমি অনুভব করলাম যেন কেউ আমাকে মারধর করছে এরপর যেন বরফের মধ্যে ডুবে গেলাম। 

তবে রাশিয়ান ফ্লু পুরোপুরি শেষ হয়নি। পরবর্তী বছরগুলোতে এটি বেশ কয়েকবার দেখা দিয়েছিল। রাশিয়ান ফ্লুর অনেকটাই ভুলিয়ে দিয়েছিল ১৯১৮ সালের বিধ্বংসী স্প্যানিশ ফ্লু। যেটি আরো বেশি মহামারি হয়ে দেখা দিয়েছিল। এতে বিশ্বজুড়ে মারা গিয়েছিল প্রায় ১০ কোটি মানুষ।

ডেইলি বাংলাদেশ/জেএমএস