করোনাভাইরাস থেকে মুক্তি পেতে তওবার তাৎপর্য ও উপকার

ঢাকা, মঙ্গলবার   ২৬ মে ২০২০,   জ্যৈষ্ঠ ১৩ ১৪২৭,   ০৩ শাওয়াল ১৪৪১

Beximco LPG Gas

করোনাভাইরাস থেকে মুক্তি পেতে তওবার তাৎপর্য ও উপকার

শহীদুল ইসলাম ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ১৭:৪৮ ৩১ মার্চ ২০২০  

জীবনে গুরুত্বপূর্ণ একটি পরিবর্তন হচ্ছে তওবা ইস্তেগফার করার অনুভূতি তৈরি হওয়া।

জীবনে গুরুত্বপূর্ণ একটি পরিবর্তন হচ্ছে তওবা ইস্তেগফার করার অনুভূতি তৈরি হওয়া।

তওবা ও ইস্তেগফার দোয়ার বিশেষ একটি প্রকার। ইস্তেগফার হচ্ছে আল্লাহর কাছে নিজের ভুল-ত্রুটিগুলোর স্বীকার করে, তা ক্ষমার জন্য দোয়া করা। তওবার হাকিকত হলো, বান্দা দ্বারা যে গোনাহ, সীমালঙ্ঘন বা অপছন্দনীয় কাজ হয় আল্লাহর আজাবকে ভয় করে তা থেকে বিরত থাকা। অতিতের কৃতকর্মের জন্য লজ্জিত হওয়া। সঙ্গে সঙ্গে দৃঢ় প্রত্যয় গ্রহণ করা যে, ভবিষ্যতে এ রূপ কখনো করবো না। সর্বদা আল্লাহর হুকুম মেনে জীবন যাপন করবো। তার সন্তুষ্টিকে সর্বক্ষেত্রে প্রাধান্য দেব।

কোরআন ও হাদিসে বারবার তওবা-ইস্তেগফারের যে নির্দেশ এসেছে, তার মর্ম এটাই। তাই মুখে মুখে ‘তওবা তওবা’ বলাকে প্রকৃত অর্থে তওবা বলা যায় না। তসবিহ নিয়ে অন্যান্য জিকিরের ন্যায় তওবার জিকির করাও যথেষ্ট নয়। এর জন্য আবশ্যক হচ্ছে আল্লাহর দিকে প্রত্যাবর্তন করা। জীবনটাকে পাল্টে দেয়া।

জীবনে গুরুত্বপূর্ণ একটি পরিবর্তন হচ্ছে তওবা ইস্তেগফার করার অনুভূতি তৈরি হওয়া। এটা কারো কারো মাঝে আসে আল্লাহ তায়ালা হেদায়েতের আলো ঢেলে দেয়ার দ্বারা। আবার কেউ পরিস্থিতির শিকার হয়ে তওবা করেন। কেউ গজবে পরে তাওবা করেন। পরবর্তীতে ইখলাসের কারণে প্রকৃত তওবা নসিব হয়। তওবা যেভাবেই হোক আল্লাহর কাছে কোনোটাই কম দামি নয়। আল্লাহ তায়ালা চান বান্দা তার দিকে ফিরে আসুক। হাদিসে এমন কথাও এসেছে মানুষ যদি ভুল না করতো তাহলে আল্লাহ তায়ালা এমন জাতিকে সৃষ্টি করতেন যারা ভুল করতো এবং তওবা করে তার দিকে ফিরে আসতো।

তওবা ও মুহাম্মাদ (সা.) এর অনুসরণের মধ্যে উম্মতের নিরাপত্তা :

হজরত ইবনে আব্বাস (রা.) এর থেকে, ইবনে আবি হাতিম বর্ণনা করেছেন যে, ‘আল্লাহ তায়ালা এই উম্মতের জন্য দু’টি নিরাপত্তা ব্যবস্থা দিয়েছেন। তাদের মাঝে যতক্ষণ এই ব্যবস্থা বিদ্যমান থাকবে আল্লাহ তায়ালা তাদেরকে আজাব থেকে হেফাজত করবেন। তবে একটি ব্যবস্থা ইতোমধ্যে আল্লাহ তায়ালা উঠিয়ে নিয়েছেন। অন্যটি এখনো বিদ্যমান আছে। (তাফসিরে ইবনে কাছির, সূরা আনফাল-৩৩ নম্বর আয়াতের তাফসির)। যে ব্যবস্থা উঠিয়ে নেয়া হয়েছে তা ছিলো স্বয়ং মুহাম্মাদ (সা.)। তিনি যতদিন বিদ্যমান ছিলেন, আল্লাহ তায়ালা উম্মতকে সব রকম বিপদাপদ থেকে হেফাযত করেছেন। রাসূল (সা.) এর অস্তিত্ব এই উম্মতের জন্য যেমন নিরাপত্তা ব্যবস্থা হিসেবে ছিলো, তার আদর্শের অনুসরণও উম্মতের জন্য একটা নিরাপত্তা ব্যবস্থা। তাই এখন আমরা যদি তার আদর্শগুলোকে নিজেদের জীবনে আকড়ে ধরি তাহলে অনেক বিষয় থেকে নিরাপদ থাকতে পারবো।

মুহাম্মাদ (সা.) শুধু মুসলমানের জন্য নিরাপত্তা ব্যবস্থা ছিলেন এমন নয়। বরং তার অস্তিত্ব কাফেরদের জন্যও নিরাপত্তা ব্যবস্থা হিসেবে ছিলো। একদিন মক্কার মুশরিক সম্প্রদায় আল্লাহর কাছে দোয়া করলো, হে আল্লাহ! মুহাম্মাদ যদি সত্য নবী হয়ে থাকে তাহলে আকাশ থেকে পাথরের বৃষ্টি আমাদের উপর বর্ষণ করুন। তাদের বক্তব্য এটা হলেও মনের অবস্থা ছিলো ভিন্ন। মনে মনে তারা বিশ্বাস করতো মুহাম্মাদ (সা.) সত্য নবী। তাই দোয়ার পর তাদের হুশ ফিরলো। ভাবতে লাগলো আল্লাহ যদি দোয়া বাস্তবায়ন করেন তাহলে আমাদের রক্ষা নেই। তখন লজ্জিত হয়ে তারা ইস্তেগফার পড়া আরম্ভ করলো। সেই পরিপ্রেক্ষিতে আল্লাহ তায়ালা নাজিল করেন, ‘আল্লাহ তায়ালা তাদেরকে আজাব দেবেন না যতদিন আপনি তাদের মাঝে আছেন। এবং আল্লাহ তায়ালা তাদেরকে আজাব দেবেন না যতদিন তারা ইস্তেগফার পড়ে।’ (সূরা আনফাল-৩৩)। অনেক মুফাস্সিরের মত হচ্ছে, ইসলামের শুরুলগ্নে এই বিধান ছিলো যে, ইস্তেগফার দ্বারা কাফেররাও নিজেদেরকে নিরাপদ রাখতে পারতো। কিন্তু পরবর্তীতে আল্লাহ তায়ালা সে বিধান রহিত করে দিয়েছেন। এখন তারা ইস্তেগফার পড়লেও আজাব আল্লাহর বিপদাবদ থেকে রক্ষা পাবে না।

বান্দার তওবার গুরুত্ব :

আল্লাহ তায়ালা বান্দার তওবাকে কতটুকু গুরুত্ব দেন তা স্পষ্ট। এক হাদিসে এসেছে, ইমাম আহমদ ও হাকেম (রাহ.) হজরত আবু সাইদ খুদরী (রা.) এর সূত্রে হাদিসটি বর্ণনা করেছেন। হাদিসের মর্ম হলো, শয়তান জান্নাত থেকে বিতাড়িত হওয়ার পর আল্লাহর কাছে কিছু বিষয়ের জন্য আবেদন করে ছিল। একটি হচ্ছে, শয়তান আল্লাহর ইজ্জতের কসম খেয়ে বলেছিলো, হে রব! তোমার বান্দাদের মাঝে যতক্ষণ প্রাণ থাকবে আমি তাদেরকে পথভ্রষ্ট করতে থাকবো। আল্লাহ তায়ালা তার সে আবেদন মঞ্জুর করেছিলেন। সঙ্গে সঙ্গে এও বলে দিয়েছিলেন, আমিও তাদেরকে ক্ষমা করতে থাকবো যতবার তারা তওবা করবে। (আল মুসতাদরাক লিল হাকিম, হাদিস নম্বর-৭৬৭২)। আল্লাহ তায়ালা বান্দাকে ক্ষমা করার জন্য ছুতা খুঁজেন। সামান্য আমলের দ্বারা বান্দাকে নাজাত দিয়ে দেন। আমল সামান্য হলেও তা একমাত্র আল্লাহর জন্য হতে হবে। যে আমলে আল্লাহর সঙ্গে শিরক করা হয় তা কখনো গ্রহণযোগ্য নয়।

তওবা আজাব থেকে নিরাপদ রাখে :

হজরত ফুযালা ইবনে উবাইদুল্লাহ (রা.) এর সূত্রে বর্ণিত, নবী করিম (সা.) বলেন, ‘বান্দা আল্লাহর আজাব থেকে নিরাপদ থাকে যতক্ষণ সে আল্লাহর দরবারে তওবা-ইস্তেগফার পড়ে। (মুসনাদে আহমদ-খন্ড-২০, পৃষ্ঠা-৬)। তওবার দ্বারা শুধু মুখে ‘তওবা তওবা’ বলা উদ্দেশ্য কখনোই নয়। বরং তওবার দ্বারা উদ্দেশ্য নিজের অবস্থার পরিবর্তন, যা আমরা পূর্বে উল্লেখ করেছি। তাই সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে ছড়িয়ে পড়া অনাচার ও অনৈতিক কর্মকাণ্ড থেকে আমাদের ফিরে আসতে হবে। এবং মনেপ্রাণে আল্লাহর কাছে তওবা করতে হবে।

তওবা ও পার্থিব অন্যান্য উপকার :  

আল কোরআনের ভাষায়, ‘অতঃপর আমি বলেছি, তোমরা তোমাদের রবের কাছে তওবা কর। তিনি অত্যন্ত ক্ষমাশীল। তিনি তোমাদের উপর মুষলধারে বৃষ্টি বর্ষণ করবেন। তোমাদের ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততি বাড়িয়ে দেবেন, তোমাদের জন্য উদ্যান স্থাপন করবেন এবং তোমাদের জন্য নদী-নালা প্রবাহিত করবেন।’ (সূরা নুহ-১১-১৩)।

উক্ত আয়াতদ্বয়ে নুহ (আ.) নিজ সম্প্রদায়কে তওবার দাওয়াত দিয়ে, এর উপকারিতার কথা বুঝিয়েছেন। তওবার প্রথম ফায়দা হচ্ছে, অতিতের গুনাহ ক্ষমা করে দেয়া। বৃষ্টি না হলে আল্লাহ তায়ালার কাছে তওবা-ইস্তেগফার করলে তিনি বৃষ্টি দেবেন। ধন-সম্পদ দিবেন। দুর্ভিক্ষ হতে রক্ষা করবেন। কারো সন্তান না থাকলে তাকে সন্তান দান করবেন। সন্তান থাকলে তাদেরকে নেক সন্তান হিসেবে গড়ে তুলবেন। তবে কোথাও ব্যতিক্রমও হতে পারে। নদী-নালা প্রবাহের ব্যবস্থা করবেন। প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের জন্য প্রয়োজন তওবা করা। তাফসিরে মারেফুল কোরআনে উক্ত আয়াতের ব্যাখ্যায় লেখা হয়েছে, ‘তওবা-ইস্তেগফার দ্বারা পার্থিব বিপদাপদ দূর হয়ে যাওয়া সাধারণ মানুষের ক্ষেত্রে আল্লাহ তায়ালার রীতি।’ (তাফসিরে মারেফুল কোরআন-১৪০৭)। 

জরত ইউনুস (আ.) আল্লাহর নির্দেশ আসার আগেই নিজ এলাকা ছেড়ে চলে গিয়েছিলেন। নবীদের ক্ষেত্রে এটা এক রকমের ভুল। আল্লাহ তায়ালা তাকে পরীক্ষায় ফেলে মাছের পেটে দিলেন। তখন সে দোয়ায়ে ইউনুস পড়ে মুক্ত হলেন। এটাও মূলত তওবাই।

আল্লাহর রহমতের জন্য তওবা-ইস্তেগফার :

রাসূল (সা.) আল্লাহর তায়ালার কাছে দোয়া করতেন হে আল্লাহ! ক্ষণিকের জন্যও আমাকে নিজের ওপর হাওয়ালা করে দেবেন না।’ অর্থাৎ আপনার রহমতের ছায়াতলে আমাকে রেখে জীবন যাপনের ব্যবস্থা করে দেবেন। মানুষ প্রতিটি মুহূর্তে আল্লাহর রহমতের মুখাপেক্ষী। গোনাহের কারণে মানুষ আল্লাহর রহমত থেকে বিরত হয়। তওবা-ইস্তেগফার দ্বারা মানুষের উপর আল্লাহর রহমত নাজিল হয়। আল কোরআনে হজরত সালেহ (আ.) এর কওমের ঘটনা বিবৃত হয়েছে এভাবে, ‘হে আমার সম্প্রদায়! তোমরা কল্যাণ লাভের আগে এত দ্রুত অকল্যাণ কামণা করছো কেন? তোমরা যদি আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাও সম্ভবত তোমরা দয়াপ্রাপ্ত হবে।’ (সূরা নামল-৪৬)। এখন আমাদের কর্তব্য হলো অধিক পরিমাণ তওবা ও ইস্তেগফার পড়া। তাহলে আল্লাহর রহমত নাজিল হবে। তার করুণায় সিক্ত হয়ে আমরা করোনাসহ সব বিপদাপদ থেকে রক্ষা পাবো। 

তওবা ইস্তেগফার দ্বারা বান্দার মর্যাদা বৃদ্ধি পায় :

হাবশার বাদশা ছিলেন নাজাশি। সে মারা যাওয়ার পর রাসূল (সা.) তার জানাযা পড়লেন এবং সাহাবায়ে কেরামকে নির্দেশ দিলেন, তোমরা তোমাদের এই ভায়ের জন্য ইস্তেগফার পড়ো। তাহলে আল্লাহ তায়ালা তার মর্যাদা বৃদ্ধি করে দেবেন। হাদিসে এসেছে, আখেরাতে কনো কনো বান্দার মর্যাদা বৃদ্ধি করে দেয়া হবে। তখন বান্দা বলবে, হে আল্লাহ! আমি তো দুনিয়াতে এত আমল করিনি। আল্লাহ তায়ালা বলবেন, এটা তোমার সন্তানের ইস্তেগফারের বদলায় তোমাকে দেয়া হয়েছে। তাই জীবিতদের কর্তব্য হলো মৃতদের মাফের জন্য দোয়া করা। এর দ্বারা শুধু মৃতের মর্যাদা বৃদ্ধি পাবে না বরং জীবিতের মর্যাদাও আল্লাহর কাছে বৃদ্ধি পাবে।

তওবা দ্বারা পেরেশানি দূর হয় :

হজরত ইবনে আব্বাস (রা.) এর সূত্রে, নবী করিম (সা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, যে ব্যক্তি নিজের ওপর ইস্তেগফার পড়াকে আবশ্যক করে নেবে, আল্লাহ তায়ালা তাকে পেরেশানি থেকে মুক্তি দেবেন। এবং তাকে এমন স্থান থেকে রিজিক দেবেন, যা সে কল্পনাও করতে পারবে না। (আল মুসতাদরাক লিল হাকিম-খন্ড-৪, পৃষ্ঠা-২৬২)। দুনিয়াতে বহু মানুষ এর ফায়দা পেয়েছেন। আল্লাহ তায়ালা বান্দার সঙ্গে তার বিশ্বাসের দৃঢ়তা অনুযায়ী মুআমালা করেন। যার বিশ্বাস যত দৃঢ় হবে, ফলাফল সে তত বেশি পাবে। দুর্বল বিশ্বাসের লোকেরা ফল কমই পেয়ে থাকে।

ইসলাম হচ্ছে স্বভাবজাত একটি ধর্ম। দ্বীনি ও জাগতিক বিষয়ে ইসলামের চিন্তা খুবই যৌক্তিক। বর্তমানে বিশ্বের করোনাভাইরাসের কারণে সর্বত্র আতঙ্ক বিরাজ করছে। এক্ষেত্রে ইসলামের নির্দেশনা হলো, সুস্থ থাকা বা রোগ থেকে সুস্থ হওয়ার জন্য সর্বোচ্চ চেষ্টা করে যেতে হবে। সঙ্গে সঙ্গে তওবা করে মহান সৃষ্টিকর্তার দিকে ফিরে আসতে হবে। তিনি হচ্ছেন সব কিছুর মালিক ও নিয়ন্ত্রক।

ডেইলি বাংলাদেশ/আরএজে