Alexa কম্পিউটারের সেকাল-একাল

ঢাকা, মঙ্গলবার   ২২ অক্টোবর ২০১৯,   কার্তিক ৬ ১৪২৬,   ২২ সফর ১৪৪১

Akash

কম্পিউটারের সেকাল-একাল

ফিচার ডেস্ক ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ১২:২৫ ৩ অক্টোবর ২০১৯   আপডেট: ১২:৩০ ৩ অক্টোবর ২০১৯

ছবি: সংগৃহীত

ছবি: সংগৃহীত

সারা বিশ্বে কম্পিউটারের রয়েছে ব্যাপক চাহিদা। বর্তমান যুগ কম্পিউটার ছাড়া প্রায় অচল। দৈনন্দিন কাজে প্রতেকেই কমবেশি কম্পিউটার ব্যবহার করে থাকি। আমাদের জীবনে কম্পিউটারের গুরুত্ব বলে শেষ করা যাবে না। আর এই কম্পিউটারের অতীত থেকে বর্তমান অনেকেরই অজানা।

বর্তমানে প্রত্যেকেই যে কম্পিউটার ব্যবহার করছি তা কিন্তু প্রথম থেকেই এমনটা হয়ে আসেনি। একটু ভেবে দেখুন তো, বর্তমানে আমরা যে কম্পিউটার ব্যবহার করছি তার আকার যদি হয় বড় কোনো রুমের সমান! তাহলে কেমন হবে।  হ্যাঁ, ঠিক এমনই ছিল প্রথম প্রজন্মের কম্পিউটারগুলো। 

বর্তমানে আমরা যে কম্পিউটার ব্যবহার করি তার কোনো তাত্ত্বিক ও ব্যবহারিক অস্তিত্বই ছিল না। তখন কম্পিউটার বলতে অনেকগুলো যন্ত্রের সমাহার বোঝাতো যা একটি রুমের পুরোটা জুড়েই সাজানো থাকতো। পরবর্তীতে হাজার হাজার মানুষের অক্লান্ত পরিশ্রম, গবেষণা এবং অবদানের ফসল হিসেবে আমরা পেয়েছি আজকের দিনের কম্পিউটার।

আধুনিক কম্পিউটারের রূপরেখা তৈরি করেন ব্রিটিশ গণিতবিদ চার্লস ব্যাবেজ। ১৯৪০ সাল থেকে আজ পর্যন্ত কম্পিউটারের যাত্রা বা অগ্রগতির যে ইতিহাস রয়েছে, তার ভিত্তিতে বিজ্ঞানীরা এটিকে পাঁচটি প্রজন্মে ভাগ করেছেন। তাহলে জেনে নিন কম্পিউটার যাত্রার এই প্রজন্মগুলো সম্পর্কে-

প্রথম প্রজন্ম: ভ্যাকুয়াম টিউব (১৯৪০-১৯৫৬)

প্রথম প্রজন্ম: ভ্যাকুয়াম টিউব (১৯৪০-১৯৫৬)
আগেই বলা হয়েছে, বর্তমান কম্পিউটার বলতে যে যন্ত্রটি বোঝায় তা কিন্তু আজকের অবস্থায় ছিল না। তখন কম্পিউটার অর্থ ছিল বেশ কয়েকটি ছোট-বড় যন্ত্রের সমষ্টি। আর এই কম্পিউটার রাখতে একটি বড় রুম লাগত। সার্কিট হিসেবে ব্যবহার করার জন্য বড় বড় ভ্যাকুয়াম টিউবের (Vacuum Tube) দরকার পড়তো। মেমোরির জন্য ব্যবহৃত হতো অনেকগুলো ম্যাগনেটিক ড্রাম। 

এই কম্পিউটার রক্ষণাবেক্ষণ করাও অত্যন্ত খরচ সাপেক্ষ ছিল। কেননা প্রচুর পরিমাণে বিদ্যুৎ শক্তির দরকার পড়তো যন্ত্রগুলো চালানোর জন্য। এছাড়া প্রচুর পরিমাণে তাপ উৎপন্ন হওয়ার কারণে প্রায়ই বিকল হয়ে যেত এই কম্পিউটার।

পুরোপুরি যান্ত্রিক ভাষার (Machine Language) উপর নির্ভরশীল ছিল তখনকার কম্পিউটার সেবা। প্রোগ্রামিং ভাষা এতটাই প্রাথমিক স্তরের ছিল যে একের বেশি কমান্ড বা নির্দেশনা প্রদান করা সম্ভবই ছিল না। ফলে একটি নির্দিষ্ট সময়ে একটির বেশি সমস্যার সমাধান করা সম্ভব হতো না। 

কম্পিউটার অপারেটরকে দিন, সপ্তাহ, এমনকি কোনো কোনো ক্ষেত্রে মাসও পার করতে হতো কোনো নতুন সমস্যার ইনপুট দিতে। পাঞ্চ কার্ড এবং কাগজভিত্তিক হতো সেসব ইনপুট। প্রিন্ট করা কাগজের মাধ্যমেই বেরিয়ে আসত সমস্যার সমাধান।                                                                                                                                    
UNIVAC (উনিভ্যাক) এবং ENIAC(এনিয়াক) ছিল প্রথম প্রজন্মের দুটি কম্পিউটার। মার্কিন দপ্তর তাদের গণনা কাজের জন্য ১৯৫১ সালে UNIVAC কম্পিউটারের ব্যবহার শুরু হয়। এটিই ছিল বাণিজ্যিক ভিত্তিতে বিক্রিত প্রথম কম্পিউটার।

দ্বিতীয় প্রজন্ম: ট্রানজিস্টর (১৯৫৬-১৯৬৩)

দ্বিতীয় প্রজন্ম: ট্রানজিস্টর (১৯৫৬-১৯৬৩)
কম্পিউটারের দ্বিতীয় প্রজন্মের পুরোটা জুড়েই রয়েছে ট্রানজিস্টরের জয়গান। প্রথম প্রজন্মের শেষের দিকে এসে ১৯৪৭ সালে বেল ল্যাবে (Bell Labs) ট্রানজিস্টার আবিষ্কৃত হয়। যা ৫০’এর দশকের শেষে ব্যাপক জনপ্রিয়তা পায়। এ সময় ভ্যাকুয়াম টিউবের পরিবর্তে বানিজ্যিক কাজে ট্রানজিস্টরের ব্যবহার শুরু হয়।

ট্রানজিস্টরের ব্যবহার কম্পিউটারের জগতে এক পরিবর্তনের সূচনা করে। কম্পিউটারের আকার, আয়তন, গতি, মূল্য সবক্ষেত্রেই সুবিধাজনক এক পরিবর্তন আসে। তারপরও প্রচুর পরিমাণে তাপ উৎপন্ন হবার সমস্যাটি থেকেই গেল। 

এ সময় বাইনারি যান্ত্রিক ভাষার পরিবর্তে সাংকেতিক ভাষার প্রচলন শুরু হল। Assembly (অ্যাসেম্বলি) নামের এই কম্পিউটার ভাষা আসার ফলে প্রোগ্রামাররা নির্দেশনা প্রদানের ক্ষেত্রে অনেক বেশি সুবিধা পেতে শুরু করলেন। কম্পিউটারকে নির্দেশনা প্রদানের জন্য COBOL (কবল) এবং FORTRAN (ফরট্রান) নামক প্রাথমিক পর্যায়ের প্রোগ্রামিং ভাষা তৈরি হয়। কম্পিউটারের স্মৃতি বা মেমোরির ক্ষেত্রে ম্যাগনেটিক ড্রামের বদলে ম্যাগনেটিক কোরের ব্যবহার সূচনা করলো একটি স্টোরেজের মাধ্যমে।

তবে এই প্রজন্মের প্রথম দিকের কম্পিউটারগুলো মূলত পারমাণবিক শক্তি শিল্পে ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়েছিল।

তৃতীয় প্রজন্ম: সার্কিট (১৯৬৪-১৯৭১)

তৃতীয় প্রজন্ম: সার্কিট (১৯৬৪-১৯৭১)
তৃতীয় প্রজন্মে ট্রানজিস্টরের আকার ও আয়তন ক্ষুদ্র থেকে ক্ষুদ্রতর হতে শুরু করে। অনেকগুলো ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ট্রানজিস্টরের সমষ্টি হিসেবে তৈরি করলো সিলিকন চিপ। যা সেমিকনডাক্টর (Semiconductor) নামে পরিচিতি পেল। এই ‘সমষ্টিগত সার্কিটের ব্যবহার’ গতি ও কার্যদক্ষতার ক্ষেত্রে কম্পিউটারের ধারণা পুরোপুরি বদলে দেয়।

পাঞ্চ কার্ড ও কাগজে ছাপানো ব্যবস্থার পরিবর্তে কম্পিউটারের জগতে এলো কি-বোর্ড, মনিটর এবং কম্পিউটার চালানোর জন্য একটি অপারেটিং সিস্টেম (Operating System)। এর ফলে একসঙ্গে একটির বদলে কয়েকটি অ্যাপ্লিকেশন চালানোর ব্যবস্থা হলো। সেখানে অপারেটিং সিস্টেমটি একটি কেন্দ্রীয় ব্যবস্থাপনা হিসেবে মেমোরিকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারত। আগের তুলনায় কম্পিউটারের আকার, আয়তন অনেকটা ব্যক্তিবান্ধব হয়ে ওঠে।

চতুর্থ প্রজন্ম: মাইক্রোপ্রসেসর (১৯৭১ – বর্তমান)

চতুর্থ প্রজন্ম: মাইক্রোপ্রসেসর (১৯৭১ – বর্তমান)
কম্পিউটারের চতুর্থ প্রজন্মের ইতিহাস মানে অনেকটা আধুনিক কম্পিউটারের ইতিহাস। প্রথম প্রজন্মে যে বড় বড় যন্ত্রগুলোর জন্য একটা ঘরের দরকার পড়তো, তার বদলে দেখা মিলল একটা ছোট মাইক্রোপ্রসেসরের (Microprocessor)। যা হাতের তালুতেই রাখা যায়। কম্পিউটারের সবচেয়ে বড় সাফল্য আসে মাইক্রোপ্রসেসর আবিষ্কারের ফলে। 

হাজার হাজার সমষ্টিগত সার্কিট একটি ছোট সিলিকন চিপের মাধ্যমে তৈরি হল এই মাইক্রোপ্রসেসর। ১৯৭১ সালে ‘ইন্টেল ৪০০৪ চিপ’ নামে বাজারে এলো মাইক্রোপ্রসেসর। যা শুধুমাত্র একটি চিপের সাহায্যে সিপিইউ, মেমোরি এবং যাবতীয় সব ইনপুট ও আউটপুট নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। 

এর ফলে কম্পিউটার হয়ে যায় একটি টেলিভিশনের মতো। এতে কম্পিউটারের দাম চলে আসে হাতের নাগালে, ব্যবহারের সুবিধা বেড়ে যায় ও কাজের ক্ষমতা বেড়ে হয় হাজার হাজার গুণ। এটি দিয়ে তৈরি কম্পিউটারই হল আজকের ব্যক্তিগত কম্পিউটার (Personal Computer)।

১৯৮১ সালে আইবিএম (IBM) নামক কোম্পানি ব্যক্তিগত পর্যায়ে ব্যবহার করার জন্য প্রথম কম্পিউটার বাজারে ছাড়ল। এর দু’বছর পরেই ম্যাকিন্টশ (Macintosh) নিয়ে বাজারে আসলো অ্যাপল কোম্পানি। শুধু ডেক্সটপ কম্পিউটার নয়, মাইক্রোপ্রসেসরের ব্যবহার শুরু হল দৈনন্দিন জীবনে ব্যবহার করা প্রায় প্রতিটি যন্ত্রে। মাইক্রোপ্রসেসর বদলে দিল পুরো ইলেকট্রনিক্স দুনিয়া।

এই সময়ে ছোট আয়তনের কম্পিউটার তৈরি নিয়ে গবেষণা শুরু হল। অফিসে ব্যবহৃত কম্পিউটারগুলোকে একত্র করার জন্য তৈরি হল একটি নেটওয়ার্ক ব্যবস্থা। পরবর্তীতে এই নেটওয়ার্কের মাধ্যমেই তৈরি হল ইন্টারনেট। যা আজ আমাদের জীবনের এক অপরিহার্য অংশ।

পঞ্চম প্রজন্ম: কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (বর্তমান ও ভবিষ্যৎ)

পঞ্চম প্রজন্ম: কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (বর্তমান ও ভবিষ্যৎ)
কম্পিউটারের পঞ্চম প্রজন্ম অর্থাৎ বর্তমান সময়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (Artificial Intelligence) নিয়ে ব্যাপক গবেষণা শুরু হয়েছে। আমাদের দৈনন্দিন জীবনে ব্যবহৃত কম্পিউটার ও মোবাইলে কীভাবে এই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা কাজে লাগানো যায় তা নিয়ে শুরু হলো গবেষণা। আর যার ফল হচ্ছে ‘ভয়েস রিকগনিশন’ বা কণ্ঠস্বরের সাহায্যে কমান্ডিং। মাইক্রোসফট, গুগল এবং অ্যাপলের মতো কোম্পানি তাদের পিসি এবং স্মার্টফোনে সার্থকতার সঙ্গে এই সুবিধা প্রদান করছে। প্যারালাল প্রসেসিং (Parallel Processing) মুহূর্তের মধ্যে অনেকগুলো কাজ একসঙ্গে করতে সাহায্য করছে।

এছাড়া বর্তমান সময়ে বিজ্ঞানীরা কোয়ান্টাম কম্পিউটেশন, মলিকুলার এবং ন্যানোটেকনোলজি নিয়ে দিন-রাত কাজ করে যাচ্ছেন। এসব ক্ষেত্রে কাঙ্ক্ষিত সাফল্য অর্জিত হলে আগামী দিনে কম্পিউটারের বর্তমান আকার এবং আয়তন দুটোই বদলে যাবে। 

এছাড়া ‘রোবোটিক কম্পিউটিং’ নিয়েও গবেষণা চলছে। মানুষের স্বাভাবিক ভাষা এবং কথোপকথন পুরোপুরি শনাক্ত করে কম্পিউটারের একটি নিজস্ব শিক্ষণ ব্যবস্থা এবং একটি নিজস্ব মেরামত ক্ষমতা নিয়ে আসবে আগামী দিনের কম্পিউটার।

ডেইলি বাংলাদেশ/অরিন/টিএএস