.ঢাকা, শুক্রবার   ১৯ এপ্রিল ২০১৯,   বৈশাখ ৫ ১৪২৬,   ১৩ শা'বান ১৪৪০

কবি সুবোধ সরকার ৬০, আমাদের সশ্রদ্ধ প্রণাম

 প্রকাশিত: ১৭:৩২ ২৯ অক্টোবর ২০১৮   আপডেট: ১৭:৩২ ২৯ অক্টোবর ২০১৮

২০১৪ সাল। বাংলাদেশের এক তরুন কবি কলকাতায় এসেছেন। আমাকে বললেন উনি কবিতার সাথে সম্পর্কিত জায়গায় যেতে চান। কবি শঙ্খ ঘোষের বাড়ি, কবি সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের বাড়ি দেখিয়ে তাঁকে নিয়ে চললাম সিরিটিতে কবি সুবোধ সরকারের ফ্ল্যাটে। সুবোধ’দা সাদরে স্বাগত জানালেন। বেশ কিছু আড্ডা হল। বেরিয়ে আসতেই সেই তরুন কবি জিজ্ঞাসা করলেন, ‘আজ বুঝলাম কেন তুমি ওকে তোমার প্রিয়তম কবি বল।‘

কেন?

ওর ব্যবহার এত ভাল। তরুনদের প্রতি এত কেয়ারিং সে জন্যে।

সে জন্যে নয়। উনি আমার প্রিয় কবি কারন উনি স্পষ্টবাদী। ভীতু আরামী নন।

সুবোধ’দাকে অনেকদিন দেখছি। কিন্তু কখনও মনে হয়নি নেকুপুসু শব্দপ্রয়োগ বা অন্ত্যোমিলের সন্তুষ্টির জন্যে তিনি কলম ধরেছেন। কলকাতা থেকে প্রায় তিন ঘণ্টার দূরের শহর কৃষ্ণনগর থেকে তাঁর উঠে আসা। তীব্র সংগ্রামী জীবন। আর্থিক অসঙ্গতির চুড়ান্ত রূপ দেখা এহেন সুবোধ’দা কবিতার মধ্যে প্রকাশ করেছেন তার জেদ, রাগ ও উস্মা। নিজের ‘শ্রেষ্ঠ কবিতা’ বইয়ের ভূমিকায় সুবোধ লিখেছেন, “...আমি একটা জেদ নিয়ে বেঁচে আছি যে কবিতার শরীর থেকে সব গয়নাগাটি খুলে ফেলব। তাতে যদি কবিতা মার খায় খাক। এ কাজ আমার আগে অনেকে করে গেছেন। আমি আর একবার করব। কবিদের জন্যেও একটা ‘লক্ষ্মণরেখা’ আছে। সেটা মেনে চলতে হয়। কিন্তু কেন মেনে নেব? কেন আমি অন্যের জামা পরব? কেন আমি অন্যের থালায় খাব? ভিখিরিরও একটা নিজস্ব থালা থাকে।”

সুবোধ’দার স্বভাবে সতীপনার ন্যাকামি নেই। তাই সোজাসুজি বলতে পারেন ‘প্রতিটি লোকের মধ্যে একটা হারামি আছে’। সুবোধ’দা নিজেকে আদপেই কখনও কবি বলেন না। বলেন ‘আরশোলা’। খ্যাতিমান হওয়ার শুরুর দিনগুলোতেই তিনি জানিয়ে রেখেছিলেন:

‘‘এ সব চিন্তা আগে করতাম, আর করি না/ ছোট মুখে একটা বড় কথা বলি:/ কবিতাকে শেষ অব্দি কবিতাই হতে হবে/ তা সে বেশ্যার দেয়ালে ছাপা হোক/ অথবা পুরোহিতের উঠোনে।/ আপনি রবীন্দ্রসদনে দাঁড়িয়ে কবিতা পড়বেন/ না জাহান্নমে/ সেটা আপনি ঠিক করুন,/ আমি বুঝে গেছি আমি কবি নই/ আমি আরশোলা।’’

দীর্ঘ পঁয়ত্রিশ বছরের কাব্যচর্চার স্বীকৃতি স্বরূপ সুবোধ’দা একাধিক পুরস্কার পেয়েছেন। সাহিত্য অকাদেমি পুরস্কারটি হয়তো সেগুলোকে ছাপিয়ে গেছে। পুরস্কার পাওয়ার প্রতিযোগিতায় তিনি নিজেকে আলাদা প্রমাণ করতে পেরেছেন একই সঙ্গে কবিতার সৃষ্টিতে ও জনপ্রিয়তায়।

কবি হিসেবে একটা নিজস্ব ঘরানা গড়ে তুলেছেন তিনি। ওঁর সমসাময়িক অনেকের চেয়ে নিজেকে এগিয়ে আছেন কারন তিনি নিজের চারপাশে অর্থী-প্রার্থী-তাঁবেদার-মোসাহেবদের জড়ো করেন নি। যাদের তাঁর চারপাশে দেখা যায় তারা নিতান্তই গুণগ্রাহী। আঘাত কি অভিঘাত ফুৎকারে উড়িয়ে দেওয়া সুবোধ’দার ধাতে নেই। তাঁর চারপাশে নিন্দুক আর ঈর্ষাপরায়ণদের ফিসফাস, কু-ইঙ্গিত, উপেক্ষার ব্যর্থ উল্লাস আছেই। সুবোধ’দার খ্যাতির আগুন যত লেলিহান হয়ে উঠেছে, নিন্দুকেরা সক্রিয় হয়েছে তাঁর খ্যাতির ওপরে জল ঢেলে দেওয়ার জন্য। সুবোধ’দা উপেক্ষার হাওয়ায় উড়িয়ে দেননি এই উদ্যোগ। তিনি ভীষণভাবে  রি-অ্যাক্ট করেছেন। কবিতার পঙ্ক্তিতে ওঁর ক্ষোভ, ওঁর বজ্রনির্ঘোষ ঠিক আছে, কিন্তু ভুল বুঝে  সত্যিকারের কাছের মানুষকে দূরে সরিয়ে দেন নি তা নয়। তারা এখনও অবশ্যই দূর থেকে তাঁকে প্রণাম করে। তার এই রি অ্যাকশন, অভিমান এটাই বুঝিয়ে দেয় সুবোধদা প্রতিটি ইঞ্চিতে কবি। রাজনীতির ভাঁজে তিনি নেই।

তাঁর পুরস্কৃত ‘দ্বৈপায়ন হ্রদের ধারে’ কাব্যগ্রন্থের অভ্যন্তরেও রংহীন জলের মতো, হাওয়ার মতো, সুগন্ধের মতো মিশে আছে তাঁর অবিমিশ্র জেদ। কবিতার জগতে তিনি সব দিক দিয়েই বিগ বি। সেই স্টেচার, সেই ভয়েজ, সেই ক্যারিশমা। কাজেই রাজ করে চলেছেন তিনি। পশ্চিমবঙ্গ কবিতা অ্যাকাডেমির চেয়ারম্যান। রাজনীতিতে শাসক দলের অন্যতম মুখ। তরুনদের আইডল।

তবে তার চারপাশে কিছু মোসাহেবদের ভিড় কাউকে কাউকে ক্ষুব্ধ করলেও তাঁর কিছু করার নেই। রবি ঠাকুরের ভাষায় এটা খ্যাতির বিড়ম্বনা। এ নিয়ে অভিমান করার কোন মানে হয় না। কবিযশঃপ্রার্থীদের প্রতি তাঁর একটা অনুকম্পা লক্ষ্য করেছি। কোথায় যেন এখানেই সুনীল’দার সাথে তাঁর মিল। যাই হোক না কেন কেউ কবিতা লিখলে সে সুবোধ’দার ভাই। তাঁর এই মানসিকতা মানুষ হিসেবে তাঁকে স্বাতন্ত্র্য দিয়েছে। কবি হিসেবে একটা নিজস্ব ঘরানা গড়ে তুলেছেন তিনি। ওঁর সমসাময়িক অনেকের চেয়ে নিজেকে এগিয়ে রেখেছেন।

সুবোধদা ব্যক্তিজীবনে ষাট পূর্ণ করলেন। সেটা সংখ্যামাত্র। সব মিলে এত বর্ণময় জীবনে একটা জন্মদিন খুব বড় নয়। বরং বড় তার দেখানো পথ। কে তার দোহার দলে, কে তার বিষনজরে সেটাও গুরুত্বপূর্ণ নয়। তার কবিতার জন্যে ত্যাগ, নিজ বিশ্বাসে অটল থাকার শিক্ষা আর মানুষের উপকার করার প্রবৃত্তি তাঁকে তুলে এনেছে অন্য উচ্চতায়। সে জন্যেই তিনি কবিতা জগতের হিমালয়। দুই বাংলায় সমান জনপ্রিয় এই অগ্রজ কবিকে তাঁর দীর্ঘ সুস্থ জীবন কামনা করে সশ্রদ্ধ প্রণাম জানাই।