কফির সঙ্গে প্রস্রাবের গন্ধের তুলনা, বিক্রেতার নামে মামলা!

ঢাকা, মঙ্গলবার   ৩১ মার্চ ২০২০,   চৈত্র ১৭ ১৪২৬,   ০৬ শা'বান ১৪৪১

Akash

কফির সঙ্গে প্রস্রাবের গন্ধের তুলনা, বিক্রেতার নামে মামলা!

কানিছ সুলতানা কেয়া ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ১৩:৫১ ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২০  

ছবি: সংগৃহীত

ছবি: সংগৃহীত

মস্তিষ্ককে উদ্দীপ্ত আর চাঙ্গা রাখতে সুগন্ধের বিকল্প নেই। অনেকেই ক্লান্তি বোধ করলে পছন্দের কোনো সুবাস চারপাশে ছড়িয়ে দিলেই মুহূর্তেই চাঙা হয়ে উঠেন। সেই প্রাচীনকাল থেকেই বিশ্বের বিভিন্ন দেশে গন্ধ থেরাপির সাহায্যে বিভিন্ন রোগের চিকিৎসার প্রচলন রয়েছে। 

তবে আপনারা কি জানেন? গোড়ার দিকে কফির ঘ্রাণকে মানুষ প্রস্রাবের গন্ধ ভেবে তুমুল কাণ্ড ঘটিয়েছিল। এমনকি দেয়ালের বিভিন্ন রংয়ের গন্ধকে স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর মনে করা হত।

চারপাশ দূর্গন্ধময় থাকুক তা নিশ্চয়ই কেউ চায় না। পঞ্চ ইন্দ্রিয়ের একটি হলো নাক। এই অঙ্গের কাজই হলো গন্ধ বিবেচনা করা। মানুষের ঘ্রাণশক্তি অনেক প্রখর হয়ে থাকে। গন্ধ আবিষ্কারের নেশা মানুষের বরাবরই ছিল। অষ্টাদশ শতাব্দীর দিকে কয়েকজন বিজ্ঞানী জর্জিয়ার এক সংরক্ষণাগারে বসে পাঁচটি সুগন্ধি আবিষ্কার করেন। তবে জানেন কি? এসব সুগন্ধগুলো তখনকার মানুষেরা খুব স্বাভাবিকভাবে নিতে পারেননি। অনেকে তো মামলা করতে শুরু করে এসব গন্ধগুলো নিয়ে। জেনে নিন সেই গন্ধের রহস্য-

কফির সঙ্গে প্রস্রাবের গন্ধের তুলনাকফি 

কফির মগে চুমুক না দিলে অনেকের সকালই হয় না। কফির সুবাসে অনেকেই মোহিত হন। সেই কফিকেই নাকি তখনকার দিনের মানুষেরা প্রস্রাব এমনকি পুরনো জুতার গন্ধের সঙ্গে তুলনা করেছিলেন। এমনকি নরকের এক দুর্গন্ধ বলেও বিবেচিত হয় কফি। তবে ৩৫০ বছর আগে সপ্তদশ শতাব্দীর শেষের দিকে লন্ডনবাসীরা কফির গন্ধ পেয়েছিলেন। সেসময় অনেকেই এটিকে তেমন পছন্দ করেনি। 

একবার তো এক লোক কফি হাউজের মালিকের নামে আদালতে মামলাই করে বসলেন। তিনি অভিযোগ করেন, কফির দুর্গন্ধে সে নিজ বাড়িতে টিকতে পারছেন না। এমনকি কফি হাউজের পাশে বাড়ি হওয়ায় নিজেকে দুর্ভাগ্যবান বলেও ভাবতে শুরু করেন তিনি। তবে ১৭২০ এর দিকে এসে মানুষেরা কফির ঘ্রাণে অভ্যস্ত হয়ে উঠতে শুরু করে।

গোলাপের আতরগোলাপ

২০০ বছর আগের কথা। ইংল্যান্ডের রাজা টিউডর এবং স্টুয়ার্টের সময়কালে, আতর বা সুগন্ধির শুরু হয়। সুগন্ধি শব্দটি লাতিন শব্দ থেকে এসেছে। যার অর্থ ধূমপানের ন্যায় গন্ধ পাওয়া। প্রথম দিকে সুগন্ধি হিসেবে গোলাপ একটি পাত্রে ফুটিয়ে আতরের মতো করে ব্যবহার করা হত। গোলাপ পানিতে ফুটানোর ফলে সুগন্ধ বের হয়ে আশেপাশের বাতাসকে পরিশুদ্ধ করতত। ষোড়শ এবং সপ্তদশ শতাব্দীতে এটিকে প্লেগের প্রতিষেধক হিসেবেও ব্যবহার করা হত।   

অন্যদিকে, অষ্টাদশ শতাব্দীতেই প্রধম বাণিজ্যিকভাবে সুগন্ধি বিক্রির বৈধতা দেয়া হয়। আঠারো শতকের দ্বিতীয়ার্ধে সুগন্ধি হিসেবে সর্বাধিক জনপ্রিয় ছিল গোলাপের আতর বা অটো। এটি প্রথম দ্বাদশ শতাব্দীতে একজন আরবের রসায়নবিদ উদ্ভাবন করেন। তিনি গোলাপ এবং পানি জ্বাল করে এক ধরণের তেল তৈরি করে সুগন্ধিতে পরিণত করতেন।  

সেসময় গোলাপের সুগন্ধিটি এতটাই ফ্যাশনেবল ছিল যে, এটির নকল পণ্য উদ্ভাবন করতে থাকে অনেকেই। তাই ১৮৩১ সালে নকল সুগন্ধি পরীক্ষা করার উপায় বের করা হয়। একটি পরিষ্কার লেখার কাগজের উপর খুব অল্প সুগন্ধি রেখে আগুন ধরিয়ে দেয়া হত। যদি আতরটি খাঁটি হয় তবে এটি কাগজে কোনো চিহ্ন না রেখে বাষ্পীভূত হত। অন্যথায় কাগজসহ পুড়ে যেত।   

জর্জিয়ানদের স্মোকিং ক্লাবতামাক
 
সপ্তদশ শতাব্দীতে পুরুষরা স্মোকিং ক্লাব কিংবা কফি হাউসে গিয়ে তামাক সেবন করত। এর গন্ধ সেসময় অনেকেই মেনে নিতে পারেনি। এর উৎকট গন্ধে এখনকার মতো তখনো অনেক মানুষ বিরক্ত ছিল। জর্জিয়ান ইংল্যান্ডে তামাকের ধোঁয়ার গন্ধ আদালতের বিতর্ক শুরু করেছিল। জর্জিয়ান নারীরা তো তামাক না ছাড়লে স্বামীদের ছেড়েই চলে যেতেন। জর্জিয়ার সময়কালে সামাজিক জীবনে বেশ কিছু পরিবর্তন আসে। শহরগুলোতে নতুন থিয়েটার, বলরুম এবং আনন্দ উদ্যান গড়ে উঠে। সেসব স্থানে পুরুষ এবং নারীরা আড্ডা দিতেন। সেসব স্থানগুলোতে তামাক সেবন নিষিদ্ধ ছিল। 

অ্যামোনিয়াঅ্যামোনিয়া
 
অ্যামোনিয়ার গন্ধটি বেশ তীব্র। এটি নাইট্রোজেন এবং হাইড্রোজেনের একটি সমাধান। যা বাসি মূত্র দ্বারা তৈরি করা হত। তবে এটি প্রাকৃতিকভাবে স্ফটিক হিসাবেও পাওয়া যায়। অতীতে রঙিন পোশাক তৈরিতে প্রায়শই অ্যামোনিয়া ব্যবহৃত হত। এর তীব্র গন্ধ মানুষের ট্রাইজেমিনাল নার্ভকে সরিয়ে দেয়। এর ফলে একজন ক্লান্ত মানুষও মুহূর্তেই চাঙা হয়ে যেতেন। আঠারো শতকে চিকিত্সকরা স্নায়ুর প্রতি বিশেষ আগ্রহী হয়ে এটি উদ্ভাবন করেন। তারা বিশ্বাস করতেন, অ্যামোনিয়া শরীরকে পূর্ণ অ্যানার্জি দেয়। 

সে সময় জর্জিয়ান নারীরা তাদের শারীরিক দুর্বলতা কাটাতে এটি ব্যবহার করতেন। বিশেষ করে নায়িকারা তাদের আবেগ এবং কাজের শক্তি ধরে রাখতে অ্যামোনিয়ার একটি ছোট্ট বোতল নিজেদের কাছে রাখতেন। অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষের দিকে এটিকে চিকিৎসায় নানাভাবে ব্যবহার করা শুরু হয়। পানিতে ডুবে যাওয়া ব্যক্তির জ্ঞান ফেরাতে ব্যবহার করা হত এই অ্যামোনিয়া। 

দেয়ালের রংরং

রঙের গন্ধও বেশ প্রকট। বাড়ি ঘর রং করাতে গেলেই নিশ্চয়ই টের পান। সত্যিই এই গন্ধটি বেশ বিরক্তিকর। জানেন কি? রংয়ের গন্ধ সবসময়ই মানুষ অপছন্দ করেছে। যার প্রমাণ পাওয়া যায় জর্জিয়ান ডায়েরিগুলোতে। সেখানে বর্ণিত কয়েকটি গন্ধের মধ্যে একটি এটি। তারা এই গন্ধটি একেবারেই সহ্য করতে পারতেন না। কারণ কেউই এই গন্ধের জন্য পরিচিত ছিলেন না। আর ঘরের পুনর্নির্মাণ কোনো দৈনন্দিন ঘটনা ছিল না, তাই রঙের গন্ধটি একদমই অস্বাভাবিক ছিল।   

তবে যারা এই রংয়ের কাজে নিয়োজিত থাকতেন তারা এর গন্ধে অভ্যস্ত হয়ে পড়েন। অষ্টাদশ শতকের গোড়ার দিকে এটি স্বাস্থ্যের পক্ষে বিপজ্জনক বলেও মনে করা হত। ইতালীয় চিকিত্সক বার্নার্ডিনো রামাজিনী তার ১৯৮৫ সালের ডিজিজ অব ট্র্যাডিসমেনে এমনই তথ্য দেন। তিনি জানান, রঙের শক্তিশালী গন্ধের মধ্যে যারা দীর্ঘদিন থাকেন যেমন- পেইন্টার বা আর্টিষ্ট তারা দ্রুত ঘ্রাণশক্তি হারিয়ে ফেলেন।

এক নারী মাছ মাংস বিক্রেতা
মাছ

ইংল্যান্ডবাসীরা তাজা খাবার কেনায় বরাবরই অভ্যস্ত ছিল। এখনকার মতো সুপারমার্কেটও ছিল না তখন। এমনকি খাবারের কোনো প্রতিরক্ষামূলক প্যাকেজিং ছিল না। তবে অষ্টাদশ শতাব্দীতে এসে মানুষের অর্থ সংকট দেখা দেয়। ফলে বাজারে প্রচুর খাবার রয়েই যেত। অর্থ না থাকায় মানুষের মাঝে মাংস এবং মাছ কেনার আগ্রহ হারায়। এতে করে এসব পণ্য নষ্ট হতে থাকে। বিক্রেতারা একদিনের জিনিস অন্যদিন বিক্রি করতে শুরু করে। যেমন গলদা চিংড়ি শুকিয়ে শুটকি হিসেবে বিক্রি করা হত। সেসব মাছের গন্ধও মানুষ সহ্য করতে পারত না। 

সূত্র: হিস্টোরিডটকম

ডেইলি বাংলাদেশ/জেএমএস