কথা আর আচরণে সংযত হওয়া দরকার

ঢাকা, শনিবার   ২৫ মে ২০১৯,   জ্যৈষ্ঠ ১০ ১৪২৬,   ১৯ রমজান ১৪৪০

Best Electronics

কথা আর আচরণে সংযত হওয়া দরকার

 প্রকাশিত: ১৯:৩০ ৯ মে ২০১৯  

অাফরোজা পারভীন, কথাশিল্পী, কলাম লেখক, সম্পাদক। জন্ম ৪ ফোব্রুয়ারি ১৯৫৭, নড়াইল। সাহিত্যের সকল ক্ষেত্রে অবাধ পদচারণা। ছোটগল্প, উপন্যাস, শিশুতোষ, রম্য, স্মৃতিকথা, অনুবাদ, গবেষণা ক্ষেত্রে ১০১টি পুস্তক প্রণেতা। বিটিতে প্রচারিত টিয়া সমাচার, ধূসর জীবনের ছবি, গয়নাসহ অনেকগুলি নাটকের নাট্যকার। `অবিনাশী সাঈফ মীজান` প্রামাণ্যচিত্র ও হলিউডে নির্মিত স্বল্পদৈর্ঘ্য `ডিসিসড` চলচ্চিত্রের কাহিনিকার। রক্তবীজ ওয়েব পোর্টাল www.roktobij.com এর সম্পাদক ও প্রকাশক। অবসরপ্রাপ্ত যুগ্মসচিব

আমরা আগে-পরে না ভেবে অনেক সময় অনেক কথা বলে ফেলি। এমন কিছু আচরণ করে ফেলি যা বুমেরাং হয়ে দাঁড়ায়। হ্যাঁ, প্রতিটি মানুষের মধ্যেই রাগ-খেদ আছে। উত্তেজনা আবেগও আছে। অনেক সময়ই এগুলো দমন করা সম্ভব হয় না। রক্তমাংসের মানুষ তো! কিন্তু সেই পরিস্থিতি পর্যন্ত যাওয়ার আগেই যদি কেউ আকারণে বেফাঁস কথা বলে ফেলে বা বেফাঁস আচরণ করে বসে তাহলে আখেরে সেটা মারাত্মক ব্যাপার হয়ে উঠতে পারে। 

একজন সাধারণ মানুষ, ধরুন শ্রমজীবী, চাকরিজীবী, মুটে, মজুর বা কুলি যদি এমন কথা বলে বা আচরণ করে তাতে তেমন কিছু আসে যায় না। কারণ সবাই ধরেই নেয়, ওর পরিবেশ, ওর শিক্ষা ওকে এভাবেই কথা বলতে বা আচরণ করতে শিখিয়েছে। আমরা রাস্তাঘাটে প্রতিদিনই রিক্সাচালক বা গাড়ির ড্রাইভারদের অশ্রাব্য কথা অবলীলায় বলতে শুনি। যে বলে তারও কোনো বিকার নেই, যে শোনে তারও নেই। সে হয়ত দ্বিগুণ শুনিয়ে দেয়। কিন্তু এ নিয়ে কোনো বড় বাকবিতণ্ডা বা ঝামেলা হয় না। কারণ ওরা এই জাতীয় আলাপেই অভ্যস্ত। কিন্তু পেছনে বসে আমরা যারা শুনি, বড়ই বিব্রত আর লজ্জিত হই।

বস্তিবাসী কিছু মানুষের একটা ভাষা আছে। যা শুনলে আমাদের কানে তুলা দিতে ইচ্ছে করে। চোর ডাকাত ছিনতাইকারি মাস্তান গডফাদারদেরও একটা নিজস্ব ভাষা আছে। নিজেদের মধ্যে ওরা ওই ভাষাতেই কথা বলে। যদি আচমকা তার দু’একটি বাক্য আমাদের কানে আছড়ে পড়ে আমরা ঘাবড়ে যাই। ভাবি, একী ভাষা! 

আর যারা প্রতিনিয়ত টকশোতে আসেন তাদেরও একটা ভাষা আছে। অত্যন্ত উত্তেজক আগ্রাসী ভাষা, কিন্তু অশ্লীল নয়। তারা ওই ভাষাতে চেঁচামেচি করেন, টেবিল চাপড়ান, কেউ কারো কথা শেনেন না, হাতপা ছুঁড়ে কথা বলেন কিন্তু মারামারি করেন না। যা করেন তা কিন্তু মারামারির চেয়ে কম নয়। জনগণ শুধু শোনে না, দেখেও। বড় মজা পায় তারা। 

সংসদের একটা ভাষা আছে। সেটাও কম-বেশি টক শো স্টাইলের।  সে ভাষা শোনা থেকে অবশ্য আজকাল আমরা বঞ্চিত। সে ভাষা বেশি শোনা যায় জমজমাট বিরোধী দল থাকলে। 

যাদের কথা বলছি এরা পরস্পরবিরোধী কথা বলেন, কিন্তু তেমন কোনো বিরোধ বাধে না। কিন্তু এমন কিছু কথা আছে যা বললে বা করলে বিরোধ বাধে। 

যারা গুরুত্বপূর্ণ চেয়ারে আছেন, যারা গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি বা সেলিব্রেটি তাদের কথা এবং আচরণ সংযত হওয়া দরকার। কারণ সারা দেশের লোক তাদের কথা শোনে, তারা কী বলছেন সেটা ফলো করে। ধরুন দেশের কোনো জনগণের সন্তান মারা গেলে যদি একজন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি বলেন, ‘আল্লাহর মাল আল্লাহ নিয়ে গেছে’, তাহলে সেটা কতটুকু শোভন? এই একটি কথাই তো ওই বাবা মায়ের বুক ভেঙে যাবার জন্য যথেষ্ট।

আর সারা দেশের মানুষের মনে তাপ ছড়াবার জন্য যথেষ্ট। এই একটি বাক্যেই তো দেশের মানুষ বুঝতে পারে বড়লোকের সমবেদনা সহমর্মিতার কত অভাব। কিংবা ধরুন দুর্ঘটনায় অনেক মানুষ মারা গেছে, এই পরিস্থিতিতে যদি কোনো দায়িত্বশীল লোক বলেন, ‘এ আর কয়জন লোক মারা গেছে। মহারাষ্ট্রে প্রতিদিন কত লোক মারা যাচ্ছে’। সেটা কতটা শোভন? অথবা ধরুন কোন দায়িত্বশীল ব্যক্তি যদি কবিদের নিয়ে দল বানাতে চান আর আইয়ুব খানের গোলাপফুল মার্কা নিয়ে নির্বাচন করতে চান, নির্বাচনে জিতলে বায়তুল মোকাররম চত্বর দখল করে কবিতার তাজমহল বানতে চান সেটা কতটা যৌক্তিক? কিংবা ধরুন কেউ যদি প্রেসক্লাবে সাংবাদিকদের আটকে তাদের দেহতল্লাশি করতে থাকে আর ‘চোর’ বলেন সেটা কতটা উচিত? যার জিনিস তারই আগলে রাখার কথা । কারো যদি মোবাইল চুরি যায় তাহলে কি চারপাশের সব মানুষকে আটকে রেখে দেহতল্লাসী করা যায়! বিনা প্রমাণে  চোর বলা যায়?

সমস্যা হচ্ছে আমরা প্রায়শই ভেবে কোনো কাজ করি না, বা ভেবে কথা বলি না। সাধারণ মানুষ এমন করলে কোন সমস্যা নেই। কিন্তু যারা বড় পদে আছেন, গুরুত্বপূর্ণ পদে আছেন বা সেলিব্রেটি তাদের প্রতিটি কাজ করার আগে, প্রতিটি কথা বলার আগে ভেবে করা উচিk , ভেবে বলা উচিত। না হলে তাদের অসারতাই প্রকাশ পায়। তাদের অপরিপক্ততা আর অযোগ্যতার নিদর্শন হয়ে দাঁড়ায় এসব কথা আর কাজ।

কিন্তু আমাদের গুরুত্বপূর্ণ চেয়ারে যারা আছেন তাদের অনেকেই এসব ভাবেন না। মনে করেন, এ দেশটা তাদের সম্পত্তি, দেশের জনগণ তাদের ভৃত্য। কাজেই যা ইচ্ছে বলা যায়, যা ইচ্ছে করা যায়। শোভন অশোভন উচিত অনুচিত বিবেচনার কোনো প্রয়োজন তারা মনে করেন না। মূল ব্যাপার হচ্ছে,  আমাদের দেশে যোগ্য মানুষ যোগ্য চেয়ারে নেই। আর অনেক ক্ষেত্রেই ক্ষমতার বলয় বা প্রভাববলয় এদের আচ্ছাদন দিয়ে রাখে বলে এরা কোনো কথা বলতে পিছপা হয় না। কারণ এরা জানে এদের কিছুই হবে না। এদের বিরুদ্ধে কথা বলার বা পদক্ষেপ নেবার মতো শক্তি খুব কম  মানুষেরই আছে। কিন্তু এরা একটা জিনিস ভুলে যায়, ইতিহাস কিছু ভোলে না। আর সত্যিকার ইতিহাস একসময় উঠে আসে। আর সেখানে জ্বলজ্বল করতে থাকে এদের অসার কাজ, কথা আর আচরণের বয়ান। 

আমরা অনেক রক্তে দিয়ে দেশ স্বাধীন করেছি। এদেশের ধূলিকণায় জনতার রক্ত মিশে আছে। তাই আমরা চাই এমন দেশ যে দেশের  নেতারা, গুরুত্বপূর্ণ মানুষেরা হবে কথা কাজে সহমর্মি। কারো সন্তান মারা  গেলে তার পাশে এসে দাঁড়াবে। তার কাঁধে হাত রেখে কাঁদবে । যেমন মাননীয় প্রধানমন্ত্রী মাঝে মাঝেই কাঁদেন, গরীব ধনী নির্বিশেষে জড়িয়ে ধরেন। দুর্ঘটনায় মানুষ মারা গেলে কারণ খতিয়ে দেখে শাস্তির ব্যবস্থাই শুধু করবে না, যারা দুর্ঘটনা কবলিত তাদের পাশে এসে দাঁড়বে তাদের একজন হয়। যিনি গুরুত্বপূর্ণ চেয়ারে তিনি তার কাজ নিয়েই কথা বলবেন, কবিদের নিয়ে দল গঠন করতে চাইবেন না, আইয়ুব খানের প্রিয় গোলাপফুলকে মার্কা বানাতে চাইবেন না বা আমাদের সবার শ্রদ্ধার বায়তুল মোকাররম চত্বর দখল করে কবিতার তাজমহল বানানোর মতো কথা কখনো বলবেন না। আর সাংবদিক আটকে বা জনতাকে আটকে দেহতল্লাসী করা বা চোর বলার জন্য জাতির কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করে আর কোনোদিন এমন কথা বলা বা এমন কাজ করা থেকে বিরত থাকার অঙ্গিকার করবেন যিনি এটা করেছেন। একটা কথা ভুললে চলবে না, বাঙালি এমনিতে নম্র সভ্য ক্ষমাশীল জাতি,  কিন্তু  জেগে উঠলে মারাত্মক। এ দেশের মুক্তিযুদ্ধ এ কথার সবচেয়ে বড় প্রমাণ।

ডেইলি বাংলাদেশ/আরআর

Best Electronics