কতটুকু শিখছি শ্রেণিকক্ষ থেকে!

ঢাকা, মঙ্গলবার   ২৫ জুন ২০১৯,   আষাঢ় ১২ ১৪২৬,   ২১ শাওয়াল ১৪৪০

কতটুকু শিখছি শ্রেণিকক্ষ থেকে!

 প্রকাশিত: ১৫:১৮ ৮ অক্টোবর ২০১৮   আপডেট: ১৫:১৮ ৮ অক্টোবর ২০১৮

ছবি: সংগৃহিত

ছবি: সংগৃহিত

সত্যিই কি বিশ্বাস করেন, বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকদের পাওয়ার পয়েন্টের শত শত স্লাইডের লেকচার গুলো আপনাকে স্মার্ট করছে? বর্তমানে সারা বিশ্বে আলোচিত হচ্ছে বিষয়টি। প্রায় প্রতিটি ক্লাসেই দেখা যায় শিক্ষক এসে পাওয়ার পয়েন্ট লেকচার দিচ্ছে আর শিক্ষার্থীরা স্লাইডগুলো তুলে নিচ্ছে। কিন্তু এতে শিক্ষার্থী কতটুকু শিখছে তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়। এ বিষয়ে কথা বলেছেন, অকল্যান্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের কম্পিউটার বিজ্ঞানের পুরস্কার বিজয়ী বিজ্ঞানী, লেখক, পরামর্শক এবং সিনিয়র লেকচারার ড. ডি পল রালফ।   

ড ডি পলের মতে বিশ্ববিদ্যালয়ে পাওয়ার পয়েন্ট স্লাইড বন্ধ করে দেওয়া উচিত। কারণ পাওয়া পয়েন্ট স্লাইডের মাধ্যমে লেকচার শিক্ষার্থীকে চিন্তা করতে শেখায় না এবং ক্লাসরুমের শিক্ষকের লেকচারকে একঘেয়ে ও বিরক্তিকর করে অনেক সময়ই। কিন্তু বেশিরভাগ বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ড পলের এই উপদেশ উপেক্ষা করবে। কারণ তাদের ছাত্ররা কীভাবে শিখছে তার সাফল্য পরিমাপ করার পরিবর্তে, বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র সন্তুষ্টি সমীক্ষায় সাফল্যের পরিমাপ করে।

কিভাবে সমস্যা করছে পাওয়ার পয়েন্ট?
পাওয়ার পয়েন্ট স্লাইডগুলির ওপর নির্ভরশীলতা শিক্ষার্থীদের মনে একধরণের  অদ্ভুত বিশ্বাস তৈরি করেছে, পড়া, ক্লাসে নোট নেওয়া, শিক্ষকের কথা মনোযোগ দিয়ে শোনা এবং হোমওয়ার্ক এগুলো একদমই অযৌক্তিক। কেননা তারা মনে করে ক্লাসে দেওয়া সেই স্লাইডগুলো নিলেই সব বুঝতে পারবে। এবং কোর্সের  স্লাইডগুলো এমনভাব ডিজাইন করা থাকে যে, শিক্ষার্থীরা একধরনের পৌরাণিক ঘটনার মত বিশ্বাস করতে শুরু করে, তারা ডজন ডজন বই, শত শত নিবন্ধ এবং শ্রেণিকক্ষে শিক্ষকের দেওয়া হাজার হাজার প্রশ্নের সমাধান না করেই দক্ষ এবং বুদ্ধিমান হয়ে উঠতে পারে। পাওয়ার পয়েন্ট নিয়ে করা একটি গবেষণার ফলাফল পর্যালোচনা করে দেখা যায়, শিক্ষার্থীরা যখন থেকে শিক্ষকের আগের উপায়ের নেওয়া ক্লাস থেকে পাওয়ার পয়েন্টে নেওয়া ক্লাস পছন্দ করতে শুরু করে তারপর থেকে কিন্তু শিক্ষার্থীদের শিক্ষণ বা গ্রেডিং কোনটাই বাড়েনি। অর্থাৎ পছন্দের সব কিছুই কার্যকরী নয়। শিক্ষক ও শিক্ষার্থীর ইন্টারঅ্যাকটিভ ক্লাসের বিকল্প কিছুই হতে পারে না। গবেষণায় পাওয়ার পয়েন্ট নির্ভর পড়াশুনার সঙ্গে ইন্টারঅ্যাকটিভ পড়াশুনার তুলনা করে দেখানো হয়েছে, আগের থেকে বর্তমানে শিক্ষার্থীদের সমস্যা সমাধানের ক্ষমতা ও পড়াশুনার সঙ্গে বাস্তবার মিল করতে পারার প্রবণতা কমে এসেছে।

যে তিনটি প্রধান কারণে পাওয়ার পয়েন্ট স্লাইডগুলি শিক্ষণের জন্য অন্তরায়-
স্লাইডগুলো চিন্তা করতে নিরুৎসাহিত করে। স্লাইড শিক্ষকদের বুলেট পয়েন্ট, স্লোগান ব্যবহার করে জটিল বিষয় উপস্থাপন করতে উৎসাহিত করে। কিন্তু এই জটিল বিষয়টি নিয়ে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে গভীর আলোচনায় যেতে সাহায্য করে না। এর কারণে জটিল বিষয়গুলো শিক্ষার্থীদের কাছে ততটা পরিষ্কার হয় না এবং ধোয়াশাপূর্ণ থেকে যায়।

ছাত্রদের কাছে শিক্ষক সম্পর্কে মূল্যায়ন চাওয়া হলে তা পর্যালোচনা করে পরে দেখা যায়, যখন একটি কোর্স স্লাইডের ওপর নির্ভর করে তৈরি হয়, তখন শিক্ষার্থীরা কোর্সটিকে শুধুমাত্র ক্লাসে দেওয়া স্লাইডগুলির সমষ্টি মনে করে। স্লাইডের বাইরেও কিছু থাকতে পারে সেটা নিয়ে ভাবে না। আর ক্লাসে যে শিক্ষক স্লাইড ছাড়াই বইয়ের পাঠের সঙ্গে বাস্তবতা মিশিয়ে পড়ায় শিক্ষার্থীরা সেই শিক্ষকদের সমালোচনা করে বলে তিনি কোর্সটি পরিষ্কার করে বোঝায়নি। আবার যে শিক্ষক ক্লাসে বুলেট পয়েন্ট দিয়ে স্লাইড তৈরি না করে পড়ায় তাকে নিয়ে সমালোচনা করে বলা হয় সে ঠিকমত নোট সরবারহ করছে না। স্লাইড শিক্ষার্থীদের অলস করে দেয়। যখন ক্লাসে শিক্ষক স্লাইড দিয়ে পড়ায় শিক্ষার্থীরা আশা করে সেই স্লাইডের মধ্যেই তাদের প্রয়োজনীয় সব তথ্য থাকবে। এর বাইরে কিছুই দরকার নেই। তারা ভাবতে শুরু করে তাদের কেন আর নতুন করে বই পড়তে হবে, ক্লাসে গিয়ে ক্লাস নোট তুলতে হবে যখন বাড়িতে বসেই মোবাইলের স্ক্রিনে চাপ দিয়ে স্লাইড পড়তে পারছে।

এখন কথা হচ্ছে এত কিছুর পরও কেন পাওয়ার পয়েন্ট এত জনপ্রিয়! বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ছাত্র সন্তুষ্টি পরিমাপ করে কিন্তু তারা শিক্ষার্থীরা কতটুকু শিখছে তা পরিমাপ করে না। কিন্তু শিক্ষার্থী কতটুকু শিখল তা পরিমাপ করে না। পরীক্ষা, অ্যাসাইনমেন্ট, গ্রুপ ওয়ার্ক এসবের মাধ্যমে আপাতদৃষ্টিতে শিক্ষার্থীর জ্ঞান ও সামর্থ্য পরিমাপ করে। কিন্তু শিক্ষা হল তা যা শিক্ষার্থীর জ্ঞান ও সামর্থ্যের পরিবর্তন আনে। যখনই আমরা শিক্ষার্থীর লার্নিং পরিমাপ করতে যাই ফলাফলটা ভালো পাই না। কারণ এই পাওয়ার পয়েন্ট নির্ভর পড়াশুনা শিক্ষার্থীকে বিষয় সম্পর্কে গভীর জ্ঞান দেয় না এবং তার পাওয়া জ্ঞান ও সামর্থ্যের পরিবর্তন আনে না। মার্কিন একদল গবেষক দেখিয়েছে যে তাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে থাকা শিক্ষার্থীদের স্নাতকের এক তৃতীয়াংশ তাদের চার বছরের ডিগ্রি প্রোগ্রাম শেষে কোনও উল্লেখযোগ্য উন্নতি দেখায়নি। গবেষক দল শিক্ষার্থীদের ওপর কলেজিয়েট লার্নিং অ্যাসেসমেন্ট নামে একটি পরীক্ষা করে এই ফলাফল পায়। গবেষকদল শিক্ষার্থীদের ডিগ্রী প্রোগ্রামের প্রথম, মধ্য ও শেষ এই তিন সময়ে পরীক্ষা করে এই ফলাফল পেয়েছে। এই পরীক্ষাটি দিয়ে মূলত শিক্ষার্থীর বিশ্লেষণাত্মক যুক্তি, সমালোচনামূলক চিন্তাভাবনা, সমস্যা সমাধানের এবং লেখার সামর্থ্য পরিমাপ করে। যা থেকে বোঝা যায় শিক্ষার্থী কতটুকু শিখেছে। অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়গুলো এই পরীক্ষা করে দেখতে পারে এই পাওয়ার পয়েন্ট ভিত্তিক পড়াশুনায় শিক্ষার্থীর শিক্ষা কতটুকু হচ্ছে।

সূত্র: বিজনেস ইন্সাইডার

ডেইলি বাংলাদেশ/এজএমএস/এসজেড