.ঢাকা, সোমবার   ২২ এপ্রিল ২০১৯,   বৈশাখ ৯ ১৪২৬,   ১৬ শা'বান ১৪৪০

আলেকজান্দ্রিয়া লাইব্রেরির পরিণতি

 প্রকাশিত: ২০:৪৭ ৭ অক্টোবর ২০১৮   আপডেট: ২০:৪৭ ৭ অক্টোবর ২০১৮

ছবি: সংগৃহীত

ছবি: সংগৃহীত

লাইব্রেরি, বাংলায় গ্রন্থাগার। প্রকৃত অর্থে "পাঠাগার" হলো বই-পুস্তক ও অন্যান্য তথ্য সামগ্রির একটি সংগ্রহশালা, যেখানে খুব সহজেই পাঠক পাঠ, গবেষণা কিংবা তথ্যানুসন্ধান করতে পারে। ইন্টারনেট ও আধুনিক প্রযুক্তির এত বিস্তারের আগে লাইব্রেরিই ছিল জ্ঞানগর্ভ। যখন কারো কোনো বিষয় এ অনুসন্ধান এর প্রয়োজন হতো তখন তিনি লাইব্রেরিতে যেতেন। কিন্তু কখনো কি ভেবে দেখেছেন বিশ্বের সব থেকে প্রসিদ্ধ লাইব্রেরি কোনটি ছিল?

বিশ্বের প্রসিদ্ধ লাইব্রেরি নিয়ে অনেক মতবাদ থাকলেও আলেকজান্দ্রিয়া লাইব্রেরি যে তার মধ্যে অন্যতম ছিল এ নিয়ে সন্দেহ করার কোন সুযোগ নেই। বলা হয়ে থাকে প্রাচীনকালে আলেকজান্দ্রিয়া লাইব্রেরিকে জ্ঞান আহরণের জন্য তীর্থস্থান হিসেবে গণ্য করা হয়ে থাকে। কিন্তু পঞ্চম শতাব্দীর শেষে এই তীর্থস্থানের অস্ত্বীত্ব বিলিন হয়ে যায়। কিন্তু কি হয়েছিল এই লাইব্রেরির সঙ্গে? অনেকের মতে একটি ভয়ানক অগ্নিকাণ্ড এই লাইব্রেরির ধ্বংস ডেকে আনে। কিন্তু আসলেই কি তাই? না-কি এর পিছনে অন্য কোন কারণ আছে?

আলেকজান্ডার দি গ্রেট পৃথিবী জয় করেই থেমে থাকেন নি। এরিস্টটল এর এই ছাত্র জ্ঞান সংরক্ষণেও পৃথিবী শ্রেষ্ট হতে চেয়েছিলেন। তিনিই প্রথম নিজ নামের শহরে আলেকজান্দ্রিয়া লাইব্রেরি প্রতিষ্ঠার কথা ভাবেন। কিন্তু লাইব্রেরি প্রতিষ্ঠার আগেই তার মৃত্যু হয়। উত্তরসূরী টলেমি তার ইচ্ছাকে বাস্তবে রূপদান করেন। টলেমি মিশরের শহর আলেকজান্দিয়ায় একটি লাইব্রেরি ও মিউজিয়াম প্রতিষ্ঠা করেন। যা পরবর্তীতে আলেকজান্দ্রিয়া লাইব্রেরি নামে পরিচিতি লাভ করেন।

আলেকজান্দ্রিয়া লাইব্রেরি ছিল প্রাচীন গ্রিক ও মিশরীয় স্থাপত্যের এক অনন্য নিদর্শন। এই লাইব্রেরিতে লেকচার হল, ক্লাসরুম এবং হাজার হাজার সেলফ ছিল যেগুলা প্যাপিরস এর স্ক্রল দিয়ে পূর্ণ ছিল। তখন কার সময়ে এই প্যাপিরস এর স্ক্রলই জ্ঞান সংরক্ষণে ব্যবহৃত হত। টলেমি প্রথমে গ্রীক ও রোমান স্ক্রল দিয়ে লাইব্রেরি এর সেলফগুলো পূর্ণ। এছাড়াও তিনি গ্রীক এবং রোমান পন্ডিতদের আমন্ত্রণ করেন ও নিজ খরচে গবেষণা চালানোর আহ্বান করেন। এভাবেই লাইব্রেরি বড় হতে থাকে এবং লাইব্রেরি এর নিজস্ব প্যাপিরাস এর স্ক্রল তৈরি হতে থাকে। কিন্তু আলেকজান্দ্রিয়ার শাসকরা এতেও সন্তুস্ট ছিল না। তদের ইচ্ছা ছিল পৃথিবীর সকল বই এর একটা কপি আলেকজান্দ্রিয়া লাইব্রেরিতে সংরক্ষিত রাখা। ভাগ্যক্রমে সাগরতীরের আলেকজান্দ্রিয়া তখন ব্যবসার জন্য প্রসিদ্ধ ছিল। নানান দেশের জাহাজ আলেকজান্দ্রিয়ায় ভিড়ত।

আলেকজান্দ্রিয়ার শাসকরা এমন ব্যবস্থা করেন যাতে কোনো জাহাজ আলেকজান্দ্রিয়াতে ভিড়লে তাতে কোনো বই থাকলে সেই বইয়ের এর কপি করা হত। কপি জাহাজে ফেরত দিয়ে আসল বইটি লাইব্রেরিতে সংরক্ষণ করা হতো। এছাড়াও তারা বই শিকারি নিয়োগ করে। তখনকার সময় এত বই লাইব্রেরিতে আসতে থাকে যে তা সংরক্ষণের জন্য আলেকজান্দ্রিয়ার প্যাপিরাস এর আমদানি বাড়াতে হয়ে। এভাবেই আলেকজান্দ্রিয়া লাইব্রেরি বড় ও প্রসিদ্ধ হতে থাকে। কিন্তু লাইব্রেরি বড় হওয়ার সঙ্গে একটি  সমস্যাও দেখা যায়। কোথায় কোন তথ্য আছে তা খুঁজে পেতে মানুষকে বিড়ম্বণায় পড়তে হয়। এই সমস্যা সমাধানের জন্য এক পন্ডিত ক্যালিম্যাকাস পুরো লাইব্রেরির জন্য একটি সূচিপত্র বানান। এছাড়াও আলেকজান্দ্রিয়া লাইব্রেরির এক পন্ডিত এরিস্টকার্স কলোম্বাসের সময়ের ৬০০ বছর আগে প্রমাণ করেন পৃথিবী গোল। হেরণ নামের আরেক পন্ডিত সে সময় পৃথিবীর প্রথম স্টীম ইঞ্জিন তৈরি করেন যার ব্যবহার কি-না শিল্প বিপ্লবের সময় শুরু হয়। কিন্তু পৃথিবীর এই জ্ঞানগর্ভ এর পরিণতি কি ছিল?

খ্রিস্টপূর্ব ৪৮ শতকে জুলিয়াস সিজার আলেকজান্দ্রিয়া জয় করেন এবং তখন এই শহরে ভয়ানক অগ্নীকান্ড হয় । অনেক ইতিহাসবিদ ধারণা করেন এতেই আলেকজান্দিয়া লাইব্রেরি এর ধংস হয়। কিন্তু অনেক পন্ডিত এর লেখায় প্রমাণিত যে জুলিয়াস সিজার এর আলেকজান্দ্রিয়া জয়ের শত শত বছর পরেও তারা আলেকজান্দ্রিয়া লাইব্রেরি তথ্য ও জ্ঞান আহরণে ব্যবহার করেন। তো কি ছিল এই লাইব্রেরি ধ্বংসের পিছনে?

এই জ্ঞানতীর্থ ধ্বংসের পিছনে ছিল অন্ধবিশ্বাস ও জ্ঞানের আলোর ভয়। জুলিয়াস সিজারের পর এই শহর যথাক্রমে খ্রীষ্টান ও মুসলিম শাসকদের হাতে রদবদল হয়। তারা এই জ্ঞানগর্ভকে সম্পদ হিসেবে না দেখে নিজেদের অস্তিত্বের উপর হুমকি হিসেবে দেখেন। যার কারণে তারা ইচ্ছামত এই লাইব্রেরির বই ধ্বংস করতে থাকে। এভাবেই ধীরে ধীরে ধ্বংস হতে থাকে জ্ঞানতীর্থ আলেকজান্দ্রিয়া লাইব্রেরি। বর্তমানে প্রযুক্তির উন্নয়নে আমরা জ্ঞান সংরক্ষণের অনেক উপায় পেয়েছি। কিন্তু অন্ধবিশ্বাস এর সঙ্গে যুদ্ধের উপায় কি আমরা পেয়েছি? না-কি এখনকার জ্ঞানতীর্থগুলোর পরিণতিও আলেকজান্দ্রিয়া লাইব্রেরি এর মত হবে?

ডেইলি বাংলাদেশ/জেএমএস/এসজেড