ঐতিহাসিক ভাষণটি ক্যামেরায় ধারণ করেছিলেন যিনি

ঢাকা, মঙ্গলবার   ০৭ এপ্রিল ২০২০,   চৈত্র ২৪ ১৪২৬,   ১৩ শা'বান ১৪৪১

Akash

ঐতিহাসিক ভাষণটি ক্যামেরায় ধারণ করেছিলেন যিনি

ফিচার ডেস্ক ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ০৯:৫০ ৭ মার্চ ২০২০   আপডেট: ১০:৫৮ ৭ মার্চ ২০২০

তৎকালীন রেসকোর্স ময়দানে ভাষণ দিচ্ছেন বঙ্গবন্ধু, ইনসেটে অভিনেতা আবুল খায়ের

তৎকালীন রেসকোর্স ময়দানে ভাষণ দিচ্ছেন বঙ্গবন্ধু, ইনসেটে অভিনেতা আবুল খায়ের

একাত্তরের শুরুর দিকে সবাই তাকিয়ে ছিল বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের দিকে। ওই সময় তার আদেশ ও দিকনির্দেশনা পাওয়াটা মোটেও সহজ ছিল না। কারণ যোগাযোগ বলতে চিঠি, খবরের কাগজ আর টেলিগ্রাম ছিল ভরসা। ওই রকম এক সংকটময় অবস্থায় একটি বিশাল জনসমাবেশে দেয়া ভাষণ, সেটার অডিও-ভিডিও রেকর্ড করা ও প্রচার ছিল এক প্রকার অবিশ্বাস্য। তবু কিছু মানুষ নিজের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে সেটা সম্ভব করেছেন।

৭ মার্চ, ১৯৭১ সাল। আওয়ামীলীগ আয়োজিত এক বিশাল জনসভায় ভাষণ প্রদান করেন জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। ঐতিহাসিক এ ভাষণ নিয়ে ব্যাপক পূর্ব প্রস্তুতি থাকলেও, পরিকল্পনামাফিক ভাষণটির অডিও-ভিডিও ধারণ করা সম্ভব হয়নি। ঢাকা বেতার থেকে এ ভাষণ প্রচার করার কথা ছিল; কিন্তু পাকিস্তান সরকারের নগ্ন হস্তক্ষেপের কারণে সেদিন রেডিওতে তা প্রচার করা যায়নি। বঙ্গবন্ধু সেদিন গুরুত্বপূর্ণ কোনো বক্তব্য রাখতে পারেন, এ আশায় রেসকোর্সের ময়দান জনসমুদ্রে পরিণত হয়েছিল। এখনকার মতো এত আধুনিক টেকনোলজি মজুদ না থাকলেও সেদিনের জনসভার ভাষণটি বেতারে প্রচার করার যাবতীয় প্রস্তুতি সম্পূর্ণ ছিল। যদিও শেষ পর্যন্ত তা আর সম্ভব হয়নি।

সরকারের নিষেধাজ্ঞাকে উপেক্ষা করে পাকিস্তান আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র করপোরেশন এর চেয়ার‍ম্যান এ এইচ এম সালাহউদ্দিন ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক এম আবুল খায়ের এমএনএ ভাষণটি ধারণ করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। এম আবুল খায়ের এমএনএ ছিলেন তৎকালীন ফরিদপুর জেলার পাঁচ আসনের (বর্তমান গোপালগঞ্জ ১ আসন) নির্বাচিত সংসদ সদস্য। তাদের এ কাজে সাহায্য করেন অভিনেতা আবুল খায়ের। তিনি তখন সরকারের ফিল্ম ডিভিশনের ডিএফপি কর্মকর্তার পাশাপাশি একজন অভিজ্ঞ সচল ক্যামেরা বিশেষজ্ঞও ছিলেন। তাদের সঙ্গে আরো যুক্ত হলেন অভিজ্ঞ টেকনিশিয়ান এনএইচ খন্দকার।

এমএনএ আবুল খায়ের

বঙ্গবন্ধুর বক্তৃতার সময় এমএনএ আবুল খায়েরের তত্ত্বাবধানে টেকনিশিয়ান এনএইচ খন্দকার মঞ্চের নিচ থেকে ভাষণটির অডিও ধারণের সিদ্ধান্ত নেন। অন্যদিকে অভিনেতা আবুল খায়ের মঞ্চের এক পাশ থেকে সচল ক্যামেরা নিয়ে ঐ ভাষণের চিত্রধারণ করেন। কিন্তু ওই সময়ের ক্যামেরাগুলো বেশ বড় আকার হওয়ার কারণে আবুল খায়েরের একার পক্ষে সেটা নাড়াচাড়া করা বেশ কষ্টকর হয়ে পড়েছিল। ফলে এক জায়গায় স্থির থেকে তিনি যতটুকু পেরেছেন, ধারণ করেছিলেন। আর এ কারণেই সাতই মার্চের ১০ মিনিটের একটি ভিডিও চিত্র আমরা দেখে থাকি। অন্যদিকে সরকারের হস্তক্ষেপের কারণে বেতার কর্মীরা সরাসরি ভাষণটি প্রচার করতে না পারলেও; রেকর্ডটি সম্পন্ন করতে পেরেছিলেন। যেটা পর দিন বাঙালি বেতারকর্মী ও আপামর জনতার দাবির প্রেক্ষিতে বেতারে প্রচার করা হয়।

এ প্রসঙ্গে এমএনএ আবুল খায়েরের ছেলে নজরুল সংগীতশিল্পী খাইরুল আনাম শাকিল জানান, ঐতিহাসিক ৭ মার্চের ভাষণ প্রচারে পাকিস্তান সরকারের নিষেধাজ্ঞা থাকায় তারা মঞ্চের নিচে লুকিয়ে ওই ভাষণের অডিও-ভিডিও ধারণ করেছিলেন। আমার বাবার একটি রেকর্ড কোম্পানি ছিল ‘ঢাকা রেকর্ড’ নামের, ফলে তিনি অডিও রেকর্ডের দায়িত্ব পালন করেছিলেন। অন্যদিকে অভিনেতা আবুল খায়েরের যেহেতু ক্যামেরা জ্ঞান ভালো ছিল, তাই তিনি ভিডিওচিত্র ধারণ করেন। পরবর্তীতে বঙ্গবন্ধুর জন্মদিনে এ ধারণকৃত অডিও-ভিডিও তাকে উপহার দেয়া হয়েছিল এবং যুদ্ধ চলাকালীন সময় এর কয়েকটি রেকর্ডেড কপি ভারতে পাঠানো হয়। সেখান থেকে বিশ্বখ্যাত রেকর্ড কোম্পানি এইচএমভির উদ্যোগে এ ভাষণের তিন হাজার কপি বিনামূল্যে বিভিন্ন জায়গায় বিতরণ করা হয়।

যারা আবুল খায়েরকে শুধুমাত্র অভিনেতা হিসেবেই জানেন, তাদের জন্য হয়তো এ তথ্যটি বেশ চমকপ্রদ। নন্দিত কথাসাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদের নাটকের মাধ্যমেই অভিনয় জগতে জনপ্রিয়তা লাভ করেন আবুল খায়ের। তিনি প্রখ্যাত চলচ্চিত্রকার ঋতিক কুমার ঘটকের পরিচালিত ‘তিতাস একটি নদীর নাম’ চলচ্চিত্রেও অভিনয় করেছেন। এছাড়া, চলচ্চিত্রে অবদানের জন্য চারবার জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার অর্জন করেন আবুল খায়ের।

ডেইলি বাংলাদেশ/এনকে/টিআরএইচ