এ কালের বেগম রোকেয়া ‘মাস্তুরা আপা’

ঢাকা, শনিবার   ১১ জুলাই ২০২০,   আষাঢ় ২৭ ১৪২৭,   ১৯ জ্বিলকদ ১৪৪১

Beximco LPG Gas

এ কালের বেগম রোকেয়া ‘মাস্তুরা আপা’

ফাতেমী আহমেদ ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ১৭:৪৫ ২৬ মে ২০২০  

বেগম রোকেয়া

বেগম রোকেয়া

নেত্রকোনার কেন্দুয়া উপজেলার বেগম রোকেয়া। প্রাক্তন এ স্কুলশিক্ষক সবার কাছে মাস্তুরা (মাস্টার) আপা নামে পরিচিত। জেলার অসহায়, নির্যাতিত নারীদের জন্য কাজ করছেন ৩০ বছরের বেশি সময় ধরে। নারী জাগরণের অগ্রদূত বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেনের কার্যক্রমের সঙ্গে মিল থাকায় তাকে বলা হচ্ছে ‘এ কালের’ বেগম রোকেয়া।

বেগম রোকেয়ার জন্ম ১৯৪৭ সালের ১৭ মে কেন্দুয়ার কাওরাট গ্রামে। বাবা আব্দুল আজিজ তালুকদার ছিলেন নেত্রকোনার প্রতিষ্ঠিত পাট ব্যবসায়ী। মা রায়হানা বেগম ছিলেন গৃহিণী। বটবৃক্ষ তুল্য মায়ের কাছ থেকেই নির্যাতিত নারীদের জন্য কাজ করা অনুপ্রেরণা পেয়েছেন তিনি।

মানবাধিকার কর্মী ও সমাজ সংগঠক বেগম রোকেয়া একাধারে নেত্রকোনার স্বাবলম্বী উন্নয়ন সমিতির নির্বাহী পরিচালক, জাহানারা স্মৃতি উচ্চ বালিকা বিদ্যালয় ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি, বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ নেত্রকোনা শাখার প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক।

ব্যক্তিগত জীবনে নিজেও সংগ্রাম করেছেন বেগম রোকেয়া। সপ্তম শ্রেণিতে পড়ার সময়ই তার বিয়ে হয়। মাত্র সাত বছরের সংসার জীবনে তিনি দুই মেয়ের মা। বিয়ের পর শ্বশুর-শাশুড়ির চাপে আর পড়াশোনা করতে পারেননি। সংগ্রামী সংসার জীবন থেকে বেরিয়ে আবার পড়াশোনা শুরু করেন। ১৯৬৯ সালে নেত্রকোনা সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় থেকে এসএসসি, পরে এইচএসসি পাশ করেন। এরমধ্যে ওই বিদ্যালয়ের শিক্ষিকা হিসেবে যোগদান করেন। চাকরির পাশাপাশি বিএ, বিএড পাশ করেন। বাবার মৃত্যুর পর পরিবারের দায়িত্ব নেন বেগম রোকেয়া। অক্লান্ত পরিশ্রমে বোন ও মেয়েদের উচ্চ শিক্ষায় শিক্ষিত করে তোলেন।

১৯৯০ সাল পর্যন্ত নেত্রকোনা সরকারি বালিকা বিদ্যালয়ের শিক্ষক ছিলেন বেগম রোকেয়া। চাকরি থেকে অগ্রিম অবসর নিয়ে প্রতিষ্ঠা করেন নেত্রকোনা স্বাবলম্বী উন্নয়ন সমিতি নামে একটি এনজিও। এনজিও কর্মকাণ্ডের জন্য অনেক দেশ ঘুরেছেন তিনি। তার প্রথম বিদেশ সফর ছিল ১৯৮৩ সালে। ওই বছর ভারতের কলকাতা, চেন্নাই ও শ্রীলংকার কলম্বো সফর করেন বেগম রোকেয়া। এরপর এশিয়া, ইউরোপ, দক্ষিণ আমেরিকা, উত্তর আমেরিকা, আফ্রিকা মহাদেশের বিভিন্ন দেশ ঘুরেছেন তিনি। ২০১০ সালে কেনিয়ার নাইরোবিতে বিশ্ব মাইক্রো-ক্রেডিট সম্মেলনে যোগ দিয়েছিলেন বেগম রোকেয়া।

নেত্রকোনার অবহেলিত-নির্যাতিত নারীদের কাছে মাস্তুরা (মাস্টার) আপা হিসেবে সুপরিচিত বেগম রোকেয়া। তাকে বলা হয় নারী জাগরণের অগ্রদূত বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেনের উত্তরসূরী। কর্মমুখী শিক্ষা ও চাকরির ক্ষেত্র তৈরিতে তার অবদান উল্লেখযোগ্য। ব্যক্তিগত জীবনেও বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেনের মতোই সংগ্রাম করেছেন তিনি। দুজনই স্বামীকে হারিয়েছেন অল্প বয়সে, কুসংস্কারাচ্ছন্ন সমাজ আর শত প্রতিকূলতার মধ্যেই পড়াশোনা করেছেন। সমাজের কাছে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করেছেন।

শিক্ষকতা, সামাজিক কর্মকাণ্ড, অবহেলিত নারীদের জন্য সংগ্রামের পাশাপাশি লেখালেখিতেও ঝুঁকেছিলেন ‘এ কালের’ বেগম রোকেয়া। নিজের লেখা ‘আমার মুক্তি আলোয় আলোয়’ বইয়ে তিনি তুলে ধরেছেন ঘটনাবহুল, কর্মময় ও সংগ্রামী জীবনের সারসংক্ষেপ।

নেত্রকোনার ইতিহাস, সাহিত্য ও সংস্কৃতি বিষয়ক গবেষক গোলাম কবীর বলেন, বেগম রোকেয়া নিজের জীবন থেকে শিক্ষা নিয়েছেন। মানবাধিকার, সমাজ সংগঠন, অসহায়-নির্যাতিত নারীদের জন্য ৩০ বছর ধরে কাজ করছেন। অবহেলিত নারীদের কাছে তিনি মুক্তির পথিকৃত। আশা করি, অদূর ভবিষ্যতে বড় কোনো সম্মান অর্জন করবেন বেগম রোকেয়া।

কথা হয় ‘এ কালের’ বেগম রোকেয়ার সঙ্গে। ডেইলি বাংলাদেশকে তিনি বলেন, ছোটবেলা থেকেই নানা প্রতিকূলতার মধ্য দিয়ে বড় হয়েছি। চেয়েছি সমাজের অবহেলিত-নির্যাতিত নারীদের জন্য কিছু করতে। এ কারণে তাদের স্বাবলম্বী করতে নানা পদক্ষেপ নিয়েছি। সামর্থ্য অনুযায়ী কিছু করতে পেরে আমি আনন্দিত।

বেগম রোকেয়া বলেন, আমার এনজিও’র মাধ্যমে অসহায় অনেক নারী প্রশিক্ষণ নিয়ে স্বাবলম্বী হয়েছেন। এখনো আমাদের ১১টি প্রকল্প চালু আছে। এসব প্রকল্পের মাধ্যমে নারীদের অর্থনৈতিক উন্নয়ন, দুস্থদের সহায়তা, অসহায় শিশুদের বিনামূল্যে পড়াশোনার ব্যবস্থা করা হয়েছে। আগামীতেও এসব কার্যক্রম অব্যাহত রাখা হবে।

ডেইলি বাংলাদেশ/এআর