ঢাকা, সোমবার   ১৮ ফেব্রুয়ারি ২০১৯,   ফাল্গুন ৬ ১৪২৫,   ১২ জমাদিউস সানি ১৪৪০

হাদীসের আলোকে

জ্বিন-শয়তান থেকে আত্মরক্ষার উপায়

মুফতী শহীদুল ইসলাম

 প্রকাশিত: ১৯:২৯ ৭ অক্টোবর ২০১৮   আপডেট: ১৯:২৯ ৭ অক্টোবর ২০১৮

ফাইল ছবি

ফাইল ছবি

জ্বিন-শয়তানের আসর থেকে বাঁচার জন্য আমরা বিভিন্ন কবিরাজের কাছে গিয়ে থাকি। যে রকমটা আমরা জাদু-টোনা থেকে বাঁচার জন্যও করে থাকি। 

অথচ আমাদের প্রিয়নবী হজরত মুহম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে এ সংক্রান্ত যে দোয়া ও নির্দেশনা এসেছে, তার ওপর আমল করা হলে সহজেই আমরা এ সকল আপদ থেকে রেহায় পেতে পারি।

সন্ধ্যার আগেই বাচ্চাদের ঘরে নিয়ে আসা:

আমরা ছোটবেলায় কোনো জঙ্গলের পাশে খেলা করতে গেলে মুরব্বীরা মাগরিবের নামাজে যাওয়ার সময় খেলা ভেঙ্গে বাড়িতে পাঠিয়ে দিতেন। অনেকে মনে করতো, সন্ধ্যার আগে ঘরে ফেরার রুটিন হিসেবেই হয়তো তারা একাজটি করেছেন। কিন্তু এর  পেছনের কারণ যদি ব্যাখ্যা করা হয়, এসময় জ্বিন-শয়তানের আনাগোনা বেড়ে যায় আর ওদের থেকে হেফাজতের জন্য তারা এমনটি করতেন। 

অনেকে এটাকে কুসংস্কার মনে করতে পারেন। তবে এটা তেমন কিছু নয় বরং হাদীসের শিক্ষা। হাদীসে সন্ধ্যার আগে বাচ্চাদের বাড়ি ফেরার জন্য বিশেষ তাগিদ দেওয়া হয়েছে।  হজরত জাবের রাযিআল্লাহু আনহু রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে বর্ণনা করেন, ‘সূর্য ডুবে অন্ধকার যখন নেমে আসতে থাকে তখন বাচ্চাদের  তোমাদের কাছে নিয়ে এসো। বাহিরে যেতে দিও না। কেননা, ঐ সময় শয়তানের আনাগোনা বেড়ে যায়। তারপর যখন রাতের কিছু অংশ চলে যায় তখন (প্রয়োজনে) তাদের বাহিরে যেতে দাও। এবং আল্লাহর নামে ঘরের দরজা বন্ধ করে দাও। (সহীহুল বুখারি-৩২৮০) 

এই হাদীসসহ আরো বহু হাদীস দ্বারা প্রমাণীত যে, সূর্য ডুবার সঙ্গে সঙ্গে শয়তান ও তার অনুসারী জ্বিনদের আনাগোনা বেড়ে যায়। বুখারী শরীফের ব্যাখ্যাগ্রন্থ ‘উমদাতুল কারী’ -তে এই হাদীসের ব্যাখ্যায়, লেখা হয়েছে ‘ঐ সময়টাতে বাচ্চাদের ব্যাপারে শঙ্কা করা হয়েছে। কারণ, শয়তান নাপাকি পছন্দ করে। আর ছোট বাচ্চাদের শরীর সাধারণত নাপাক থাকে। তাছাড়া, বাচ্চারা শয়তান থেকে রক্ষার দোয়া-কালামও তেমন জানে না। সন্ধ্যায় শয়তান বের হয়ে, যার পেছনে লাগা সম্ভব হয় তার পেছনেই লেগে যায়।’

শয়তানের দলের ঐ সময় বের হওয়ার কারণ হলো ‘তাদের জন্য দিনের আলোর তুলনায় রাতের অন্ধকারে ঘোরাফেরা করা অনেক সহজ। এরকমভাবে প্রত্যেক অন্ধকারই ওদের চলাফেরার বেশি উপযোগী। এজন্য কেউ কেউ বলেন ‘শয়তানের দল অন্ধকার থেকে সাহায্য নেয়। আর আলোকে অপছন্দ করে ও কুলক্ষণ মনে করে। (উমদাতুল কারী শরহে সহীহিল বুখারী, খন্ড-১২. পৃষ্ঠা-৩৮১)
 
হজরত আনোয়ার শাহ কাশ্মিরী (রাহ.) বুখারী শরীফের ব্যাখ্যাগ্রন্থে লেখেন ‘স্কুল-মাদরাসা ছুটির পর ছাত্র-ছাত্রীরা যেমন দৌড়ে বাড়ির দিকে রওয়ানা হয়, শয়তানের দলও সন্ধ্যা হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বের হয়ে, জনপদের দিকে দৌড়ে আসতে থাকে।’ (ফয়জুল বারী, খন্ড-৪. পৃষ্ঠা-১১) 

তাই পিতা-মাতার দায়িত্ব হলো, সূর্য ডুবার সঙ্গে সঙ্গে বাচ্চাদের বাসায় নিয়ে আসা। অন্ততপক্ষে নিজেদের কাছে নিয়ে আসা। এই হাদীসের ব্যাখ্যা থেকে আরো কয়েকটি বিষয় বুঝে আসে।

(ক) অপবিত্রতাকে শয়তান পছন্দ করে আর পবিত্রতাকে ভয় পায়। তাই আমাদের উচিৎ সবর্দা পবিত্র অবস্থায় থাকা। আর মহিলাদের বিশেষ দিনগুলোতে সতর্কতার মাত্রা বাড়িয়ে দেয়া।

(খ) অন্ধকার ওদের যাতায়াতের জন্য বেশি উপযোগী। এর দ্বারা প্রতীয়মান হয় যে, বাড়ি- ঘরের যে অংশ সব সময় অন্ধকার থাকে, কেউ ভয়ে যেতে চায় না, বিশেষ প্রয়োজন ছাড়া ঐ স্থান এড়িয়ে যাওয়া।
 
আমরা অনেকে এ বিষয়গুলোকে গুরুত্ব দেই না। না দেওয়ার কারণে, বিপদের মুখোমুখি হলে, তাবীজ-কবিরাজের পেছনে ছুটাছুটি করি। বহু সময় ও অর্থ ব্যয় করি। অথচ শুরুতে সামান্য সতর্ক হলেই আমরা এ সকল আপদ থেকে রেহায় পাই।

রাত্রি বেলায় ঘর থেকে কম বের হওয়া:

হজরত জাবের ইবনে আব্দুল্লাহ রাযিআল্লাহু আনহু বর্ণনা করেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, ‘গভীর রাত পর্যন্ত কিসসা, কাহিনীর যে মজলিস হয়, তাতে যেয়ো না। কেননা, তোমরা কেউ জান না যে, আল্লাহ তায়ালা তার কোন কোন সৃষ্টিজীবকে কোথায় কোথায় ছড়িয়ে দিয়েছেন। তাই দরজা বন্ধ করে দাও, কলসের মুখ আবৃত কর, পাত্রকে উপুড় করে দাও এবং বাতি নিভিয়ে দাও।’ (বুখারী, আদাবুল মুফরাদ-১২৩০) 

মেশকাত শরীফের এক বর্ণনায় এসেছে ‘রাতে যখন পথ-ঘাট শূন্য হয়ে যায়, তখন তোমরা ঘর থেকে খুব কম বের হবে।’

কুকুর বা অন্য কোনো পশুর আওয়াজ শুনলে করণীয়:

হজরত জাবের রাযিআল্লাহু আনহু বলেন, আমি নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলতে শুনেছি,  ‘তোমরা রাতের বেলায় কুকুর বা গাধার চিৎকার শুনলে, বিতাড়িত শয়তান থেকে আল্লাহর আশ্রয় প্রার্থনা করবে (অর্থাৎ ‘আউযুবিল্লাহি মিনাশ শায়ত্বনির রাযীম’ পড়বে)। কেননা, কুকুর, গাধা এমন কিছু দেখে যা তোমরা দেখতে পাও না।’ (বুখারী, আদাবুল মুফরাদ-১২৩৩) 

কোনো কোনো বর্ণনায় এসেছে ‘তোমরা দরজা বন্ধ করে দাও। কেননা, শয়তান বন্ধ দরজা খুলতে পারে না। এবং তাতে আল্লাহর নাম নাও (অর্থাৎ বিসমিল্লাহ বলে দরজা বন্ধ কর)।’ (বুখারী, আদাবুল মুফরাদ-১২৩৪) 
  
আরো কিছু সময় সতর্ক থাকার:

সূর্য ওঠা ও ঠিক দুপুরের সময়ও সতর্ক থাকা চাই। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, ‘দেখো! সকালে সূর্যের কিনারা যখন উদিত হয় তখন নামাজ ছেড়ে দাও, যতক্ষন না তার পুরোটা উদিত হয়।’ (সহীহুল বুখারী-৩২৭২) 

এমনিভাবে ঠিক দুপুরে নামাজ পড়াও বিভিন্ন হাদীস ও ফিকহের আলোকে প্রমাণীত। আর মহান আল্লাহর ইবাদত যখন বন্ধ হয়ে যায় তখন ওদের আনাগোনা বেড়ে যায়। তাই এই দুই সময়েও সতর্ক থাকা চাই।

যে সকল স্থানে সতর্ক অবস্থায় চলতে হয়:
 
কিছু কিছু সময় যেমন সতর্কতা অবলম্বন করতে হয়, তেমনি কিছু কিছু স্থানেও  সতর্ক হয়ে চলতে হয়। এর মধ্যে প্রথম হলো- বাথরুম।

এ প্রসঙ্গে হাদীসবেত্তাগণ বলেন, ‘অন্যান্য ময়লা জায়গাগুলোতে শয়তানের দল যেমন জমা হয়, তেমনিভাবে বাথরুমগুলোতেও শয়তানের দল জমা হয়।’ (দরসে তিরমিযী, খন্ড-১. পৃষ্ঠা-১৭২) 

তাই নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বাথরুমে যাওয়ার সময় দোয়া পাঠের নির্দেশ দিয়েছেন। যেন মহান আল্লাহ তায়ালা এই দোয়ার বরকতে জ্বিন-শয়তান থেকে হেফাজত করেন। 

দোয়া:

اللهم انى أعوذبك من الخبث و الخبائث
আল্লাহুম্মা ইন্নী আউযুবিকা মিনাল খুবছি ওয়াল খাবায়িছ

ময়লা ফেলার স্থান:

সাধারণত সকল ময়লা জায়গায় ওদের যাওয়া আসা হয় যেমনটি ইতোপূর্বে আলোচনা হয়েছে; বিশেষ করে খাবারের উচ্ছিষ্ট যেখানে ফেলানো হয়। তাই ময়লা ফেলার স্থান ও ডাস্টবিন ইত্যাদির ক্ষেত্রে সতর্ক থাকা। কোনো প্রাণীকে না মারা বা তাড়াতে হলে নিয়ম মেনে তাড়ানো। 

রাসূল সাল্লাল্লাহু  আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, ‘তোমরা গোবর ও হাড্ডি দ্বারা ইস্তেঞ্জা করবে না। কেননা, এগুলো তোমাদের ভাই জ্বিনদের পাথেয়।’ (তিরমিযী-১৮) 

পূর্বে হাদীসের আলোকে তা আলোচনা হয়েছে। জ্বিন শয়তান থেকে সকাল পর্যন্ত পাহারাদারীর ব্যবস্থা:

হজরত আবু হুরাইরা (রা.) বলেন, নবী করীম সাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এক রমজানে আমাকে জাকাতের মাল হেফাজতের জিম্মাদারী দিলেন। তিনি আমাকে বললেন, লোকদের থেকে সদকার মাল নিবে এবং এগুলো হেফাজত করবে। তো হঠাৎ এক আগন্তুক এসে সেখান থেকে জাকাতের মাল নিয়ে চলে যেতে লাগলো। আমি তাকে ধরে ফেললাম। এবং কসম খেয়ে বললাম, আমি তোমাকে নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কাছে নিয়ে যাবো। তখন ঐ চোর নিজের ওজর পেশ করতে লাগলো। বলতে লাগলো আমি অনেক অভাবী। আমার সন্তানাদিও অনেক। তাই আমি বাধ্য হয়ে চুরি করেছি। 

সকালে যখন নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সঙ্গে আমার সাক্ষাত হলো তখন তিনি জিজ্ঞেস করলেন, তোমার আটককৃত ব্যক্তি রাতে কী করেছিলো ? (নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ওহীর মাধ্যমে ঘটনাটি জেনেছিলেন)। আমি বললাম, আমার দয়ার কারণে তাকে ছেড়ে দিয়েছি। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, সে মিথ্যা বলেছে। সে আবার আসবে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলার কারণে আমার বিশ্বাস হয়ে গেলো সে আবার আসবে। তাই ওৎপেতে রইলাম তাকে ধরার জন্য। 

সে আবার আসলো, আমি তাকে পাকড়াও করলাম, দয়াবশত পূর্বের ন্যায় ছেড়েও দিলাম। সকালে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সঙ্গে সাক্ষাতে পূর্বের ন্যায় কথা হলো। তিনি চোর আবার আসবে বলে চলে গেলেন। 

তৃতীয়বার যখন আমি তাকে পাকড়াও করলাম তখন বললাম আজ আর তোমাকে ছাড়ছি না। অবশ্যই রাসূলের দরবারে তোমাকে হাজির করবো। এবার সে বললো আমাকে ছেড়ে দাও! আমি তোমাকে এমন এক দোয়া শিখাবো যা দ্বারা আল্লাহ তায়ালা তোমাকে উপকৃত করবেন। সে কী দোয়া শিখালো? সে শিখালো, বিছানায় যাওয়ার সময় ‘আয়াতুল কুরসী’ তেলাওয়াত কর, তাহলে আল্লাহ তায়ালার পক্ষ থেকে পাহারাদার হিসেবে একজন ফেরেস্তা নিয়োগ দেয়া হবে। এই পাহারাদারীর কারণে, শয়তান তোমাদের কাছে ভিড়তে পারবে না। আর এই পাহারাদারীর ব্যবস্থা থাকবে সকাল পর্যন্ত। (সহীহুল বুখারী-৩২৭৫)  

দিনে জ্বিন থেকে হেফাজতের দোয়া:

হজরত আবু হুরাইরা রাযিআল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, যে ব্যক্তি দিনে একশত বার এই দোয়া পাঠ করবে-

لا اله الا الله وحده  لا شريك له له الملك و له الحمد و هو على كل شئ قدير

‘লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওহ্দাহু লা-শারীকা লাহু, লাহুল মুলকু ওয়া লাহুল হামদু ওয়া হুয়া আলা কুল্লি শায়য়িন ক্বাদীর’ 

তাহলে আল্লাহ তায়ালা পাঠকারীর আমলনামায় দশটি গোলাম আযাদ করা সওয়াব লিখে দেন। দোয়ার বদৌলতে আমলনামায় একশত নেকি লেখা হবে এবং একশত গুনাহ মুছে দেয়া হবে। এবং ঐ দিন সন্ধা পর্যন্ত শয়তান থেকে হেফাজতের ব্যবস্থা করা হবে।(সহীহুল বুখারী-৩২৯৪)

দুঃস্বপ্ন দেখলে করণীয়:

হজরত আবু কাতাদা (রা.) থেকে বর্ণীত, নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, ভালো স্বপ্ন আল্লাহর পক্ষ হতে হয়। আর খারাপটি শয়তানের কারসাজি। অতএব তোমাদের কেউ খারাপ স্বপ্ন, যা ভয় পাইয়ে দেয় দেখলে বামদিকে থুথু দিবে এবং আল্লাহর কাছে শয়তানের অনিষ্টতা থেকে আশ্রয় প্রার্থনা করবে। এমনটি করলে ঐ স্বপ্ন তার কোনো ক্ষতিই করতে পারবে না। (সহীহুল বুখারী-৩২৯২)

‘মনজিল’ নামে শায়েখ জাকারিয়া (রাহ.) এর ছেলে ত্বালহা কান্ধলবী এর ছোট একটি দোয়ার বই আছে। পবিত্র কোরআন ও হাদীস থেকে খুবই উপকারী ও পরীক্ষিত আমলগুলো এখানে জমা করা হয়েছে। 

এই বইটি জাদু-টোনা, জ্বিনের আছর ও অন্যান্য বিপদ-আপদ থেকে বাঁচার জন্য সকাল-সন্ধ্যায় নিয়মিত আমল করলে খুবই উপকার পাওয়া যাবে-ইনশাআল্লাহ।

ডেইলি বাংলাদেশ/আরএজে