Alexa এমপি মাশরাফীর দেশ ত্যাগে পুরনো রূপে সেই হাসপাতাল

ঢাকা, রোববার   ২২ সেপ্টেম্বর ২০১৯,   আশ্বিন ৭ ১৪২৬,   ২২ মুহররম ১৪৪১

Akash

নড়াইল সদর হাসপাতাল

এমপি মাশরাফীর দেশ ত্যাগে পুরনো রূপে সেই হাসপাতাল

রনজিনা খানম, নড়াইল ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ১০:২১ ৭ জুন ২০১৯   আপডেট: ১২:৪২ ৮ জুন ২০১৯

ছবি: ডেইলি বাংলাদেশ

ছবি: ডেইলি বাংলাদেশ

বিভিন্ন পদে পদায়নকৃত চিকিৎসক-কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নানা অনিয়ম ও অব্যবস্থাপনার কারণে নড়াইল-২ আসনের এমপি মাশরাফী বিন মোর্ত্তজা গত ২৫ এপ্রিল আকষ্মিক পরিদর্শনে আসনে নড়াইল সদর হাসপাতালে। এসময় নানা ধরণের অনিয়ম ও অব্যবস্থাপনা দেখে অসন্তোষ প্রকাশ করেন। পরে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় হাসপাতালের ৪ চিকিৎসককে সাময়িক বরখাস্ত করে। তবে এমপি মাশরাফী বিন মোর্ত্তজা বিশ্বকাপ ক্রিকেটে অংশ নিতে দেশ ত্যাগ করার সঙ্গে সঙ্গেই হাসপাতালে অব্যবস্থাপনা পুরনো রূপে ফিরে গেছে।

জানা গেছে, এমপি মাশরাফীর আকষ্মিক সফরের পর কিছুটা পরিবর্তন আসলেও দেশ ত্যাগের পর চিকিৎসক সংকট, দালালদের দৌরাত্ম ও ওষুধ কোম্পানির প্রতিনিধিদের যন্ত্রনাসহ নানা অনিয়ম-অব্যবস্থাপনায় হাসপাতালে সেবা নিতে আসা রোগীরা ফের ভোগান্তিতে পড়েছে। এতে রোগীসহ সাধারণ মানুষের মাঝে হতাশা ও ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। 

আট লক্ষাধিক জনসংখ্যা অধ্যুষিত এই জেলায় স্বাস্থ্য সেবার প্রাপ্তির একামাত্র ভরসা নড়াইল আধুনিক সদর হাসপাতাল। ৫০ শয্যা বিশিষ্ট নড়াইল আধুনিক সদর হাসপাতালটি ২০০৪ সালে ১০০ শয্যায় উন্নিত করা হয়। কিন্তু চিকিৎসকসহ বিভিন্ন পদে জনবল সংকটের কারণে সব সময়েই খুড়িয়ে খুড়িয়ে চলছে হাসপাতালের চিকিৎসা সেবা। 

হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, বর্তমানে নড়াইল আধুনিক সদর হাসপাতালে প্রথম শ্রেণীর পদমর্যাদা সম্পন্ন তত্ত্বাবধায়কসহ চিকিৎসকের পদ রয়েছে ৫০টি। তার মধ্যে ২১টি পদ শূন্য রয়েছে। বাকি ২৯টি পদ পূরণ থাকলেও ওই চার চিকিৎসক সাময়িকভাবে বরখাস্ত এবং আরো এক চিকিৎসক প্রেষণে অন্য জেলায় কর্মরত রয়েছেন।

বরখাস্তৃকত চারজন চিকিৎসকের মধ্যে সিনিয়র কনসালটেন্ট (সার্জারি) মোঃ আকরাম হোসেন ২০১৪ সালের ৯ জানুয়ারি নড়াইল সদর হাসপাতালে যোগদান করেন। তিনি প্রতি সপ্তাহে রোববার ও সোমবার রোগী দেখতেন। বরখাস্তকৃত জুনিয়র কার্ডিওলজি ডা. মোঃ শওকত আলী ২০১৮ সালের ৬ জুন নড়াইল সদর হাসপাতালে যোগদান করেন। তিনি সপ্তাহে প্রতি মঙ্গলবার শুধুমাত্র হাসপাতালে সেবা দিতেন। বাকি দিনগুলি তিনি বিনা ছুটিতেই নিজ এলাকায় প্রাইভেট চেম্বারে রোগী দেখতেন।

আরেক বরখাস্তকৃত জুনিয়র কার্ডিওলজী কাজী মোঃ রবিউল ইসলাম নড়াইল সদর হাসপাতালে যোগদান করেন ২০১৮ সালের ৬ জুন। তিনি সপ্তাহে শনিবার, রোববার ও সোমবার হাসপাতালে আসতেন। বাকি দিনগুলো নিজের এলাকায় অবস্থান করতেন। অপর বরখাস্তকৃত মেডিকেল অফিসার এএসএম সায়েম নড়াইল সদর হাসপাতালে যোগদান করেন ২০১৮ সালের ৩ জুলাই। তিনি অনিয়মিতভাবে কুমিল্লা হতে নড়াইলে আসতেন। গত ২৫ এপ্রিল এমপি মাশরাফীর আকষ্মিক সফরকালে তিনি ছুটি ছাড়াই বাড়িতে অবস্থান করছিলেন। 

সব মিলিয়ে চিকিৎসক সংকটের কারণে প্রতিদিন ওয়ার্ড ও বহির্বিভাগ ৬/৭ শত রোগীকে চিকিৎসা দিতে হিমশিম খাচ্ছে চিকিৎসকরা। এছাড়াও দ্বিতীয় শ্রেণীর পদমর্যায় সম্পন্ন প্রশাসনিক কর্মকর্তা, নার্সিং সুপার ভাইজার, সিনিয়র ষ্টাফ নার্স, ষ্টাফ নার্স পদগুলির অধিকাংশ পূরণ থাকলেও তৃতীয় শ্রেণীর পদমযার্দা সম্পন্ন ৩৪টি পদের মধ্যে উচ্চমান সহকারী, অফিস সহকারী কাম ডাটা এন্ট্রি অপারেটরসহ সেবক, ফার্মাসিষ্ট, ল্যাব টেকনিশিয়ান, রেডিও থেরাপিস্ট, ফিজিও থেরাপিস্ট, ওয়ার্ড মাস্টার, ষ্ট্রলাইজার কাম-মেকানিক, ইকুইপমেন্ট কেয়ার টেকার, টিকেট ক্লার্ক, লিয়েন কিপার, রিসিপশনিষ্ট, রেকর্ড কিপার, ডার্ক রুম সহকারীসহ ১৬টি পদ দীর্ঘদিন ধরে শূন্য রয়েছে। চতুর্থ শ্রেণী পদমর্যাদার এম এল এস, এস, ল্যাব এটেনডেন্ট, ষ্ট্রেচার বেয়ারার, কুক/মশালচী, ঝাড়–দার, গার্ডেনার পদে ২৫টি পদের মধ্যে ১২টি পদ শূন্য রয়েছে। 

সরেজমিনে হাসপতালে গিয়ে দেখা যায়, জরুরি বিভাগে কর্মরত চিকিৎসক হাফিজুর রহমান নিজ কক্ষ ছেড়ে বিশ্রাম নেয়ার কক্ষে বসে রোগী দেখছেন। এমপি মাশরাফীর পরিদর্শনের পর ওষুধ কোম্পানির প্রতিনিধিদের হাসপাতালে প্রবেশ নিষিদ্ধ হলেও পুনরায় তারা আবার ভীড় করছেন। ৬/৭ জন ওষুধ কোম্পানীর প্রতিনিধি ডাঃ হাফিজুর রহমানকে ওষুধের স্যম্পল দিচ্ছেন এবং তাদের কোম্পানীর ওষুধ লিখতে অনুরোধ করছেন। এসময় একাধিক অসুস্থ রোগী দাড়িয়ে থাকলেও ওষুধ কোম্পানির প্রতিনিধিদের কারণে চিকিৎসা সেবা ব্যহত হচ্ছিলো। 

এ বিষয়ে হাফিজুর রহমান বলেন, ওষুধ কোম্পানির লোকদের এখানে আসার কে অনুমতি দিয়েছে জানি না। তবে তাদেরকে আসতে দেখছি। এ ব্যাপারে তত্ত্বাবধায়ক স্যারই ভাল জানেন।

এদিকে এমপি মাশরাফী বিন মোর্ত্তজার পরিদর্শনের পর দালালদের দৌরাত্ম কমলেও ফের বৃদ্ধি পেয়েছে তাদের দৌরাত্ম। প্রতিদিনই ৮/১০ মহিলা দালাল ও বিভিন্ন ডায়গনেষ্টিক সেন্টারের প্রতিনিধিরা বিভিন্ন পরীক্ষা নিরীক্ষা ও চিকিৎসার নাম করে হাসপাতাল থেকে রোগী ভাগিয়ে নিচ্ছে। 

হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা লোহাগড়া উপজেলার ব্রাহ্মণডাঙ্গা গ্রামের হায়দার শেখ বলেন, আমার মাকে ডাক্তার দেখানোর জন্য হাসপাতালে এসেছি। একজন দালাল আমাকে ক্লিনিকে যাওয়ার পরামর্শ দেন। কিন্তু টাকা পয়সা কম থাকায় হাসপাতালে কয়েক ঘন্টা দাড়িয়ে থাকার পর কোনো মতে ডাক্তার দেখাতে পেরেছি। 

হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা শহরের মহিষখোলা এলাকার রমজান আলী বলেন, হাসপাতালের বহির্বিভাগে এতো রোগীর ভীড়, সে তুলনায় ডাক্তার একেবারেই কম। যার কারণে দুই ঘন্টা পর ডাক্তার দেখাতে পারলেও মাত্র ২৫ সেকেন্ড সময় দিয়েছেন তিনি।

নড়াইল সদর হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. মোঃ আব্দুস শাকুর বলেন, নড়াইল সদর হাসপাতালে আগের চেয়ে চিকিৎসার মান অনেক ভাল। কিছু সমস্যা রয়েছে, আশা করি নতুন করে জনবল নিয়োগ সম্পন্ন হলেই সমাধান হয়ে যাবে। এ জন্য সকলের আন্তরিক সহযোগিতা প্রয়োজন। 

ডেইলি বাংলাদেশ/টিআরএইচ