Alexa এখনো ক্ষত বয়ে বেড়াচ্ছেন তারা

ঢাকা, রোববার   ২১ জুলাই ২০১৯,   শ্রাবণ ৭ ১৪২৬,   ১৮ জ্বিলকদ ১৪৪০

এখনো ক্ষত বয়ে বেড়াচ্ছেন তারা

 প্রকাশিত: ১৬:১৭ ৯ অক্টোবর ২০১৮   আপডেট: ১৬:৪৬ ৯ অক্টোবর ২০১৮

ফাইল ছবি

ফাইল ছবি

মৃত ভেবে মর্গের লাশঘরে ফেলে রাখা হয়েছিল তাকে। টানা ছয় ঘণ্টা লাশঘরে পরে ছিলেন। লাশ শনাক্ত করতে গিয়ে, জীবিত দেখতে পেয়ে উদ্ধার করা হয় তাকে। ৭২ ঘণ্টা পর জ্ঞান ফিরে আসে তার। মরতে মরতে অল্পের জন্য বেঁচে যান তিনি। তবে ফিরে পাওয়া প্রাণে প্রতিনিয়ত অসহ্য যন্ত্রণা ভোগ করতে হচ্ছে তাকে। গোটা শরীরে গ্রেনেডের ১৮শ স্প্লিন্টার বয়ে বেড়াচ্ছেন। রাতে স্প্লিন্টারের যন্ত্রণায় ভালোমতো ঘুমাতেও পারেন না তিনি।

২০০৪ সালের ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলায় ভাগ্যক্রমে বেঁচে যাওয়া মাহবুবা পারভীনের নতুন জীবন পাওয়ার গল্প এটি। সেদিনের ভয়াবহ গ্রেনেড হামলায় ঘটনাস্থলেই নিহত আওয়ামী লীগের মহিলা বিষয়ক সম্পাদক আইভি রহমানের লাশের পাশে যে তিনজন নারীকে রক্তাক্ত অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখা যায়, তাদেরই একজন সাভারের মাহবুবা পারভীন। শুধু মাহবুবা পারভীন নয়, সেদিনের ভয়াবহ গ্রেনেড হামলায় আহত হন আরো কয়েকশত নেতাকর্মী। গ্রেনেড হামলায় আহত সকলের গল্পগুলোই এমন বেদনার।

২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলায় শরীরে ৫৬টি স্প্লিন্টার নিয়ে জীবন সংগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছেন তৎকালীন ঢাকা মহানগর আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক বজলুর রহমান। বর্তমানে তিনি ঢাকা উত্তর আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি। যে ৫৬টা স্প্লিন্টার শরীরে আছে সেগুলো আর বের করা যাবে না। কিডনিতে আছে, পায়ের রগের মধ্যে আছে, শিরার মধ্যেও আছে স্প্লিন্টার। 

৬৯ নম্বর ওয়ার্ড (বর্তমান ডিএসসিসি ৩৩ নম্বর ওয়ার্ড) কোতয়ালি থানা থেকে ২১ আগস্টের জনসভায় গিয়েছিলেন রাশিদা আক্তার রুমা। গ্রেনেড হামলার ঘটনার সময় তার ১৮টি দাঁত পড়ে যায়। পেটের এক পাশ কেটে ফেলা হয়। ১৪ বছরে ১৭ বার অপারেশন হয়েছে তার। বর্তমানে পায়ে পচন ধরেছে। পায়ের পাতার আঘাত শুকাচ্ছে না। যত দিনে যাচ্ছে তার শরীরের অবস্থা খারাপ হচ্ছে। 

সেদিন গ্রেনেড হামলায় আহত আরেক জন হলেন রত্না আক্তার রুবী। প্রায় ৫০টি স্পিন্টার এখনো শরীরে বয়ে বেড়াচ্ছেন ৩৯ বছর বয়সী এই নারী। যতদিন জীবিত আছেন ততদিন এই যন্ত্রণা তাকে বয়ে বেড়াতে হবে।  

বর্বরোচিত সে গ্রেনেড হামলায় গুরুতর আহত আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য এস এম কামাল হোসেনের শরীরে এখনো ১০ থেকে ১২টি স্প্রিন্টার রয়ে গেছে। যতদিন জীবিত থাকবেন, ততদিন তাকে এই স্প্লিন্টারের বোঝা বয়ে বেড়াতে হবে।

আওয়ামী স্বেচ্ছাসেবক লীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য লিটন মোল্লা। ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলায় আহত হয়েছিলেন তিনিও। এখনো তার শরীরের নানা জায়গায় ক্ষত ও স্প্লিন্টার রয়ে গেছে। শ্রবণ শক্তিও প্রায় নেই বললেই চলে। অসুস্থতার কারণে কোনো কাজ করতে পারেন না তিনি। 

মাদারিপুর জেলা সদরের ছিলারচর ইউনিয়নের পশ্চিম রঘুরামপুর গ্রামের প্রাণ কৃষ্ণ সেদিন স্পিন্টারের আঘাতে চোখ হারিয়েছিলেন। তার পরিবার এখন চলছেন সহধর্মিনীর কাজের ওপর।

সেদিনের গ্রেনেড হামলায় আহত হন উম্মে রাজিয়া কাজল। বর্তমানে তিনি সংরক্ষিত মহিলা আসনের এমপি। একুশ আগস্ট আহতদের মধ্য থেকে উম্মে রাজিয়া কাজলসহ আরো একজনকে সংরক্ষিত আসনে এমপি করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। 

২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলায় আহতদের একজন নাসিমা ফেরদৌস। মৃত্যুর দুয়ার থেকে ফিরে আসা এই নারী এখনো বয়ে চলেছেন শরীরে অসহ্য যন্ত্রণা। শরীরের ভেতরেই দুঃসহ যন্ত্রণা তাকে প্রতিদিনই মনে করিয়ে দেয় ২০০৪ সালের ২১ আগস্টের সেই ভয়াবহ হামলার কথা। 

ওই হামলায় পল্লবী থানা মহিলা আওয়ামী লীগের সহসভানেত্রী দৌলতুন নাহারের পেটের নাড়িভুঁড়ি বের হয়ে যাওয়াসহ দুই পা ক্ষত-বিক্ষত হয়ে যায়। মুমূর্ষু অবস্থায় কলকাতার পিয়ারলেস হাসপাতালে কয়েক দফা অপারেশন হয় তার। নাহারের ডান চোখ নষ্ট হয়ে গেছে। এখন বাম চোখেও ঝাপসা দেখেন তিনি। 

সেদিন স্প্লিন্টারের আঘাতে শরীরের পুরো নিম্নাংশ ঝাঁঝরা হয়ে গিয়েছিল ঢাকা জেলা স্বেচ্ছাসেবক লীগের সাংস্কৃতিক সম্পাদিকা নীলা চৌধুরীর। বাম পা আকারে কিছুটা ছোট হয়ে গেছে তার। শরীরে অসংখ্য স্প্লিন্টারও রয়ে গেছে। বর্তমানে সুইডেনে স্থায়ীভাবে বসবাস করছেন তিনি। 

কেরানীগঞ্জের আকবর সবুজ সেদিন আহত হয়েছিলেন। সবুজের হাড়ের ভেতর ২টি স্প্লিন্টার নিয়ে বেচে আছেন। স্ক্রাচে ভর দিয়ে চলাফেরা করেন তিনি। বর্তমানে কেরানীগঞ্জের চর রুহিতপুরের একটি ভাড়া বাসায় থাকেন আকবর।

২১ আগস্টের গ্রেনেড হামলায় আহত হয়ে পঙ্গুত্বের বোঝা নিয়ে দুর্বিষহ জীবন কাটাচ্ছেন আওয়ামী লীগের আরো অনেক নেতাকর্মী। কেউ চলার শক্তি হারিয়েছেন, কেউ হারিয়েছেন দৃষ্টিশক্তি। এখনো অনেকের শরীরে রয়ে গেছে অসংখ্য স্প্লিন্টার। সব মিলিয়ে অসহ্য যন্ত্রণা বয়ে বেড়াচ্ছেন এ মানুষগুলো।  

২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলায় আহতদের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যাবতীয় সাহায্য সহযোগিতা করেছেন। অনেককে এখনো তিনি চিকিৎসা ও ওষুধ খরচ দিচ্ছেন। ছেলে-মেয়েদের পড়াশোনার ব্যবস্থা করছেন। অনেক হতাহতের স্বামী, স্ত্রী বা সন্তানদের চাকরি দিয়েছেন। ছেলেমেয়েদের চাকরি দিয়েছেন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কারণে গ্রেনেড হামলায় আহতদের তেমন আর্থিক সমস্যা না থাকলেও শারীরিকভাবে ভালো নেই কেউ।

ডেইলি বাংলাদে/এসআই