Exim Bank Ltd.
ঢাকা, বৃহস্পতিবার ২০ সেপ্টেম্বর, ২০১৮, ৫ আশ্বিন ১৪২৫

ইরিনা স্যান্ডলার

এক সাহসী হৃদয়ের গল্প

হাসিব শাহ আমানডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম
এক সাহসী হৃদয়ের গল্প
ইরিনা স্যান্ডলার

পোল্যান্ড দখল করার মধ্য দিয়েই শুরু জার্মানদের ইউরোপ দখলের অভিযান, শুরু হয় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ। পোল্যান্ড থেকেই শুরু হয় ইহুদি নিধন। এবং শুধু পোল্যান্ডেই নয়, জার্মান অধিকৃত কোথাও ইহুদিদের সাহায্য করাকে সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ ছিল। এমনকি এক্ষেত্রে মৃত্যুদণ্ডের আইন পর্যন্ত রাখা হয়। শুধুমাত্র যে ব্যক্তি সাহায্য করবে তারই মৃত্যুদণ্ড নয়, বরং তার পুরো পরিবারের জন্যই এই শাস্তির বিধান রাখা হয়। অনিবার্য বিপদের শঙ্কা সত্ত্বেও মানবাধিকারকির্মী ইরিনা স্যান্ডলার সব ঝুঁকি মোকাবিলা করে কমপক্ষে আড়াই হাজার শিশুর প্রাণ রক্ষা করতে সক্ষম হন। নারী ‘অস্কার শিন্ডলার’ নামে পরিচিত ইরিনা কাজ শুরু করেন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পূর্ব থেকেই। তিনি পোল্যান্ডের সমাজ কল্যাণ বিভাগে চাকুরি করতেন।

ইহুদিদের দূর্দশা দেখে তাদের জন্য কিছু করার চিন্তা করেন তিনি ও তাঁর সহকর্মীরা। যার পরিপ্রেক্ষিতে তৈরি হয় আন্ডারগ্রাউন্ড সংগঠন “জোলান্টা”। ইহুদি পরিবারগুলোর জন্য নকল কাগজ-পত্রের যোগাড় শুরু করে সংগঠনটি। ৪ বছর যুদ্ধ চলাকালীন সময়ে তাঁরা প্রায় ৩ হাজার পরিবারের জন্য মিথ্যা পরিচয় প্রদানের কাজ করেন। এমনকি ১৯৪১ সালে মৃত্যুদণ্ডের বিধান চালুর পরও তাঁদের এ কাজে ছেদ পড়েনি। ১৯৪৩ সালে ইরিনা সংগঠনের “শিশু রক্ষা বিভাগের” প্রধান হিসেবে নিযুক্ত হন।

সমাজ কল্যাণ বিভাগে কাজ করায় ইরিনার ওয়ারশ শহরেরর বস্তি এলাকায় প্রবেশের অনুমতি ছিল। সে সময়ে পুরো বস্তিতে টাইফয়েড ছড়িয়ে পড়ে। জার্মান সৈন্যদের মাঝেও এ রোগ ছড়ানোর আশংকা দেখা যায়। এই ভয় থেকে নাজি বাহিনী ডাক্তারদের প্রবেশের, রোগের নমুনা পরিদর্শন এবং চিকিৎসার অনুমতি দিত। এই সুযোগকেই দারুণভাবে কাজে লাগান ইরিনা ও তাঁর দল। তাঁরা টাইফয়েড কতটুকু ছড়িয়ে পড়েছে এবং অবস্থা পরিদর্শনের নাম করে ডাক্তারের বেশে বস্তিতে প্রবেশ করতেন এবং শিশুদের বের করে নিয়ে আসতেন। তাঁরা সাধারণত অ্যাম্বুলেন্স ও ট্রামে করে শিশুদের বের করে নিতেন। তবে অবস্থা বুঝে তাঁরা বিভিন্ন প্যাকিং এর নাম করে সেই প্যাকেট এমনকি স্যুটকেসে করেও শিশুদের পাচার করতেন। এভাবে করে কমপক্ষে ২৫০০ শিশুকে তাঁরা বের করে আনতে সক্ষম হন, যাদের মাঝে কমপক্ষে ৪০০ জনকে ইরিনা নিজেই উদ্ধার করেন।

উদ্ধারকৃত শিশুদের সংখ্যা বেড়ে গেলে তারা কাজের ধরণে পরিবর্তন আনেন। শিশুদের তখন পোলিশ খ্রিস্টান পরিবারগুলোতে হস্তান্তর করা হত, সে সব শিশুদের খ্রিস্টান নামও দেয়া হত। খ্রিস্টান পরিবারের মাঝে রেখে তাদেরকে খ্রিস্টান ধর্মের প্রার্থনার কৌশলও শেখানো হত। যদি তাদের পরীক্ষা করে দেখা হয় সেক্ষেত্রে যেন শিশুরা উতরে যেতে সক্ষম হয়। কিছু শিশুদের পাঠানো হত ওয়ারশের খ্রিস্টান পরিচালিত এতিমখানাগুলোতে অথবা রোমান ক্যাথলিক কনভেন্ট বা স্কুলগুলোতে। যেসব স্থানেও শিশুদের খ্রিস্টান নাম দেয়া হয় এবং বিভিন্ন খ্রিস্টান রীতি শেখানো হত।

ইরিনা স্যান্ডলারের মুখ্য উদ্দেশ্য ছিল শিশুদের নিরাপদে রাখা এবং যুদ্ধ শেষে তাদেরকে পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা। এজন্য তিনি উদ্ধারকৃত শিশুদের আদ্যেপান্ত অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে লিখে রাখতেন। শিশুদের পরিবারের নাম, তাদের আসল নাম-পরিচয়, নতুন নাম ও পরিচয় ইত্যাদি সব কিছুই রেকর্ডে রাখা হত। তিনি এ সংক্রান্ত সকল নথি কাঁচের পাত্রে জমা করে তা মাটির নিচে পুঁতে রাখেন। যেন ভুল কারো হাতে না পড়ে এবং কোনোভাবে কাগজগুলোও নষ্ট না হয়। ১৯৪৩ সালের শেষের দিকে ইরিনা গেস্টাপোর কাছে ধরা পড়েন। এরপর তাঁর উপর চলে নির্মম নির্যাতন। সবকিছু সত্ত্বেও তিনি সকল শিশুর পরিচয় গোপন রাখতে সক্ষম হন। এমনকি তিনি তার কোনো সহকর্মীর নাম বা পরিচয়ও গেস্টাপো বাহিনীর কাছে প্রকাশ করেন নি।

তার কাজগুলো মৃত্যু পরোয়ানা জারির জন্য যথেষ্ট এবং গেস্টাপো তাঁকে মৃত্যুদণ্ড দেয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়ার কিছুদিন পূর্বে তার সংগঠনের কয়েকজন সহকর্মী বিভিন্ন তদবির করে উচ্চপদস্থ একজন গেস্টাপো অফিসারের সঙ্গে দেখা করে ঘুষ প্রদানের মাধ্যমে ইরিনাকে বের করে আনেন। মৃত্যুমুখ থেকেই বেঁচে ফিরেও ইরিনা একই কাজে ফিরে যান এবং যেগোটাতে নতুন নামে, নতুন পরিচয়ে আবারো যোগ দেন। যুদ্ধের পর তিনি সেবিকার (নার্স) পেশা গ্রহণ করেন। পাশাপাশি পুরোদমে উদ্ধারকৃত শিশুদের স্ব-স্ব পরিবারে ফিরিয়ে দেয়ার চেষ্টা চালাতে থাকেন। কিন্তু শিগগিরিই যে দুঃখজনক ব্যাপারটি উপলব্ধি করেন তা হল, এ শিশুদের প্রায় প্রত্যেকের পরিবারকেই “ট্রেবলিঙ্কা কনসেট্রেশন ক্যাম্পে” মেরে ফেলা হয়েছে অথবা পরিবারগুলো নিখোঁজ।

১৯৬৫ সালে ইসরায়েল থেকে তাকে ‘পোলিশ রাইশিয়াস অ্যামং দ্য নেশনস’ সম্মাননায় ভূষিত করা হয়। তবে এ পুরষ্কার গ্রহণের জন্য তিনি ইসরায়েলে যেতে পারেন নি। কেননা তখন পোল্যান্ডের কম্যুনিস্ট সরকার ইসরায়েল গমনের বিষয়ে নিষিদ্ধতা আরোপ করে রাখে। অবশেষে ১৯৮৩ সালে তিনি ইসরায়েলে যাওয়ার অনুমতি পান এবং তখন এ পুরষ্কার গ্রহণ করেন।

২০০৩ সালে পোপ দ্বিতীয় জন পল ইরিনাকে চিঠি লিখে ব্যক্তিগতভাবে তাঁর কাজের জন্য ধন্যবাদ জানান। এবং উক্ত বছরের শেষের দিকে তাকে পোলিশ সর্বোচ্চ বেসামরিক খেতাব‘ অর্ডার অব হোয়াইট ঈগল’-এ ভূষিত করা হয়। আমেরিকান সেন্টার ফর পোলিশ কালচার তাকে জান কারস্কি খেতাবে ভূষিত করে “সাহসিকতা ও সুহৃদ” এর জন্য। অনেক পুরষ্কার ও নানান সম্মানে ভূষিত হওয়ার পরও ইরিনা ইহুদিদের প্রতি তাঁর অবদানের ব্যাপারে নিরহংকার থাকেন।

২০০৭ সালে দেয়া একটি সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, “বিশ্বাস করি একজন ডুবন্ত মানুষকে অবশ্যই রক্ষা করতে হবে তার ধর্ম, জাতীয়তা সব কিছুর সীমানাকে উপেক্ষা করে। “হিরো” নামক শব্দটিতে প্রচণ্ড বিরক্তবোধ করি। করেছি সবটুকুই বিবেকের তাড়না থেকেই করেছি। হিরো সবসময় অনন্য, অসাধারণ কাজ করেন। আমার কাজটা অসাধারণ ছিল না, সাভাবিক ছিল।” ২০০৮ সালে ৯৮ বছর বয়সে ইরিনা স্যান্ডলার তাঁর শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।

ডেইলি বাংলাদেশ/জেএমএস/এসজেড

আরোও পড়ুন
সর্বাধিক পঠিত
শিস দিয়েই দুই বাংলার তারকা জামালপুরের অবন্তী
শিস দিয়েই দুই বাংলার তারকা জামালপুরের অবন্তী
সুজির মালাই পিঠা
সুজির মালাই পিঠা
আশুরার রোজা: নিয়ম ও ফজিলত
আশুরার রোজা: নিয়ম ও ফজিলত
তরুণীদের বেডরুমে নেয়ার পর হত্যা করাই কাজ
তরুণীদের বেডরুমে নেয়ার পর হত্যা করাই কাজ
অবন্তী সিঁথির জয়জয়কার
অবন্তী সিঁথির জয়জয়কার
যদি তুমি রুখে দাঁড়াও তবেই তুমি বাংলাদেশ!
যদি তুমি রুখে দাঁড়াও তবেই তুমি বাংলাদেশ!
যৌনতায় ঠাসা ৫টি সিনেমা
যৌনতায় ঠাসা ৫টি সিনেমা
সূরা আল নাস এর গুরুত্ব ও ফজিলত
সূরা আল নাস এর গুরুত্ব ও ফজিলত
‘তারেকের তিন গাড়ি, আমার বোন চলে বাসে’
‘তারেকের তিন গাড়ি, আমার বোন চলে বাসে’
শচীনের সঙ্গে অভিনেত্রীর ‘গোপন’ সম্পর্ক!
শচীনের সঙ্গে অভিনেত্রীর ‘গোপন’ সম্পর্ক!
বিয়ে ছাড়াই মা হলেন জিৎ-এর প্রেমিকা!
বিয়ে ছাড়াই মা হলেন জিৎ-এর প্রেমিকা!
নিককে প্রকাশ্যে চুমু খেলেন প্রিয়াঙ্কা
নিককে প্রকাশ্যে চুমু খেলেন প্রিয়াঙ্কা
ন্যান্সি ও তার স্বামীকে গ্রেফতারের দাবি
ন্যান্সি ও তার স্বামীকে গ্রেফতারের দাবি
সূরা বাকারার শেষ অংশের ফজিলত
সূরা বাকারার শেষ অংশের ফজিলত
‘শাহরুখ’ আর রেডি গোয়িং টু জাহান্নাম!
‘শাহরুখ’ আর রেডি গোয়িং টু জাহান্নাম!
মিলনে ‘অপটু’ ট্রাম্প, বোমা ফাটালেন এই পর্নো তারকা!
মিলনে ‘অপটু’ ট্রাম্প, বোমা ফাটালেন এই পর্নো তারকা!
বিবাহিতা বা সন্তানের মা হলে ১০ লাখ জরিমানা!
বিবাহিতা বা সন্তানের মা হলে ১০ লাখ জরিমানা!
‘পবিত্র আশুরা’
‘পবিত্র আশুরা’
এ কেমন কাণ্ড পুলিশ পুত্রের!
এ কেমন কাণ্ড পুলিশ পুত্রের!
কাকে বিয়ে করবেন?
কাকে বিয়ে করবেন?
শিরোনাম:
এশিয়া কাপে পাকিস্তানকে হারিয়ে ভারতের জয় এশিয়া কাপে পাকিস্তানকে হারিয়ে ভারতের জয় আদালতে হাজির হওয়ার মতো সুস্থ নন খালেদা জিয়া: অ্যাডভোকেট মাসুদ তালুকদার আদালতে হাজির হওয়ার মতো সুস্থ নন খালেদা জিয়া: অ্যাডভোকেট মাসুদ তালুকদার এক শতাংশ প্রতিবন্ধী কোটা রাখার পরামর্শ সংসদীয় কমিটির এক শতাংশ প্রতিবন্ধী কোটা রাখার পরামর্শ সংসদীয় কমিটির সুষ্ঠু নির্বাচন হলে সরকারের অস্তিত্ব থাকবে না: ফখরুল সুষ্ঠু নির্বাচন হলে সরকারের অস্তিত্ব থাকবে না: ফখরুল আগামী নির্বাচনের মাধ্যমে শৃঙ্খলমুক্ত হতে চান এরশাদ আগামী নির্বাচনের মাধ্যমে শৃঙ্খলমুক্ত হতে চান এরশাদ অক্টোবরের শেষ সপ্তাহে নির্বাচনকালীন সরকার: কাদের অক্টোবরের শেষ সপ্তাহে নির্বাচনকালীন সরকার: কাদের রোহিঙ্গাদের কারণে কক্সবাজারে পরিবেশ বিপর্যয়, এইডস ও সংঘবদ্ধ অপরাধের ঝুঁকি তৈরি হয়েছে: সংসদে প্রধানমন্ত্রী রোহিঙ্গাদের কারণে কক্সবাজারে পরিবেশ বিপর্যয়, এইডস ও সংঘবদ্ধ অপরাধের ঝুঁকি তৈরি হয়েছে: সংসদে প্রধানমন্ত্রী ইস্কাটনে জোড়া হত্যা; এমপিপুত্র রনির বিরুদ্ধে মামলার রায় ৪ অক্টোবর ইস্কাটনে জোড়া হত্যা; এমপিপুত্র রনির বিরুদ্ধে মামলার রায় ৪ অক্টোবর