Alexa এক রাখাল সাহাবির তাওহিদের প্রতি বিশ্বাস ও শাহাদাতের গল্প

ঢাকা, মঙ্গলবার   ২২ অক্টোবর ২০১৯,   কার্তিক ৬ ১৪২৬,   ২২ সফর ১৪৪১

Akash

এক রাখাল সাহাবির তাওহিদের প্রতি বিশ্বাস ও শাহাদাতের গল্প

শেষ পর্ব

নুসরাত জাহান  ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ১৮:৪৩ ২ অক্টোবর ২০১৯  

ছবি: ডেইলি বাংলাদেশ

ছবি: ডেইলি বাংলাদেশ

হজরত আদম (আ.) থেকে নিয়ে হজরত রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পর্যন্ত সকল নবী-রাসূল একটিমাত্র মৌলিক বিষয়ের ওপর পৃথিবীবাসীকে দাওয়াত দিয়েছিলেন।

তারা সকলেই তাওহিদ ও একত্ববাদের ওপর মানুষকে আহ্বান করেছিলেন। এ যাবত পৃথিবীতে যেসব জাতি-গোষ্ঠীর ওপর আল্লাহ তায়ালার পক্ষ হতে আসমান থেকে আজাব-গজব নাজিল হয়েছে, সে কেবল তাওহিদ প্রত্যাখ্যান করার করণেই। আম্বিয়ায়ে কেরাম যত কষ্ট-ক্লেশ ও জুলুম-নির্যাতন সয়েছেন তাও এই তাওহিদের বাণী প্রচার করার নিমিত্তেই। এ এমন এক বুনিয়াদি আকিদা, যাকে ইসলাম ও আল্লাহ তায়ালার দ্বীনের মূল স্তম্ভ বলা হয়ে থাকে।

আরো পড়ুন>>> এক রাখাল সাহাবির তাওহিদের প্রতি বিশ্বাস ও শাহাদাতের গল্প পর্ব-১

ইসলামের মর্ম হলো, আল্লাহ তায়ালাকে মাবুদ স্বীকার করে। অন্যসকল উপাস্যকে অস্বীকার করা। সকল মাবুদ থেকে নিজের সম্পর্কহীনতার কথা ঘোষণা করা। আল্লাহ তায়ালা ব্যতীত কারো হুকুম পালন না করা।

ওলামায়ে কেরাম লিখেছেন, তাওহিদ দুই প্রকার। এক. তাওহিদে ইতেকাদি বা আকিদাগত তাওহিদ। দুই. তাওহিদে আমলি বা কর্মগত তাওহিদ। আকিদাগত তাওহিদের মর্ম হলো, মানুষ এ কথার ওপর বিশ্বাস স্থাপন করবে যে, আল্লাহ ব্যতীত কোনো শ্রষ্টা নেই। কোনো মাবুদ নেই। ইবাদতের উপযুক্ত কোনো সত্তা নেই। আল্লাহ তায়ালার জাত ও সিফাতের মধ্যে কোনো শরিক নেই। আল্লাহ তায়ালার সত্তা ও গুণাবলীর মধ্যে কোনো অংশীদার নেই। আল্লাহ তায়ালার জাত ও সত্তায় কাউকে শরিক সাব্যস্ত না করার অর্থ হলো, আল্লাহ ব্যতীত কাউকে মাবুদ ও ইবাদতের উপযুক্ত মনে করা যাবে না। সিফাত ও গুণাবলীতে কাউকে শরিক সাব্যস্ত না করার অর্থ হলো, আল্লাহ তায়ালার যেসকল সিফাত ও গুণাবলী তাঁর সত্তার সঙ্গেই সীমাবদ্ধ সেসব বিষয়ে অন্য কাউকে শরিক না করা।

উদাহরণত, আল্লাহ তায়ালা রিজিক দান করেন। তিনি রাজ্জাক। রিজিক দান করার এই সিফাত অন্যকাউকে শামিল না করা। আল্লাহ তায়ালার কুদরতি কবজায় প্রত্যেক মানুষের লাভ-ক্ষতি নিহিত আছে। এই লাভ-ক্ষতি আল্লাহ তায়ালারই কবজায় এ কথা বিশ্বাস করা। তিনি ব্যতীত অন্যকাউকে লাভ ও ক্ষতির জিম্মাদার সাব্যস্ত না করা। আল্লাহ তায়ালার কুদরতি কবজায় অসুস্থতা ও সুস্থতা নিহিত রয়েছে। তাই অসুস্থতা ও সুস্থতাকে আল্লাহ তায়ালা ব্যতীত অন্যকারো সঙ্গে সম্বন্ধযুক্ত না করা। মোটকথা, আল্লাহ তায়ালার যেসকল সিফাত ও গুণাবলী আছে তার কোনোটিতেই অন্যকে শরিক সাব্যস্ত না করা।

এ বিষয়টি এই জন্য আরো ব্যাখ্যার দাবি রাখে যে, আল্লাহ তায়ালার জাতের সঙ্গে শরিক সাব্যস্ত করার বিষয়ে বর্তমান দুনিয়ার অধিকাংশ ধর্মেই ভ্রান্তি রয়েছে। নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসালামকে যে সব কাফের-মুশরিকের প্রতি প্রেরণ করা হয়েছে, তিনি যখন তাদেরকে তাওহিদের দাওয়াত দিয়েছেন, তারা বলত যে, সৃষ্টিকর্তা আল্লাহ ছাড়া আর কেউ নেই এ কথা আমরাও বলি। তারা এও মানতো যে, আল্লাহ তায়ালা এই মহাবিশ্ব সৃষ্টি করেছেন। এ মহাবিশ্বের সবকিছু তিনিই সৃষ্টি করেছেন। আমাদেরকেও তিনি সৃষ্টি করেছেন। তবে তারা আল্লাহর সিফাতের সঙ্গে কিছু দেব-দেবীকে শরিক মানত। তারা বলত, রিজিকের দায়িত্ব আল্লাহ তায়ালা অমুক দেবতার কাছে সোপর্দ করেছেন। বৃষ্টির দায়িত্ব দিয়েছেন অমুক দেবতাকে। রোগমুক্তির দায়িত্ব দিয়েছেন অমুক দেবতাকে। এভাবে তারা আল্লাহ তায়ালার অন্যান্য সিফাতের মধ্যেও বিভিন্ন দেবতাকে শরিক করার অপরাধে অপরাধী ছিল। এ জন্যই তাদেরকে মুশরিক বলা হয়। কোরআনুল কারিম বলছে, যদি আপনি তাদেরকে জিজ্ঞাসা করেন, আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবীকে সৃষ্টি করেছেন? তারা বলবে, আল্লাহ। এরপর আল্লাহ তায়ালা বলেন, আল্লাহ ছাড়া কোনো খালেক নেই, এ কথা মানা সত্তেও তোমরা তাঁর সিফাতে অন্যদেরকে শরিক সাব্যস্ত করছ? (সূরা নামল, আয়াত ৬০) এটা কোনো জ্ঞান ও বুদ্ধিমত্তার কাজ না।

এ কারণে আকিদাগত তাওহিদ তখনি পূর্ণাঙ্গতা লাভ করে, যখন আল্লাহ তায়ালার জাতের সঙ্গেও কাউকে শরিক সাব্যস্ত করা হবে না এবং তাঁর সিফাতের মাঝেও কাউকে শরিক সাব্যস্ত করা হবে না। অর্থাৎ, মানুষ ইবাদত করলে একমাত্র আল্লাহর ইবাদত করবে। মাবুদ মানলে আল্লাহকেই মানবে। কোনো কিছুর প্রয়োজন হলে আল্লাহর কাছেই প্রার্থনা করবে। মুশকিল আসানকারী, রিজিকদাতা, রোগনিরাময়কারী আল্লাহ তায়ালা ব্যতীত অন্য কাউকেই মনে করবে না। এই হলো পূর্ণাঙ্গ তাওহিদ। হজরত আদম (আ.) থেকে নিয়ে হজরত রাসূলে কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পর্যন্ত সকল নবী-রাসূল এরই প্রতি মানুষকে দাওয়াত দিয়েছেন।

তাওহিদের দ্বিতীয় প্রকার হলো তাওহিদে আমলি বা কর্মগত তাওহিদ। তাওহিদে আমলির মর্ম হলো, আল্লাহ ছাড়া কোনো মাবুদ নেই। এ বিশ্বাস মানুষের ব্যবহারিক জীবনে এমনভাবে মিশে যাবে যে, প্রতিমুহূর্তে তার সামনে জ্বলজ্বল করবে যে, আল্লাহ তায়ালা ব্যতীত কেউ আমার ক্ষতিসাধন করতে পারবে না। আমার উপকারও করতে পারবে না। আল্লাহ তায়ালা ছাড়া আনুগত্য করার উপযুক্ত কেউ নেই। আমাকে আল্লাহর হুকুমেরই আনুগত্য করতে হবে। আল্লাহ তায়ালার হুকুম পালনের জন্য যে কোনো কোরবানি পেশ করতে আমার কোনো দ্বিধা থাকবে না। এই বিশ্বাস যখন মানুষের জীবনে মিশে যায়, সুফিয়ায়ে কেরামের পরিভাষায় তখন বলা হয়, তার তাওহিদে আমলির মাকাম অর্জিত হয়েছে।

তাওহিদে আমলির ফল এই দাঁড়ায় যে, মানুষ তার জীবনের প্রতিক্ষেত্রে, প্রতিমুহূর্তে আল্লাহ তায়ালার হুকুমকে চোখের সামনে রাখে। সে প্রতি-পদক্ষেপে চিন্তা করে, আমার এই পদক্ষেপে আল্লাহ তায়ালা সন্তুষ্ট হবেন নাকী অসন্তুষ্ট হবেন? আমার এ কাজের দ্বারা আল্লাহ তায়ালার নাফরমানি হয়ে যাবে না তো? যদি নাফরমানির আশঙ্কা থেকে থাকে তা হলে সে সেই পদক্ষেপ থেকে বিরত থাকে। সে আল্লাহ ব্যতীত কাউকে ভয় করে না। কারো কাছে কিছু প্রত্যাশাও করে না। আল্লাহ তায়ালার হুকুমের বিরুদ্ধাচরণ করার জন্য কেউ যদি তার পদতলে রাজ্যের ধন-সম্পদ এনে স্তুপ করে, তা হলে সেই সম্পদও তার দৃঢ়তাকে টলাতে পারে না। সে কিছুতেই আল্লাহ তায়ালার হুকুমের বিরুদ্ধাচরণ করতে পারে না। কেউ যদি তার ওপর চরম জোরজবরদস্তি করে কিংবা সে যদি চোখের সামনে মৃত্যুর পরোয়ানা দেখতে পায়, এর পরও সে বিশ্বাস করে জীবন ও মৃত্যু, সুস্থতা ও অসুস্থতা সবকিছু আল্লাহর কুদরতি কবজায়। যদি তিনি আমার মৃত্যুর জন্য এই সময়ই নির্ধারণ করেন তবে তা কেউ ঠেকাতে পারবে না। যদি আমার জীবন অবশিষ্ট থাকে তা হলে কেউ আমাকে মৃত্যুর হাওয়ালা করতে পারবে না। এ কারণে সে কখনোই কোনো ভয়-ভীতি, জুলুম ও জবরদস্তির কারণে আল্লাহ তায়ালার হুকুমের বিরুদ্ধাচরণ করার ইচ্ছা করে না। শেখ সাদি বড় চমৎকার বলেছেন-
موحد چہ بر پائی ریزی زرش
چہ شمشیر ہندی نہی بر سرش
امید و ہر اسش نباشد نہ کس
بریں است بنیاد توحید و بس
তাওহিদাবাদীর বিশ্বাসের দৃঢ়তা এই হয় যে, যদি তোমরা তার পদতলে পৃথিবীর সকল সম্পদ জমা কর কিংবা তার মাথার ওপর হিন্দি তরবারি ঝুলিয়ে দাও, আল্লাহ ব্যতীত অন্যকারো প্রতি সে ভরসা করে না। আল্লাহ ব্যতীত অন্যকাউকে সে ভয়ও করে না। এটাই তাওহিদের ভিত্তি ও বুনিয়াদ।

নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ঘটনা আপনি শুনে থাকবেন। ঘটনাটি এক যুদ্ধ থেকে ফেরার পথে ঘটেছিল। ভরদুপুরে যাত্রাবিরতি দিয়ে নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসালাম একটি গাছের ছায়ায় আরাম করছিলেন। শত্রু পক্ষের একলোক এ সময় হঠাৎ উদয় হলো। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের তরবারিটি তখন গাছের ডালে ঝুলে ছিল। লোকটা নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের তরবারিটি হাতে নিয়ে তার ঘুম ভাঙিয়ে বলল, আমার তরবারি থেকে এখন তোমাকে কে রক্ষা করবে? নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জেগে উঠেই দেখলেন, একলোক উদ্যত তলোয়ার নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। সাধারণত এই পরিস্থিতিতে মানুষ হতভম্ব হয়ে যায়। লোকটা ছিল খুনের নেশায় উন্মত্ত এক কাফের। হাতে খাপমুক্ত তলোয়ার। নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ওপর খারাপ উদ্দেশ্য নিয়ে হামলা করতে এসেছে। কিন্তু এর পরও নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অত্যন্ত প্রশান্তচিত্তে উত্তর দিলেন, আল্লাহ। আমাকে আল্লাহ তায়ালা রক্ষা করবেন।

এ কথার অর্থ ছিল, যদি এই মুহূর্তে আমাকে মৃত্যুদান করাই আল্লাহ তায়ালার মনজুর হয় তা হলে দুনিয়ার কোনো শক্তিই আমাকে রক্ষা করতে পারবে না। আর যদি আল্লাহ তায়ালা আমার হায়াত অবশিষ্ট রাখেন, তা হলে তোমার এই তলোয়ার, তোমার এই দুশমনি আমার এতটুকু ক্ষতি করতে পারবে না। এই উত্তর তিনি এতটা আস্থা ও বিশ্বাসের সঙ্গে দিয়েছিলেন, সেই আস্থা ও বিশ্বাস শত্রুর অন্তরে কাঁপুনি ধরিয়ে দেয়। তার হাতের তলোয়ার মাটিতে পড়ে যায়।

এবার নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তলোয়ারটি হাতে নিয়ে বললেন, এবার বল তোমাকে এই তলোয়ার ও এর হামলা থেকে কে রক্ষা করবে? লোকটির কাছে এর কোনো উত্তর ছিল না। নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসালাম তাকে ছেড়ে দিলেন। লোকটি নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আস্থা, বিশ্বাস ও তাওয়াক্কুলের দৃঢ়তা দেখে ইসলাম কবুল করে মুসলমান হয়ে যান। (সহিহ বুখারি, সহিহ মুসলিম, মুসনাদে আহমদ)

আমার বক্তব্যের উদ্দেশ্য হলো, তাওহিদে আমলি তখনি বলা হয়, যখন মানুষ তার জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে এই বিষয়কে সামনে রাখে যে, লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ বলার পর আমি আমার প্রভুর সঙ্গে একটি প্রতিজ্ঞা করেছি। সেই প্রতিজ্ঞার দাবি হলো, আমি আমার জীবনের যে কোনো পদক্ষেপে তাঁর কোনো হুকুমের বিরুদ্ধাচরণ করব না। যখন মানুষের এই মাকাম অর্জিত হয়, তখন একেই তাওহিদে আমলি বলা হয়। প্রকৃতপক্ষে এটাই সে মাকাম, যা মানুষের জীবনে বিপ্লব সৃষ্টি করে। একজন মানুষকে জাহান্নাম থেকে বের করে জান্নাতে পৌঁছে দেয়। আল্লাহর অপ্রিয় থেকে প্রিয় বান্দা বানিয়ে দেয়।
 
তাওহিদে আমলি অর্জন করার তরিকা হলো, মানুষ সর্বপ্রথম এ কথা জানার চেষ্টা করবে যে, এই প্রতিজ্ঞা করার পর আমার ওপর কোন কোন দায়িত্ব ও জিম্মাদারি অর্পিত হয়েছে। আল্লাহ তায়ালা আমার ওপর কোন কোন বিধি-নিষেধ আরোপ করেছেন। জানতে হবে তিনি আমাদেরকে কোন কোন বিষয় পরিহার করতে বলেছেন। প্রথম কর্তব্য হলো এই বিষয়গুলো জানা। এ জন্যই নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, 
طَلَبُ الْعِلْمِ فَرِيْضَةٌ علي كُلِّ مُسْلِم
প্রত্যেক মুসলমানের ওপর (ইমান আনার পর প্রথম) দায়িত্ব হলো, সে ইলম অন্বেষণ করবে। (সুনানে ইবনে মাজাহ)

সে জানার চেষ্টা করবে, কিসে আল্লাহ তায়ালা সন্তুষ্ট হবেন এবং কোন কাজে আলাহ তায়ালা অসন্তুষ্ট হবেন। যখন এই বিষয়গুলো মানুষ জানবে তখনই প্রকৃত তাওহিদের আনুগত্য সম্ভব হবে।

ডেইলি বাংলাদেশ/আরএজে